যাব, যাব করেও আর যাওয়া হয়ে উঠছিল না। রোজই একটা না একটা ছুতোয় নিজেকে গুটিয়ে রাখছিলাম ইচ্ছে করেই। মনের এই দোনোমনা ভাবটা আগাম আঁচ করতে পেরে গিন্নি ফোঁড়ন কেটে বলেন – বুড়োমিতে ধরেছে তোমাকে। এই কথার পরে নিশ্চিত ভাবে আর পিছিয়ে যাওয়া চলেনা। জয় মা বলে বেড়িয়েই পড়ি। বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই টোটো স্ট্যান্ড। সেখানে দাঁড়িয়ে কোরিয়া, বুড়ো, ঝন্টুরা কাতর দৃষ্টিতে প্যাসেঞ্জারের পথপানে তাকিয়ে আছে। উঠে বসলে ওদের পকেটে দুটো পয়সা আসে বটে, তবে ডাক্তারবাবু বলেছেন – রোজ রোদে পুড়ে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি করুন। নাহলে ওষুধ সেবন করতে হবে। আপাতত আরও খানিকটা হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
ইদানিং বেশ কয়েকটা সান্ধ্য টি ভি সিরিয়ালেই দেখছি হঠাৎ করে হামলে পড়া সংকট থেকে উত্তরণের আশায় সিরিয়ালের নায়ক অথবা নায়িকা গনগনে আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এসব দৃশ্য জুড়লে নাকি দর্শকদের সেন্টিমেন্টে বেশ খানিকটা সুড়সুড়ি দেওয়া যায়, সিরিয়ালের টি আর পি চড়চড় করে বেড়ে যায়। আগুনে গরমে তেতে থাকা রাস্তায় গুটিগুটি পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে আমারও তেমনি মালুম হলো। তাপদাহে সত্যিই অসহনীয় পরিস্থিতি।


দেশের আবহ দপ্তর ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে যে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যবর্তী সময়ে দেশের পূর্ব, মধ্য এবং উপদ্বীপীয় অংশের বিস্তির্ণ অংশে তাপদাহের স্থায়িত্ব স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই আশঙ্কার। এখনি থার্মোমিটারের পারদ ৪০ ডিগ্রির পাল্লা অতিক্রম করেছে এবং তা আরও ওপরে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মধ্য ভারতের অনেকগুলো জায়গায় দিন মানের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আপেক্ষিক আর্দ্রতার মাত্রা। বিজ্ঞানীদের মতে এই প্রবণতা সত্যিই উদ্বেগের।
আবহবিদরা এই দ্বৈত প্রভাব সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পাবার জন্য সাধারণ থার্মোমিটারের পরিবর্তে শুষ্ক ও আর্দ্র কুণ্ড থার্মোমিটারের সাহায্যে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো যে আমাদের দেহযন্ত্র এই শুষ্ক ও আর্দ্র কুণ্ড থার্মোমিটারের ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় স্বাভাবিক থাকতে পারে। এই তাপমাত্রায় ঘাম ঝরার বিষয়টি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তবে এমন পূর্বানুমানের বিষয়টি যে বাস্তবতা নির্ভর ছিল এমনটাও নয়।
আমেরিকার পেনসেলভেনিয়া স্টেট হিউম্যান হিউম্যান এনভায়রনমেন্টাল এজ থ্রেশহোল্ড (HEAT) এর পক্ষ থেকে করা এক গবেষণায় এই বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য উঠে এসেছে সম্পূর্ণভাবে হাতেকলমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে। হিউম্যান ভলান্টিয়ার বা মানুষী স্বেচ্ছাসেবকদের ভিন্ন ভিন্ন তাপ ও আর্দ্র প্রকোষ্ঠে রেখে যাচাই করা হয়েছে তাদের শারীরিক সক্রিয়তার মাত্রা। এখান থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। দেখা গেছে যে সম্পূর্ণ সুস্থ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তরতাজা যুবকদের তাপীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার স্বাভাবিক ক্ষমতা আর্দ্র ও শুষ্ক কুণ্ড থার্মোমিটারের তাপমান ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই দ্রুত কমতে থাকে। আগে এই তাপসীমা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে মনে করা হতো। গবেষকরা জানিয়েছেন যে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৬০% আপেক্ষিক আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরের সহজাত তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাটি অকার্যকর হয়ে পড়ে । এই অবস্থায় শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমাদের বাইরের উপায় অবলম্বন করতে হয়।
এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে সবথেকে ভুক্তভোগী মানুষেরা হলেন বয়স্ক ও শিশুরা। বয়স্ক মানুষদের এমনিতেই নানান ধরনের শারীরিক সমস্যার কারণে নানান ধরনের ওষুধপত্রের ওপর নির্ভর করতেই হয়। এইসব মানুষদের দেখভাল করার জন্য চিকিৎসকদেরও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এই সমস্যা তার সহনমাত্রাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে তা আগে থেকেই জানতে পারলে চিকিৎসকদের কাজ খানিকটা সহজ হয়– এমনটাই মনে করেন অধ্যাপক W Larry Kenney, গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য সঞ্চালক।
এই বছরের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমাদের শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি খরতাপের প্রভাব বিষয়ে প্রায় একই ধরনের সমীক্ষা চালিয়েছিল রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্ষয় দেওরাসের নেতৃত্বাধীন গবেষকরা। Climate Dynamics পত্রিকায় প্রকাশিত এই নিবন্ধটি থেকে জানা গেছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশের মানুষজন পশ্চিমের শুষ্ক তাপের প্রভাব নিয়ে যতটা সচেতন, শুষ্ক আর্দ্র তাপের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মোটেই সচেতন নন। বিগত ৮০ বছরের তাপীয় উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখিয়েছেন যে এই অসচেতনতার কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই বেশি। আমরা মানে অপেক্ষাকৃত আর্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারী আবাসিকরা কিন্তু এই বিষয়ে খুব সচেতন নই।
অথচ দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তরফ থেকে বারবার এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করে চলেছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে ১৯৮১ – ২০২০ পর্যন্ত সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন যে দেশের উপকূলীয় এলাকার শুষ্ক ও আর্দ্র কুণ্ড থার্মোমিটারের তাপমাত্রা ক্রমশই বাড়ছে।এই অবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনে বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ফলে আমরা একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরে পাই তেমনি কিছু আশঙ্কার মেঘও এসবের আড়ালে জমা হতে থাকে। গবেষকরা জানিয়েছেন যে এই সময়ে শারীরিক ঝুঁকির পরিমাণ স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় ১২৫% বেড়ে যায়। মৌসুমী বায়ুর বিদায় ক্ষণে এই ঝুঁকির সম্ভাবনা উত্তরভাগের অপেক্ষা দক্ষিণে সরে আসতে থাকে। মেঘের গভীরতা কমে গেলেও আর্দ্রতার মাত্রা আরও দীর্ঘায়িত হয় বিশেষ করে কেরলাম সহ দক্ষিণের উপদ্বীপীয় ভূখন্ডের ওপর। প্রায় ৭০% ভারতীয় এরফলে শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এই বছর অর্থাৎ ২০২৬ সাল সমস্ত পূর্ববর্তী রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাবে বলে মনে করছেন আবহবিদরা,তাই দুশ্চিন্তা কমছে না। ২০২৪ এর তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এই বছরের তাপপ্রবাহ। এই অবস্থার শিকার হতে হবে সকলকেই। প্রস্তুত হতে হবে আজই।














