দুর্গাপুরের ছাত্রীটির সঙ্গে ঘটা ঘটনা ঘিরে যা কিছু আলাপ-আলোচনা, তা দেখে ভয়াবহ লাগছে।
আলোচনা ঘুরে গেছে ধর্ষণ হয়েছে নাকি সহবাস, তার দিকে! যে শব্দটা উচ্চারণ করতে সবাই ভুলে যাচ্ছে, যথারীতি, তা হল ‘সম্মতি।’
হাঁসখালির ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ‘ওদের রিলেশন ছিল।’ এই মুহূর্তে কিন্তু পুলিস, প্রশাসন, মিডিয়া, সোশাল মিডিয়া— সকলেরই একটাই আলোচ্য। ‘ওদের রিলেশন ছিল কি ছিল না?’ এই বিবেচনা নিয়ে এঁরা নাকি ‘মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ’ চান। মুখ্যমন্ত্রী আর এঁদের মানসিকতার মধ্যে তফাতটা কোথায়? People deserve the CM they have got. She is just the face of the colllective.
মেন্স রাইটস বিশেষ-অজ্ঞ নন্দিনী ভট্টাচার্য এবিপি আনন্দতে এসে বলে যাচ্ছে, ‘ছেলে-মেয়েরা পড়তে আসবে, তারপর ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্ক হবে, তারপর ছেলেদের ফাঁসিয়ে দেবে।’
‘৩৬৫ দিন’ লিখছে, মেয়েটা সহবাসকে ধর্ষণ বলে চালাচ্ছে।
‘আজকাল’ বলছে, আগে সহবাস হয়েছে তারপর সম্ভবত ধর্ষণ।
বিরক্ত লাগছে। একমাত্র লিঙ্গ-আন্দোলনকারী ছাড়া খুব সহজ কথা কয়েকটা কথা বলার কোনো লোক নেই। সেই সহজ কথাগুলো সহজ করে বলে যাই।
১) মেয়েটি যদি রাতে তার পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে থাকে তবে বেশ করেছে।
২) মেয়েটি যদি তার পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে রাতে যৌনতা করতেও বেরিয়ে থাকে, তাহলেও বেশ করেছে।
৩) কিন্তু এমনও হতে পারে যে মেয়েটি ছেলেটির সঙ্গে বেরিয়েছিল, কিন্তু যৌনতার ইচ্ছা ছিল না। সেক্ষেত্রে জোর করে থাকলে তা ধর্ষণ।
৪) আবার এমনও হতে পারে যে ঘনিষ্ঠতার প্রথম দিকে অসুবিধে না হলেও পরে মানে প্রবেশের সময় মেয়েটির অস্বস্তি হয়েছে ও সীমানা লঙ্ঘন মনে হচ্ছে। সেক্ষেত্রেও তা ধর্ষণ।
৫) অন্য লোকগুলির সিমেন কেন পেতে হবে?
ভ্যাজাইনায় সিমেন পাওয়া গেলেই একমাত্র ধর্ষণ, এটা তো ২০১৩ সালের পরিবর্তিত ধর্ষণ আইন অনুযায়ী মানা হয় না! মাত্র একরকম ভাবে এবং শুধু অনুপ্রবেশমূলক ভাবে যে ধর্ষণ হয়, তা তো নয়!
৬) অন্য লোকগুলো কেন ওই দৃশ্যে উপস্থিত? তারা যদি ছেলে-মেয়েদুটোকে শাসিয়েও থাকে, তাহলে কোন অধিকারে? টাকা চেয়ে থাকলেও কোন অধিকারে? যৌনতা করতে গেলে টাকা দিতে হবে নাকি?
৭) ছেলেটি বেশ কিছুক্ষণ মেয়েটিকে ওই লোকগুলোর কাছে রেখে হস্টেলের গেটের কাছে ফিরে এসেছিল কেন? টাকা আনতে? নাকি পালিয়ে এসেছিল?
৮) ওইসময় মেয়েটির সঙ্গে ওরা কি করেছিল? যা করেছিল, তার মধ্যে পিনো-ভ্যাজাইনাল কার্য ছাড়া অন্য কোনো ভাবে শরীরের সীমানা লঙ্ঘন করে থাকলে, তার কী প্রমাণ পুলিস খুঁজছে? (যাতে সিমেন পাওয়া যায় না)
কী প্রমাণই বা পাবে ভাবছে?
নির্ভয়ার ঘটনায় রাম সিং-এর রাগের কারণ ছিল ছেলে-মেয়েদুটি ঘনিষ্ঠ ভাবে বসেছিল। ‘ও পেলে আমি কেন পাব না?’ এটা পুরুষদের গিড় মানসিকতা এরকম ক্ষেত্রে ভারতে৷ ওই লোকগুলির পক্ষে নিদেন শ্লীলতাহানি করা খুব অসম্ভব নয়।
৯) একটি মেয়ে ধর্ষণের অভিযোগ করেছে যখন, ঘটনার ঠিক পরেই তা করেছে যখন, তখন যদি শুধু বয়ফ্রেন্ডও দোষী হয়, তবে কেন ও কখন মেয়েটির মনে হল তার মর্যাদা, আত্মসম্মান, সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা পুলিস কীভাবে খতিয়ে দেখছে?
বন্ধুরা ফোন করে তার বাবাকে ডেকে এনেছে ভিন রাজ্য থেকে। সেই বাবা কি কনফিউজড হচ্ছেন না নিজে? একে তো বিজেপি হাইজ্যাক করে তাঁকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। রাজ্য সরকার রাজ্য ছাড়তে দিচ্ছে না। পুলিস বলছে ‘সম্পর্ক ছিল।’ কীভাবে মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন? ‘মুখ্যমন্ত্রী যেন ক্ষমা করে দেন’ এটাও শীর্ষক হয়ে গেল? ওটা ক্ষমতাবানের সামনে ক্ষমতাহীনের অসহায় হাতজোড় ছিল তো!
মেয়েটিই বা মাথা ঠাণ্ডা রাখছে কী ভাবে? বলা বাহুল্য রাখা সম্ভব নয়। এবং এই অবস্থায় সে যখন যা বলছে, সবই গণ্য হচ্ছে ‘বয়ান বদলানো’ হিসেবে। মনে রাখতে হবে আমি যত সহজে বলতে পারছি কনসেন্ট ভায়োলেশন হলেই ধর্ষণ, ও সেভাবে ভাবতে শেখেনি। ওভাবে ভাবতে কেউ ছোটবেলা থেকে শেখায় না।
মিডিয়া, সোশাল মিডিয়া, সেখানকার যত ইনফ্লুয়েন্সার, সরকার, পুলিস— সকলকে ভীষণ অশিক্ষিত লাগছে। মনে হয় বড় বড় করে লিখে রাস্তায় রাস্তায় হোর্ডিং টাঙানো উচিত:
“পূর্বসম্পর্কিত ব্যক্তিদের একজন আরেকজনের কনসেন্ট লঙ্ঘন করতে পারে। সেটা ধর্ষণ৷ ‘সম্পর্ক’ আর ধর্ষণ মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ নয়!”









