“সিংভূম জেলার বন – জঙ্গল ও পাহাড় শ্রেণী ভারতবর্ষের মধ্যে সত্যিই অপূর্ব। বেঙ্গল – নাগপুর রেলপথ হওয়ার আগে এই অঞ্চলে যাবার কোন সহজ উপায় ছিলনা। … গত ১৯৪৩ সালের নভেম্বর মাসে আমি মিঃ সিংহের সঙ্গে সিংভূমের বিখ্যাত সারাণ্ডা ফরেস্ট ভ্রমণ করি। …. মনোহরপুর থেকে মোটর ছেড়ে আমরা কোয়েনা বলে একটি পার্বত্য নদী পার হলুম। তারপর রাঙা মাটির আঁকাবাঁকা পথ এঁকেবেঁকে যেতে যেতে সাত – আট মাইল দূরবর্তী সপ্তশত শৈলযুক্ত সারাণ্ডা (Saranda of Seven Hundred Hills) অরণ্য প্রান্তরের নীল রেখার সঙ্গে মিশে গিয়েছে, পথের পাশে এখানে একটা ডুংরি (অনুচ্চ পাহাড়) ওখানে একটা ছোট শালবন, কোথাও বা একটা হো – অধিবাসীদের গ্রাম। … ” – বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বনে পাহাড়ে’।
“… গত ৯ ই তারিখে ঘাটশিলা থেকে বেরিয়ে রেলে এসেছি চাঁইবাসা, তারপর মি: সিংহের সঙ্গে মোটরে এসেছি ৬৭ মাইল কুমডি বাংলোতে। গুয়া ও নোয়ামুন্ডি হয়ে। গুয়া ছাড়িয়ে এই সাতাশ মাইলের মধ্যে কোন লোকালয় নেই – সারাণ্ডা অরণ্য, ছোটনাগপুরের সর্বাপেক্ষা নিবিড়তম অরণ্য। ….” – বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘ ‘ থালকোবাদে একরাত্রি ‘।
পাহাড় অরণ্য ঝর্না নদীতে মোহময়, খনিজ সম্পদে ভরা, জনজাতি অধ্যুষিত, অপরূপ সুবর্ণরেখা – দামোদর – কোয়েল বিধৌত প্রতিবেশী ঝাড়খণ্ড রাজ্য। ধলভূমগড়, ঘাটশিলা, বুরুডি, মুসাবনি, গালুডি, চান্ডিল, রাজরাপ্পা, হাজারীবাগ, কোডারমা, পত্রাতু, রাঁচি, পালামৌ, বেতলা, ম্যাক্সলাসকিগঞ্জ, নেতারহাট, মধুপুর, গিরিডি, দেওঘর, ম্যাসানজোর … কত সুন্দর সুন্দর ঘোরার জায়গা।
এখানকার পূর্ব সিংভূম, সরাইকেলা – খারসাওয়ান, রাঁচি, হাজারীবাগ, কোডার্মা, পালামৌ ইত্যাদি জেলা তো যাওয়া আর দেখা কিছুটা হল। কিন্তু ট্রেনে করে উপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া পশ্চিম সিংভূম এর অপার্থিব সৌন্দর্য অনুভব সম্ভব হয়নি। তাই এবারে বার্ষিক মিলন সভার পর আমাদের সামান্য পরিব্রজন সেখানে ।
মনোহরপুর পৌঁছে প্রথমে দক্ষিণ কোয়েল, কোয়েনা ও কারো নদী দর্শন। তারপর স্থানীয় ও সারাণ্ডা র জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাত্রা করে ওড়িশা সীমান্তবর্তী হাতিদের পাহাড় ‘ কিরিবুরু ‘ পৌঁছব। দেদার বৃক্ষ নিধন, পাহাড় জঙ্গল কেটে যথেচ্ছ খনি নির্মাণ ও খনন, সড়ক – রেল – নির্মাণ, নগরায়ন, রাষ্ট্র – মাওবাদী যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে অরণ্য ও বন্য প্রাণী কমে গেলেও এখনও ওখানে বেশ কিছু হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী রয়েছে।
ঝাড়খন্ড রাজ্যের পশ্চিম সিংভূম জেলার শেষ প্রান্তে ওড়িশার কেওনঝর জেলার সীমান্তে ছোটনাগপুর মালভূমির অন্তর্গত পাহাড়ের উপর ছোট্ট সুন্দর শহর কিরিবুরু। জনজাতি শব্দমালায় হাতিদের পাহাড়। Steel Authority of India Ltd. (SAIL) এর কিরিবুরুতে একটা (Kiriburu Iron Ore Mine অথবা KIOM) আর ১৩ কিমি দূরবর্তী জমাট বাধা মেঘের মত ঘন পাহাড় অরণ্য মেঘাতুবুরু তে আরেকটা (Meghatuburu Iron Ore Mine অথবা MIOM) লোহার খনি রয়েছে। কিছুটা দূরে ঝাড়খন্ডের গুয়া, নোয়ামুন্ডি তারপর ওড়িশার জোডা, গরুমহিষানি, বাদামপাহাড় অঞ্চল জুড়ে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি লৌহ আকরিক রয়েছে। SAIL ছাড়াও Tata Steel প্রমুখের নিজস্ব খনি আছে। এই খনিগুলি এবং অন্যান্য খনি থেকে ওড়িশার পারাদ্বীপ, অন্ধ্রের বিশাখাপতনম বন্দর থেকে চিন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ওমান প্রভৃতি দেশেও প্রচুর রপ্তানি হয়।
এই অঞ্চলে রয়েছে নানা ধরনের বৃক্ষ, পাখি, প্রজাপতি। প্রচুর সুদৃশ্য জল প্রপাত। নীলগিরি পর্বতের নীলাকরঞ্জি ফুলের মত এখানে রয়েছে হুতিতি ফুল, আট বছর পর পর ফোটে। আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রাচীন জনজাতি হো, মুন্ডা, এবং বিরহর, খড়িয়া দের কিছু গ্রাম। এই কোলহান অঞ্চলে হো, মুন্ডা রাই প্রধান জনজাতি।
কিরিবুরু, কোয়েনা, সামটা তিনটি রেঞ্জের মধ্যে কিরিবুরুর বন দপ্তরের ‘ ফরেস্ট রেস্ট হাউসে ‘ থেকে আমরা প্রকৃতির নিসর্গ সৌন্দর্য উপভোগ করব এবং থালকোবাদ, কুমুদি, বড়াইবুরু, শশাংবুরু, প্রভৃতি দেখে চাঁইবাসা, জামশেদপুর হয়ে ফিরব এরকমটি পরিকল্পনা।
কিরিবুরু যাওযার সবচাইতে ভালো উপায় হাওড়া থেকে সকাল ৬.২০ তে ‘ বড়বিল জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে ‘ চেপে দুপুর ১.২০ তে বড়বিল পৌঁছে অথবা তার আগের স্টেশন বড়া জামদা পৌঁছে ২০ / ২৩ কিমি সারান্ডার জঙ্গল পাহাড়ের পথে গাড়িতে কিরিবুরু পৌঁছনো।
আবার এই ট্রেনে দুপুর ১.৪০ এ রওনা দিয়ে রাত ৮.৫৫ নাগাদ হাওড়া ফেরা যায়। আবার পূব দিক থেকে ওড়িশার বাঁশপানি এবং পশ্চিমদিক থেকে মনোহরপুর স্টেশন দিয়েও যাওয়া যায়। আমাদের বড়বিল জনশতাব্দী ট্রেনেই ২০ ও ২৩ নভেম্বরের যাতায়াতের AC Chair Car এর টিকিট কাটা ছিল। ভেবেছিলাম আরামে এই অরণ্যসুন্দর অঞ্চলের চমতকার নিসর্গ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাব আসব। কিন্তু দেখা গেল ঐ জনশতাব্দী ট্রেনটি ইদানিং এত দেরি করে যাচ্ছে যে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে বা পরের দিন পৌঁছচ্ছে। অগত্যা বিকল্প ভাবতে হল। সফর সঙ্গী মুখার্জিদা খুব বিচক্ষণ ও সচেতন মানুষ, কর্মসূত্রে ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে উনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। মুখার্জিদাই যাতায়াত থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। উনি ১৯ নভেম্বর রাতের হাওড়া জগদলপুর (ছত্তিশগড়) সম্বলেশ্বরী এক্সপ্রেসের দুটি AC Three Tier টিকিট কাটলেন। মুখার্জি দার সঙ্গে আমরা নিশ্চিন্তে বহু জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি। যেরকম একবার ভালো পাহাড়ের কমলদার আমন্ত্রণ ছিল। মুখার্জিদা কি একটি সাধারণ ট্রেনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে খুব কম খরচে আমাদের বিখ্যাত ধলভূমগড় নিয়ে গেলেন। তারপর সেখানে শালবন, সাঁওতাল গ্রাম দেখে আমরা অপরূপা সুবর্ণরেখায় সূর্যাস্ত দেখলাম। পরেরদিন কুয়াশামাখা ভোরে রহস্যময় পরিত্যক্ত ধলভূমগড় রানওয়ে দেখে গালুদি হয়ে দলমা পাহাড় পেড়িয়ে দুয়ারসিনি দিয়ে পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের ভালো পাহাড়ে পৌঁছলাম।
রাত দশটা দশে ট্রেন ঠিক সময়েই ছাড়ল। অচিরেই সহযাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, তারপর প্রবল আড্ডা। মিঃ দাশগুপ্তর থেকে অনেক তথ্য পাওয়া গেল, সেইসঙ্গে কিরিবুরু ও সারাণ্ডা জঙ্গলের হাতি, ভালুক, চিতাবাঘ, নেকড়ে, বন্যবরাহদের গল্প। ওনারা রাত তিনটের দিকে টাটানগর নেমে যাওয়ার পর বাকি রাত আমরা গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম। পরেরদিন দু ঘন্টা দেরিতে সকাল ৫.৫৮ তে মনোহরপুর স্টেশন এ নামলাম। টাটানগর জংশন স্টেশনের পরের বড় স্টেশন সিনি জংশন থেকে একটা লাইন চাঁইবাসা হয়ে দক্ষিণ দিকে গিয়ে বড়বিল হয়ে ভুবনেশ্বর চেন্নাই গেছে, অন্য লাইনটি রাজখারসোয়ান জংশন, চক্রধরপুর, মনোহরপুর, রৌরকেল্লা জংশন হয়ে ঝরসুগুদা জংশন থেকে একদিকে নাগপুর – মুম্বাই অন্যদিকে সম্বলপুর জগদলপুর গেছে।
কুয়াশামাখা ভোরে মনোহরপুরে নেমে ভালো ঠাণ্ডা পেলাম। আগে থাকতে গাড়ি বলা ছিল। গাড়িতে করে বেশ কিছুটা গিয়ে কোয়েল নদীর সঙ্গে কারো নদীর সঙ্গম দেখলাম। কারো নদীর রং একটু লালচে। কুয়াশা ঢাকা পাখির ডাক ও ফুলের গন্ধ মাখা দারুন পরিবেশ। এরপর কিরিবুরু র দিকে রওনা দিলাম। জঙ্গল আর জঙ্গল। বিভিন্ন প্রজাতির দেশজ গাছ। কুয়াশা কেটে গিয়ে অপরূপ দৃশ্য। জঙ্গলের পরেই পাহাড়ের সারি। সুন্দর মসৃণ হাইওয়ে। গাড়ির সংখ্যা খুব কম। মাওবাদী বিরোধী অভিযানের অংশ হিসাবে সি আর পি এফ এর কোবরা বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল বাইকে করে টহল দিচ্ছে। কিছুক্ষণ অরণ্য মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর ছবির মত সুন্দর কোয়েনা নদী চোখে পড়ল। গাড়ি থেকে নামলাম। চোখ জুড়ানো নির্জন সৌন্দর্য। পাহাড় কেটে স্রোতস্বিনী কোয়েনা কলকল শব্দে বয়ে যাচ্ছে। এরপর উপত্যকা পথে বেশ কিছু জনজাতি গ্রাম চোখে পড়ল। পূর্ব সিংভূমে সাঁওতাল, রাঁচির দিকে মুন্ডা, আর এদিকটায় হো দের বাস। কিছু বিরহর, খেড়িয়া। একদা কোলহান রাজ্য। তবে আধুনিকতার প্রভাবে গ্রামগুলির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। একটা পর্যায়ের পর পাহাড়ের উপর গাড়ি ওঠা শুরু হল। দুদিকের সারাণ্ডার অরণ্য আরও ঘন হল। একটা সুন্দর মোড় পড়ল। Saddle Point। এখন সি আর পি এফ ক্যাম্প। মনোহরপুর থেকে ৫৪ কিমি এসে আমরা কিরিবুরু পৌঁছলাম। শহরের এক প্রান্তে অনেকটা জায়গা, বাগান, ওয়াচ টাওয়ার নিয়ে Kiriburu Forest Rest House। থাকার চমৎকার ব্যবস্থা। খাওয়ার বিষয়টি পৃথকভাবে বলতেই হয়। এখানকার রাঁধুনি বিভীষণ কুমার বেহরার অনবদ্য রান্না বিভিন্ন আমিষ – নিরামিষ পদ ঠাণ্ডার মধ্যে গরম গরম খেয়ে আমরা অভিভূত। কিরিবুরু তে সেভাবে হোটেল নেই। SAIL এর দুটি গেষ্ট হাউজ আছে। বন দপ্তরের বরাইবুরু, কুমুদি আর থলকোবাদে রেস্ট হাউজ আছে।
দুপুরে খাওয়ার কিছুক্ষণ পর আমরা গাড়ি করে বেরিয়ে দুটো খনি এবং দুদিকের জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে দুটো খুব সুন্দর জলপ্রপাত দেখলাম। ঘাঘরিতা আর ঝিঙ্গারা। পথে জঙ্গলের পথে সি আর পি এফের কোবরা বাহিনী চোখে পড়ল। ঝিঙ্গারা প্রপাত ওড়িশার কেওনঝরের জঙ্গলে বোলানি লোহা খনির কাছাকাছি। বিকেলের আগে পৌঁছলাম Kiriburu Sunset Point। সাতশো পাহাড়ের ঢেউয়ের মাঝে সূর্য ডোবার পালা। দিকচক্রবাল ও আকাশ জুড়ে রঙের খেলা। সূর্যের কুসুম রঙা লালিমার সঙ্গে আকাশের নীলিমার নানা কম্বিনেশন। অপরূপ। সামনের জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। ক্রমে পাহাড়গুলো কুয়াশায় ঢেকে গেল। সন্ধ্যা নামার পর রেস্ট হাউসে ফিরে এলাম।
পরেরদিন ২১ নভেম্বর আমাদের থলকোবাদ অরণ্যটি দেখার কথা ছিল। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা খুব খারাপ থাকার জন্য গাড়ির মালিক গাড়ি দিতে রাজি হলেন না। অন্যদিকে থলকোবাদ অরণ্যের মধ্যে মাওবাদী বিরোধী কোবরা র অপারেশন চলায় এবং কিছুদিন আগে মাইন বিস্ফোরণে পাতা কুড়োতে যাওয়া একটি জনজাতি বালিকার ও মাইন বিস্ফোরণে তিনটে হাতির মৃত্যু হওয়ার কারণ দেখিয়ে নিরাপত্তার অভাব জানিয়ে বন দপ্তর আমাদের শেষ মুহূর্তে অনুমতি দিল না। তখন আমরা একটা গাড়ি নিয়ে প্রথমে বরাইবুরুর ঘন শাল জঙ্গল দেখে খনি শহর নোয়ামুন্ডি হয়ে ঘুরতে ঘুরতে জেলা সদর চাঁইবাসায় পৌঁছলাম।
জঙ্গল অনেক পাতলা হয়ে গেছে। লোকালয়, খনি গ্যারেজ, গুদাম, দোকান – বাজার, গাড়ির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। পথে আমরা মোরাং নদী, ক্ষেত – গ্রাম, টাড় – জঙ্গল পেড়িয়ে ১৮৩৭ এর কোল বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে কোল যোদ্ধাদের যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক সিরিংসিয়া ঘাঁটির শহীদ স্থান দেখলাম।
শীর্ণকায়া রোরো নদী অতিক্রম করে চাঁইবাসা শহরে প্রবেশ করলাম। এক সময়কার ব্রিটিশদের কোল অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রশাসনিক সদর এবং ক্রিশ্চিয়ান মিশনারীদের ধর্মান্তরকরণের কেন্দ্র ছিল চাঁইবাসা। তারপর স্বাস্থ্যকর জায়গা হিসাবে বাঙালিবাবুদের বেড়ানোর, কারো কারো থেকে যাওযার জায়গা। মিশনারী প্রতিষ্ঠিত বহু স্কুল কলেজের জন্য পড়াশুনা করতে আসার জায়গা। এখন চাঁইবাসা অনেক বড় ও ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। বেশ কিছু তালাও আর রুঙতা গার্ডেনস আছে। শহর সংলগ্ন লুমুপগুটু ঝর্নাও এখন ম্রিয়মাণ।
মুখার্জিদা বেশ কিছু জামা কাপড়, বাচ্চাদের লজেন্স এনেছিলেন যেগুলি থালকোবাদের একটি জনজাতি গ্রামের স্কুলে দেওয়ার কথা ছিল। সেখানে যেতে না পারায় সেগুলি কিরিবুরুর ঝুপড়ি – ঝুগ্গি বাসীদের দেওয়া হল। এখানকার একটি বড় হাট যা প্রতি শনিবার সকাল থেকে রাত অবধি চলে সেখানে গেলাম। আশপাশ থেকে তো বটেই বহু দূরদূরান্ত থেকে হো জনজাতির নারী পুরুষ নানারকম সব্জি, জংলি তেঁতুল, পিঁপড়ের ডিম, মধু, মাশরুম, কন্দ, কলা, পেঁপে, কুদরুম, জিবা, শুঁটকি মাছ ইত্যাদি নিয়ে এসে বসেছেন। ফল সব্জি গুলি এত তাজা ও নধর যে চোখ জুড়িয়ে যায়। হাটের বেশিরভাগ ক্রেতাই স্থানীয় খনি শ্রমিক – কর্মচারী। তাদের কথা মাথায় রেখে বসেছে আলু – পিঁয়াজ, ফল, কাপড় চোপড়, মাছ, মাংস ইত্যাদির দোকান। পাহাড়ি গ্রামের হো রমণীরা দুপুরের মধ্যে ফিরে যান। তারপর স্থানীয়রা চালান।কলকাতার মল গুলির যেমন ফুড কোর্ট, সেরকম এখানে রাস্তার বিপরীত পাশের মাঠ জুড়ে অনেকগুলো হাড়িয়া আর চাটের দোকান। তাদের ঘিরে বিভিন্ন বয়সী প্রচুর নারী পুরুষের অবস্থান। পরিশেষে তুরীয় আনন্দে ইহলোকের সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলে পাহাড়ি শহরের নির্জন পথ ধরে টলমলে পায়ে প্রস্থান।
তারাশঙ্কর ‘কালিন্দী’ তে পরাক্রমশালী যে সাঁওতালদের বর্ণনা দিয়েছেন তাঁরা আজ শেষ। জল জঙ্গল জমিন থেকে উচ্ছেদ হয়ে রুগ্নসুগ্ন মলিন চেহারা নিয়ে মরশুমী ক্ষেত মজুর অথবা পরিযায়ী জনমজুর হয়ে ইট ভাটা, রাস্তা সারাই ও নির্মাণ প্রভৃতিতে যুক্ত হয়ে কোনরকম মানবেতর দরিদ্র মলিন জীবন যাপন করছেন। বিভূতি ভূষণের ‘ বনে পাহাড়ে ‘ বর্ণিত স্বাস্থ্যবান স্বাধীন আনন্দে থাকা অরণ্যের সন্তান হো দের অবস্থাও একইরকম। দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তাঁরা তাঁদের অরণ্য পাহাড় থেকে প্রায় উৎপাটিত। সেগুলো এখন রাষ্ট্রের সহযোগিতায় শিল্পপতি, কর্পোরেট, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, মাফিয়াদের হস্তগত। হো জনজাতিরা এখন ভাঙ্গাচোরা স্বাস্থ্য আর অপার দারিদ্র্য নিয়ে সস্তার জনমজুর। আধুনিকতার ছোঁয়ায় জনজাতি দের অনেকেই আধুনিক পোষাক, মোবাইল, গণ পরিবহন ইত্যাদির ব্যবহার শিখেছেন, পাশাপাশি রোগ, নেশা, লোভ ইত্যাদিও তাঁদের গ্রাস করেছে। আমাদের সামান্য পরিব্রজনে আমরা জনজীবনে এই পরিবর্তনগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। হো নারীরা সংসার চাষবাসের পরও দূরদূরান্তে সামান্য ক্ষেতের কিংবা বন থেকে সংগ্রহ করা ফুল, ফল, কন্দ ইত্যাদি বিক্রি করে খুব কষ্ট করে জীবন ধারণ করছেন। বিভীষণ বেহরার দুর্দান্ত রান্না খেয়ে আমরা সারাটা দিন হেঁটে হেঁটে ঘুরে কাটালাম আর স্থানীয় জনজীবনকে পর্যবেক্ষণ করলাম।
আজ ২৩ নভেম্বর। বিভূতি অনুরাগী আমরা কিরিবুরু – মেঘাতুবুরু ভ্রমণের চমৎকার অভিজ্ঞতা ও আনন্দ নিয়ে ফিরে যাব। এবারও তার বিক্ষিপ্ত যাতায়াতের জন্য বড়বিল – হাওড়া জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে ভরসা রাখতে পারলাম না। সকাল সকাল কিরিবুরু ফরেস্ট রেস্ট হাউসের গেটের সামনে থেকে বাস ধরে চলে এলাম বড়া জামদা। এখানকার বাসগুলিই একমাত্র পরিবহন। রাত সাড়ে তিনটে থেকে চলতে শুরু করে এক ঘণ্টা বাদ দিয়ে দিয়ে বিকেল অবধি। শহর থেকে বেরোনোর আগে সারা শহর সমস্ত লোকালয় দিয়ে একবার পাক খায় যাত্রীদের তোলার জন্য। সকালে পাহাড় আর সারান্ডার গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাত্রাটিও যথেষ্ট উপভোগ্য ছিল। বড়া জামদা থেকে বড়বিল – টাটানগর রুটের মজার চরিত্র পন্ডাবাবুর একটি Eicher AC বাসে দুপুরের মধ্যে টাটানগর স্টেশন। পৌনে চার ঘন্টা লাগল। সেখানে খাওয়া দাওয়া করে খানিকটা জিরিয়ে উঠে পড়লাম হাওড়াগামী বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে। পরেরদিন যে অনেক কাজ আছে। মোদীজীর বহুল প্রচারিত বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের একটি রৌরকেল্লা – হাওড়া বন্দে ভারত দুঘণ্টা দেরিতে হাওড়া পৌঁছল। যাতায়াতে ঝক্কি হয়েছে অনেক, কিন্তু আনন্দ আরও বেশি। আর স্মৃতিতে রয়ে গেল নিবিড় অরণ্য, সাতশো পাহাড় আর মেঘের রাজ্য সারান্ডা, কিরিবুরু আর মেঘাতুবুরু।
ছবি: দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, পিয়ালতরু










আরণ্যকদের অরণ্যে আর অধিকার নেই
তবু কোনোভাবে টিকে আছে বেঘর হয়েই।