[এই লেখার শিরোনামের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই তমোনাশদা (ডঃ তমোনাশ চৌধুরী)কে। কয়েক মাস আগে পুণ্যব্রত গুণের লেখা ‘শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর’ বইটা ওনাকে উপহার দিয়েছিলাম। তমোনাশদা দারুণ খুশি হয়ে বইটা উল্টে পাল্টে দেখেই বললেন আমরাও কয়েক বছর পর এই রকম লিখব – ‘পুণ্যব্রত গুণের সঙ্গে কয়েক বছর’। কয়েক বছর অপেক্ষা করতে পারলাম না, অভিজ্ঞতার ঝুলি এক বছরে কম ভরেনি…]
২০২৪ এর নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে এক রবিবারের বিকেল। অ্যাকাডেমির কনফারেন্স হলে সদ্য গঠিত অভয়া মঞ্চের মত বিনিময় সভা। যৌথ লড়াই এর নতুন মঞ্চ কে ঘিরে তুমুল উন্মাদনা। দ্রোহের কার্নিভালের সাফল্য নিয়ে এসেছে নতুন উদ্যম। বিকেল চারটে থেকে প্রায় চার ঘণ্টা চলেছে জোরদার তর্ক বিতর্ক মত বিনিময় । মিটিং শেষ হলেও কথা শেষ হয় না। ডঃ গুণ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হলের বাইরে এসে একটা সিগারেট ( না কি বিড়ি ?মনে নেই) ধরিয়ে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করেছেন। ছত্তিশগড় মুক্তিমোর্চার সংগ্রাম, শঙ্কর গুহ নিয়োগীর হত্যা, কানোরিয়ার আন্দোলন – সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ অনেকের কাছেই ছিল এক নতুন রূপকথার নির্মাণ , আর সেই স্বপ্নের আখ্যানের এক চরিত্র হিসাবেই পুণ্যব্রত গুণের নাম জানতাম। অভয়া আন্দোলনের সুত্রে ডঃ গুণ কে সামনে থেকে দেখা। তখনও আলাদা করে কোন দিন কথা বলার সুযোগ হয়নি। দূর থেকে দেখলে বেশ রাশভারি মনে হয়, মিটিং এর মাঝে প্রায়শই নানা লোকজন কে ধমক টমক ও দেন। তাও সাহসে ভর করে কথা বলতে এগোলাম। এক নামজাদা সমাজতাত্ত্বিক অভয়া আন্দোলন কে শাণিত ভাষায় তীব্র আক্রমণ করেছেন, তার জবাবে একটা নিবন্ধ লিখে পাঠিয়েছিলাম নামকরা এক বাজারি পত্রিকায়, স্বভাবতই সেটি ছাপা হয়নি। তাও কেবলই মনে হচ্ছে এর জবাব টা অন্তত কিছ লোকের কাছে পৌঁছানো দরকার। অপেক্ষায় ছিলাম, সামনের তিন জনের সঙ্গে কথা শেষ হবার পর পাশ থেকে বললাম “ ডঃ গুণ, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল”। খুব মন দিয়ে শুনলেন, শুনে বললেন “লেখাটা আমাকে পাঠান, আমরা একটা ওয়েব ম্যাগাজিন চালাই – ডক্টরস ডায়লগ, সেখানে বার করব।“ এই ভাবেই পুণ্যদার সঙ্গে আলাপের শুরু। একটা, দুটো, তিনটে – ডক্টরস ডায়লগে আমার লেখার সংখ্যা বাড়তে থাকল। কিছুদিন পর পর মেসেজ আসতে থাকল –“ নতুন কিছু লিখলেন? একটা বড় লেখা দেবেন বলেছিলেন…”।
ডক্টরস ডায়লগে প্রথম লেখা বেরোনোর পর ডঃ অমিতাভ চক্রবর্তী ৮০ র দশকের চিকিৎসক আন্দোলন এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে পরামর্শ দেন। এই বিষয়ে পড়াশুনো একেবারেই ছিল না। ওনার কাছেই জানতে চাই। নিজের একটি লেখা পাঠিয়ে আমাকে বলেন “পুণ্যদারও এই নিয়ে লেখা আছে”। মেসেজ করি ডঃ গুণ কে। ৫ মিনিটের মধ্যে উত্তর আসে _ “আমি মাথাভাঙ্গায়। পাঠানোর চেষ্টা করছি কিন্তু নেট কানেকশন ভাল না। কলকাতায় ফিরে পাঠিয়ে দেব”। এর ঠিক পনেরো মিনিট পর ৮০ র দশকের আন্দোলন নিয়ে দুটো পি ডি এফ ফাইল পেয়ে যাই। পুণ্যদার সিরিয়াসনেস এর সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয় । গত একবছরে এই জানা ক্রমশ বেড়েছে, কখনোই পুরোটা মাপা যাবে বলে মনে হচ্ছেনা, পরিচিত, স্বল্পপরিচিত, অপরিচিত সকলের ক্ষেত্রেই সমান সিরিয়াস।
এর মধ্যেই ৩ ডিসেম্বর অভীক দে এবং বিরূপাক্ষ বিশ্বাস কে স্বাস্থ্য দফতরে ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদে West Bengal Medical Concil অভিযান। কোন একটা অসুবিধার কারণে যেতে পারিনি । গ্রুপে খবর পেলাম রাতভর অবস্থান চলবে । খোলা আকাশের নিচে ঘাসের উপর ত্রিপল বিছিয়ে শোবার ব্যবস্থা। পুণ্যদা বেশ কিছু চিকিৎসক ও অচিকিৎসক সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ওখানেই শুয়ে পড়লেন। বাড়িতে বসে অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছি। নরম বিছানায় ঘুম আসছেনা। পর দিন দুপুরে কিছ শুকনো বিস্কিট , কেক ইত্যাদি সহযোগে অমিতদা (অধ্যাপক অমিত ভট্টাচার্য) কে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলাম । পুণ্যদার হাতে একটা সুগার ফ্রি বিস্কিটের প্যাকেট ধরাতেই হেসে বললেন – “খাবার চাইনি তো , লেখা চেয়েছি আপনার কাছে। বড় লেখাটা কবে দিচ্ছেন?” পাঁচ মিনিট পর আবার আসলেন – “অমিতদাকে কী ভাবে চেনেন? আপনি যাদবপুরের ছাত্রী? অমিতদারা সব আগুনঝরানো বিপ্লবী, জানেন তো? আমাদের সংশোধনবাদী বলে পাত্তা দেন না। নিউ হরাইজন বুক স্টোরে আলাপ হয়েছিল অনেক বছর আগে, ভুলেই গেছেন, কিন্তু আমার মনে আছে ”! অমিতদা মহা অপ্রস্তুত- ‘কি যে বলেন, আপনাকে ভোলা যায় না কি’ ইত্যাদি ইত্যাদি !
সেদিন স্বাস্থ্য ভবনে ডেপুটেশনের পর অবস্থান উঠে গেল। ৬ তারিখ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে স্বাস্থ্য ভবন মিছিল। অভয়ার মা বাবা এসেছিলেন এই মিছিলের শুরু তে, সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, মিছিল শুরু করা যাচ্ছেনা। পুণ্যদা একা হাতে সাংবাদিকদের সামলে ওর মা বাবাকে বেরোনোর রাস্তা করে দিলেন, মিছিল শুরু করলেন। মিছিলে আলাপ হল ব্যারাকপুরের মিতা চক্রবর্তীর সঙ্গে- প্রথম আলাপেই খুব সাদরে কাছে টেনে নিলেন মিতাদি। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছু কথা হল পুণ্যদার সঙ্গে – ক্যালকাটা হার্ট ক্লিনিকের সামনে দিয়ে যাবার সময় এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানা হয়ে গেল। এই মিছিলেই ডঃ গুণ পাকাপাকি ভাবে পুণ্যদা হয়ে গেলেন।
এর মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর খুনের মামলায় জামিন হয়ে গেল সন্দীপ ঘোষ অভিজিৎ মণ্ডলের । ১৪ তারিখ রাসমণি রোড, ১৮ তারিখ ওয়াই চ্যানেলে বিক্ষোভ সমাবেশ- কুশপুত্তলিকা দহন, মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ – সব কিছ নিয়ে দানা বাঁধতে থাকল ডোরিনা ক্রসিং এ জুনিয়র ডাক্তারদের অনশন মঞ্চের জায়গাতেই লাগাতার অবস্থানের কর্মসূচি। পুলিশের অনুমতি পাওয়া গেলে ২০ ডিসেম্বর শুরু হতে পারে এমন শোনা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য নিয়ে একটি শিক্ষাশিবির পূর্বঘোষিত ছিল। বুঝতে পারছিনা সেটা আর হবে কি না। মেসেজ করে জানতে চাইলাম । এবারেও ৫ মিনিটের মধ্যে উত্তর –‘অবশ্যই হবে। চলে আসুন”। মহাবোধি সোসাইটি তে একটি চমৎকার শিক্ষা শিবিরে অংশ নিলাম। সার্বজনীন স্বাস্থ্য- ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার- এই ধারণার সম্পর্কে প্রথম জানলাম। সরকারি স্বাস্থ্য নীতি এবং জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে অসাধারণ আলোচনা করলেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, ডঃ সুজয় বালা, ডঃ রাহুল মুখোপাধ্যায় এবং ডঃ নির্মাল্য দাস । সার্বজনীন স্বাস্থ্যপরিষেবা ও গণস্বাস্থ্যনীতি বনাম স্বাস্থ্যবিমা, স্বাস্থ্যের পরিকাঠামোগত উন্নতি বনাম স্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণ- এই ছিল শিক্ষা শিবিরের মূল আলোচ্য বিষয় । স্বাস্থ্যশিক্ষা শিবির থেকে ধর্মতলায় ডোরিনা ক্রসিং। অবস্থানের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা শিবির থেকে এসে প্রবল উদ্যমে অবস্থানের প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন পুণ্যদা। বাড়ি ফিরতে মন চাইছে না, তাও ফিরতে হবে। সামনে মেয়েদের বোর্ডের পরীক্ষা। বেরিয়ে আসার ঠিক আগে পুণ্যদা অনুরোধ করলেন – ‘আজকের স্বাস্থ্যশিক্ষা শিবিরের রিপোর্টটা এক্টু লিখে দেবেন? কাল ডক্টরস ডায়ালগে বার করব”। সেই প্রথম ইভেন্ট রিপোর্ট লেখার ফরমায়েশ। মনের মধ্যে কোথাও একটা আনন্দ অনুভব করলাম, সেই প্রথম এই আন্দোলনে ‘ইনসাইডার’ হিসাবে স্বীকৃতি…
ডিসেম্বর এর ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং এ টানা ১২ দিনের অবস্থান অভয়া মঞ্চের আন্দোলনে এক বড় মাইলস্টোন । তিনমাস আগে অনশন মঞ্চে মানুষের যে ঢল নেমেছিল, সেই জনতা ক্রমে গৃহমুখী এবং কর্মক্ষেত্র মুখী হয়েছে সময়ের স্বাভাবিক নিয়মেই। এই ভাঁটার সময়ে শক্ত বোল্ডার হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অভয়া মঞ্চ, জলের টানে পিছু হটল না। ১২টা দিন ১১ টা রাত ধরে ডোরিনা ক্রসিং এ প্রতিবাদী জনসমাগম, বক্তৃতা, নাচ, গান, নাটক, ডিসেম্বের এর শীতে সারা রাত ধরে গান, শ্লোগান – কর্মী সংগঠকদের মনোবলকে বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। কলেজ করে সোজা চলে যাচ্ছি অবস্থানে, কোনদিন বাড়ি ফিরছি, কোনদিন ফিরছি না, থেকে যাচ্ছি। ভোর রাতে উবের ধরে বাড়ি ফিরছি। ভুলবো না সেই অবাঙ্গালি উবের চালক কে, যিনি বলেছিলেন – “সবাই যখন ঘুমোচ্ছে আপনারা জেগে রাত কাটাচ্ছেন, জাগিয়ে রাখছেন সকল কে। আপনারাই পারবেন এই অন্যায়ের বিচার আনতে ।“
এই অবস্থান চলার সময়ে পুণ্যদার সঙ্গে আলাপ পরিচয় আরও বাড়ল। পরিচয়ের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোয় পুণ্যদাই কিছুটা এগোলেন। অবস্থানের দ্বিতীয় দিন বিকেল, মঞ্চের পিছনে অস্থায়ী ঘরটায় ঢুকে কোনার দিকে একটা চেয়ারে একটু কুণ্ঠিত হয়েই বসেছিলাম, সকলের সঙ্গে তখনও তেমন আলাপ পরিচয় হয়নি। পুণ্যদা উলটো দিকের চৌকিতে বসে সপারিষদ আড্ডা দিচ্ছিলেন। আমাকে হাত দিয়ে পাশে ডেকে নিলেন। খুব সহজেই আপনি থেকে তুমি তে নেমে আসলেন। পুণ্যদা্র সামনেই বসে ছিলেন ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এর ডঃ দেবাশিস হালদার। আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন –“ গোপাকে চেনো ? ও আমাদের আন্দোলন নিয়ে ভাল লিখছে ডক্টরস ডায়ালগে ।“ দেবাশিস কে দেখিয়ে বললেন “ওকে তো জানোই । WBJDF এর নেতা, আমার দলের ছেলে “। 
অবস্থান মঞ্চেই জানলাম আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যাদবপুরের সহপাঠী , কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় গণস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার সুবাদে দীর্ঘ দিন ধরে পুণ্যদার পরিচিত। ওর ছাত্র নটরাজ মালাকার পি এইচ ডি র গবেষণার সময়ে পুণ্যদার সঙ্গে অনেক বার যোগাযোগ করেছে। এই সময় থেকেই একটু একটু করে গণস্বাস্থ্যের আলোচনা শুরু হল।
অবস্থান মঞ্চে পুণ্যদা রাতে থাকতে পারতেন না। WBMC অভিযানে খোলা আকাশের নিচে ঘাসের উপর চাদর বিছিয়ে শুয়ে মারাত্মক ঠাণ্ডা লেগেছিল। প্রত্যেক দিন বিকেলের দিকে ক্লিনিক থেকে এসে থাকতেন রাত পর্যন্ত। বাড়ি ফিরে কাউকে না কাউকে ফোন করতেন প্রতিদিন, খাবার ঠিক সময়ে এল কি না, সবাই খেয়েছে কি না, কত জন রাতে থাকছে ইত্যাদি। ২৬ শে ডিসেম্বর বিশেষ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হল সবাই থাকব রাতে। পুণ্য দা প্রস্তুত ছিলেন না। জিজ্ঞেস করলাম ‘পারবেন? এখনও খুব কাশি হচ্ছে তো ! ‘ হাসলেন- ‘পারতেই হবে। যৌথ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত’। রাতে সবাই মিলে অবস্থান মঞ্চে । সেদিন শ্লোগান হচ্ছেনা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ প্রয়াত হয়েছেন। মঞ্চে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করে সেদিন মঞ্চের আলো এবং শ্লোগান বন্ধ আছে। মাইক ছাড়া গান কবিতা হচ্ছে- ইলোরা দি, মিতাদি, শতাব্দী, মাঝে মাঝে ধরতাই দিচ্ছি আমি। দুটো প্লাস্টিক চেয়ার কে ড্রাম বানিয়ে বাজাতে বসে গেছে দেবাশিসদা। পুণ্যদাকে এক্টু ঘুমোতে হবেই, পরের দিন সকালে নৈহাটিতে ক্লিনিক, ভোরে বেরোতে হবে। এই সব কলরবের মধ্যেই কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়ে নিয়ে রাত দুটো নাগাদ উঠে পড়লেন। দুটো থেকে প্রায় ভোর চারটে অব্দি চলল বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা – শঙ্কর গুহ নিয়োগী ও ছত্তিশগড় আন্দোলন, শহীদ হাসপাতাল, সংঘর্ষ ও নির্মাণ। পাঁচটায় উবের ডেকে বাড়ি ফিরছি যখন মাথায় শুধু ঘুরছে শেষ দু’ঘণ্টার আলোচনা –“ বিপ্লবের পরে নির্মাণ করলে তো চলবে না, নিয়োগী বলতেন সংঘর্ষের পাশাপাশি ক্রমাগত নির্মাণ করে যেতে হবে, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, আবার বোধের জগতেও । এই simultaneous reconstruction টা না থাকলে নতুন সমাজ জন্মই নেবেনা।“ গুহ নিয়োগীর সংঘর্ষ নির্মাণের তত্ত্ব অজানা ছিল না, কিন্তু কখনও খুব বেশি পড়াশুনো বা আলোচনার সুযোগ হয়নি। সেদিনের আলোচনা নতুন করে ভাবার রাস্তা তৈরি করে দিল। মনে হচ্ছিল সামাজিক সাম্য ও লিঙ্গ সাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্যে আপাত বিরোধ এর জায়গা গুলোয় সমাধানের দিশা দেখাতে পারে এই নিরন্তর সংঘর্ষ ও নির্মাণের তত্ত্ব। পূর্ব নির্ধারিত কোন অভ্রান্ত লক্ষ্য না রচনা করে নির্মাণের পথ টাও সংঘর্ষের মধ্যে দিয়েই তৈরি হলে নতুন সমাজে সমানাধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠা অর্থবহ হবে। সেদিনই বুঝলাম, পুণ্যদা খুব ভাল শিক্ষক। ভাল শিক্ষক পেলে জানার ইচ্ছা বেড়ে যায়। অভয়া আন্দোলনের সূচনা, প্রকৃতি, মঞ্চের গঠন, এর পাশাপাশি শহীদ হাসপাতাল,কানোরিয়া, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ – এই সব নানা বিষয়ে প্রশ্ন জমা হয়েই চলেছে। লিখলাম পুণ্যদা কে – “অনেক প্রশ্ন আছে। একদিন সময় দিতে পারবেন?” উত্তর এল একটু পরেই “অবশ্যই, কথা ত বলতেই হবে। এক দিনে হবে না।“ প্রতীক্ষায় থাকলাম।
৩১ ডিসেম্বর দ্রোহের বর্ষ বরণ দিয়ে শেষ হয়েছিল অবস্থান কর্মসূচি । তার পর কয়েক দিন কোন কর্মসূচি ছিল না। পুণ্য দাকে মেসেজ করে কুশল জানতে চেয়েছিলাম। লিখেছিলেন “ অবস্থানে নিয়মিত যাওয়ার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। এখন সেটা নেই। অনেক দিন কোন কর্মসূচি ও হচ্ছেনা। কিছু না থাকলে মাথার মধ্যে চাপ অনুভব করি, কষ্ট হয়।“ বিস্মিত হয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম এই অন্যতর জীবনবোধ, এক অন্যতর জীবনযাপন। 
পর দিন শিয়ালদহ কোর্টে জমায়েত। ১৮ জানুয়ারি শনিবার আর ২০ জানুয়ারি সোমবার শিয়ালদহ কোর্ট চত্বর এক উত্তাল সময়ের সাক্ষী হয়ে রইল। আর জি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের মামলার রায়দান ছিল ১৮ জানুয়ারি। ঘটনার ১৬২ দিন এবং বিচার শুরুর ৬৮ দিন পর শিয়ালদহ অতিরিক্ত দায়রা বিচারকের আদালতে রায় ঘোষিত হয়- সঞ্জয় রাই ই একমাত্র দোষী। ২০ জানুয়ারি সাজা ঘোষণা করলেন বিচারক অনির্বাণ দাস – যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০০০০ টাকার জরিমানা।
১৮ এবং ২০ দু দিন ই সব নিয়মের নিগড়কে অগ্রাহ্য করে দূর দূরান্তের বহু সাধারন মানুষ এসে যোগ দেন । প্রতিবাদী গান, কবিতা, স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শিয়ালদহ এলাকা। ১৮ তারিখ রায় ঘোষণার দিন জুনিয়র চিকিৎসক আন্দোলনের নেতারা অভয়া মঞ্চের কর্মসূচিতে যোগ দেন। জুনিয়র চিকিৎসকরা WBJDF এর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লিফলেট বিতরণ করে যেখানে তদন্ত প্রক্রিয়ার ২০টি গভীর অসঙ্গতি কে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন বক্তব্যে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে জাল স্যালাইনে প্রসুতি মৃত্যু আর দুর্নীতি ঢাকতে চিকিৎসকদের অন্যায় সাসপেনসন এবং আস্ফাকুল্লা নাইয়ার বাড়ি পুলিশি অভিযানের প্রসঙ্গ ও উঠে আসে। এই দু দিনের শেষ কর্মসূচি ছিল শিয়ালদহ থেকে মৌলালি পর্যন্ত মিছিল এবং মানব বন্ধন। ২০ তারিখ মৌলালি তে কুশ পুত্তলিকা দাহ করা হয়।
১৮ তারিখ পুণ্যদা ছিলেন না কলকাতায়। তখনও ফেরেন নি উত্তর বঙ্গ থেকে। মেসেজে জানালেন ফোনে লাইভ দেখছেন ক্লিনিকের ফাঁকে ফাঁকে। ১৮ তারিখ রাতে একটা মেসেজ পেলাম- “ আমি আর তমোনাশ থাকতে পারিনি, মনীষার সঙ্গে তোমরা কয়েক জন এই ক’দিন সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছ। তোমাদের স্যালুট জানাই”। সেই রাতে উত্তেজনায় ঘুম আসেনি। যাদবপুর ছাড়ার পর তেমন ভাবে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। ভিতরে ভিতরে কোথাও একটা যন্ত্রণা হত। চারপাশের পরিবেশ আরও বিমুখ করে দিয়েছিল। অভয়াহত্যা আর পরবর্তী গণজাগরণের অভিঘাতে অনেকের মত আমিও রাস্তায় নেমেছিলাম। অদলীয় প্রতিবাদী মঞ্চ হিসেবে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম অভয়া মঞ্চ কে। কিন্তু এটা আগে বুঝিনি যে এই আন্দোলন আমার অস্তিত্বের অংশ হয়ে উঠবে। সেই দিনই ভেঙ্গে গিয়েছিল চারপাশের সব দেওয়াল। জীবনের অর্ধশতাব্দী পরে অনুভব করলাম কুসুমাকীর্ণ পথ আমার জন্য নয়। শুধু অভয়ার বিচারই আমার একমাত্র লক্ষ্য নয়, মেঠো রাস্তায়, অসংখ্য মানুষের শ্রমে আর ঘামেই খুঁজতে হবে জীবনের মানে। কাকে কোন কথাটা বলে রাতের ঘুম কেড়ে পথের স্বপ্ন দেখাতে হবে এটা পুণ্দার চেয়ে ভাল আর ক’জন জানেন! তাই আজ ও মেডিক্যাল কলেজের নবীন চিকিৎসকরা নিয়মিত যাতায়াত করে চেঙ্গাইলে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে । তিরিশ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে নিঃশব্দে গড়ে উঠছে গণস্বাস্থ্য আন্দোলন ।
দিনে দিনে অভয়া মঞ্চের সঙ্গে সম্পর্ক যত নিবিড় হয়েছে, সক্রিয়তা বেড়েছে, সমানুপাতিক হারে পুণ্যদা র সঙ্গে যোগাযোগ আরও নিয়মিত হয়েছে। সোদপুর স্টেশনের পাশে এক প্রতিবাদ সভায় গেছি। পুণ্যদা চেঙ্গাইলের ক্লিনিক সেরে পৌঁছালেন প্রায় সাড়ে আট টায়। পায়েল চায় পুণ্যদা শেষ পর্যন্ত থাকুন। তাই কিছুতেই বক্তৃতা দিতে ডাকছে না। আমরা যতই বলি আমাদের অনেক দূর ফিরতে হবে, পুণ্যদা ও অনেক সকালে বেরিয়েছেন, কাল ও অনেক সকালে বেরোবেন ফেরার প্রয়োজন ওনারই সব চেয়ে বেশি। পায়েল অবিচল। নির্বিকার পুণ্যদাও। ১ নং প্ল্যাটফরম সংলগ্ন রাস্তার ধারে ভিড় উপচে পড়ছে, পথ চলতি মানুষ কাজ ভুলে বক্তৃতা শুনছেন ,গান শুনছেন। এই পরিবেশে পুণ্যদার adrenaline rush হয়। সব ক্লান্তি ভুলে বসে রইলেন রাত দশটা পর্যন্ত। শেষ বক্তা ছিলেন পুণ্যদা। বক্তৃতা শেষে আমরা ফিরছি। সঙ্গে পুণ্যদা। হঠাৎ দেখলাম এক অতি উৎসাহী বক্তা স্বতঃ প্রণোদিত হয়ে মাইক নিয়ে অভয়ার নির্যাতনের কথা স্মরণ করে প্রবল অশ্রু বিসর্জন করতে শুরু করলেন। সামনের সারিতে অভয়ার মা বাবা। সংগঠক এবং আমরা সবাই হতবিহবল। পুণ্যদা ফিরলেন। বক্তার কাছ থেকে মাইক টা নিয়ে নিলেন। ঘোষণা করলেন “ আমরা কেউ কাঁদছি না, কারণ আমাদের চোখে আর এখন জল নেই, আগুন আছে।“ আজ ও প্রতিমুহূর্তে অনুভব করি সেই আগুনের উত্তাপ। এই আগুন টাই আমাদের থামতে দেবেনা, তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে প্রতিদিন।
প্রতিবাদী চার চিকিৎসকদের আইনি চিঠির বিরুদ্ধে ২৯ জানুয়ারি West Bengal Medical Concil অভিযানের প্রস্তুতি মিটিং। মিটিং শেষে পুণ্যদা এসে বললেন WBMC র কর্মসূচি শেষ হলে আমার বাড়িতে এস, কথা বলব। এর কিছু দিন আগে ফোন পেয়েছিলাম – “ ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা বার্ষিক বক্তৃতামালা আয়োজন করি। এবার তুমি একজন বক্তা। অভয়া আন্দোলন নিয়ে বলবে। তোমার বন্ধু সব্যসাচী স্বাস্থ্য আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে।“ এই বক্তৃতার জন্যেও কথা বলা খুব জরুরি ছিল। WBMC র কর্মসূচির শেষে আলাপ করিয়ে দিলেন বাগিদির (লিলি দে সরকার) সঙ্গে। পুণ্য দা আর বাগিদির সঙ্গেই গেলাম সল্টলেকে ওঁদের বাড়ি। সেই প্রথম যাওয়া। কিন্তু কখনও এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়নি আমি এখানে এর আগে কখনও আসিনি। সন্ধ্যে ৬ টা থেকে চলল আলোচনা- অভয়া আন্দোলন, ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। সাড়ে নটায় থামতেই হল, বাড়ি ফিরতে হবে। বুঝতে পারলাম এই আলোচনা শেষ হবার নয়। চলতে থাকবে। সঙ্গে নিয়ে এলাম অমূল্য উপহার-পুণ্য দার লেখা ‘পা মিলিয়ে পথ চলা ‘- গণস্বাস্থ্যের এক নিরলস কর্মী সংগঠকের অসাধারণ প্রতিবেদন।
বইমেলায় অভয়া মঞ্চ প্রকাশ করল প্রতিবাদী কবিতার সঙ্কলন ‘দ্রোহের দিনলিপি’। বই প্রকাশের পর শ্লোগান দিয়ে মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিলেন পুণ্যদা। তমোনাশদার পরিকল্পনায় বই মেলায় অভয়াহত্যা নিয়ে জনতার বিচার ও বেশ সফল ভাবে চলল। দ্রোহের দিনলিপি প্রকাশের দিনই কোর্ট থেকে মেডিক্যাল কাউন্সিলের অবৈধ রেজিস্ট্রারকে অপসারণের নির্দেশ । কিছুদিন আগে অভয়া মঞ্চের প্রতিবাদী জমায়েতের সাফল্য। সবাই দারুন খুশি। এরই মধ্যে হঠাৎ এক অসাধারণ দৃশ্যের জন্ম হয়। সন্ধ্যে নাগাদ মণীষাদির (মণীষা আদক) প্রবেশ বইমেলায় এবং তীর বেগে ছুটে এসে জয়োল্লাসে পুণ্যদাকে প্রবল আলিঙ্গন। সবাই চমকিত এবং পুলকিত। তিরিশ বছর ধরে পরিচিত বন্ধুর ভালোবাসার আতিশয্যে পুণ্যদাকে বেশ অভ্যস্ত মনে হল। বললেন “মণীষা যখন এগুলো আগে করত আমি খুব embarrassed feel করতাম। এখন আর অসুবিধা হয় না” অনুভূতির স্বাভাবিক অনাড়ষ্ট প্রকাশ আমাদের সমাজে মেয়েদের মধ্যে যেমন খুব বেশি দেখা যায় না, আবার পুণ্যদার প্রজন্মের বামনেতাদের মধ্যেও সচরাচর দেখা যেত না। ! এই স্বাভাবিকতাই পুণ্যদা, মণীষাদির মত মানুষদের ভিড়ের থেকে আলাদা করে দেয়। মণীষাদির ব্যক্তিত্বটা খুব আকর্ষণীয়। একেবারেই উচ্চকিত নয়, মিছিলের সামনে থাকে না, বক্তৃতা দিতে চায় না কিন্তু নীরবে নারী নির্যাতন বিরোধী ‘rapid response force’ তৈরি করে চলেছে।
প্রণতি প্রকাশনীর স্টলে হাতে পেলাম রুমঝম ভট্টাচার্যের লেখা ‘দীপ জ্বেলে যাও’। পুণ্যদার জীবন অবলম্বন করে লেখা উপন্যাস। তার সঙ্গে আশিস কুণ্ডু র ‘দল্লী রাজহরা ডাখয়েরি’ আর ডঃ পুণ্যব্রত গুণের লেখা ‘শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর’। পরবর্তী একটা সপ্তাহ কাটল একটা ঘোরের মধ্যে। এক দিনে শেষ করলাম ‘দীপ জ্বেলে যাও’। পড়লাম ‘শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর’। আততায়ীর গুলিতে নিহত নেতার দেহ দু হাতে নামানো , মরদেহ নিয়ে নিয়োগীজীর পরিবারের সঙ্গে ভিলাই যাত্রা – এক অচেনা পুণ্যদা – আমার নেতা, আমার রাজনৈতিক শিক্ষক ! বুকের মধ্যে এক অসহায় যন্ত্রণা অনুভব করি –ভারতবর্ষে বিপ্লবের এক তাজা স্বপ্ন শেষ করে দিল খনি মালিক দের ভাড়াটে গুণ্ডার দেশি পিস্তলের গুলি-
“স্বপ্নদ্রষ্টা আমার নেতা যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোনও স্বপ্ন দেখছেন, মুখে হালকা একটা হাসি! যেন ‘নিয়োগীজী’ বলে ডাকলেই চোখ খুলে বলবেন ‘কেয়া খবর ডাক্তারসাব’!… নিয়োগীর মৃত্যুতে আমি দুঃখ পাইনি, কেননা যে জীবনে যে মৃত্যু তিনি চেয়েছিলেন তা পেয়েছেন—শ্রেণীসংগ্রামে শহীদ হয়েছেন।” (পুণ্যব্রত গুণ,শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর )

যায় । ন্যূনতম মূল্যে উচ্চমানের চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে মডেল ক্লিনিকগুলি নতুন সমাজের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিশা দেখাচ্ছে। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। ৩৫ বছর বয়সে নেতা কে হারিয়ে, সংগঠন হারিয়ে ফিরেছিলেন কলকাতায়। কি অসম্ভব মনোবল আর প্রত্যয় নিয়ে তিলেতিলে গড়ে তুলেছেন এই শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। ৮ বির জনসভায়, পরেও বিভিন্ন সময় বলেছেন একদিকে শ্রমজীবী, অন্যদিকে নিজের নতুন সংসার গড়ে তোলার গল্প। বাগিদির স্কুলের চাকরি আর বাবা অধ্যাপক অতীন্দ্রমোহন গুণের নীরব সমর্থন এবংঅকুণ্ঠ সহায়তা ছাড়া এই লড়াই সম্ভব হত না। কলকাতায় ফেরার বছর দুয়েক পরে অর্কর জন্ম । বাগিদির মাসের মাইনে থেকে জমানো টাকায় নার্সিং হোমের খরচ মেটানো।কৃতী চিকিৎসকপুত্রের মা এইবার খুব স্বাভাবিক ভাবেই চান ছেলে এবার দায়িত্বশীল সংসারী হয়ে উঠুক, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে পারিবারিক উপার্জন বৃদ্ধি করুক, সন্তানের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করুক। কিন্তু সে তো হবার নয়। উনিশ বছর বয়স থেকে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে শুরু করেছে যে ছেলে, তাকে কি এত সহজে চেনা ছকে, গতে বাঁধা জীবনে ফেরানো যায়! নতুন সমাজ গঠনের নিরলস লড়াই চালাচ্ছেন তিনি, অস্ত্র দিয়ে নয়, স্ক্যালপেল আর স্টেথো নিয়ে স্বপ্নের সমাজের স্বাস্থ্যের ভিত্তি নির্মাণ করে চলেছেন চেঙ্গাইল, বাউরিয়া, নৈহাটি, সুন্দরবন, জলপাইগুড়ি, মাথাভাঙ্গা, আর উত্তরবঙ্গের চা বাগানের মডেল ক্লিনিকে।
পুণ্যদা লিখেছেন “নিয়োগীজীর সঙ্গে বেরোনোর সুযোগ আমি হারাতে চাইতাম না, কেননা সেটা হত এক প্রাণবন্ত ক্লাস” (পুণ্যব্রত গুণ,শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর )। পুণ্যদার সঙ্গে যখন সময় কাটানোর সুযোগ হয়, আমার ও ঠিক এমনটাই মনে হয়। ১৯৯২ এর ১ লা জুলাই ভিলাই রেল অবরোধে পুলিশের গুলি তে ১৫ জন শ্রমিকের আত্মবলিদান, দাল্লি রাজহরা থেকে একা গাড়ি নিয়ে ভিলাই থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক, সাথী দের মরদেহ নিয়ে ফেরা – ২০২৫ বইমেলা চলার সময়ে পুলিশের অ্তিসক্রিয়তায় না হওয়া, এক মিছিল (ভাঙ্গড় ভূমি উচ্ছেদ কমিটির ডাকা) থেকে ফেরার পথে রুদ্ধশ্বাসে শুনেছিলাম এই কাহিনী। মাঝে মাঝে মনে হয়, একজন মানুষ এত কর্মকাণ্ডের শরিক কী করে হতে পারেন! শহীদ হাসপাতালে নিরলস কাজ, নিয়োগীর মৃত্যুর পর জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা, সংগঠনের ভিতরে শ্রেণীস্বার্থের লড়াই এর জেরে বাংলায় ফিরে কানোরিয়া আন্দোলনে যোগদান, শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্যকেন্দ্র,ইউনিয়নের সঙ্গে বিচ্ছেদ, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং তিরিশ বছর ধরে বিরামহীন গণস্বাস্থ্যের হোলটাইমার হিসাবে কাজ করে যাওয়া , স্বাস্থ্য শিক্ষা নির্মাণ ট্রাষ্ট ও তার নির্দিষ্ট কর্মসূচির তত্ত্বাবধান , ডক্টরস ডায়লগ ওয়েবজিন এবং স্বাস্থ্যের বৃত্ত পত্রিকার অন্যতম সম্পাদকের দায়িত্ব, ২০১৭ থেকে চিকিৎসক আন্দোলনে অংশ নিয়ে ২০১৯ থেকে জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস (JPD) এর জয়েন্ট কনভেনর এর দায়িত্ব, ২০২৪ এর অগাস্ট থেকে অভয়া আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন, ২৮ শে অক্টোবর থেকে অভয়া মঞ্চের কনভেনরের দায়িত্ব গ্রহণ – এই এত গুলি কাজের প্রত্যেকটির ধরণ, পদ্ধতি অন্য টির থেকে আলাদা। পুণ্যদা কে কোনদিন একটার সঙ্গে আর একটা কে ওভারল্যাপ করতে দেখিনি।
এই সময় আর একটা মেডিক্যাল কাউন্সিল অভিযান হয়। অবৈধ registrar মানস চক্রবর্তী কে অপসারণের দাবিতে। শোনা যাচ্ছে অভীক বিরু ও না কি গোপনে এসেছে। হঠাৎ ঠিক হওয়া JPD র কর্মসূচি , অন্য নেতারা কেউ আসতে পারেন নি। পুণ্যদা চেঙ্গাইলের ক্লিনিক থেকে এলেন। মাইকে শ্লোগান নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কি। পুণ্য দা বললেন প্রতিবাদ তো গুন গুন করে হয় না, জোরের সঙ্গেই হয়। যতক্ষণ অবৈধ পদাধিকারীরা ভিতরে থাকবে শ্লোগান চলবে। তাতেও মানানো যাচ্ছে না। তখন অকুতোভয়ে বললেন তাহলে আমাদের arrest করুন কিন্তু শ্লোগান চলবে। শ্লোগান চলল। একে একে নাটের গুরুরা বেরোতে শুরু করলেন। মাথা নিচু করে দৌড়ে গাড়িতে উঠে পলায়ন। এই ধরণের দাগী অপরাধী দের মান সম্ভ্রম কম ই থাকে। সবাই পালানোর পরেও প্রতিবাদী শ্লোগান থামছেনা, সবাই দারুন উত্তেজিত। পুণ্যদা একটু কুণ্ঠিত হয়ে বললেন আমি এবার বেরোই,আমার ছেলে আজ ইংল্যান্ডে ফিরে যাবে। শুনে বিস্মিত লাগে, ছেলে অনেক দিনের জন্যে চলে যাবে বহুদূরে, অবিচলিতভাবে পুলিশ কে বললেন arrest করুন !
১৯৯৯ এ উড়িষ্যা সাইক্লোনে রিলিফ ওয়ার্কের গল্প শুনেছিলাম ফোনে। দু বছরের অসুস্থ ছেলে বাড়িতে, বাড়াবাড়ি কিছু হলে বড় নার্সিং হোমে ভর্তি করে চিকিৎসা করানোর মত আর্থিক সঙ্গতি নেই। তাই পুণ্যদার রিলিফ টিমে যাওয়ায় সায় দিতে পারছেন না বাগি দি, ভয় পাচ্ছেন।এই সময় আনন্দবাজারে একটা ছবি বেরোল- একটি দু-তিন বছরের শিশু রাস্তা থেকে রিলিফের চাল খুঁটে খাচ্ছে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ছবিটা মেলে ধরলেন বাগিদির সামনে। এর পর আর উড়িষ্যা অভিযানে সবুজ সঙ্কেত পেতে অসুবিধা হয়নি পুণ্যদার। এর পরের গল্প টাও আমার কাছে রিলিফ ওয়ার্কের মতই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। রিলিফের কাজ সেরে ফিরছেন। অর্ক কে কোন ভাবেই ORS খাওয়ানো যাচ্ছেনা। ছোট্ট অর্ক ঠোঁট চেপে ধরে ব্যর্থ করে দিয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার সব প্রচেষ্টা, ক্রমশই নির্জীব হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফ্লুইড চালানো ছাড়া উপায় নেই। পুণ্যদা বাড়ি ফিরে ঘুমন্ত অর্কর মাথার কাছে গিয়ে একবার জোরে ডাকলেন – অর্ক নিমেষে চোখ খুলল, বাবা কে দেখে মুখে খুশির ছোঁয়া, এই সুযোগে ORS এর গেলাস মুখের সামনে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ‘খেয়ে নে বাবা’। অর্ক চুপটি করে লক্ষ্মী ছেলের মত বাবার কোলে বসে ORS এর গেলাস শেষ করে ফেলল। কোথাও ভর্তি করার দরকার হল না। বাড়ি থাকলে এখনো বাবা বাড়ি ফিরে বা বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে না ডাকলে আঠাশ পেরোনো অর্কর খুব অভিমান হয়।
২০২৫ এর ১লা মার্চ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তোলপাড়। এবারের শো স্টপার স্বয়ং শিক্ষা মন্ত্রী। কোন এক দুর্জ্ঞেয় দুর্দম প্রণোদনায় মন্ত্রী চালক কে হুকুম করেন সবেগে গাড়ি চালিয়ে ডেপুটেশন দিতে আসা ছাত্র দের ছত্রভঙ্গ করতে। বিক্ষোভরত ইংরেজি স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায় লুটিয়ে পড়ে গাড়ির চাকার তলায়। ছাত্রের পায়ের উপর দিয়ে চলে যায় শিক্ষা মন্ত্রীর গাড়ি । ছাত্রের শরীরের উপর দিয়ে মন্ত্রীর দম্ভের রথচালনা- বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এমন কখনো ঘটেছে বলে জানা নেই। বিক্ষোভের বারুদে অগ্নি সংযোগ করে এই ঘটনা । স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র বিক্ষোভে কিছুক্ষণের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে যায় যাদবপুর এলাকা, থানা ঘেরাও শুরু হয়। ২ মার্চ থেকে যাদবপুরের বিক্ষোভ ক্রমে বিস্ফোরণের চেহারা নেয়। অভয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর স্বতস্ফুরত ভাবে গড়ে ওঠা প্রতিবাদী অভয়া মঞ্চ আরো বহু প্রতিবাদী মানুষ এবং সংগঠনের সঙ্গে যাদবপুরের ছাত্র আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ায় । মার্চ মাসের প্রতিটি দিনই কোন না কোন প্রতিবাদ কর্মসূচি। ক্যাম্পাসের বাইরে যাদবপুর থেকে গোল পার্ক অব্দি দুটো বড় মিছিল হয়। ৩ তারিখ বিকেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে বড় মিছিল হয়। ২৫ শে মার্চ ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের মিছিল হয়, যাতে যোগ দেন সবাই, এমন কি ভিন্ন রাজনীতির মানুষেরাও। অভয়া মঞ্চের অনেকেই এই মিছিল গুলিতে অংশ নেন। অভয়া আন্দোলন এর বাইরে এই দু’টি মিছিলেই পুণ্য দার সঙ্গে অনেকটা পথ হাঁটা। দুদিনই চেঙ্গাইলে ক্লিনিক শেষ করে এসে মিছিলে পা মেলান। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে জানলাম দু’টি বই এর কথা – Mao tse tung এর দেহরক্ষী Chen Chang Feng এর লেখা On the Long March with Chairman Mao আর Chou En Lai এর দেহরক্ষী Wei Kuo Lu র লেখা On the Long March as guard to Chou En Lai. বললেন এই বই দুটোর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘আমার লেখা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর’ নামটা ঠিক করেছিলাম। কিছুক্ষণ পর বললেন
“আমার খুব ইচ্ছা ছিল নিয়োগীজীর ব্যক্তিগত সচিব অথবা ড্রাইভার এর কাজ করা। যদি সেই সুযোগ পেতাম তাহলে ওনাকে অনেক কাছ থেকে দেখতে পারতাম, এই বইটা আরো অনেক ভাল ভাবে লিখতে পারতাম কিন্তু কিছুতেই রাজি হলেন না। হাসপাতালে আপনার অনেক কাজ, সেই কাজটাই ভাল করে করুন, মানুষের উপকার হবে। ব্যাস, হয়ে গেল“…
২৬ মার্চ, অভয়ার বিচারের দাবিতে জনচেতনা মঞ্চের মিছিল ধর্মতলা থেকে কলেজ স্কোয়্যার। জনচেতনা মঞ্চের অন্যতম আহবায়ক সন্দীপ রায়ের সঙ্গে working team এর whatsapp গ্রুপে কিঞ্চিৎ ঠাণ্ডা যুদ্ধ হবার পরে স্টুডেন্টস হেলথ হোমে দেখা। আলাপ হয়নি, বক্তৃতা শুনলাম। পুণ্যদার কাছে আগেই শুনেছিলাম পঞ্চায়েত যৌথ কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ রায়। বক্তৃতা শুনে ভাল লাগল। বুঝলাম শুধু নেতাগিরি করেন না আর অকারণ Whatsapp যুদ্ধ করেন না। পথে নেমে কাজ করেন। প্রশাসনিক বহু বাধা সত্ত্বেও অভয়ার বিচার এবং নারী সুরক্ষার দাবি কে সামনে রেখে সরকারী কর্মচারীদের আন্দোলন গড়ে তুলছেন। সবাইকে মিছিলে আসতে আহ্বান করলেন। একই দিনে করুণাময়ীতে একটা কর্মসূচি সঠিক ও ভেজাল ওষুধ নিয়ে। আমার সেখানেই যাবার ইচ্ছা আগে। পুণ্যদা বললেন আমি আগে করুণাময়ী তে যাব, ওষুধ নিয়ে বলতে হবে, তার পর কলেজ স্কয়ারে চলে যাব। সল্টলেকে যারা থাকে তারা করুণাময়ীর কর্মসূচি সেরে কলেজ স্ট্রিট যাবে। অভয়া মঞ্চের বাকিরা সবাই জনচেতনার মিছিলে হাঁটবে ধর্মতলা থেকে। নির্দেশ মত মণীষাদি আর অভিজিৎদার নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যায় অভয়া মঞ্চের সদস্যরা যোগ দিলাম মিছিলে। মিছিল শেষে পথসভা। পথসভাও যখন শেষ পর্যায়ে পুণ্যদার ফোন এল- ´রাস্তা জ্যাম ছিল তাই দেরি হল, আমহার্স্ট স্ট্রিট ক্রসিং এ এসে গেছি” সন্দীপদার সঙ্গে তখনো আলাপ নেই তাও দূতের কর্তব্য পালন করলাম। পুণ্যদার জন্য সভা শেষ না হয়ে চলতে থাকল। এই মিছিল আর পথসভার সুত্রেই সন্দীপদার সঙ্গে আলাপ বাড়ল, জেলা সংগঠন গুলির কথা এবং সেখানে ৯অগাস্টের সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথা জানলাম, পুণ্যদাকে জানালাম। বললেন সন্দীপকে বোলো আমাকে ফোন করতে। তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো মাস। সন্দীপ রায় জেলার পাশাপাশি অভয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি গুলির ও অন্যতম উদ্যোক্তা এবং পুণ্যদার অন্যতম ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছেন। দেখলাম সন্দীপদার এত বছরের সংসদীয় বাম রাজনীতির প্রতি আনুগত্য, দলীয় ছাত্র যুব আন্দোলনে দীর্ঘ দিন কাজের অভিজ্ঞতা , একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ – কোনটাই পুণ্যদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়াল না। পুণ্যদা বামপন্থী হলেও সংসদীয় বাম শিবিরের লোক নন এই তথ্য জানা সত্ত্বেও কোথাও শ্রদ্ধার ঘাটতি হল না, সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ নিয়ে এসে এক দিনের জন্যেও কোন অশ্রদ্ধা, অবিশ্বাস বা সন্দেহ দেখলাম না। পুণ্যদার দ্বার ও সব সময়েই অবারিত, নিজের ছোট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর মুক্তির স্বপ্ন দেখা সব মানুষই পুণ্যদার পরমাত্মীয়। লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠ হলে এমনই হয়।পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস অটুট রেখে ভিন্ন মতের মানুষরা একসঙ্গে পথ চলতে পারেন যদি সেই পথ চলা কোন বৃহৎ লক্ষ্যের অভিমুখে পরিচালিত হয়।
পুণ্যদা প্রতিমাসে উত্তরবঙ্গে যান, জলপাইগুড়ি, মাথাভাঙ্গা আর কার্শিয়ং এর মার্গারেট’স হোপ নামে এক বন্ধ চা বাগানের ক্লিনিকে। শ্রমজীবী মানুষের চিকিৎসক , শীত গ্রীষ্ম , বর্ষা বারোমাস ৬৫ বছর বয়সেও নন এ সি কোচে যাতায়াত করেন। সন্দীপদা একদিন বললেন এক্টু বোঝালে পারো তো পুণ্যদাকে, এই বয়সে এত টা ধকল ঠিক হচ্ছেনা । জানালাম পুণ্যদাকে। খুব মজা পেয়ে বললেন সন্দীপকে বোলো ওর পার্টি যদি এসির টিকিট কেটে দেয় , তাহলে ওই পার্টিতেই জয়েন করব। সন্দীপদার চটজলদি উত্তর – পার্টির দরকার হবেনা, পুণ্যদা চাইলে ওনার জন্য সন্দীপ নিজেই ব্যবস্থা করে দিতে পারবে ! এই হালকা মজা গুলো চলতেই থাকে, বাড়তে থাকে পারস্পরিক আলাপ আলোচনা বোঝাপড়া – অভয়া মঞ্চ না গড়ে উঠলে আদানপ্রদানের এই সুযোগ গুলোই কখনো তৈরি হত না। ভিন্নমতাবলম্বী মানুষদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং লক্ষ্যে অবিচলতাই অভয়া মঞ্চের শক্তি।
মার্চ মাসের মাঝামাঝি কোন একদিন, তারিখ মনে নেই। পুণ্যদার কাছ থেকে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগে যোগ দেবার আহবান পেলাম। সঙ্গে শ্রমজীবীর লিখিত আদর্শ ও নীতি – মেহনতী মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত থাকার অঙ্গীকার, মেহনতী মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষার আন্দোলনে যুক্ত অন্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রতিশ্রুতি- শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ মনে করে অপেক্ষাকৃত কম খরচে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিসঙ্গত আধুনিক চিকিৎসা জনতার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যত রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচীই নেওয়া হোক না কেন, জনতার স্বাস্থ্যের অবস্থার সামান্যতম পরিবর্তনও হতে পারে না, যদি না স্বাস্থ্য কর্মসূচী খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-সংস্কৃতির আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত থাকে। জনসাধারণকে অসুখের আর্থসামাজিক কারণ সম্বন্ধে জানিয়ে চিকিৎসা বিষয়টাকে ধোঁয়াশা মুক্ত করে জনসাধারণের হাতে চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধের সহজ প্রযুক্তিগুলো তুলে দেওয়া দায়িত্ব বলে মনে করে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ । দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি ফান্ডিং এজেন্সির অর্থের ওপর নির্ভরতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ জনতার উদ্যোগে তাঁদের সামর্থ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা স্বনির্ভর কর্মসূচীর পক্ষে।শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী ও রোগীদের মধ্যে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে, যেমনটা হবে শোষণহীন নতুন সমাজে । এর সঙ্গে লেখা ‘যদি সহমত হও তবেই সদস্য পদ নিও, যদি সদস্য পদ নিতে না চাও, তাহলেও সম্পর্ক থাকবে’। ‘বুকের ভিতর দারুণ ঝড়‘…
শঙ্কর গুহ নিয়োগীর স্বপ্ন আর আদর্শ নিয়ে গড়ে তোলা শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ থেকে সদস্য পদ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন শহীদ হাসপাতালের চিকিৎসক, ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার অন্যতম সংগঠক ডঃ পুণ্যব্রত গুণ। দেওয়াল ভেঙ্গে গিয়েছিল কবেই, এবার উজানস্রোতে ভাসার পালা। মাথার মধ্যে প্রতি নিয়ত ঘুরতে থাকে পুণ্যদার সেই দিনের কথা – “দায়িত্বটা মাথায় রেখো । পথের আন্দোলনের মধ্যে সক্রিয় ভাবে থেকে আন্দোলন কে দেখা, আন্দোলনের ইতিহাস লেখা- এই সুযোগ সবার থাকে না। চলমান অভয়া আন্দোলন আর গণস্বাস্থ্য আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে হবে তোমাকে “। এমন কত মানুষের চলার পথ কে বদলে দিয়েছেন পুণ্যদা। বদলে দিলেও ওনার মত লক্ষ্যে অবিচল আর কত জন থাকতে পারে ! মাঝে মাঝে যখন সোশ্যাল মিডিয়া অথবা অন্যান্য লঘু আনন্দে গা ভাসিয়ে ফেলি, সংক্ষিপ্ত বকুনির মেসেজ আসে- “ অকারণ শক্তিক্ষয় করছো আজকাল, সময় নষ্ট কর খুব”। এই দু লাইনের ওজন ২০০০ কুইন্টাল এর চেয়েও বেশি। জীবনের সব আনন্দ উপভোগ যাঁর কাছে শুধু মানুষের পাশে থাকার সংগ্রাম, তাঁর কাছে নতজানু হতেই হয়।
সারা সপ্তাহে সোম থেকে শনি- ছয় দিন ক্লিনিক করেন পুণ্য দা- সোম মঙ্গল বুধ শনি চার দিন চেঙ্গাইলে শ্রমিক কৃষক মৈত্রী কেন্দ্র, বৃহস্পতিবার বারাসাত সিটিজেনস ফোরাম আর শুক্রবার নৈহাটি। ঝড় জল তুফান সব কিছুকে উপেক্ষা করে কোনদিন সাড়ে ছয়টা,কোনদিন ৭ টায় বেরিয়ে পড়েন । উত্তরবঙ্গের তিনটি জায়গায় চার দিন এর ক্লিনিক সেরে যে সোমবার সকালে ফেরেন, সে দিনটাও ছুটি নেন না, সকালে বাড়ি ফিরে এক ঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়েন চেঙ্গাইলের শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্দেশে। এর মধ্যেই চলে মিটিং,মিছিল, রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা। তাঁর নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগী সম্পর্কে লিখেছেন পুণ্যদা –
“ভোর হোক বা গভীর রাত—কখনো তাঁকে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক আলোচনায় ক্লান্ত হতে দেখিনি” (পুণ্যব্রত গুণ, শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর)।
পঞ্চাশ পেরোনোর আগেই ঘাতকের গুলিতে নিহত নেতার আদর্শ আর অক্লান্ত কর্মোদ্যোগ কে মাথায় রেখে প্রতিদিন সূর্য চন্দ্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ৬৫ বছরেও অবিরাম দৌড়ে চলেছেন পুণ্যদা। 
পুণ্যব্রত গুণ-ঝড়ে ফেসবুক কাঁপিয়েছিলেন নবীন চিকিৎসক থেকে প্রবীণ সাংবাদিক এবং আরো বহু মানুষ। আমি এক লাইন ও লিখিনি। পরিচয়ের বয়স তখন এক বছর ও হয়নি। শুধু পড়তাম । মুগ্ধ হয়ে পড়তাম। পড়লাম সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর লেখা ‘পাটোয়া থেকে মমতা , পুণ্যর প্রতিস্পর্ধী যাপন’ –
“মাসি গৌরী আইয়ুব। মেসো আবু সৈয়দ আয়ুব। ওর বাবা অতীন্দ্রমোহন গুণ। ইত্যাদি প্রভৃতি তালিকা দীর্ঘ করা যেত। কিন্তু এগুলো কোনও পরিচয়ই নয় গণ চিকিৎসক ডাক্তার পুণ্যব্রত গুনের। কেননা, বংশ কৌলিন্যজাত সামন্ততান্ত্রিক ধারণাকে পুণ্য ঘৃণার বস্তু বলে মনে করে।…১৯৯১ সালের ২৮.সেপ্টেম্বর শংকর গুহ নিয়োগী ভিলাইতে খুন হওয়ার পর , দললিরাজহারায় যাই। সেখানে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার নেতা পুণ্য আমাদের কাছে যেন ভিনগ্রহের মানুষ। সংগঠনের কাজ বলতে তখন ওর ঘাড়ে শহীদ হাসপাতালের যাবতীয় দায়িত্ব। সকালে আউটডোর, ইমারজেন্সি সামলে তার পরিচালনা যাকে ইংরেজিতে বলে Alpine to elephant সব পুণ্যর দায়িত্বে। খনি এলাকার গরিব মানুষের একমাত্র ভরসা শহীদ হাসপাতাল। সঙ্গে আরও দুই বঙ্গসন্তান একজন ডাক্তার শৈবাল জানা অপরজন তাঁর স্ত্রী আল্পনা দে সরকার। ওরা ছ মু মো (ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা) র দফতর লাগোয়া কমিউনে সবার সঙ্গে পংক্তি ভোজন করতো। সংগঠনের হোল টাইমার। ওদের ঘুম বা বিশ্রামের ঠিক ঠিকানা ছিল না। রাত বিরেতে কল এলেই একছুট্টে হাসপাতাল (একাধিক দিন সে ঘটনার সাক্ষী ছিলাম)।শুধু কি তাই, ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার প্রচারের নিউজ লেটার, হিন্দি/ইংরেজি/বাংলা সম্পাদনা , ডাক্তারি জার্নাল ,বই পত্র ঘাটাঘাঁটির পর কখন যে ঘুমোতে যেত কোনওদিন বুঝতে পারিনি।“
শ্রমিক কৃষক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তিরিশ বছর আর শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের পঁচিশ বছর উপলক্ষ্যে মেডিক্যাল কলেজে একটি অনুষ্ঠানে (৭ এপ্রিল ২০২৫) এসেছিলেন বিপুল চক্রবর্তী অনুশ্রী চক্রবর্তী । পুণ্য দার পরিকল্পনামত আমি ওনাদের বাড়ি পৌঁছে দিই। ফেরার পথের আড্ডায় ঠিক এই রকম কথাই বলেছিলেন অনুশ্রী দি – ‘পুণ্য কখন ঘুমোতে যেত আমরা কেউ জানতাম না’ !
যদি ও পুণ্যদা এসব মানেন না। অতিশয়োক্তি বলে উড়িয়ে দেন। আমাকে বহুবার পরামর্শ দিয়েছেন “ কলেজে যাওয়া আসার পথে ঘুমিয়ে নাও, তাহলে কাজের সময় বাড়াতে পারবে” । এটাও না কি নিয়োগীজীর উপদেশ। উনিও এমনটিই করতেন। যাওয়া আসার পথে ঘুমিয়ে নিতেন। পুণ্যদাও তাই করেন। ঘুমের মত আবশ্যিক শারীরবৃত্তীয় কাজটি কেও যে নেতার নির্দেশ মেনে রাজনীতি সচেতন হয়ে করা যায় তা পুণ্য দার সঙ্গে আলাপ না হলে কী ভাবে জানতাম ! খুব সাম্প্রতিক একটি ঘটনা মনে পড়ল । ভুবনেশ্বরের ট্রেন ধরতে সাত সকালে হাওড়ায় হাজির হয়ে শুনেছি ট্রেন আড়াই ঘণ্টা লেট । পুণ্যদার ফোন এল। কখন পৌঁছাব , কোথায় খাব, মেয়ের সঙ্গে কখন দেখা হবে – এই সব নিরীহ নিখাদ কুশল জিজ্ঞাসার পরেই বলেন – ‘কাল কের মিটিং এর মিনিটস এর খাতা টা সঙ্গে এনেছো তো? বসে না থেকে Analysis টা করে ফেল।‘ যাতায়াতের পথে ঘুমিয়ে নেওয়ার সুপরামর্শ কে আর একটু বিস্তৃত করে অপেক্ষার সময় টাতেও সুনিদ্রার পরিকল্পনা করছিলাম। সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল ! ২৪ ঘণ্টার প্রতিটি ঘণ্টা , প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড এর সদ্ব্যবহার শিখতে হয় পুণ্যদার কাছে। তার মানে এই নয় যে শুধু কাজ করেন, নিজেই বলেন – মানুষের সঙ্গে অনেকটা গল্প না করলে অনেকটা বোঝা হয় না। কাজের মধ্যে অনেক গল্প , গল্পের মধ্যেই কাজ সেরে ফেলা, কাজের ফাঁকে ঘুমানো, ঘুমিয়ে উঠেই পঞ্চেন্দ্রিয় সজাগ করে কাজে নেমে পড়া। মিলিটারি ডিসিপ্লিন বললে আপত্তি করেন, দিনে রাতে, শয়নে, স্বপনে, জাগরণে প্রতি মুহূর্তে নিজে কে ‘গণমুক্তিফৌজ’ এর সৈনিক মনে করেন। এ এক আশ্চর্য অনুশীলন।
এই পর্যন্ত পড়ে যদি মনে হয় পুণ্যদার জীবনটা শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাস আর শৃঙ্খলার নিগড়ে বাঁধা তাহলে ভুল হবে। পুণ্যদা তত্ত্বে আটকে থাকার লোক নন। সমাজ সংসারের প্রতি সাধারণীকৃত ভালোবাসা নিয়ে তাত্ত্বিক আন্দোলনে বিশ্বাসী নন। পুণ্যদা রক্ত মাংসের জ্যান্ত মানুষ, যাঁর হৃদয়ের উষ্ণতা আর অপ্রতিরোধ্য চৌম্বক শক্তিতে আকৃষ্ট হন বহু মানুষ। নিজে অবশ্য এসব তেমন মানেন না, বলেন “ লোকের আমাকে ভালোবাসা অথবা অপছন্দের একটাই কারণ – আমার অনেক গুলো মুখ নেই, সব জায়গায় একটাই মুখ”।সামাজিক অর্থনৈতিক সাম্যের লক্ষ্যে অবিরাম লড়াইয়ের পাশাপাশি সূর্যের উত্তাপ, চন্দ্রের স্নিগ্ধতা আর আজীবন অটুট চারিত্রিক সঙ্গতি আর সততা – এই হল পুণ্য দার মন্ত্রশক্তি। তাই শ্রমজীবীর নবীন চিকিৎসক – মৃন্ময়, আপন, আদিত্য, অভিজিৎ, সাবিত, রাহুলদেব, অভনি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মী সীমা, শ্যামলী, কপিল এবং আরো অনেকের প্রাত্যহিক জীবনের খুঁটিনাটি, প্রেম, বিরহ, বিবাহ- সব ডিটেইলস মুখস্ত পুণ্যদার। পুণ্যদা এদের শুধু শিক্ষাগুরু নন, অভিভাবক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই ঠাকুর পুকুর থানার ওয়ারেন্ট বেরোনোর পর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র চিকিৎসক অনীক চক্রবর্তী লেখেন
“পুণ্যদার জীবন আর তার কাজের আগুনে আমি- আমরা শুধু মোমবাতি জ্বালাইনি, মশালও সাজিয়ে রাখা আছে। সে মশাল বের করা হয় না, আওয়াজ তোলা হয় না তার কারণ অন্য কিছু নয়, শুধুই ঘেন্না। এই সরকার এবং তার শাসনব্যবস্থার প্রতি। তার সীমাহীন ঔদ্ধত্য, ঔদাসীন্য আর নির্লজ্জতার প্রতি। কিন্তু তার মানে এই নয় এখনও চুপ থাকব… নিতান্ত দুঃস্বপ্নেও পুণ্যদাকে ছোঁয়ার ধৃষ্টতা দেখালে আমার জন্যও একটা জায়গা রাখবেন আপনাদের জেলের ভেতর। মশাল নিয়েই যাব।“
জীবনে যা যা কাজ করেছেন পুণ্যদা, সব গুলোই অপরাজেয় প্রত্যয় আর গভীর নিষ্ঠা নিয়ে করেছেন, চটজলদি কিছু পাবার আশায় করেন নি। অভয়ার বিচারের লক্ষ্যে খুব বেশি রাস্তা এখনো অতিক্রম না করা গেলেও অভয়া মঞ্চ হতাশাগ্রস্ত না হয়ে, শক্তিশালী অস্তিত্ব নিয়ে ১৫ মাস ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, এর জন্য পুণ্যদার নেতৃত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে। এই অভূতপূর্ব অদলীয় রাজনৈতিক মঞ্চ গণআন্দোলন পরিচালনা করে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী,যে পরিকল্পনা ঠিক হয় আভ্যন্তরীণ সভায়। এই সভা গুলোতে অনেক মানুষ আসেন। সব সভার মত এখানেও সভার মত বিনিময়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্তরে গণ সংযোগ ও চলতে থাকে। ব্যক্তিগত সংযোগের ক্ষেত্রে পুণ্যদার বিশেষ পারদর্শিতা থাকলেও মিটিং একবার শুরু হয়ে গেলে আর একবার ও অন্য দিকে মন দিতে দেখিনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবার বক্তব্য মন দিয়ে শুনবেন। মতামত দেবেন। মিটিং এর মধ্যে সামান্যতম গল্প করাও পুণ্যদার অপছন্দ। পুণ্যদার এই প্রবল সিরিয়াসনেস অনেক অনাবিল মজার গল্প তৈরি করে প্রায় প্রতি মিটিং এই। বড় মিটিং বা শিক্ষাশিবির, অনেক লোক, পিছনে কথা বন্ধ করা যাচ্ছেনা, পুণ্যদা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে পরীক্ষার হলের ইনভিজিলেটরের মত পায়চারি শুরু করে দেন। এক দিন সামনের সারিতে বসে সই এর কাগজ হাতে নিয়ে গল্প করতে গিয়ে বকুনি খেলাম আমি আর ঝুম্পাদি। ঝুম্পাদি পুণ্যদার বাবা অধ্যাপক অতীন্দ্রমোহন গুণের ছাত্রী। পুণ্যদার বকুনি খেয়ে খুবই আবেগাপ্লুত গলায় বলল “আগে স্যার বকতেন , এখন দাদা বকছেন”! কোন এক দুর্জ্ঞেয় কারণে পুণ্যদার কাছে বকুনি খেলে প্রীতির পরিমাণ বর্ধিত হয়। আমরা চুনোপুঁটিরা বিপুল আনন্দ উপভোগ করি যখন পুণ্যদা গম্ভীর হয়ে মাইকে বলেন – ‘মানস,তমোনাশ, উৎপল পিছনে বসে কথা বলছো, সামনে এসে বস’। সভায় প্রবল হাস্যরোল, বিনা বাক্যব্যয়ে, কোন প্রশ্ন না করেই মানসদা (ডঃ মানস গুমটা), তমোনাশদা (ডঃ তমোনাশ চৌধুরী) আর উৎপলদা (ডঃ উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়) সলজ্জ মুখে বাধ্য ছাত্রের মত সামনের সারিতে এসে বসে পড়েন। ডঃ তমোনাশ ভট্টাচার্যদা পুণ্যদার টাকি হাউজ স্কুল এবং মেডিক্যাল কলেজের ‘ভাই’ হবার সুবাদে প্রায় প্রতি মিটিং এই বকুনি খান। ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিবাদী মানুষের মধ্যে এই শ্রদ্ধা ও প্রীতির বন্ধন, পুণ্যদার প্রতি সর্বস্তরে এক গভীর আস্থা ও আনুগত্য – এ শুধু পুণ্যদার অর্জন নয়। এ অর্জন অভয়া মঞ্চের, যে ছক ভাঙ্গা প্রতিবাদী মঞ্চের সঙ্গে পুণ্যদার যোগাযোগ অনিবার্য ছিল । সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী যথার্থই বলেছেন
“ঘরের খেয়ে বনের মোষতাড়ুয়া পুণ্য যে অভয়া মঞ্চ গড়ার অন্যতম পুরোধা হবে, সেটা ওর রাজনৈতিক জীবন বোধের এক প্রকার অনিবার্য পরিণতি।রাষ্ট্রীয় রক্ত চক্ষু দেখার অভ্যাস ওর আছে। প্রতিস্পর্ধাও ততোধিক”।
রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই প্রতিবাদীরা জোটবদ্ধ হচ্ছেন অভয়া মঞ্চকে কেন্দ্র করে, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ছে গণস্বাস্থ্যের আন্দোলন, জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস, ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এবং অভয়া মঞ্চ ও তার বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন হেলথ ক্যাম্প এবং রিলিফ ক্যাম্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। এই সম্মিলিত সংগ্রামই একদিন ছিনিয়ে আনবে বিচার, বন্ধ করবে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ। দিনবদলের স্বপ্ন দেখাচ্ছে অভয়া মঞ্চ। এই সময় পুণ্যদার মত মানুষদের আরো অনেক অনেক দিন পথে নামার পূর্ণ শক্তি নিয়ে পাশে থাকা প্রয়োজন।
খুব ভালো থাকুন কমরেড, রাত প্রভাতের স্বপ্ন দেখান আরো অনেক মানুষকে এবং সুন্দর সমাজ গড়ার মন্ত্রে উজ্জীবিত করুন আমাদের আগামী প্রজন্ম কে।লাল সেলাম।।
কৃতজ্ঞতা
১। বিপুল চক্রবর্তী, অনুশ্রী চক্রবর্তী
২। অধ্যাপক কাঞ্চন সরকার
৩। অভয়া মঞ্চ এবং শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা নির্মাণের সব প্রতিবাদী বন্ধুরা
৪ নম্বর প্লাটফর্ম ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত.












পুণ্যদা একাই এক প্রতিষ্ঠান। এই পচে যাওয়া ধসে যাওয়া সমাজের গতিপথ বদলের যোগ্যতম কান্ডারী। যখন সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের bankruptcy হতাশার পাহাড় জমায় তখন এই চিরতরুণ মানুষটি এক মুঠো দূষণমুক্ত নীল আকাশের স্বপ্ন হয়ে দেখা দেন।
গোপা তাঁর অনবদ্য কলমে ও নিবিড় অনুভবে পূণ্যদার পূর্ণাঙ্গ মূর্তিটি সুচারু রূপে নির্মাণ করেছেন। গোপাকে অসংখ্য অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই।