সেদিন খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে বেশ অন্যরকম অনুভূতি হলো। খবরটা এরকম – শহর সাফসুতরো রাখতে অভিনব উদ্যোগ ভদ্রেশ্বর পুরসভার। বর্জ্য প্লাস্টিক জমা দিলেই ভরপেট খাবার। খবরটা বিস্তারিতভাবে পড়ে দেখলাম পুরসভার এহেন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ভদ্রেশ্বরের জুটমিল কলোনি এলাকায় বসবাসরত মানুষজন। যে সব মানুষ এই কাজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন তারাও খুশি কেননা এক কিলোগ্রাম বর্জ্য প্লাস্টিকের বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন দুটি করে খাবার কুপন। এই উদ্যোগের ফলে নাকি বস্তি এলাকার পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন থাকছে। পুর কর্তৃপক্ষ প্লাস্টিক থেকে শহরকে মুক্ত করতে এই প্রকল্পের কথা ভেবেছেন। প্রশ্ন হলো, এভাবে কি আদৌ প্লাস্টিক বিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব ? এর উত্তরে বলবো – না সম্ভব নয়। প্লাস্টিক অজেয়, অন্তত এই মুহূর্তে।শীত গ্রীষ্ম বর্ষা – আমাদের ঘুম ভাঙে বলরামের হুইসেলের শব্দে। বলরাম আমাদের এলাকার সবুজ সাথী। বলরামের কাজ হলো প্রতিদিন, প্রায় ঘড়ি বাঁধা সময়ে এসে, এলাকার বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাঁচা ও পাকা বর্জ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া। সবুজ বিয়োজ্য বর্জ্য সবুজ বালতিতে এবং অন্যান্য শক্ত, কঠিন অবিয়োজ্য বর্জ্য নীল রঙের বালতিতে জমা করে রেখে দিতে হয়। অবিয়োজ্য বর্জ্যের সিংহভাগ দখল করে থাকে বিচিত্র সব প্লাস্টিক পণ্যের সম্ভার। আমরা সবাই বলরামের গাড়িতে সবকিছু জমা করেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি– যাক্! আবর্জনা বিদায় হলো। কিন্তু প্রশ্ন তো এখানেও। আমার আপনার আমাদের ঘরের প্লাস্টিকেরা সব গেল কোথায়? তারা কি সত্যি সত্যিই ধরাধাম ত্যাগ করিল?একদিন একটু খোশ মেজাজে বলরামকে পেয়ে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম – আচ্ছা বলরাম,এই যে বস্তা বস্তা প্লাস্টিক আমরা সবাই মিলে তোমার গাড়িতে জমা করি প্রতিদিন সেগুলো কোথায় যায় বলতো? বেশ খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বলরাম উত্তর দিল – কোথায় আর যাবে? এসব গলিয়ে ফেলে আবার নতুন প্লাস্টিক তৈরি করা হয়।
রিসাইকেল বা পুনর্নবীকরণকেই এই মুহূর্তে প্লাস্টিক থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় হিসেবে মনে করা হচ্ছে। আমাদের ঘরের প্লাস্টিকের অতি সামান্য অংশ রিসাইকেল করতে পাঠিয়ে আমরাও সবাই কমবেশি স্বস্তি বোধ করি। ভাবখানা এই – যাক্, ওদের সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া গেল ! এটাই যে যথেষ্ট নয় তা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে সেই দেশে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের মাত্র ৬% রিসাইকেল করা হয়। ভারতের মতো দেশে এই অনুপাত যে আরও আরও নগণ্য তা বোধহয় বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। যত্রতত্র, যেমন তেমন করে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক আমাদের পয়প্রণালী ব্যবস্থাকে জল চলাচলের অনুপযোগী করে তোলে, এখানে সেখানে পড়ে থাকা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিককে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে গরু ছাগল নিজেদের বিপদ ডেকে আনে, আর দৃশ্য দূষণের কথা নাই বা বললাম।একথা তো আর অবিদিত নয় যে পরিবেশের নানান অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বর্জ্য প্লাস্টিক অবিয়োজ্য অর্থাৎ যা এসে মাঠেঘাটে জমা হলো তা কখনোই প্রাকৃতিক নিয়মে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় না , অবিকৃত অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকে। সূর্যের তাপে সেগুলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে ভেঙে গিয়ে মাইক্রো প্লাস্টিকে পরিণত হয়। প্লাস্টিকের এই আণুবীক্ষণিক কণিকারাই নানান উপায়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গের সৃষ্টি করে। নিরন্তর প্রচারের মাধ্যমে প্লাস্টিকের ব্যবহারকে যদি সীমিত করা যায়, আবশ্যিকভাবে প্লাস্টিক বিনের ( plastic bin) ব্যবহারকে উৎসাহিত করা যায় তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতি থেকে খানিকটা মুক্তি পেতে পারি, কিন্ত তা সহজে হবার নয়, অন্তত আমাদের দেশে।বিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন যে পেট্রোলিয়াম থেকে উৎপন্ন প্লাস্টিককে রিসাইকেলেবেল বা পুনর্নবীকরণ যোগ্য হিসেবে কখনোই প্রস্তুত করা হয়নি। প্লাস্টিক থেকে প্রায় ১৬০০০ রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যায় যাদের অধিকাংশই উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ করা হয় যাতে প্লাস্টিক নমনীয় হবার সাথে সাথে শক্তপোক্ত,বর্নিল এবং সৌর তাপ সহনশীল হতে পারে। ব্যবহারের প্রকৃতির তারতম্য অনুসারে প্লাস্টিকের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে এই রাসায়নিক পদার্থগুলো মেশানো হয়; ফলে এই সমস্ত প্লাস্টিক বর্জ্যকে রিসাইক্লিং কেন্দ্রে আলাদা আলাদা করে নিয়ে যেতে হবে এবং আলাদা আলাদা করেই রিসাইকেল করতে হবে।
আরও একটা বিষয়কে মাথায় রাখতে হবে,তাহলো রিসাইকেল করার ফলে প্লাস্টিক তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। কাঁচ বা এলুমিনিয়ামের বেলায় কিন্তু এমনটা হয় না, অর্থাৎ তাদের মৌল গুণাবলী অক্ষুণ্ন থাকে। রিসাইকেল করা কাঁচের বোতল থেকে বারংবার কাঁচের বোতল উৎপাদন করা সম্ভব হলেও, প্লাস্টিকের বর্জ্য বোতল থেকে এক থেকে দুবার বোতল তৈরি করা যায় ।শেষমেশ তাদের ঠাঁই হবে ভাগাড়ে অথবা তাদের ইনসিনেরেটারের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করতে হবে। এরফলে বাড়বে জল,মাটি এবং বাতাসের দূষণের মাত্রা। এর থেকে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার যে রিসাইক্লিং কখনোই টেকসই ব্যবস্থাপনার ভাবনাকে পরিপুষ্ট করে না। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং পরিবেশে প্লাস্টিকের ফিরে আসাকে বিলম্বিত করতে পারে মাত্র, কখনোই পরিবেশে তার ফিরে আসাকে নির্মূল করতে পারে না। প্লাস্টিক এক নাছোড়বান্দা উপাদান।আমাদের সৌজন্যে প্লাস্টিক আজ সর্বত্রগামী – জল স্থল অন্তরীক্ষে আজ সগৌরবে বিদ্যমান এই অবাঞ্ছিত উপকরণটি। পৃথিবীর উত্তরে থাকা আর্কটিক ওশেনের হিমবাহ থেকে শুরু করে, প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাতের তলদেশ, উত্তুঙ্গ পর্বত শিখরে,আমাজনের বৃষ্টিবনের গভীরতম অংশ থেকে শুরু করে বাদাবনের খাঁড়ি– সর্বত্রই প্লাস্টিক পণ্যের সম্ভার দৃশ্যমান। আমাদের হাতে হাতেই তার এমন বিশ্বজয়ী হয়ে ওঠা।
একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে যে, দূষণের কারক কেবলমাত্র প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ নয়, প্লাস্টিকের সর্বাত্মক ব্যবহার ক্রমশই এই সময়কে যেন গ্রাস করে ফেলেছে। মাইক্রো প্লাস্টিক একটু একটু করে আমাদের জৈবনিক অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলছে। মানব শরীরের এমন কোনো অংশ নেই যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক বাসা বাঁধেনি – রক্ত বাহিত হয়ে তা পৌঁছে গেছে আমাদের ফুসফুস, মস্তিষ্ক, পুরুষের অন্ডকোষ ( testicles), অমরা ( placenta) এমন কি মাতৃদুগ্ধে। আগামী প্রজন্মের সামনে এক অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে সন্দেহাতীতভাবে।
এখানেই শেষ নয়। নতুন নতুন গবেষণায় উঠে আসছে আরও সব চাঞ্চল্যকর তথ্য যা আমার, আপনার,আমাদের সকলের রাতের ঘুম কেড়ে নেবার পক্ষে যথেষ্ট। খুব উদ্বেগের কথা যে প্লাস্টিকের জীবনচক্রের সঙ্গে আমাদের জীবনচক্র এক তারে বাঁধা পড়ে গেছে। একদিকে প্লাস্টিক ভাঙছে, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে অন্যদিকে কমছে আমাদের আয়ুষ্কাল। নিত্যনতুন উপসর্গ এসে হাজির হচ্ছে আমাদের দেহযন্ত্রে। কতশত বিপদ যে এখনও ওৎ পেতে আছে তার হদিস জানা নেই। হাতের তীর, মুখের বাক্যকে যেমন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় প্লাস্টিককে এড়িয়ে চলাও আজকের দিনে সম্ভব নয়। তার জন্য অনেক অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে আমাদের সকলকে। আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত?
The biggest threat to mankind in general and mother nature in particular! Spread of Plastic has to be controlled at any cost, on war footing. Need stringent laws and regulations. Thanks for the beautiful article. Will anyone in position to take action understand?
Thanks for your comments. The world is at the brink of disaster . We need to fight together. Aware the people. Let’s fight together.
Soumen Roy
5 months ago
একজোট হয়ে কথা হোক,আন্দোলন হোক সে ভালো কথা। তবে আমরা মোটেও প্লাস্টিক ত্যাগের জন্য প্রস্তুত নই।বহু শিক্ষিত লোককে বাজারে লঙ্কা একটা পলিথিনে,টমেটো একটায় ইত্যাদি করতে দেখি।যতক্ষণ বাজারে পাওয়া যাবে এইরকম চলবে। সে আপনি যতই সচেতনতা গড়ার চেষ্টা করুন। বাজারে না পাওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা কোনদিন হবেনা সবাই জানেন। এটাকে নেগেটিভ থট বলে ধরবেন না।এটা ফ্যাক্ট।
আবার বলি লেখার মাধ্যমে সচেতন করে চলুন।যদি কিছু হয়।
ঘুরে ফিরে বল আমাদের কোর্টেই ফিরে আসবে। সমস্যা তো শুধু ক্যারিব্যাগ নিয়ে নয়। গোটা প্লাস্টিক পরিবারই এজন্য দায়ী। মাইক্রো প্লাস্টিক বিপদ সংকেত দেখিয়ে যাচ্ছে। এরপরও চোখ উল্টিয়ে থাকলে কিছুই বলার নেই
কয়েকদিন আগে এক ফেসবুক বন্ধু একটা পোষ্ট করেছিলেন – শিয়ালদহ এবং অন্যান্য স্টেশন চত্বরে হকার সরিয়ে দেওয়ার জন্য নাকি মধ্যবিত্ত মানুষজন খুব খুশি হয়েছেন। শিক্ষিত,
১৯৪৩ সালে সিসিলি জয় করাটা মিত্রপক্ষের কাছে খুব জরুরি ছিল। জেনারেল প্যাটনের নেতৃত্বে অপারেশন হাস্কি নামের একটা অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে জয় লাভের জন্য
পুবের আকাশে আলতাপাটি শিমের রঙ ধরা মাত্র আরম্ভ হয়ে যায় বাস্তু গোলাপায়রাদের বকবকম। বারবাড়ির ঠাকুরদালানের পঙ্খের কাজ করা খাঁজগুলোয় ঘাড় গুঁজে রাত কাবার করে দেয়
হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাতের তত্ত্ব পন্ডিতদের বিতর্ক সভা আর পরিভাষা কন্টকিত পুঁথির পাতার বাইরে কতটা ছড়িয়েছিল সন্দেহ আছে| এই ভুবনের ভার যাদের করতলে, মেঘের আড়াল থেকে
১. কলকাতার কোল ঘেঁষে যেমন বিধাননগর উপনগরী, মুম্বাইয়ের ঠিক তেমনিই নবি মুম্বাই। একেবারে শুরুতে অবশ্য ডাকা হতো নিউ মুম্বাই নামে,পরে ইংরেজি নিউ শব্দের মারাঠিকরণ করে
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।
The biggest threat to mankind in general and mother nature in particular! Spread of Plastic has to be controlled at any cost, on war footing. Need stringent laws and regulations. Thanks for the beautiful article. Will anyone in position to take action understand?
Thanks for your comments. The world is at the brink of disaster . We need to fight together. Aware the people. Let’s fight together.
একজোট হয়ে কথা হোক,আন্দোলন হোক সে ভালো কথা। তবে আমরা মোটেও প্লাস্টিক ত্যাগের জন্য প্রস্তুত নই।বহু শিক্ষিত লোককে বাজারে লঙ্কা একটা পলিথিনে,টমেটো একটায় ইত্যাদি করতে দেখি।যতক্ষণ বাজারে পাওয়া যাবে এইরকম চলবে। সে আপনি যতই সচেতনতা গড়ার চেষ্টা করুন। বাজারে না পাওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা কোনদিন হবেনা সবাই জানেন। এটাকে নেগেটিভ থট বলে ধরবেন না।এটা ফ্যাক্ট।
আবার বলি লেখার মাধ্যমে সচেতন করে চলুন।যদি কিছু হয়।
ঘুরে ফিরে বল আমাদের কোর্টেই ফিরে আসবে। সমস্যা তো শুধু ক্যারিব্যাগ নিয়ে নয়। গোটা প্লাস্টিক পরিবারই এজন্য দায়ী। মাইক্রো প্লাস্টিক বিপদ সংকেত দেখিয়ে যাচ্ছে। এরপরও চোখ উল্টিয়ে থাকলে কিছুই বলার নেই