পুবের আকাশে আলতাপাটি শিমের রঙ ধরা মাত্র আরম্ভ হয়ে যায় বাস্তু গোলাপায়রাদের বকবকম। বারবাড়ির ঠাকুরদালানের পঙ্খের কাজ করা খাঁজগুলোয় ঘাড় গুঁজে রাত কাবার করে দেয় ওরা। দিনমণির প্রথম কিরণ শ্যাওলাজমা উঠোনের কোণে তেরছা হয়ে পড়ার আগেই জেগে ওঠে ছেয়ে রঙের কবুতরের দল – ভোরের ফ্যাকাসে আলোয় চকচক করে ওঠে ওদের গলার ময়ূরকণ্ঠী রঙের পালক, চোখের চুনিতে ঝিলিক মারে সকালের সূর্য।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চোখ মেলেন তেতলার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো সরোজবাসিনী দেবী – এবাড়ির সাবেক বড়গিন্নি।
গুলি গুলি চোখ মেলে তিনি প্রথমেই কঠোর দৃষ্টিতে জরিপ করে নেন চতুর্দিক। হেবোটা এখনো পাশবালিশ আঁকড়ে ঘুমুচ্ছে। হারামজাদা! সারাজম্ম পূর্বপুরুষের রোজগারের কলসি গড়িয়ে খেয়ে গেলি – তোর বাপ ঠাকুদ্দাও অবিশ্যি তাই-ই করেছে, নিজেদের মুরোদ দেখাবার তাগিদ হয়নি একবারও। গড়িয়ে খেতে খেতে কলসির জল যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, সে খেয়াল কি আছে অলম্বুষটার?
সরোজবাসিনীর দীর্ঘশ্বাসের ঠেলায় কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো পাখাহীন শূন্য আংটা লোভনীয়ভাবে দুলতে থাকে। সেই দিকে তাকিয়ে তিনি বিড়বিড় করেন – মর মর! যত রাজ্যের অলবড্ডে ড্যাকরার দল, মর!
হেবোর পাশে আলুথালু হয়ে শুয়ে থাকা মঞ্জুরানীর ওপর নজর পড়তে ফের দাঁত কিড়মিড় করে ওঠেন বড়গিন্নি। স্বামীর ফুটো কড়ির মুরোদ নেই, তবু রাত জেগে সিরিয়াল দেখার অত নেশা কিসের লা? তারপর মাঝ সকাল অবধি গায়ের কাপড় আলগা করে, নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে লজ্জাও করে না গতরখাকী মাগীর?
অন্ত্যজ পরিবার থেকে মেয়ে নিয়ে এলে এমনধারা অসৈরণই হয় বড়খোকা – সখেদে নিজের জ্যেষ্ঠপুত্র, হেবোর বাপকে স্মরণ করেন বড়গিন্নি। দেওয়ালে কান পাতলে ফ্রেমের মধ্যে থেকে তাঁর মিহি দন্তবাদ্য স্পষ্ট শোনা যায়।
ভিতরবাড়ির দোতলার ঘরের সস্তা সাটিনের পর্দা পরম মমতায় ঠেলে সরিয়ে, সরোজবাসিনীর অন্তর্দৃষ্টি এবার হেবোর একমাত্র পুত্রের শোবার ঘরে নিঃসঙ্কোচে ঢুকে পড়ে।
খাটের এককোণের ছত্রি থেকে ঝুলছে রংচটা মশারির খুঁট – টাঙানোর সময় হয়নি ছেলের। হবে কি করে? কি এক ছাইয়ের কল সেন্টারে কাজ করে, রাত দুপুরের আগে ছুটি নেই। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই দেড়টা দুটো। খাবার ঘরের সাতকেলে শ্বেতপাথরের টেবিল ফেটে গিয়েছে কোণাকুণি, খাঁজে জমেছে বিস্তর ময়লা। সেই ময়লা ন্যাতা বোলানো টেবিলে কাঁসার বগি থালা চাপা দেওয়া খানকতক চিমড়ে রুটি আর ঠান্ডা ঘ্যাঁট পড়ে থাকে বাড়ির একমাত্তর বংশধরের জন্য। কোনওমতে সেটা গলাধঃকরণ করেই বিছানার পানে ছোটে ছেলেটা। আহা মরে যাই – ফের বিলাপ করেন সরোজবাসিনী – নুড়ো জ্বেলে দিতে হয় অমন অলপ্পেয়ে আপিসের মুখে! মানিকটার কষ্ট যে আর চোখে দেখা যায় না। আহা, দাদাশ্বশুরের মোহরগুলোর খোঁজ যদি কোনওক্রমে পেয়ে যেত এরা! মঞ্জুকে এবার দিয়েই দেবেন নাকি সুলুকসন্ধান?
তারপরেই জিভ কাটেন বড়গিন্নি – মিশি খাওয়া এবড়োখেবড়ো দাঁতের সারির ফাঁক দিয়ে লাল টুকটুকে রসনার আগা বেরিয়ে আসে। মনে পড়ে যায় রায়বাহাদুর দাদাশ্বশুর গগন মুখুজ্যের উইল –m‘এই বসতবাটীর হৃদকন্দরে আমার সঞ্চিত অর্জন গচ্ছিত রহিল। উপযুক্ত উত্তরাধিকারী তাহা স্বীয় বুদ্ধিবলে এবং কর্মফলে আবিষ্কার করিবে আশা রাখি। ততদিন এই বাটীর আত্মা উহা রক্ষা করিবে। ইহার অধিক কোনও সূত্র আমার ইচ্ছাপত্রে থাকিবে না।’
পটলোৎপাটন করার পরে মোহরের ঠিকানা মালুম হলেও কোনও ভাবে তা পাঁচকান করার জো নেই সরোজবাসিনীর। বছর চারেক আগে কার্তিকী অমাবস্যার রাতে ছাতের লোহার জলট্যাঙ্কির উপর বসে স্বয়ং গগন মুখুজ্যে রক্তচক্ষে তাঁকে মন্ত্রগুপ্তির হুকুম দিয়ে গেছেন – সেই মহান আত্মার কাছে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, অমান্যি করেন তাঁর সাধ্য কী? অবিশ্যি হেবোর বউটা নিকষ্যি গবেট, ইশারা ইঙ্গিতে বোঝাতে গেলেও কিচ্ছুটি বোঝে না – হাবার মতো বড় বড় চোখ করে চেয়ে থাকে কেবল। ফের দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সরোজবাসিনী – ঠাকুরঘরের সিংহাসনের পাশে মাকড়সার জাল সেই হুহু বাতাসে ছিঁড়ে যাবার জোগাড় হয়।
ভিতর বারান্দার নকশাকাটা গ্রিলে জং ধরেছে বহুদিন। বিলেত থেকে আনানো চিনেমাটির টুকরো বসানো মেঝের ফাটলগুলো এখন এত গভীর যে ফাঁকফোকরে কয়েকশো আরশোলার পরিবার নিশ্চিন্তে বাস করে। দেয়ালগিরির ঝলমলে আলো কবেই হারিয়েছে কালের ঘূর্ণিতে – ন্যাড়া গজালগুলো দাঁত ছরকুটে ব্যঙ্গ করে বড়গিন্নির দৃষ্টিকে।
মর, মর – অভিসম্পাতে ভিতরবারান্দা মথিত করে দিয়ে পার হয়ে যায় সরোজবাসিনীর তীক্ষ্ণ নজর। এবড়ো খেবড়ো সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় একতলায়, ভাঁড়ার ঘরের কোণে, যেখানে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে রয়েছে বাসন্তী দাসী।
আ মোলো যা, ছিষ্টির কাজ পড়ে রয়েছে, ইদিকে হাড়কাটার বেবুশ্যের মতো ঠ্যাং তুলে ঘুমুচ্ছে দ্যাখো মেয়েমানুষটা! সরোজবাসিনীর অগ্নিদৃষ্টি এক পাক নৃত্য করে নেয় ভাঁড়ার ঘর জুড়ে। সেকেলে জানলার ভাঙা খড়খড়ি কেঁপে ওঠে থরথর করে, আর সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে বাসন্তী। খানিকক্ষণ থুম মেরে বসে থেকে হুড়মুড় করে উঠে পড়ে ব্যস্ত হাতে বিছানা গোটায়।
উঃ, মেলা কাজ এখন। জল তোলো রে, দুধ আনো রে, উঠোন ঝাঁটাও রে, চা করো রে – ফরমাস তো রাজা জমিদারদের মতো, তাও যদি ট্যাঁকের জোর থাকত! এমন কাজের মুখে কবে লাথি মেরে চলে যেতো বাসন্তী, যদি না —যদি না ভুবিমাসী একদিন এবাড়ির কত্তা গিন্নির কথা আড়াল থেকে শুনে ফেলত। ভুবিমাসী এক গাঁয়ের লোক, তার আগে এখানে ঝিয়ের কাজে লেগেছিল। সে-ই একদিন গাঁয়ে খবর আনে, এই আদ্যিকালের বাড়ির কোন গোপন কুঠুরিতে নাকি এখনকার মালিকের ঠাকুদ্দারও ঠাকুদ্দার আমলের ঘড়া ঘড়া মোহর লুকোনো আছে। বংশ পরম্পরায় খোঁজাখুঁজি হয়েছে বিস্তর – পাওয়া যায়নি গুপ্তধন।
হুঁঃ, নিজের মনেই মুখ টিপে হাসে বাসন্তী। সে হলো গিয়ে দখনে’র ভূপালগঞ্জের ডাকাতপাড়ার মেয়ে – কোথায় গুপ্তধন খুঁজতে হয় সেটা তার মতো চৌকস মেয়েছেলে জানবে না তো কি এই ঘটি গড়িয়ে জল খাওয়া ন্যাদোস ভদ্দরলোকেরা জানবে? লোভের ছায়া তিরতির করে কাঁপে বাসন্তীর চোখের পাতায়। ছ’মাস ধরে হাড়ে দুব্বো গজিয়ে খাটাখাটুনির দাম পাওয়ার সময় এসেছে বোধহয় এবার।
সদর দরজা সাবধানে ভেজিয়ে বড় রাস্তায় পা রাখে বাসন্তী। রায়বাহাদুর গগন মুখুজ্যের আলিশান অট্টালিকার দৃষ্টির বাইরে গিয়ে ব্লাউজের ভিতর হাত চালিয়ে ছোট্ট মুঠোফোনটা বের করে চটজলদি টিপতে থাকে একটা নম্বর – দোস্তিপুরের আকাই শেখের নম্বর। চোরবাজারের মুকুটহীন সম্রাট আকাই শেখ, যার খোঁচড় হয়ে সে ঢুকেছে এই বাড়িতে! পথ চলতি মানুষের কান বাঁচিয়ে তাকে জানাতে থাকে বাসন্তী, কেমন করে পাক্কা গোয়েন্দার মতো তক্কে তক্কে থেকে অ্যাদ্দিনে সে নজর করে দেখেছে যে পুরোনো গোয়ালঘরের পশ্চিমকোণের মেঝেটা একটু একটু করে বসে যাচ্ছে যেন – চেপে পা ফেললে কেমন ঢপ ঢপ শব্দ হয়।
(ক্রমশ)











