নেতা-নেত্রীদের অপকর্ম দেখতে দেখতেই সাধারণ মানুষ ‘রাজনীতি’ সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। টাকা বাড়ি জমি গাড়ি পদ খ্যাতি ইত্যাদির লোভ, রাজনীতির জগতে কদর্য সব উদাহরণ তৈরি করে। ‘নীতি’ অথবা ‘আদর্শ’-র কার্যত চিহ্ন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না সেখানে। পাশাপাশি যে মানুষগুলো নীরবে শুধু দিয়েই যান, আদর্শকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের দিকে কোনোদিনই ফিরেও তাকান না, তাঁরা শুধু উপেক্ষাই পান! তাঁদের অবদান ও বীরত্ব সমাজের কাছে থেকে যায় অজ্ঞাত।
এমনি এক অখ্যাত-অপরিচিত বীরের কথা বলার জন্যেই এই লেখা।
মানুষটির পোশাকী নাম তরুণ চক্রবর্তী। আমাদের কাছে খোকন। ‘সাহাপুর হরেন্দ্রনাথ বিদ্যাপীঠ’ ইস্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকেই আমার ক্লাসের বন্ধু। ওঁরা থাকতো সাহাপুর ক্যাম্পে। আমি ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ে কীরকম জামা-প্যান্ট পড়ে রবীঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা আবৃত্তি করেছিলাম ইস্কুলের অনুষ্ঠানে, তা-ও খোকন আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে বৃদ্ধ বয়সে।
খোকন ছোটবেলা থেকেই ডাকাবুকো। ফুটবল আর মারামারিতেও সমান চৌকস। ইস্কুলের রংবাজ ছাত্ররা ওঁর হাতে অনেকবারই শায়েস্তা হয়েছে।
১৯৬৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে খোকন ভর্তি হয়েছিলো গোলপার্কের সাউথ সিটি কলেজে। কিন্তু পড়াশুনা করে ‘ক্যারিয়ার’ গড়ার সময় আর তখন কোথায়! ১৯৬৬ সালে ‘খাদ্য ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি বিরোধী’ গণ-আন্দোলনে সারা পশ্চিমবঙ্গ তখন উত্তাল। একেরপর এক জায়গায় ছাত্রদের মিছিল হচ্ছে; পুলিশের লাঠি-গুলি চলছে; স্বরূপনগর, বসিরহাট, কৃষ্ণনগর, বেহালা ইত্যাদি জায়গায় তখন স্তুপিকৃত হয়ে উঠছে শহীদের লাশ; পুড়ছে ট্রাম। কয়েকদিনে পুলিশের গুলিতে সরকারিভাবেই অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু, ৩০০-র বেশি আহত, গ্রেপ্তার প্রায় ৭,০০০ জন। খোকন তখন অনিবার্যভাবেই সক্রিয় ছিলো রাস্তায়।
পরের বছরেই “নক্সালবাড়ি লাল সেলাম” শ্লোগানে উদ্বেলিত পশ্চিমবঙ্গ। পড়াশুনার পাট একেবারেই লাটে উঠলো খোকনের। কোনও কাজই আধাখ্যাঁচড়া ভাবে করার ছেলে ছিলো না। “যা করতে হবে তার জন্য একশো ভাগ নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে।” রাজনীতিতেও তা-ই। বাড়িঘর ছেড়ে বিপ্লবী রাজনীতিকেই আঁকড়ে ধরলো। ভিয়েতনাম মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে মিছিল, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সভা, সর্বত্রই সক্রিয় তরুণ চক্রবর্তী। চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের প্রবাদপ্রতিম নেতা অনন্ত সিংহের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আরসিসিআই (‘রেভল্যুশনারি কমিউনিস্ট কাউন্সিল অব্ ইন্ডিয়া’) সংগঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হয়ে উঠেছিলো খোকন। কুখ্যাত খুনি পুলিশ অফিসার রুনু গুহনিয়োগী এই সংগঠনের নাম রটিয়েছিলো ‘এমএমজি’ (ম্যান-মানি-গান)। গভীর রাজনৈতিক ও কমিউনিস্ট প্রত্যয় নিয়েই যে এই সংগঠনটি চলতো, তাকে বিকৃত করার বদ উদ্দেশ্যেই।
আরসিসিআই-এর প্রতিটি অ্যাকশনে খোকন ছিলো একেবারে সামনে। সদর স্ট্রীটের পোস্ট অফিসে, নিউ আলিপুরের ন্যাশনাল অ্যাণ্ড গ্রীনলেজ ব্যাঙ্কে, সর্বত্র। একটি অ্যাকশনের পরের দিনই, পুলিশ যখন হন্যে হয়ে খুঁজছে ‘ডাকাত’-দের, খোকন তখন ও.সি.-র হাত থেকে থানায় পুরস্কার নিচ্ছে এক ডাকসাইটে ছিনতাইবাজকে তাড়া করে ধরার জন্যে। হাজারিবাগ জেল থেকে কলকাতায় নিয়ে আসার পরে, লালবাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে রুনু গুহনিয়োগী অশ্রাব্য ভাষায় খিস্তি দিয়ে চলেছে ওঁদের, উপরওয়ালা পুলিশ অফিসারের সামনে দাঁড়িয়েই। সহ্যের সীমা অতিক্রম করায় খোকন বলে ওঠে, “তুই কী সবে গোঁফ ওঠা ‘নকশাল’ পেয়েছিস নাকি? হাতকড়া-ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে, চারিদিকে পুলিশ নিয়ে, লালবাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে মাস্তানি মারছিস। হিম্মৎ থাকলে খুলে দে। আমার হাতে স্টেনগান দে, নিজে স্টেন নে। চল খোলা মাঠে। গুলির মালা পরিয়ে দেবো রে গলায়, শুয়ারের বাচ্চা।” এই ছিলো খোকন।
রাষ্ট্রবিরোধী বিপ্লবী রাজনীতির ফল হিসাবে, খোকন ১৯৬৯ সালে অনেকের সঙ্গেই গ্রেপ্তার হয় ঝাড়খণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে। হাজারিবাগ কেন্দ্রীয় কারাগারে ওর বন্দী জীবনের শুরু। নাগারে ৯ বছর বিভিন্ন জেলে বন্দী জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে ওঁর। হাতকড়া আর ডান্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় আদালতেও হাজির করা হয়েছে! রক্তবমি করা অবস্থায় জেল থেকে স্ট্রেচারে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময়ে হাতজোড় করে পুলিশ অফিসারের অনুরোধ, “দয়া করে দেখবেন, আমার যেন চাকরিটা না যায়”! এঁরা ভোজবাজি করে উড়েও হয়তো যেতে পারে, এমনই পুলিশ মহলে অনেকের বিশ্বাস ছিলো! গ্রেপ্তার হয়ে আসা এক সর্বভারতীয় বিপ্লবী নেতার কথা – “মশারি না হোইলে তো ঘুমাইতে পারমু না” – শুনে জেলে সেলের মধ্যে ‘নেতা’র জন্য মশারি খাটিয়ে দেওয়ার কাজ! বারবার জেলে বন্দী-হত্যার জীবন্ত সাক্ষী; মরতে মরতেও বেঁচে যাওয়া; বাইরের আগুনখোর ‘বিপ্লবী’ জেলে গিয়ে পুলিশের দালাল হয়ে যাওয়া; … বহু কিছুই জমা হয়েছে খোকনের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে।
জেল থেকেই পরীক্ষা দিয়ে খোকন স্নাতক হয়। জেলে থাকা অবস্থাতেই ওঁর পিতৃবিয়োগ ও মাতৃবিয়োগ ঘটে। ১৯৭৮ সালে, শেষ ‘রাজবন্দী’ হিসাবে জেল থেকে ছাড়া পায় ওঁরা একই সংগঠনের ছয় জন। তার মধ্যে ছিলো ইস্কুল থেকেই আমাদের ক্লাসের আরেক বন্ধু বাসু – বাসুনারায়ণ ঘোষাল। বাসুও থাকতো সাহাপুর ক্যাম্পেই।
এখানকার রাজনীতির ‘প্রচলিত ধারা’ অনুযায়ী, জেল থেকে পিতৃ-মাতৃ-পরিবারহীন হয়ে বেরিয়ে আসার পরে, কেউ-ই আর খোকনের খোঁজখবর বিশেষ রাখতো না! কোনোদিন জল খেয়ে পেট ভরিয়ে শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়েই রাত কাটিয়েছে। কখনও লরিতে উঠে কোথাও কয়লার যোগানে তৎপর হয়েছে। কখনও হয়তো কোনো ঠিকাদারের কর্মী হিসাবে কাজ করেছে। কখনও চেষ্টা করেছে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া কোনও কমরেডের সঙ্গে ‘ইন্টিরিয়ার ডেকোরেশন’-এর কাজ করতে। কখনও ফিনান্স কোম্পানির এজেন্ট, কখনও ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের প্রাত্যহিক জমা প্রকল্পের কর্মী। একসময়ে ব্যাঙ্ক এবং এলআইসির চাকরিকে হেলায় প্রত্যাখ্যান করে রাজনীতি করতো খোকন। জেল-জীবনের শেষে, চলন্ত বাস থেকে নেমে রাস্তায় বসে রক্তবমি করেছে। কিন্তু কারও কাছে নিজের অবস্থা কখনও জানায়নি। আমি জানতে পেরে কয়েকবার নেপাল থেকে চীনা ওষুধ (Vitamin U) আনিয়ে ওঁকে সুস্থ করার চেষ্টা চালিয়েছি। অসম্ভব চাপা স্বভাবের ছিলো। কাউকে কোনোদিনই নিজের কথা বলতো না। একসময়ে লাখলাখ টাকা উপার্জন করেছে ব্যাঙ্কের কর্মী হিসাবে; আবার ‘বামপন্থী’ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ বিশ্বাসঘাতকতায় সেই সুযোগও হারিয়েছে! কিন্তু কখনও কারও কাছে মাথা হেঁট করেনি, মেরুদন্ড সোজাই রেখেছে চিরকাল।
ছাত্রাবস্থায়, বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে নিয়মিত উত্তক্ত করা বেয়াদব ছেলেদের সম্পর্কে শিক্ষকেরা নালিশ জানাবার জন্য নির্ভর করেছিলেন তরুণ চক্রবর্তীর উপর; খোকন নিজস্ব কায়দায় সে সমস্যা মিটিয়ে ছিলো। বহু জনের চোখের জলের কারণ, আঞ্চলিক আতঙ্ক এক কংগ্রেসী ত্রাসকে একসময়ে এলাকা ছাড়া করেছে। ‘বাম’ শক্তিকে প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে বিভিন্ন সময়ে। কংগ্রেসী গুণ্ডাদের পরিকল্পিত আক্রমণ থেকে সিপিআই(এম)-এর মিছিলকে রক্ষা করার জন্যে, সবার অলক্ষ্যে — চাদরের মধ্যে স্টেনগান নিয়ে মিছিলকে পাহারা দিয়ে পথ হেঁটেছে। কিন্তু সিপিআই(এম) কখনোই দরকারের সময়ে খোকনের পাশে দাঁড়ায়নি! অসভ্যতা সীমা ছাড়ালে বয়স্ক তথাকথিত ‘সংগ্রামী তৃতীয় ধারা’-র জনৈক নেতাকে সপাটে শায়েস্তা করতেও বাধ্য হয়েছে খোকন, বুড়ো বয়সেও। গ্রেনেড আর প্রচণ্ড শক্তিশালী বোমা তৈরিতে খোকন ছিলো সিদ্ধহস্ত। রাইফেল ও রিভলবারে ছিলো সব্যসাচী। অনন্ত সিং-এর শিক্ষা।
যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে, চিরকালই দাপুটে সেনা খোকন। দীর্ঘ জেলজীবনে, কংগ্রেস এবং ‘বাম’ শাসনে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’-র পুলিশী আদর-যত্নে ওর স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি হয়েছিলো। লিখতে পারতো না, হাত কাঁপতো; ওঁর প্রিয় কবিতা লেখাও বন্ধ হয়ে গেছিলো। ধীরেধীরে সারা শরীর অকেজো হয়ে আসে। বারবার পড়ে যেতে থাকে বাড়িতে। শেষপর্যন্ত বোঝা যায়, একের-পর-এক ব্রেনস্ট্রোক হয়েছে। ধীরেধীরে বাঁদিকের হাত-পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। কথাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। এই অবস্থায়, ওঁর স্ত্রী দিপালীর দিবারাত্রি সাহচর্য-পরিষেবা শুধুই সম্ভ্রম জাগায়। দিপালী কাঁদতে কাঁদতে আমাকে একদিন প্রশ্ন করলো, “দীপুদা, যে মানুষটা সারাজীবন অন্যের জন্যে বাঁচলো, তাঁর এতো ভয়ঙ্কর কষ্ট কেনো?” আমি কোনও জবাব দিতে পারি নি!
জেল জীবনের অভিজ্ঞতা খোকনের চিন্তাভাবনাকে পরিপক্ক করে তুলেছিলো। জেলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ হওয়া কোনও বিপ্লবী ‘নেতা’ যখন বেরিয়ে এসে আর চিনতে পারেন না! জেলের মধ্যে অতি জঘন্য ভূমিকা পালন করা অন্য সংগঠনের ‘নেতা’ যখন জেলের বাইরে বিপ্লবী ভাবভঙ্গি দেখান! খোকনদের ‘ডাকাতি’ করা টাকার ভাগ ও অস্ত্র নেওয়া বিপ্লবীরা যখন যুধিষ্ঠির সাজার চেষ্টা করেন! ওঁর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জগৎ তখন তোলপাড় হয়ে যায়। প্রথম সারির জনৈক ‘নকশাল’ নেতা জেলে ঢুকেই খোকনকে বলেছিলেন, “তোমরা অনন্ত সিং ছাড়া আর নেতা খুইজ্জা পাইলা না? আরে, ডাকাইতি কোইরা কহনো বিপ্লব হোইছে?” প্রশ্ন শুনে ক্রুদ্ধ খোকন তাঁকে তৎক্ষণাৎ বলে, “আমি যদি আপনার এই প্রশ্নের জবাবে বলি, ‘আপনারা চারু মজুমদার ছাড়া আর নেতা খুইজ্জা পাইলেন না! গলা কাইট্টা কহনো কোথাও বিপ্লব হোইছে?’ কী বলবেন?” জেলে থাকতে এমনকি অনন্ত সিং-এর সঙ্গেও রাজনৈতিক দূরত্ব গড়ে ওঠে খোকনের। ওঁর ভাষায়,”আমরা আসলে কতগুলো পাগল ছিলাম, বুঝলি! রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে কোনও বাস্তব ধারণাই ছিলো না। তাই ওরকম পাগলামিতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। একদিকে ভোটবাজ বিশ্বাসঘাতকের দল, অন্যদিকে আমাদের পাগলামি। কী যে হবে, বুঝতে পারি না!”
১৯৭৮ সালে জেল থেকে খোকন বেরিয়ে আসার পরে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্বারভাঙা হল’-এ এক সেমিনারে গিয়ে দেখেছি, অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কতটা সম্ভ্রম করেন আরসিসিআই-এর তরুণ চক্রবর্তীকে। অন্যান্য বহু কমিউনিস্ট কর্মীর মতো, খোকনেরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে ধারনা ছিলো, “বুর্জোয়া কবি।” আমি একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ সংকলন ‘কালান্তর’ ওঁকে উপহার দিয়ে বলি, “পুরোটা পড়া শেষ কর, তারপর কথা হবে।” বইটা শেষ করার পর ওঁর প্রথম উক্তি, “আমরা তো কিছুই পড়িনি, তাই কী ছাগল ছিলাম! ভাবা যায়, এই চূড়ান্ত প্রগতিশীল ও মনীষী মানুষটাকে আমরা কী জঘন্য ভাবে গালাগালি করেছি! কেউ আমাদের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কিছু বলেও নি! এই অপরাধের কোনও ক্ষমা হয়!” এই হলো তরুণ চক্রবর্তী।
একসময়ে অনন্ত সিং-এর একটা বই বেরিয়েছিল, ‘আমি সেই মেয়ে’। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের পর, সেই বিদ্রোহী নেতাদের তখন ব্রিটিশ পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে চট্টগ্রামে। অনন্ত সিং সেসময়ে একদিন সারা গায়ে কাদামাখা এক উলঙ্গ পাগল সেজে ঘুরছেন। ছোটছোট বাচ্চারা তাঁকে ইঁট ছুঁড়ে মারছে। তখন এক জমিদার বাড়ির ছোট্ট একটি মেয়ে দয়া করে সেই পাগলটিকে ডেকে খেতে দেয়। অনন্তবাবু তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন, সেদিনের সেই মেয়েটির হাতে যদি এই বই পড়ে, তিনি যেন জেনে রাখেন, সেদিনের সেই উলঙ্গ ‘পাগল’ ছিলেন আসলে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম নেতা পলাতক অনন্ত সিং। খোকন যখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী, তখন অনন্ত সিং-ও সেখানে আটক ছিলেন। একদিন জেলে বনেদি বংশের সুদর্শনা এক বয়স্কা মহিলা তাঁর পুত্রসহ, ধুতি-পাঞ্জাবি-শাল-মিস্টি নিয়ে অনন্ত সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি অনন্তবাবুকে প্রণাম করে কোলে মাথা রেখে কাঁদতে থাকেন। অনন্ত সিং তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, তাঁর দুচোখ বেয়েও তখন জলের ধারা। দুজনেরই মুখে কোনও কথা নেই! এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনার বিবরণ আমি খোকনের কাছেই শুনেছি।
তরুণ জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে স্নাতক হবার পর, রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও অনন্ত সিং হাঁড়ি ভর্তী রসগোল্লা আনিয়ে সবাইকে খাওয়ান। অনন্তবাবুর কাছে তরুণ চক্রবর্তী ছিলো জালালাবাদ পাহাড়ের যোদ্ধা প্রথম শহীদ ১৬-বছরের ‘টেগরা’ (হরিগোপাল বল)-এর প্রতিমূর্তি। সেকথা উনি বলেওছিলেন দলের কারও কারও কাছে।
আরসিসিআই-এর কাজকর্ম সম্পর্কে বহির্জগতের কোনও ধারণাই প্রায় নেই। সংগঠন চালানোর নিপুন পদ্ধতি; ‘ডাকাতি’-র খুঁটিনাটি; সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার; অস্ত্র সংগ্রহের বিবরণ; ঘাটশিলায় পাহাড়-জঙ্গলে সশস্ত্র লড়াইয়ের – এমনকি জলের অভাবে পেচ্ছাপ খাবার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা; পাহাড়-জঙ্গলে আঞ্চলিক সাঁওতালদের অমূল্য সহযোগিতা; লড়াইয়ের আসল পথপরিকল্পনা; – এসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ হয়তো কোনোদিনই আমরা আর জানতে পারবো না! তবুও তা বাস্তব। ভোটবাজিতে ভরপুর রাষ্ট্রসেবার পরিবেশে, শোষক রাষ্ট্রবিরোধী সংগ্রামী কমিউনিস্ট-মুক্তিযুদ্ধের অলিখিত ইতিহাসের একটি অধ্যায়।
পরবর্তী জীবনেও খোকন বামপন্থীদের আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। এমনকি ‘শ্রমজীবী ভাষা’ পত্রিকা আয়োজিত নানা সভা ও সেমিনারেও খোকন উপস্থিত থেকেছে।
ওঁদের মুক্তি দেবার ব্যাপারে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর তীব্র আপত্তি ছিলো। তাই নিয়ে বামফ্রন্টের নীতিনির্ধারক সভায় ভীষণ তর্কাতর্কি হয়। জ্যোতিবাবু বলেন, “অনন্ত সিংকে পার্টি বের করে দিয়েছিল।” প্রমোদ দাশগুপ্ত মন্তব্য করেন, “না। অনন্তবাবু মেম্বারশিপ রিনিউ করেন নি।” জ্যোতি বসু তখন বলেন, “এরা যে ভবিষ্যতে আবার কিছু করবে না, সেই গ্যারান্টি আপনারা দিলে আমি ওদের ছাড়তে পারি।” তখন বামফ্রন্টের জনৈক প্রবীন নেতা বলেন, “সিপিআই(এম) দলের যাঁদের ছাড়ছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের গ্যারান্টি যদি আপনি দিতে পারেন, আমরাও ওঁদের গ্যারান্টি দেবো।” অবশেষে রণে ভঙ্গ দেন জ্যোতি বসু।
মুক্তির আদেশ দেবার দিন বিচারক মৌখিকভাবে বলেছিলেন, “সাবধান। মর্টার-রকেট লঞ্চার-গ্রেনেড এসব সম্পর্কে আপনাদের জ্ঞান যেন অন্যদের হাতে না পরে। আপনাদের যে মানসিকতা, তা অন্যদের থাকবে না। তখন ভয়ঙ্কর ব্যাপার হতে পারে। যদি সেরকম কিছু ঘটে, তবে কিন্তু প্রথমেই আপনাদের গ্রেপ্তার করা হবে।”
রাষ্ট্রের কাছে ‘বিপজ্জনক’ সেই তরুণ চক্রবর্তী আজ অজ্ঞাত এক বীর হিসাবেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও শয্যাশায়ী জীবন কাটিয়ে গেলো, সকলের অলক্ষ্যে! চারিদিকের হতাশাব্যঞ্জক গাঢ় অন্ধকারের মধ্যেও প্রজ্বলিত এক ক্ষীণ কিন্তু উজ্জ্বল প্রদীপ নিভে গেলো, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ সকাল ৯.৩০-এ। কোনও কর্পোরেট চিকিৎসালয়ের রাজকীয় শয্যায় শুয়ে না। শৈশব-কৈশোরের বিচরণভূমি সাহাপুর ক্যাম্পে নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটের ততোধিক ছোট তক্তপোশে শুয়ে। দিনেরপরদিন সারা পিঠ ভর্তি বেডশোরের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও, ঋজু শিড়দাঁড়া নিয়েই বিদায় নিলো।
তোকে ‘লাল সেলাম’, খোকন।
“ঘুমিয়ে এলো ঘুমের ঘোর,
গানের পালা সাঙ্গ মোর।”
আমাদের হাতেও আর খুব লম্বা সময় নেই!











Lal selam Comred