উড়িষ্যায় মুর্শিদাবাদের তরুণের খুনের প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি জানিয়েছেন, তাদের স্লোগান ‘ঘরের ছেলে ঘরের ভাত খান’। তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যে ক্রমহ্রসমান কর্মসংস্থানের জন্য রাজ্যের মানুষকে গ্রাসাচ্ছাদনের কারণেই আরও বেশি বেশি করে রাজ্যের বাইরে যেতে হচ্ছে, এটা অবশ্যই ঘটনা। শুধু বিজেপি কেন বামসমেত অন্যান্য বিরোধী দলগুলিই এই বিষয়ে সোচ্চার। কাজের বাজার বা রোজগারের সুযোগ যে এই রাজ্যে দিনের পর দিন কমে আসছে, সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু, ‘ঘরের ছেলেকে’ শুধু ‘ঘরের ভাত’ই খেতে হবে কেন, এটাই আমার মাথায় ঢুকছে না। আর, ঘর বলতে কী বোঝায়? রাজ্য, জেলা না আরও ছোট বৃত্ত? মানে, দেশটা নয় কেন? ভারতের যে কোনো প্রান্তেই যেতে গেলে কি ‘ইনার লাইন পারমিট’ লাগবে এখন থেকে?? কারণ,বোঝাই যাচ্ছে দেশটা ‘ঘর’ নয়!
আমাদের রাজ্যের মাননীয়া আবার কিছু বিষয়ে কথা বলেন না, এক্স হ্যাণ্ডেল বা ট্যুইটে বার্তা পাঠিয়ে দেন(মাঝে মাঝে অবশ্য জনসভায় হুঙ্কার ছাড়েন)।পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দেবার দায়িত্ব কার/কাদের জানা নেই। হ্যাঁ, এখান থেকেই নাকি একটা ‘Zero FIR’ নথিভুক্ত করা হয়েছে, আর পশ্চিমবঙ্গের একটি পুলিশ দল বোধহয় উড়িষ্যা যাবে, হয়তো যে থানায় তা নথিভুক্ত হয়েছে, সেখান থেকেই। ব্যাস, আর কী করার আছে? হয়তো রাজ্যের কোনো মন্ত্রী বা নেতা ক্ষতিপূরণ দিতে যাবেন, দায়িত্ব শেষ!! আবারও ঘটবে ঐখানে বা অন্য কোনো রাজ্যে, আবার সেই একই প্রতিক্রিয়া!
কিন্তু, প্রশাসনিক রীতি বা প্রোটোকল কী বলে? উচিত তো ছিল সরাসরি প্রশাসনিক উচ্চস্তরে উড়িষ্যার counterpart এর সঙ্গে যোগাযোগ করা। অন্ততঃপক্ষে সংখ্যালঘু মন্ত্রক, স্বরাষ্ট্র সচিব, প্রয়োজনে মুখ্যসচিবের তো অবশ্যই দরকার ছিল উড়িষ্যার সচিব স্তরে ‘অফিসিয়ালি’ যোগাযোগ স্থাপন করা। মুখ্যমন্ত্রী স্তরে কথা বলা নানা কারণে যখন সম্ভব বলে মনে হয়না।
কিন্তু, সোজা কাজ সহজ ভাবে করা এখন আর আদৌ সম্ভব নয়। বিগত বেশ কয়েক মাস ধরে বাঙলার বাইরে বাঙালি শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন, বাঙলাদেশী বলে অনেককে জোর করে বাঙলাদেশে ঢুকিয়েও দেওয়া হয়েছে। কোর্টে ভারতীয় বলে সমস্ত প্রমাণ হাজির করার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে জানানো হচ্ছে, স্রেফ মানবিক কারণেই ফেরানো হচ্ছে, অর্থাৎ বাঙলাদেশী তকমা থেকে সরছে না। পরপর বেশ কয়েকটি কেসে প্রমাণ হয়ে গেছে ভুল মানুষকে বর্ডারের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ভুল (?) এর জন্য ঠিক কতোজনের শাস্তি হয়েছে, আদালত বা প্রশাসনের তরফে। আমাদের রাজ্য সরকার কি কারুর শাস্তি কোনোদিন চেয়েছে আদালত বা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে? কতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে সুপ্রিম কোর্টে অহরহ যাচ্ছে, তাহলে এক্ষেত্রে সমস্যাটা কী হলো?
ভাবার কোনো কারণ নেই এই হামলা শুধু একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ। জুয়েলকে হত্যার কয়েকদিন আগে ৭ই ডিসেম্বর উড়িষ্যার মালকানগিরিতে এক ট্রাইবাল মহিলার হত্যাকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার আদিবাসীর হামলায় দণ্ডকারণ্য প্রজেক্টের MV 26 গ্রামের সমস্ত বাড়ি (প্রায় ১৬৩টি) ও সম্পত্তি সম্পূর্ণ ভাবে ভস্মীভূত হয়, হাজারের উপর মানুষ কোনো ক্রমে পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। দণ্ডকারণ্যে বাঙালি– আদিবাসী বিবাদ নতুন নয়, যেটা নতুন সেটা হলো এই হামলার পিছনে দক্ষিণপন্থী প্রচার মাধ্যমগুলির মদত এবং আক্রান্তদের উপর ‘Illegal Bangladeshi Settler’ তকমা প্রদান (Alt News, 12 th. December)।
দণ্ডকারণ্যে যাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়, তারা সকলেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে আসা উদ্বাস্তুদের মধ্যে সবচেয়ে অসহায় দরিদ্র হিন্দু পরিবারগুলির অন্তর্গত। কারণ তারা প্রায় বাধ্য হয়েছিল এখানে আসতে, অন্য কোথাও আশ্রয় না পেয়ে। প্রাথমিক ভাবে অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, এখানে প্রথম পাঠানো ৩৪৭৪৫ জনের মধ্যে কোনো রকম পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হবার আগেই চলে আসে ১৫১৪৫ জন ও পরবর্তী কালে আরও ৫৮৩৪ জন(তথ্য, Report of the committee of Ministers for the Rehabilitation of Displaced Persons in West Bengal, 1954)। পুনর্বাসনের জন্য নথিভুক্ত হয় মাত্র ১২৪৩৭ জন। বিভিন্ন সময়ে মানুষ এলেও পুনর্বাসনের হার ছিল অতি সীমিত, সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল চাষযোগ্য জমির অভাব এবং সরকারি সদিচ্ছার বিপজ্জনক ভাবে অনুপস্থিতি। এ সত্ত্বেও সেখানে যারা পরবর্তী সময়ে থেকে গেছে, এই বঙ্গের বাসিন্দারা তাদের প্রতি খুব অদ্ভুত ভাবে উদাসীন। যেটুকু অবহিত, সেটাও মরিচঝাঁপি অধ্যায়ের কল্যাণে!!
খুব অবাক ব্যাপার, মতুয়াদের নিয়ে যখন প্রেস মিডিয়া, রাজনৈতিক দলগুলি এতো সোচ্চার, সেখানে দণ্ডকারণ্যের হিন্দু বাঙালিদের দুর্দশা নিয়ে কারুর আদৌ কোনো মাথা ব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। মালকানগিরির ঘটনা হয়ে গেছে প্রায় ৩ সপ্তাহের বেশি। কিন্তু এই নিয়ে কোনো হেলদোল, কোনো প্রতিবাদ কোথাও দেখেছেন? এদেরও বেশিরভাগ কিন্তু অনুচ্চবর্ণেরই। বস্তুতঃ, আন্দামান, বিহার ও দণ্ডকারণ্যে পুনর্বাসনের জন্য যাদের পাঠানো হয়েছিল তাদের সিংহভাগই নিম্নবর্গের খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্যই তাদের নিয়ে মাথাব্যাথা না থাকার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তারা এ রাজ্যের ভোটার নয়। সব মাথাব্যাথার উৎস তো একটাই, সেটা হলো ভোট। বাকি সব ধর্ম, জাতি, বৈধ-অবৈধ অনুপ্রবেশ, কে ঘুসপেটিয়া কে সম্মানীয় রিফুউজি, এ সবই তো হলো strategy মাত্র!!
আর, মালকানগিরিতে যাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ বলা হচ্ছে, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছে বাংলাদেশ তৈরি হবার অনেক আগেই, পূর্ব পাকিস্তান থেকে। এতো বছর পরেও কিন্তু ‘অবৈধ’ তকমাটা রয়েই গেলো। শুধু ‘পাকিস্তানি’র বদলে সম্বোধনটা হয়েছে ‘বাংলাদেশী’!!
ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে এখন অন্য প্রদেশের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা অজুহাতে। এক অদ্ভুত অসহিষ্ণুতা গ্রাস করছে এমনকি সাধারণ মানুষকেও। তবে, বাঙলা ভাষা ও বাংলাদেশী অপবাদে বাঙালির উপর আক্রমণের মধ্যে সম্ভবতঃ একটা পরিকল্পিত pattern/ purpose আছে। এটাকে ঠিক নিছক অজ্ঞানতা বা অশিক্ষিতের আস্ফালন বলে উড়িয়ে দেওয়াটা মোটেই সম্ভব নয়! প্রাণের দায়ে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেই এখন নিজেদের মধ্যেও বাঙলায় কথা না বলার অভ্যাস করছে। জানি না শেষমেষ আমাদেরও হয়তো ‘হিংলিশ'(হিন্দি ও ইংলিশের জগাখিচুড়ি)এ অভ্যস্ত হতে হবে, ভারতবর্ষে থাকতে হলে!!
তবে,তা সত্ত্বেও মূল প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই গেলো, ভারতবর্ষের যে কোনো প্রান্তে শুধু বাঙালি কেন যে কোনো ভারতীয়ের কাজ করার অধিকার আছে কি নেই। আর, থাকলে কোন পরিচয়পত্র তা সুনিশ্চিত করবে??
আমাদের রাজ্যের শাসক দল তো কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যা থেকে ফায়দা তোলাতেই বেশি আগ্রহী (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তুলেও ফেলে কোনো না কোনো কৌশলে)।আর, কেন্দ্রীয় শাসক দল তো ‘ঘরের ছেলেকে ঘরেই ঢুকিয়ে দিচ্ছে’!! তারাই বলুক, এখন থেকে অন্য প্রদেশে কাজ করতে গেলে Work Permit লাগবে কিনা!! শুধু খেটে খাওয়া কেন, এখন তো শিক্ষিত বাঙালির একটা বড় অংশ কাজের সূত্রে বাঙ্গালোর নিবাসী। কর্ণাটক বা দক্ষিণ ভারত তুলনামূলক ভাবে অনেক ভদ্র পরিশীলিত। কিন্তু, ঘৃণা ও বিদ্বেষের আবহাওয়ায় এই ভদ্রতা চিরকাল বজায় থাকবে, এই গ্যারান্টি কে দেবে?! দুটোই তো ভীষণ ভাবে সংক্রামক ব্যাধি………..
নতুন বছরে মানুষ কতো কী প্রার্থনা করে। সত্যি করে বলতে গেলে এখন কিছু প্রার্থনা কেন আশা করতেও ভয় হয়। সব সময় শঙ্কিত থাকতে হয়, আরও খারাপ কিছু ঘটবে না তো ?!
নিজের শ্রম ও বুদ্ধি দিয়ে মানুষ নিজের উপার্জন করবে, আর সেখানে অন্ততঃ জাতি-বর্ণ-ধর্ম-ভাষা কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না, জানিনা এই আশা করাটাও খুব অন্যায় বা আকাশকুসুম কল্পনা হয়ে যাবে কিনা!!
তবে পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুযায়ী, মনে হচ্ছে সেটাও বোধহয় একটু নয় বেশ বেশিই হয়ে যাচ্ছে……………….











