১১ই মে ২০২৫ রবিবার ভোর পাঁচটাতেও গদগদে গরম। দমদমা উড়ান বন্দরে নেমে দুরু দুরু বক্ষে নিজের মুখ দেখালাম ডিজি যাত্রার ক্যামেরায়। আমার এইসব ঝাঁ চকচকে স্মার্ট কারবারের গম্ভীর আর ইংরিজি বলা জায়গায় খুব ভয় করে। খালি মনে হয় এই বুঝি কেউ বকে দিল, এখানে কি চাই! তবে মুখ মিলিয়ে ক্যামেরা ঢুকতে দিল। ঢুকে পকেটে হাত দিয়েই দেখলাম মানিব্যাগ নেই। কোথায় গেল। এখানে পকেটমার! কভি নেহি। কমতে থাকা স্মৃতির ফাঁকে মনে হোল যেন বাড়ি থেকেই নিয়ে বেরুইনি। গিন্নির গঞ্জনায় ক্ষীণ কন্ঠে ওনাকে এবং নিজেকেও বোঝালাম মানিব্যাগ বাড়িতেই নিরাপদে আছে। কিন্তু ট্যুর করব কিকরে। আমার কার্ড টার্ড নেই, পারিনা। আর যেখানে যাচ্ছি সেখানে ওসবের বালাই আছে বলে মনে হয় না। একটু অসহায় লাগছিল। তখন নীলু শাহ রুখ খানের মত মাথা হেলিয়ে জানান দিল, ম্যায় হুঁ না। তো চল মাওফানলুর।
পাঁচ জনের দল। নীলু রীনা সুপূর্ণা সবার বন্ধু পাপা এবং এই অধম। গৌহাটি থেকে চার ঘন্টার রাস্তা খাসি পাহাড়ের এই পার্বত্য উপত্যকা মাওফানলুর। পথে ইকোস্পোর্ট গাড়ি আসার বদলে ইকো গাড়ি আসায় ড্রাইভারকে এক প্রস্ত নীলুর চোটপাট হোল। তবে ড্রাইভার ছেলেটার অসাধারণ টেম্পারামেন্ট। মিটিমিটি হাসি আর খাসি ও হিন্দি ভাষা মিশিয়ে ব্যাখ্যা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। এর পরে ওকে আরো বুঝলাম, পুরো ট্যুরে ছবির জন্যে যখনি যেখানে দাঁড়াতে বলেছি দাঁড়িয়েছে। আমরা বিভিন্ন স্পটে যথেচ্ছ সময় কাটিয়েছি। নো বিরক্তি। আর প্রানটা জুড়িয়ে গেল নামটা শুনে। মর্নিং স্টার।
রাস্তায় মেঘালয় তার নামের প্রতি সুবিচার করে অঝোরে বৃষ্টি নামাল। বৃষ্টিতে লাল পাথুরে মাটি আর সবুজের সমারোহের এক দুর্ধর্ষ রূপ দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মাওফানলুর দুপুর দুটোয়। হিল সাইড হোমস্টে। একটু বলে নিই এদিকটা হিমালয়ের অংশ নয়। এটা একসাথে জয়ন্তিয়া খাসি গারো পাহাড় বলে।। নীচু পাহাড়। উচ্চতা মোটামুটি গড়ে তিন চার হাজার ফুটের আসপাশে। ল্যাটেরাইট পাথরের আধিক্যের জন্যে মাটি লাল রঙের।
এবার আমরা গরম গরম ডাল ভাত ডিমভাজা খেতে খেতে বৃষ্টি ভ্যানিশ। ঠান্ডা ঠান্ডা এক নরম উজ্জ্বল রোদ। আমরা সবুজ ঘাসে মোড়া উঁচুনীচু পাহাড়ে ঘুরে বেড়ালাম। একটা বড় লেক আছে। আর তার আগে যে ছোট লেক আছে, তাতে একটা ভাংাচোরা বাঁশের সাঁকো আছে। বৃষ্টিতে পিছল থাকায় আমরা সেটা পেরনর চেষ্টা করিনি। গোড়াতে চড়েই ছবি তুললাম। একটা জিনিস দেখে খারাপ লাগল ব্যবসার কথা ভেবে প্রকৃতি আর বাস্তুতন্ত্রকে গুলি মেরে লেকের ঘাড়ের ওপরেই নতুন নতুন হোমস্টে হোটেল তৈরি হচ্ছে।
রাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম। হাওড়ায় মে মাসে পচা গরমের কথা ভেবে এই কান্ডটি অবাস্তব লাগছিল। সারা রাত ঝমঝমে বৃষ্টি আর হাওয়া। বেশ থ্রিলিং লাগছিল। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে চিন্তা নিয়ে, কাল সকালে বেরতে পারব তো।
আজ সোমবার ১২ ই মে। ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে বৃষ্টি ধরে গেল। মর্নিং স্টার ‘গুড মর্নিং’ করে দুয়ারে হাজির। আমরা এগলাম মারখাম ভ্যালির দিকে। মোটামুটি দু ঘন্টার জার্নি। রাস্তায় ঝকঝকে সবুজ পাহাড়। পাদদেশে চাষবাসের ক্ষেত। গাড়ির রাস্তায় একটু উঁচু থেকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল যেন বিশাল এক নকশি কাঁথা বেছান আছে। তার রঙ নানা পোঁচের সবুজ -গাঢ়, হাল্কা, ফিঁকে আর মাঝে মাঝে লালের ছোঁয়া। একটা জায়গায় পাহাড়টি অদ্ভুত। মনে হচ্ছে যেন এক অশান্ত সবুজ সমুদ্র তার অসংখ্য ঢেউ নিয়ে কোন এক যাদুমন্ত্রে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।

আর আছে একটি বিশাল লেক। আশার কথা এখনো কোনো থাকার জায়গা করা হয়নি। প্রকৃতি পিপাসুরা দেখে চলে যায়। তবে প্রকৃতির এই নির্জনতা এই একলা থাকার ইচ্ছেটা অচিরেই লুপ্ত হবে, কারণ পাহাড় ভেংগে দ্রুত গতিতে রাস্তা তৈরি হচ্ছে।

আমাদের শেষ গন্তব্য নংখুম রিভার আইল্যান্ড। এই দ্বীপটির সৃষ্টি কিনসি নদীর দুটি ধারার মধ্যে। ওয়েনিয়া ফলসের একটু আগেই একটা ব্রিজ পেরিয়ে ট্রেকিংএর রাস্তা আছ এই দ্বীপে যাওয়ার। অন্তত দুঘন্টার হাঁটা। সময় থাকলে সেটাই করা উচিৎ। তাহলে প্রাকৃতিক দৃশ্যের পাশাপাশি দ্বীপবাসিদের সাথে মেশা কথা বলার সুযোগ থাকে। শোনা যায় এই আদিবাসীরা খুব অতিথি বৎসল। আমাদের হাতে সময় খুব কম ছিল। তাই গাড়ি করে অন্য দিক দিয়ে গিয়ে একটি হ্যাংগিং ব্রিজ পায়ে হেঁটে পেরিয়ে দ্বীপে প্রবেশ করলাম। নদীর ফর্মেশানটা এমন, প্রচুর বালি আছে। একটা জায়গায় জলও লেকের মত শান্ত। বাঁধা আছে হাতনৌকা। সময় থাকলে চড়া যায়। আছে একটি জাহাজের শেপের ছোট্ট বাড়ি। আঁধার ঘনিয়ে আসছে। ইভনিং এ মর্নিং স্টারের তাড়ায় ফিরতে শুরু করলাম মাওফানলুর। ফেরার শেষ দিকটায় মেঘালয় তার এক অন্য রূপ নিয়ে দেখা দিল। রাস্তায় বৃষ্টি নেই কিন্তু মেঘ মেঘ আর মেঘ। এত ঘন মেঘ,এক ফুটের দূরের রাস্তাও ভালো দেখা যাচ্ছেনা। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়িতে বেশ বিপজ্জনক। লালমোহনবাবুর ভাষায় বললে বেশ একটা ইয়ে লাগছিল। ওখানকার নিত্য যাত্রা করা ড্রাইভার মর্নিং স্টার, সেও একবার একটু ক্ষণের জন্য যেন দিশেহারা হয়েছিল। তবে তার সহজাত অসাধারণ দক্ষতায় আমাদের অক্ষত শরীরেই মাওফানলুর ফিরিয়ে আনল।
আজ মংগলবার ১৩ ই মে। আমাদের ঝটিকা সফর শেষ। এটুকু সময়েই অকৃত্রিম প্রকৃতির কাছে ঝড়ের মত দুটি দিন কাটিয়ে একই সাথে অসাধারণ অভিজ্ঞতার আনন্দ এবং বেড়ান শেষ হওয়ার বিষাদের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে এবার বাড়ি ফেরার পালা।
শেষের আগেঃ ওহ। বাড়ি ফিরে দেখলাম মানিব্যাগ যথাস্থানেই আছে!









