২১ ফেব্রুয়ারি ‘২৬ এর প্রতিবেদনে আমরা উল্লেখ করেছিলাম যে বর্তমান মধ্য এশিয়া (Middle East) ও পশ্চিম এশিয়ার (West Asia) সংকট, উত্তেজনা ও মুহুর্মুহু যুদ্ধের মূল কারণগুলি হল:
(১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (The USA) ও যুক্তরাজ্যের (The UK) এখানকার মূল্যবান খনিজ সম্পদ পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দখলদারি এবং সেই কারণে এখানকার সম্পূর্ণ সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অর্জনের অভিযান; (২) ধর্মীয় কারণে পবিত্র জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত আব্রাহামের থেকে উদ্ভূত তিনটি ধর্ম – ইহুদি ধর্ম (Judaism), খ্রিস্টান ধর্ম (Christianity) ও মুসলিম ধর্ম (Islam) – এর মধ্যে যে চলমান যুদ্ধ যা একাদশ শতাব্দী থেকে ধর্মযুদ্ধ (Crusade) হিসাবে সমগ্র লেভান্তে তে (বর্তমান ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন) ছড়িয়ে পড়ে তার আধুনিক রূপ; (৩) এই সমগ্র অঞ্চলে মার্কিনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের একমাত্র বাধা, ইজরায়েলের এই সমগ্র অঞ্চলে সামরিক প্রতিপত্তির একমাত্র বাধা ও একইসাথে অস্তিত্বের প্রধান ‘ বিপদ ‘ ইরানের শক্তিশালী সামরিক – ইসলামি কাঠামোকে ধ্বংস ও দুর্বল করে ইরান কে বাগে আনা এবং (৪) এই অঞ্চল সহ ইসলামি দুনিয়ায় সুন্নি সৌদি আরব ও শিয়া ইরানের আধিপত্যের লড়াই। তারই ফলশ্রুতি এই অঞ্চলে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে শুরু হওয়া ভয়ংকর যুদ্ধ।
আমরা প্রতিবেদনটিতে এবং আগের বেশ কিছু প্রবন্ধে আলোচনা করেছি যে ১৯৯১ তে মহাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং রুশ ও যুগোস্লাভ মডেলের সমাজতন্ত্র গুলির পতনের পর এবং তারও আগে ১৯৭৮ থেকে সমাজতান্ত্রিক চিনের হান আধিপত্যবাদী পুঁজিবাদের সাধনার কারণে সারা বিশ্বে একমেবাদ্বিতীয়ম মহাশক্তি হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুনিয়ায় কর্তৃত্ব করা সত্ত্বেও মূলতঃ আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটে সে দীর্ণ হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতায় চিনের থেকে ক্রমাগত পেছিয়ে পড়ে। এছাড়াও BRICKS, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU), লাতিন আমেরিকার Pink Tide আন্দোলনের বিভিন্ন মার্কিন বিরোধী মোর্চা সহ বহু প্রতিস্পর্ধী কাঠামো ও বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। বাণিজ্য ঘাটতি, ডলারের অবমূল্যায়ন, দেশের মধ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ছাঁটাই, গৃহহীনতা, শ্বেতাঙ্গ জাতিবাদ, Occupy আন্দোলনের মত বিভিন্ন জনআন্দোলন এবং নাগরিক বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়। রিপাবলিকান বুশ জুনিয়র (যার সময়ে প্রথম মার্কিনের মাটিতে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ এ কোন বিরোধী শক্তির ভয়ংকর আক্রমণ সংঘটিত হয়) থেকে ডেমোক্র্যাট বাইডেন (যার সময়ে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের সূচনা) অবধি নানাবিধ চেষ্টা সত্ত্বেও বিগত ২৫ বছরে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে না পেরে অসৎ ফাটকা ব্যবসায়ী, বেপরোয়া অভব্য ব্যক্তিত্ব, আগ্রাসী শ্বেতাঙ্গ জাতিবাদী, প্রমাণিত যৌন অপরাধী, সমাজ বিরোধী ও লুটেরা মানসিকতার এবং মার্কিন যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তুতকারকদের প্রতিনিধি যুদ্ধবাজ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার বাহিনী কে নির্বাচনে জয়লাভ করিয়ে ক্ষমতায় আনা হয়। এবং সেই থেকে মরীয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঘরে বাইরে একের পর এক ভয়ঙ্কর অপরাধ সংঘটিত করে আবিশ্বের ভৌগোলিক, সামরিক, রণকৌশলগত, অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক দখলদারি, আধিপত্য, লুঠ, নৈরাজ্য, হিংসা, আগ্রাসনের থাবা বাড়িয়ে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে ক্যারিবিয়ান, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়ায় একের পর এক শিষ্টাচার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভেঙে ফেলা, সাংঘাতিক সামরিক আগ্রাসন, ভীতি প্রদর্শন, ভয়ঙ্কর যুদ্ধ, প্রবল ধ্বংসলীলা, নৈরাজ্য সৃষ্টি, খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ আত্মসাৎ এবং বিশ্বজুড়ে একদিকে অভূতপূর্ব অস্থিরতা ও সংকট সৃষ্টি, অন্যদিকে তার উপর নির্ভরশীলতায় সবাইকে বাধ্য করার বলপূর্বক কর্মসূচি চালাতে থাকে। সেই লক্ষ্যে তার এই মুহূর্তের প্রধান লক্ষ্যবস্তু (Target) সমগ্র মধ্য প্রাচ্য এবং ইসলামি বলয়ের একমাত্র অদম্য রাষ্ট্র ইরান।
২০২৩ এ ইরানের মদতপুষ্ট গাজার সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী হামাস কর্তৃক ইজরায়েল আক্রমণ করার প্রত্যাঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র – ইজরায়েল গাজার উপর যে ভয়ানক মারণ আক্রমণ নামিয়ে আনে সেটি ক্রমে বর্ধিত করে ইরান সমর্থিত শিয়া শাসক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী সম্বলিত ইরানের পশ্চিমে ইরাক থেকে সিরিয়া হয়ে লেবানন অবধি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবল বোমাবর্ষণে আসাদ কে উৎখাত করে, হিজবুল্লাহ ও অন্যান্যদের দুর্বল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে এবং ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও বোমা বর্ষণে দুর্বল করে দেয়। বাদবাকি মধ্য প্রাচ্যের সৌদি আরব, জর্ডান, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ওমান, কাতার, বাহরিন, কুয়েত এবং ইরাক মার্কিন সমর্পিতই ছিল। এরপর তারা পরিকল্পিতভাবে ২০২৫ এ ইরান আক্রমণ করে বেশ কিছু রাষ্ট্রনেতা ও সেনা বাহিনীর জেনারেলকে হত্যা করে এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে। কিন্তু ইরান সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশ এবং মার্কিন ও ইজরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ ছায়াযুদ্ধ (Proxy Wars) চালিয়ে, মার্কিনি নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) সামলিয়ে অভিজ্ঞ। রাশিয়া, চিন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) ও ড্রোন প্রযুক্তি খুবই উন্নত, সেগুলির ভাণ্ডারও বিশাল এবং বড় দেশ ইরানের ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পাহাড়ি গুহা ও মাটির তলার বাঙ্কারে সুরক্ষিত বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে সেগুলি ইজরায়েলের বিভিন্ন শহর ও পশ্চিম এশিয়ার ২৭ টি মার্কিন ঘাঁটি ইত্যাদির দিকে তাক করা। এছাড়াও ইরান পরমাণু বোমা তৈরির শেষ পর্যায়ে। ২০২৫ এর যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইজরায়েলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ করে নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজাতে থাকে। ইরানও আলোচনায় অংশ নেওয়ার সঙ্গেসঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রত্যাঘাতের ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো ছাড়াও পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতির মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওমানের মাধ্যমে ও সরাসরি ইরানের সঙ্গে রণকৌশলগত কারণে আলোচনা চালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে তার ইন্ডো – প্যাসিফিক কমান্ড থেকে ইউ এস এস আব্রাহাম লিঙ্কন বিমানবাহী রণতরী কে ওমান উপসাগরে এবং ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে ইউ এস এস জেরাল্ড ফোর্ড কে আরব সাগরে নিয়ে আসে। ইউ এস এস আইসেনআওয়ার থাকে ভূমধ্যসাগরে। এছাড়া পারস্য উপসাগরের বাহরিনে রয়েছে তাদের পঞ্চম নৌবহর। এবার সি আই এ ও মোসাদের নির্দিষ্ট তথ্য পেয়ে মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমানবাহিনী ২৮ তারিখ সকালে তেহেরানে ইরানের প্রধান ধর্মগুরু ও সর্বোচ্চ নেতা এবং আয়াতুল্লা খোমেনির মৃত্যুর পর থেকে ৩৬ বছর ধরে ইরানের একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্র আলি খামেনেইকে সপর্ষদ গোপন বাঙ্কারে সভা চলাকালীন হত্যা করে। প্রবল বিস্ফোরণে সমগ্র কম্পাউন্ড ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, খামেনেই এর পরিবারের অনেকেরও মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে ইরানের বহু জায়গায় বোমাবর্ষণ করা হয়, বিশেষ করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস ব্যবস্থাটি অচল করে দেওয়া হয়। ইরান স্থল, নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধে শক্তিশালী হলেও বিমান যুদ্ধে তুলনামূলকভাবে অনেক দুর্বল। সেটি কাজে লাগিয়ে ইজরায়েলি বিমানবাহিনী ক্রমাগত ইরানের উপর মারাত্মক সব বোমা ও ড্রোন বর্ষণ করে চলেছে। অন্যদিকে মরীয়া ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার উজাড় করে ইজরায়েল, মধ্য প্রাচ্যের সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি, আমিরশাহী তে অস্ট্রেলিয়ান ঘাঁটি, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটি ছাড়াও মার্কিন ও ইজরায়েল বান্ধব সৌদি, আমিরশাহী, কাতারের উপর মুহুর্মুহু শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে চলেছে। প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলির অনেকগুলিকে আকাশ পথে নিষ্ক্রিয় করা সত্ত্বেও অনেক গুলি উপরোক্ত অঞ্চলে পড়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ঘটাচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু মানুষের বিশেষত ইরানে মৃত্যু হয়েছে, বহু মূল্যবান সম্পদ ও ঘরবাড়ি ধুলোয় মিশে গেছে, বহু মানুষ আহত, পরিবেশ দূষণ তীব্র, পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে, ন্যূনতম পরিষেবা ব্যাহত, সবকিছু থমকে আছে। দুবাই, আবু ধাবি ও দোহা কে কেন্দ্র করে বিশ্বের বৃহত্তম বিমান পরিষেবা স্তব্ধ। প্রচুর বিদেশি এবং ভারতীয় শ্রমিক – কর্মচারী – যাত্রী আটকে রয়েছেন। সেখানকার সাধারণ মানুষ প্রচন্ডভাবে বিপদগ্রস্ত ও আতঙ্কিত।
এছাড়াও ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে, চিনা ছাড়া বিদেশি তেলবাহী জাহাজ গুলিকে ডুবিয়ে দিয়ে এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি, আমিরশাহী, কুয়েত প্রভৃতি দেশের তৈল শোধনাগার ও বন্দরগুলি ক্ষতিগ্রস্ত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ খনিজ তেল সরবরাহের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পারস্য উপসাগর সংলগ্ন ইরাক, কুয়েত, ইরান, বাহরিন, কাতার, ওমান এবং সৌদি ও আমিরশাহীর এক বড় অংশ থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে ভারত সহ আবিশ্বে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করবে। এছাড়াও ইরান সমর্থিত হুথি লোহিত সাগরে সন্ত্রাস বৃদ্ধি করে ও বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক মহলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ইরানের লক্ষ্য তেল সরবরাহ এবং এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে আকাশ ও জলপথ বন্ধ করে দিয়ে সংকট তৈরি করা যাতে বিশ্ব জনমত যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেয়। আর বেশি সংখ্যক মার্কিন সৈন্য হত্যা যাতে মার্কিন দেশেই ট্রাম্প বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত এলাকায় ইরানের কিছু নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ধংস করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলি বাহিনী পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ এখনও নিতে পারেনি। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে হিজবুল্লাহর ইজরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া কে কাজে লাগিয়ে ইজরায়েল লেবাননের রাজধানী বেইরুট সহ হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত জায়গাগুলি বোমা ফেলে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং তার সঙ্গে স্থল বাহিনী (IDF এর বিভিন্ন শাখা) পাঠিয়ে লেবানন সীমান্ত নিজের মত গড়ে নিচ্ছে। আগেই গাজা ও জর্ডন নদীর ওয়েস্ট ব্যাংকে সীমান্ত বাড়িয়ে চলছিল। এর পাশাপাশি ইজরায়েলি বিমান বাহিনী (IAF) ইরানের উপর ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে তাদের সামরিক কমান্ড, ঘাঁটি এবং স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলি ধ্বংসের কাজ করছে।
মার্কিনের অভিসন্ধি হচ্ছে: (১) যুদ্ধকে কিছুটা প্রলম্বিত করে এবং অন্যদের ভুক্তভোগী করে উপসাগরীয় দেশগুলিকে যেমন যুদ্ধে জড়ানো, সেরকমই ইউরোপ সহ অন্যান্য মহাদেশের সহযোগী দেশগুলিকে যুদ্ধে জড়ানো। ইতিমধ্যে কাতার, আমিরশাহী, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া যোগ দিয়েছে। স্পেন সহ কিছু বিরুদ্ধ স্বর শোনা গেলেও সেগুলি মার্কিন চাপে কতদিন বলবৎ থাকবে অজানা। (২) ইন্ধন দিয়ে ইরানের পূর্ব সীমান্তবর্তী আফগানিস্তান ও পাকিস্তান দুটি ইসলামি মৌলবাদী দেশকে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা। (৩) লোকদেখানো শান্তি উদ্যোগ, আলাপ – আলোচনা, বাণিজ্যিক বোঝাপড়া ইত্যাদির মাধ্যমে রাশিয়া ও চিনকে মধ্য প্রাচ্য থেকে দূরে রাখা। (৪) ইজরায়েলের মাধ্যমে ক্রমাগত বিমান হানা ঘটিয়ে ইরানকে এবং সেখানকার বর্তমান শক্তিশালী সামরিক – ইসলামি কাঠামোকে ধ্বংস করা। (৫) তারপর সেখানে পুতুল সরকার বসানো, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার দখল, পরমাণু কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের মাটিতে স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি নির্মাণ। শেষ বেলায় সে মেরিন ও গ্রাউন্ড অফেন্সিভ এও যেতে পারে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। তাই সে কিছুটা সময় নিচ্ছে। ইরানকে চারিদিক দিয়ে কোণঠাসা করে, তার অস্ত্র ভাণ্ডার নিঃশেষিত ও ধ্বংস করে, তার শক্তিশালী নেতৃত্বকে হত্যা করে, তার শক্তিশালী সেনা বাহিনী এবং ‘ ইসলামিক রেভেলিউশনারি গার্ড কর্পস ‘ কে দুর্বল করে তারপর ইরানের ভৌগোলিক দখল নিতে চাইছে। তাই সে আগেই ক্যারিবিয়ান অপারেশন করে ভেনেজুয়েলার বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেখেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তি ক্ষেত্রে পরমাণু সহ অন্যান্য প্রচলিত ও অপ্রচলিত শক্তি প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও শক্তি খরচে এখনও ৬৫% ক্ষেত্রে পেট্রোলিয়ামের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সে বিশ্বের সবচাইতে বেশি পেট্রোলিয়াম যেমন খরচ করে তেমনই সবচাইতে বেশি পেট্রোলিয়াম উৎপাদন করে। তার রয়েছে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ পাথরের মধ্যে থাকা Shelf Oil এর ভাণ্ডার। টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, অ্যারিজোনা, আলাস্কা প্রভৃতি স্টেটসে রয়েছে বেশ কিছু খনি। এছাড়াও প্রতিবেশী কানাডা ও মেক্সিকো থেকে প্রচুর পেট্রোলিয়াম আমদানি করে। ফলে যুদ্ধ কিছুটা দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ভাণ্ডারের বিশেষ অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। রাশিয়ার রয়েছে প্রচুর খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। চিন প্রযুক্তি গত উন্নতি ঘটিয়ে এবং নিজের বৃহৎ কয়লা ভান্ডারকে কাজে লাগিয়ে খনিজ তেল নির্ভীরতাকে ৫০% এর মধ্যে নিয়ে এসেছে। এছাড়া তার উত্তর পূর্ব ও উত্তর পশ্চিমে রয়েছে বড় তেল ভাণ্ডার। এছাড়াও সে মধ্য এশীয় দেশগুলি এবং রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশ থেকে আমদানি করে। রাশিয়ার সঙ্গে রয়েছে পাইপ লাইন। ইরান থেকে আনা বিশাল পরিমাণ তেল সে রাশিয়ার মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করবে। সমস্যা হবে অন্যান্য দেশ, ছোট দেশ এবং ভারতের মত স্বনির্ভরতা বিসর্জন দিয়ে পরমুখাপেক্ষী দেশের যেখানকার অশিক্ষিত, অযোগ্য, অবিবেচক, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোভী শাসকরা কাজের চাইতে শূন্যগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে যেতেই পছন্দ করেন। ফলে এখানকার অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি আসন্ন। এর জন্য পরিস্থিতির চাইতেও এখানকার শাসক রাজনীতিকদের মদতপুষ্ট অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে কৃত্রিমভাবে সংকট দেখিয়ে, দাম বাড়িয়ে, কালোবাজারি করে মানুষের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
মধ্য এশিয়ার যুদ্ধ এই মুহূর্তে এক বিপজ্জনক ধ্বংসলীলায় পর্যবসিত হয়েছে। যেখানে নারী, শিশু, স্কুল পড়ুয়া, হাসপাতাল, জনবসতি, বাণিজ্যিক বিমানবন্দর সবই প্রবলভাবে আক্রান্ত। একদিকে যুদ্ধবাজ ট্রাম্প – নেতানিয়াহু র নেতৃত্বে পরমাণু শক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ইরাকের পর প্রাচীনতম সভ্যতার আধার ইরানকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে চলেছে। অন্যদিকে কট্টর মৌলবাদী ইসলামি – সামরিক শক্তি ইরান সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেই এর দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনেই এর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয়ে তাদের বিস্তৃত ভয়ঙ্কর ক্ষেপণাস্ত্রর ভাণ্ডার নিয়ে ইজরায়েল কে ধ্বংস করতে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কে উচিত শিক্ষা দিতে উদ্যত।
অনেক বছর ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রপুঞ্জ কে ঠুটো জগন্নাথ করে রেখেছে। অন্য বৃহৎ দুই শক্তি রাশিয়া ও চিন ভেনেজুয়েলার মত তাদের মিত্র দেশ ইরানের বিপদে এখন অবধি বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারত তাঁর এতদিনকার বিশ্ববরেণ্য জোট নিরপেক্ষ অবস্থান, পরবর্তিতে সোভিয়েতের পতনের পর মার্কিন ও সোভিয়েতের মধ্যে এবং পুরোনো মিত্র ইরান ও রণকৌশলগত মিত্র ইজরায়েলের মধ্যে ভারসাম্য নীতি বিসর্জন দিয়ে সমস্ত ভারতবাসীর ক্ষতি ও অসম্মান করে একেবারে যুদ্ধ উন্মাদ ও মানবতা বিরোধী অপরাধী ডোনাল্ড ট্রাম্পের পায়ে পড়ে গেছে। যুদ্ধের ঠিক আগের মুহূর্তে তার ইজরায়েল সফর ও নেতানিয়াহু প্রশস্তি আবার ভারতের মুখ পুড়িয়েছে যতই গদি মিডিয়া মিথ্যা দিয়ে সত্য ঢাকার ধারাবাহিক চেষ্টা করুক। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে ক্রমে বিলুপ্তির পথে নিয়ে চলা চিরঅর্বাচীন রাহুল গান্ধীর কথায় কেউ গুরুত্ব দেন না। সবকিছুতে মন্তব্য করা মুসলিম সম্প্রদায়ের মসিহা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকটি নট। বিজেপি ও তৃণমূল দল দুটি পুজো থেকে নির্বাচন অবধি এই দীর্ঘ সময় মানুষকে ‘ এস আই আর ‘ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। কিছু বাম দল যৌথ বা পৃথকভাবে সামান্য কিছু প্রতিবাদ করলেও তাদের দীর্ঘ ত্রুটিপূর্ণ নীতি, কর্মকাণ্ড ও অনুশীলনের কারণে তারা জনবিচ্ছিন্ন এবং তাদের বক্তব্যের কোন প্রভাব জনমানসে অনুপস্থিত।
একদিকে ট্রাম্প – নেতানিয়াহু র আগ্রাসন, অত্যাচার, যুদ্ধ উন্মাদনার এবং অন্যদিকে খামেনেই অত্যাচারী ইসলামি মৌলবাদী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আগে থাকতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং ইরানের মানুষ এবং ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশের মানুষ প্রতিবাদে পথে নেমেছিল। সেগুলির বৃদ্ধির সঙ্গে ভারত সহ প্রতিটি দেশ ও মহাদেশের মানুষ যদি এই যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন তাহলেই একমাত্র এই যুদ্ধ থামানো সম্ভব। নরওয়ে, স্পেন, জাপানের মত অন্যান্য দেশগুলি এগিয়ে এলেও এই যুদ্ধ ও ধ্বংস বন্ধ করার একটি সম্ভবনা তৈরি হবে।
০৪.০৩.২০২৬










