লাল নীল গেরুয়ার মেলা বসেছে
লাল নীল গেরুয়ার মেলা রে।
আয় আয় আয় রে ছুটে খেলবি যদি আয়
নতুন সে এক খেলা রে।।
২০২৬ এর নির্বাচন ঘোষিত হয়ে গেছে। নতুন কিছু নয়। তবু প্রতিবারই প্রার্থী সমর্থক ও সাধারণ ভোটাররা আশা করেন এই বার নতুন কিছু হবে। বিরোধীরা চান বদল, ক্ষমতায় থাকা দল চায় আরো বেশি জনসমর্থন, সাধারণ ভোটার চায় বিভিন্ন পরিষেবা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উন্নতি। যাঁরা বিশ্বাস করেন বুর্জোয়া পার্লামেন্টে প্রতিনিধি পাঠিয়ে লাভ নেই তাঁদের ও কিছু প্রত্যাশা থাকে। তাঁরা চান ভারতীয় গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসব নির্বাচন এই ধারণার উপর মানুষের আস্থা ক্রমশ কমতে থাকুক। নির্বাচনের সময় মানুষের দাবি সচেতনতা এবং রাজনৈতিক আলাপ আলোচনায় আগ্রহ বাড়ে তাই ভোট বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি গুলিও এই সময় মানুষের দাবি দাওয়া নিয়ে আলোচনা ও কর্মসূচি সংগঠিত করে সংসদীয় দল গুলির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অসারতা প্রমাণ করার চেষ্টা করে।
এই চেনা গল্পের সঙ্গে ২০২৬ এর নির্বাচনে নতুন মাত্রা আনল পানিহাটি কেন্দ্র। যদিও গত সাত আট মাসের ঘটনা ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখলে বোঝা যায় বজরংপন্থীদের এই ঘোষণা প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে গিয়েছিল। আপাত অর্থে এ এক বিরল সংকট – সন্তানহারা পিতামাতা অসহায় ভাবে ঘুরছেন এক দরজা থেকে আরেক দরজায়। অধরা বিচারের আশায় গেরুয়া ধারণ করলেন শ্রীমতি দেবনাথ। গেরুয়া রাজ্যে নারীনির্যাতনের ভয়াবহ ইতিহাস আর পরিসংখ্যান অজানা না থাকলেও ক্ষমতা না হলে বিচার পাওয়া যাবেনা এই সত্যকে অমোঘ বিবেচনা করে ৫৬ ইঞ্চি আর তার সহকারীর (যার টিকির দেখাও পাননি তাঁরা চেষ্টা করেও) পদতলে আত্মসমর্পন করলেন। যে ব্যবস্থায় বিচার পাবার পূর্বশর্ত ক্ষমতা সেখানে গণতন্ত্র চরম ব্যর্থ। গণতন্ত্রের এই ব্যর্থতায় রাষ্ট্রপ্রধানরা লজ্জিত নন, লজ্জিত আপামর রাজ্যবাসী, আপামর ভারতবাসী। এই লজ্জা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবেনা, লজ্জার দায় নিতে হবে একদিন রাষ্ট্রকে।
একটি সংসদীয় রাজনৈতিক শক্তি অভয়া আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে প্রার্থী ঘোষণার পর শ্রীমতি দেবনাথের আক্রমণের মূল লক্ষ্য অভয়া আন্দোলনের নেতৃবর্গ এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল । তৃণমূলের বিরুদ্ধে দাগা কামানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী কামান দাগতে চাইছেন তাদের বিরুদ্ধে যারা এক চুল জমি না ছেড়ে বিচারের আন্দোলনটা কে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এই হত্যা এবং প্রমাণ লোপাটের সঙ্গে তৃণমূল সরাসরি যুক্ত, সুয়ো মোতো আর সি বি আই পর্বতের মুষিক প্রসব বিজেপির অঙ্গুলি হেলনে এ কথা এখন দুই পার্টির ক্ষীর খাওয়া নেতারা ছাড়া সবাই জানে। তবু আক্রমণের নিশানা জুনিয়র ডাক্তার, অভয়া মঞ্চ এবং একটি রাজনৈতিক দল, যারা তৃণমূল এবং বিজেপি বিরোধী, যে দলের নেতা কর্মীরা পতাকা আর দলীয় পরিচয় ছাড়াই অভয়ার লড়াইয়ে আছেন পুরোদস্তুর।কোন কোন অতি উৎসাহী পতাকা আর রং নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন না এমন নয়, তেমন অত্যুৎসাহ সামলে দেবার লোকেরও অভাব নেই। আসলে রাষ্ট্রের ক্ষমতার চাপে অসহায় শ্রীমতি দেবনাথ, হয়তো অসহায়তার কথা উপলব্ধি না করেই আক্রমণ সাজাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে যারা বিচার আনতে বদ্ধপরিকর। বিচার আনার প্রচেষ্টাতে জল ঢেলে, অভয়া মঞ্চকে ঘিরে যে গণ আন্দোলন গড়ে উঠেছে গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সেই আন্দোলনকে সমূলে উৎপাটিত করার চেষ্টাতেই বিজেপির পানিহাটির চাল।
যাদের অঙ্গুলি হেলনে বিচার অধরা হল, যাদের কাছে বিচারের জন্য সাক্ষাৎ ভিক্ষা করেও প্রত্যাখ্যাত হলেন, অসহায় মা বাবা সেই ক্ষমতার স্তম্ভকে আঁকড়ে ধরেই বলীয়ান হতে চাইছেন!
রাজ্যে দেশে এক ঘোরতর সংকট। রাজ্যে শ্বাসরোধকারী সন্ত্রাস। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এক হাতে ধর্মের কুঠার, অন্য হাতে SIR এর মুষল নিয়ে ফ্যাসিবাদের রথ ছোটাচ্ছে । এই ক্রান্তিলগ্নে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সংহত ঐক্য ছাড়া বিজেপির জয়রথ ঠেকানো অসম্ভব। জার্মানি ইতালির ইতিহাস দেখিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক শক্তির অনৈক্য আর দুর্বলতা কী ভাবে নাৎসিবাদ আর ফ্যাসিবাদের রাস্তা প্রশস্ত করেছে। এই সময় কড়া নাড়ছে এক নির্বাচন। শ্রমজীবী সহ রাজ্যের বিপুল অংশের মানুষ এই নির্বাচনে অংশ নিতে চান। ভারতবর্ষের আধা সামন্ততান্ত্রিক পরিমণ্ডলে সংসদীয় ক্ষমতায় বিশ্বাসী নন বহু বামপন্থী মানুষ। তাঁরা মনে করেন ক্ষমতার স্বর এক, লাল সবুজ গেরুয়া সবাই ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে। সংসদীয় নির্বাচন দিয়ে এই শক্তিদের পরাস্ত করা অর্থহীন কারণ ক্ষমতার অলিন্দে সব ভাষাই এক সুরে কথা বলে। বৃহৎ গণ আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে খোল নলচে বদলেই শুধুমাত্র পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই নির্বাচন নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। এই তত্ত্ব সন্দেহাতীত ভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। সংসদীয় বামদের সঙ্গে ঐক্যের আপাতভাবে অন্তরায় এই তত্ত্ব। যদিও বাস্তব বলে তাত্ত্বিক লড়াই এর চেয়ে অনেক বেশি লড়াই হয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনায় পরস্পরের ভূমিকা নিয়ে। সংসদীয় দলে নির্বাচন আর ক্ষমতা জপমন্ত্র হয়ে যাওয়ায় এক বড় অংশের সুবিধাবাদ আর ক্ষমতালোভ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে ক্ষইয়ে দিয়েছে আদর্শবাদ। সরকার গঠনই একমাত্র লক্ষ্য বিবেচিত হওয়ায় এক বড় অংশের মানুষ সুবিধাবাদী না হয়েও নির্বাচন ছাড়া বদলের আর কোন রাস্তার কথা ভুলে গেছেন বা শোনেনইনি কোনদিন ! তবু এখনও সংসদীয় বামেদের মধ্যে আছেন এখনো বেশ কিছু মানুষ, যাঁরা লাভের জন্য নয়, সাম্যের আদর্শকে বুকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। অসংসদীয় বামেরা শতধাবিভক্ত । ২০১১র পরিবর্তনের স্বপক্ষে যাঁরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের অনেকে আজ তৃণমূলের দলদাস। তবু এই শিবিরে এখনও আছেন অসংখ্য আত্মত্যাগী সংগ্রামী মানুষ, যারা কোন ক্ষমতা বা সরকারি অনুগ্রহের প্রত্যাশী না হয়ে আজীবন লড়াইয়ের ময়দানে আছেন, সুদূর দিগন্তে রক্তিম সূর্যোদয়ের স্বপ্ন নিয়ে।
পারস্পরিক আক্রমণ সব পক্ষের আদর্শবাদী মানুষদের ঐক্য নষ্ট করে সুবিধা করে দিচ্ছে শাসক গোষ্ঠীর। তাই অভয়া আন্দোলনে নির্বাচনী ফায়দা লুটতে চাওয়া তৃণমূল বিজেপির সঙ্গে একাসনে সংসদীয় বামদের বসালে অগণিত মানুষের রাজনৈতিক আবেগ আর নিঃস্বার্থ সংগ্রামকে অপমান করা হয় যাঁরা সংসদীয় বাম দলের সদস্য বা ভোটার হয়েও ব্যক্তি পরিচয়ে প্রতিরোধ গড়ার লক্ষ্যেই এসেছিলেন এই আন্দোলনে, দলের ঝুলি ভরানোর জন্য নয়।
এই খানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে আসে। বামরা অভয়া আন্দোলনকে ভোটের বৈতরণী পার করার জন্য ব্যবহার করছে এ অভিযোগ শুধু তৃণমূল বিজেপির নয়, অসংসদীয় বামেরা ও কখনও এই অভিযোগ করছেন। এই তৃতীয় গোষ্ঠীর অভিযোগটা একটু গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার দরকার কারণ তত্ত্ব আর মতের পার্থক্য থাকলেও এই শিবিরের সকলেই সংসদীয় বামদের শত্রুপক্ষ মনে করেন না ভোট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু দলীয় কর্মীর অহেতুক অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা- অভয়া আন্দোলনে অংশ গ্রহণকে সামনে রেখে ভোট দেবার আহ্বান – এই আন্দোলন এবং এই দলটির সমূহ ক্ষতি করছে। একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী এবং নেতা অভয়ার শববাহী গাড়ি আটকে দ্বিতীয় বার পোস্ট মর্টেম এর দাবি করেছিলেন অসম সাহসে। দ্বিতীয় পোস্ট মর্টেম এর দাবি মানা হয়নি, বাধা ভেঙে গাড়ি এগিয়ে যায়। দ্রুত দেহের সৎকার করা হয়। দ্বিতীয় পোস্ট মর্টেম করাতে না পারলেও গাড়ি আটকানোর সাহসকে অবশ্যই কুর্নিশ জানাতে হয়। এই ঘটনার আগে আর জি কর, মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হাসপাতালে দেহ ঘিরে ধরে ম্যাজিস্ট্রেট ইনকোয়েস্ট এবং পোস্ট মর্টেম করাতে বাধ্য করেন। হাসপতালে মিটিং ডাকেন, যে মিটিং সন্দীপ ঘোষের চ্যালারা বন্ধ করে দেয় ইলেকট্রিক এর সুইচ অফ করে। চিকিৎসক মহলে এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তে জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস এর বেশ কিছু সদস্য উপস্থিত হন। এদের সকলের প্রচেষ্টাতেই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এর পরে ও ওই রাজনৈতিক দলের প্রচারে এখনো শোনা যায় গাড়ি আটকে ওই নেত্রীই অভয়া আন্দোলনের সূচনা করলেন ! এই অতিশয়োক্তিগুলি দলের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। কোন দল রং না দেখে যে সংগ্রামী নেত্রী পুলিশকে অগ্রাহ্য করে গাড়ি আটকেছিলেন তাঁকেও অসম্মান করা হয়।
গোড়ার কথায় ফেরা যাক। সবুজ গেরুয়ার মধ্যে কোন দল বেশি ক্ষতিকর সে বিশ্লেষণ আপাতত বন্ধ করে অভয়া আন্দোলন পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে ফ্যাসিবাদী দলের কর্মসূচি কোন দল রূপায়ণের চেষ্টা করছে, কোন দল এই মুহূর্তে এই রাজ্যে বিজেপির ফ্যাসিবাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত করছে সেটা নিয়ে ভাবা বেশি জরুরি। এর সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে এই মুহূর্তে ফ্যাসিবাদ আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোন কোন সংসদীয় শক্তি সোচ্চার হয়েছে এবং তার জন্য বিভিন্ন সময় নানা ভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এটাই সময়ের দাবি। এবার সত্যি নতুন এক খেলা।
নির্বাচনে বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ভোটের শতাংশ বাড়লে (বামফ্রন্টের দলগুলি ছাড়াও আরো বেশ কিছু বাম গণতান্ত্রিক দল নির্বাচনে লড়ছে) আন্দোলনের সব দাবি পূরণ হয়ে যাবে বা সমাজটা আমূল বদলে যাবে এমন আদৌ নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তৃণমূল বিজেপির ভোট কমিয়ে বিরোধী ভোট বাড়লে আত্মবিশ্বাস বাড়বে সেই মানুষদের যাঁরা দল না দেখে অভয়া আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নেমেছিলেন, আত্মবিশ্বাস দ্বিগুণ হবে সেই মানুষদের যাঁরা এখন ভোটের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার জন্য উদয়াস্ত লড়াই করে বেড়াচ্ছেন। আর যে সংগ্রামী মানুষেরা নির্বাচনকে অস্বীকার করে গণ আন্দোলন আর গণসংগ্রামে বিশ্বাস করেন, তাঁদের আন্দোলনেও মানুষের অংশ গ্রহণ বাড়বে। বিজেপি তৃণমূলের অপ্রতিরোধ্য সন্ত্রাস যে আসলে অপ্রতিরোধ্য নয়, লক্ষ কোটি মানুষ গর্জে উঠলে আসলে সবাই কাগুজে বাঘ – এই তত্ত্বে মানুষের আস্থা বাড়বে।
তাই এবারের নির্বাচনী ‘খেলা’ সত্যিই নতুন এক খেলা। নির্বাচন এবং গণ আন্দোলন কাছাকাছি এসে হাতে হাত রাখার বিরল মুহূর্ত ইতিহাসে খুব বেশি তৈরি হয় না। আমরা সেই ঐতিহাসিক সময়ের দায় নিয়ে এগিয়ে চলেছি। অতীতের অপূর্ণ প্রত্যাশাপূরণ, ভবিষ্যতের অদেখা স্বপ্ন সার্থকের দায়িত্ব বর্তমান এই সংগ্রামের।
‘আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দুটো দল ‘ — দিক চিনতে যেন ভুল না করি আমরা। এ লড়াই বাঁচার লড়াই।










অভয়া আন্দোলনের সমালোচকদের বিরুদ্ধে সপাটে এক থাপ্পর। যারা সেদিন না থাকলে এই পাশবিক ঘটনাটি “ছোট্ট ” ঘটনায় পরিনত হত তাদের প্রতি আঙ্গুল তোলার দুঃসাহস কে দুমড়ে মুচড়ে ফেলার আহ্বান রইলো “রাত জাগা ” প্রতিবাদীদের কাছে।