শুরুর কথা
আমি এ লেখা যখন লিখছি তখন তথাকথিত “ধর্মোন্মাদ” একটি দেশ এবং যুদ্ধোন্মাদ সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকা এবং এর বিশ্বস্ত দোসর ইজরায়েলের মধ্যে ১ মাসের বেশি সময় ধরে (২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে) যুদ্ধ বেঁধেছে। রাশিয়া, চিন, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত দেশ এবং সমগ্র ইউরোপ এবং “বন্দেমাতরম” গাওয়া ভারতও ইংরেজিতে বললে sitting on the fence (প্রাচীরের ওপরে বসে জল মাপছে)। হাতে গোণা দুয়েকটি দেশ বিবৃতি দিয়েছে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু কিছু দেশে কিছু পরিমাণে গণবিক্ষোভ হচ্ছে। কিন্তু যে ignition point তথা জ্বলনাংকে পৌঁছুলে এক সামগ্রিক গণপ্রতিরোধ হয় – যেমনটা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে হয়েছিল, সে ক্ষেত্রটি অনুপস্থিত। আমি জানিনা, কবে সেই জ্বলনাংকে পৌঁছবে। কিন্তু যত দ্রুত ঘটে বিশ্বজনতার জন্য তত মঙ্গল।
(ইংল্যান্ডে ইরান আক্রমণের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ)
(আমেরিকায় “নো কিং” আন্দোলন)
(ব্রাসেলস-এর রাস্তায় ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ)
মায়ের হাতের খুন্তিও কোন উৎপাদনের কাজে লাগে। কিন্তু বুলেট, মিসাইল, ড্রোন একমাত্র শিশুঘাতী, নারীঘাতী এবং বয়স নির্বিশেষে সমস্ত মনুষ্যসন্তানঘাতী মানুষকে হত্যা এবং সার্বিকভাবে একটি দেশকে ধ্বংস করা ছাড়া অন্য কোন কাজে লাগেনা। এর জন্য লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা।
যে দেশগুলো প্রাচীরের ওপরে বসে জল মাপছে, তার সত্যিই কী “নিরপেক্ষ”? এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক, সামরিক, উগ্র আধিপত্যবাদের প্রসঙ্গ জড়িয়ে নেই? বিলক্ষণ আছে। আছে বলেই জল মাপছে। এর মধ্যে কিছু অংশ (ইরান ধ্বংস হলে) প্রবল “মানবিকতার” আবেগ-উচ্ছাসে ভেসে ইরানের পুনর্গঠনের কাজে হাত লাগাবে। আরেকদল ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে হাত লাগাবে। War Industry আরও অনেক রাফেল বা সমগোত্রীয় যুদ্ধ বিমান তৈরি করবে। এরকম হাজারো উদাহরণ দেওয়া যায়।
(সামরিক অস্ত্র বিক্রির সবচেয়ে বড়ো কোম্পানিগুলো – “জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি”)
আর আমেরিকা এবং ইজ্রায়েল? ইজরায়েলের ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধি করতে বদ্ধপরিকর। ওদের জনসংখ্যার জন্য এটা প্রয়োজন। আর “মেরিবাবা” আমেরিকা কেবলমাত্র “বিশ্বমানবতা”কে রক্ষা করার জন্য ভেনেজুয়েলা, ইরাক থেকে আফগানিস্তান – কোথায় না সৈন্য পাঠিয়েছে। ফলে এদের সৈন্যবাহিনী যেকোন পরিবেশে যুদ্ধ করার জন্য সবচেয়ে সক্ষম। হিটলারের একটি “মরুশৃগাল” রোমেল ছিল। কিন্তু আমেরিকার গোটা সৈন্যবাহিনীই মরুশৃগালের বৃহৎ সংস্করণ। কেন করছে এরকম যুদ্ধ যুদ্ধোন্মাদ বিধ্বংসী ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছাড়াও যেহেতু পৃথিবীতে তেলের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, এ কারণে তেল এবং এনার্জি উৎপাদনের ওপরে দখল নেওয়া এই মুহূর্তের বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি।
ইরানের যে পশ্চিমী-শিক্ষিত ব্যক্তিটিকে আমেরিকা মুক্তির কাণ্ডারি বা দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, এবং পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমে প্রায় হুল্লোড় পড়ে গেছে, এ ঘটনা ইতিহাসে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যেও এরকম হয়েছিল। একদা CIA-র কর্তাব্যক্তি এবং পরে, তাঁর বয়ান অনুযায়ী, CIA-র লাগাতার কুকর্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে অনুশোচনার কারণে CIA থেকে অবসর নেন। এবং একটি বেস্টসেলার বই লেখেন The New Confession of An Economic Hitman: How America Really Took over the World. (2016)। এই মানুষটিরে নাম John Perkins। ১৯৭৫-৭৮ সালের সময়কালের কথা জন পার্কিন্স এভাবে বলেছেন – “We launched an Immense effort to show the world what a strong, democratic friend of US corporate and political interests could accomplish.” (পৃঃ ১১৭, অধ্যায় ১৮)
এর অব্যবহিত পরেই বলেছেন – “Never mind his obviously undemocratic title or the less obvious fact of the CIA-orchestrated coup against the democratically elected premier … Washington and its European partners were determined to present the shah’s government as an alternative to those in Iraque, Libya, China, Korea, and other nations where a powerful undercurrent of anti-Americanism was surfacing.” (পৃঃ ১১৭)।
ওপরের অংশগুলো আমার মূল লেখার সঙ্গে বিশেষভাবে সংপৃক্ত নয়। তবে বর্তমান বিশ্বুপরিস্থিতিতে ভীষণভাবে জরুরী। মূল অংশটুকু পড়ার সময় এ কথাগুলোও যেন আমরা স্মরণে রাখি।
মেডিসিন ও দেহের প্রসঙ্গ
মানুষের অস্তিত্ব এবং দেহ রয়েছে সমস্ত রাজনীতির ভরকেন্দ্রে। দেহ রাজনীতি নিয়ে আমার আলোচনায় একদিকে রয়েছে দেহ বা ব্যক্তির দেহ, রয়েছে এই দেহ বা ব্যক্তি কিভাবে মেডিসিনের তথা জ্ঞানের জগতের সাবজেক্ট হয়ে উঠলো সে প্রসঙ্গ; অন্যদিকে রয়েছে অ্যানাটমির ভিন্নতর জ্ঞান কিভাবে দেহের ধারণার বিবর্তনে সাহায্য করছে এবং এই জ্ঞান শেষ অবধি পণ্য দুনিয়ার একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে দেহের বা ব্যক্তিদেহের পুনর্নিমাণে।
একটু ইতিহাস ঝালিয়ে নিই। মানুষের শরীর এবং এর অঙ্গসংস্থানের তথা অ্যানাটমির জ্ঞান প্রথম স্তরে ছিল অ্যানাটমির পুস্তকের পাঠের জ্ঞান, যা ছিল প্রধানত গ্যালেনের বই থেকে আহরিত এবং গ্যালেন নিজে ছাগল এবং বাঁদরের অতিরিক্ত একটি মনুষ্যদেহেও শবব্যবচ্ছেদ করেননি। সেসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগৎ-কে নিয়ন্ত্রণ করছে “হিউমার” বা “ত্রিদোষ তত্ত্ব”-র ধারণা। একে অনেকেই “ফিলসফিক্যাল অ্যানাটমি” তথা দার্শনিক অ্যনাটমি বলে থাকেন। কারণ? প্রকৃত অর্থে মানুষের শরীরের শবব্যবচ্ছেদ এ পর্যায়ে হয়নি। এই স্তরের অ্যানাটমির জ্ঞানের দুটি নমুনা চিত্র নীচে রয়েছে। যে কেউ সহজেই বুঝবেন এখানে দেহকে দ্বিমাত্রিক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এবং দেহের এই বোধ পণ্য দুনিয়ার কোন কাজেই লাগবেনা।
(চিত্রটি ১৩শ শতকের)
(চিত্রটি ১৫শ শতকের)
এর পরবর্তী সময়ে প্রধানত ১৩শ থেকে ১৫শ শতাব্দী থেকে ইটালিকে কেন্দ্র করে শব্যবচ্ছেদ-কেন্দ্রিক অ্যানাটমি শিক্ষা পুরোদমে শুরু হল। শব্যবচ্ছেদ করতেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং মাইকেলেঞ্জেলোর মতো শিল্পীরা, যে জ্ঞান ভেসালিয়াসের মতো ডাক্তারের হাতে পড়ে একেবারে ভিন্ন চরিত্র পেয়ে গেলো। একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন “medical anatomy” – দেহের শরীরী অনুধাবনে ত্রি-মাত্রিক ধারণা একমাত্র হয়ে উঠলো। দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এলো দেহসংক্রান্ত ধারণায় ও চিকিৎসার সংস্কৃতিতে এবং বৌদ্ধিক জগতে – (১) অসুখ তথা রোগ যে দেহের অভ্যন্তরে অঙ্গসংস্থানের মধ্যে থাকে (organ localization of disease), কোন কল্পিত হিউমার বা “ত্রিদোষ তত্ত্ব”-র মাঝে নয় এ ধারণা এবং (২) মৃতদেহকে ভালো করে বোঝার মধ্য দিয়ে জীবিত দেহের ধারণা অর্জন করা যাবে – “The dead teach the living”। দেহকে বোঝার জন্য এক ধরনের নির্লিপ্তি বা নৈর্ব্যক্তিকতা চিরকালের জন্য অবিচ্ছেদ্যভাবে প্রবেশ করলো মেডিসিনের জগতে। এ নির্লিপ্তি বা নৈর্ব্যক্তিকতা দর্শনের পরিধিতে বিবেচনার ও আলোচনার স্তরের নৈর্ব্যক্তিকতা নয়, পরীক্ষিত ধারণার মধ্য দিয়ে লব্ধ নির্লিপ্ত নৈর্ব্যক্তিকতা – নৈর্ব্যক্তিকভাবেই মানুষের দেহ এবং অস্তিত্বকে কাগজের ওপরে প্লট করে ফেলা সম্ভব গ্রাফের চেহারায়, যেমন ভুগোলে হয়। আমি এ স্তরের অ্যানাটমির জ্ঞানকে বলছি “দ্বিতীয় স্তর”-এর অ্যানাটমির জ্ঞান।
আমরা দ্য ভিঞ্চির আঁকা দুটি শৈল্পিক ত্রিমাত্রিক ছবি দেখে নিই এ সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী ধারণা হিসেবে।
(ভেসালিয়াসের বিখ্যাত Vitruvian man)
(মস্তিষ্কের চিত্র – ভেসালিয়াস)
ভেসালিয়াসের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় অতি নিখুঁত ড্রয়িং-এর তুলনা করলে দ্য ভিঞ্চির শৈল্পিক সুষমা আরো ভালো করে বোঝা যাবে। ভেসালিয়াসের ত্রিমাত্রিক দুটি ছবি – দেহের মাংসপেশি ও মস্তিস্ক নিয়ে।
(ভেসালিয়াসের ত্রিমাত্রিক ছবি – শরীরের শিরা-ধমনী)
(ভেসালিয়াসের ত্রিমাত্রিক ছবি – মস্তিষ্কের অভ্যন্তর)
আমরা এবার হালের দুনিয়ায় আসতে পারি। গত ২১শে ম, ২০১৮ সমস্ত সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল কলকাতায় প্রথম সফল হৃদপিণ্ড সংস্থাপন বা ট্র্যান্সপ্ল্যান্টের বিবরণ। সবাই কমবেশি স্মরণ করতে পারবেন সে ঘটনা। বাঙ্গালোরে পথ দুর্ঘটনায় মারা গেল ২১ বছরের এক তরুণ বরুণ ভি কে। কলকাতার ফর্টিস হাসপাতালে ভর্তি ছিল দিলচাঁদ সিং “irreversible severe cardio-myopathy” নিয়ে। তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং পশ্চিমবাংলার অর্থাৎ তিনটি রাজ্যের চিকিৎসকেরা এক প্রদেশের হৃদপিণ্ড সংস্থাপন করলেন আরেক প্রদেশের ব্যক্তির দেহে। যদি রাজনীতির প্রেক্ষিতে মেডিসিন ও দেহকে ভাবি তাহলে দেহের রাজনীতির এবং বায়োমেডিসিনের এ হচ্ছে মানবিক মুখ, যা দেহের রাজনীতির বয়ানে অনির্বচনীয় আনন্দ বা bliss-এর স্বাদ আনে। আবার অন্যদিক থেকে থেকে দেখলে বায়োমেডিসিন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী জ্ঞানের ডিসিপ্লিন হিসেবে ফুকোর ভাষায় একটি “docile body” বা “অনুগত” দেহের জন্ম দিচ্ছে। আমাদের প্রতিদিনের কারবার এই অনুগত দেহ নিয়ে। এ দেহগুলো disciplined, বাধ্য এবং মেডিসিনের প্রয়োজনে এদের ওপরে সমস্ত রকমের পরীক্ষানিরীক্ষা করা যায়। কিন্তু দেহ যদি অনুগত না হয়? সেখানে রাষ্ট্র এসে সরিয়ে দেবে মেডিসিনকে, মেডিসিনের জ্ঞান তখন রাষ্ট্রের সাথী হবে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। আমরা তখন “অবাধ্য দেহ” ঐশী ঘোষদের কিংবা শাহিনবাদের নারী-বৃদ্ধা-শিশুদের বা উত্তরপ্রদেশের ২৩টি লাশ দেখবো।
দেহের ওপরে রাষ্ট্রের চিহ্ন এঁকে দেবার একটি ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত দিক হল মৃতুদণ্ড দেওয়া। আমরা যারা ফুকোর Discipline and Punish বইটি পড়েছি তারা ঐ বইয়ের প্রথম দুটি অধ্যায়ে দেখেছি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দানের গ্রাফিক বর্ণনা। গা শিউড়ে ওঠা, দেহের প্রতিটি অনুভূতিকে অবশ করে দেওয়া সে বিবরণে আমরা জেনেছি দেহের ওপরে রাষ্ট্রের, রাজনীতির এবং দণ্ডনীতির কি ভয়াবহ পরিণামচিহ্ন এঁকে দেওয়া যেতে পারে – “দু-তিনবার চেষ্টা করার পরে, ঘাতক স্যামসন এবং যে অভিযুক্তের শরীর থেকে চিমটে দিয়ে মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছিল তারা দুজনেই তাদের পকেট থেকে ছুরি বের করলো এবং ব্যক্তিটির দেহ অস্থিসন্ধি থেকে আলাদা আলাদা টুকরো করার বদলে দুই ঊরু কেটে ফেললো। এরপরে দুদিক থেকে দুটো ঘোড়া বিপরীতদিকে টানতে থাকলো আর দুই ঊরু আলাদা হয়ে গেলো – প্রথমে ডান দিক, পরে বাঁ দিক, এভাবে চারটে অঙ্গকে ছিঁড়ে ফেলা হলো। এরপরে যাজক এলো ওর স্বীকারোক্তি নেবার জন্য।” কিন্তু এখানে, এই ঐতিহাসিক সময়ে, শাস্তি দেবার ধরনটি আমাদের আধুনিক বোধে ও বর্তমান জীবনযাপনের মাঝে বিচ্ছিরিভাবে নগ্ন, কদর্য। এমনকি সাধারণ বিচারেও বড্ডো দৃষ্টিকটু। অনেকটা বর্তমান ভারতের মব লিঞ্চিং-এর মতো – সভ্য দেশের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ কোনরকম আব্রু নেই। এজন্য সভ্য রাষ্ট্রের বোধ বিবর্তিত হবার সঙ্গে শাস্তিদানের প্রক্রিয়াটি সরে গেল সামাজিক নজরের (gaze) আড়ালে – আইনী পর্দার পশ্চাৎপটে।
পুনরায়, আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার অসংখ্য ঘটনায় আমরা দেখি যে মেডিসিনে suffering বা ক্লিষ্টতাকে ধারণ করার কোন ক্ষেত্র বা স্পেস নেই। এখানে একটি মৃত্যু কেবলমাত্র একজনের “অদৃশ্য” বা “অপসৃত” হয়ে যাওয়া, কোন loss কিংবা ক্ষতি বা বেদনা হিসেবে লেখা হয়না। পল ফার্মার তাঁর Pathologies of Power গ্রন্থে অসুখ, দারিদ্র্য, ক্ষমতা ও রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন – “the experience of suffering, it’s often noted, is not effectively conveyed by statistics or graphs. In fact, the suffering of the world’s poor intrudes only rarely into the consciousness of the affluent, even when our affluence may be shown to have direct relation to their suffering.” এ আলোচনার সূত্র ধরে অ্যাসেফির (Acephie) কাহিনী শুনিয়েছেন। কিভাবে স্বচ্ছল কৃষক পরিবারের কন্যা অ্যাসেফি পরিবার সহ “water refugee” হয়ে যায় রাষ্ট্রের তরফে বহুজাতিক কোম্পানির চাপে বাঁধ তৈরি করার জন্য। এবং পরবর্তীতে অ্যাসেফি রাষ্ট্রের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি মিলিটারি অফিসারের মারফৎ AIDS-এর শিকার ও বাহক হয়ে মরে যায়। অ্যাসেফির শরীরে, অঙ্গসংস্থানের মাঝে, অ্যানাটমির খাঁজে খাঁজে উৎকীর্ণ হয়ে থাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাচিহ্ন, যা কোন bliss বা সুখানুভূতি তৈরি করেনা। ফার্মারের নিজস্ব বয়ানে – “In 1983, when I began working in the Central Plateau, AIDS was already afflicting an ever-increasing number of city dwellers but was unknown in areas as rural as Kay. Acéphie Joseph was one of the first villagers to die of the new syndrome.” এ পুস্তকেই আলোচনার শেষ দিকে এসে ফার্মার বুলেটবিদ্ধ ম্যানো-র কথা বলেছেন। ম্যানো-র শরীরে, তার অ্যানাটমির মাঝে বুলেট লুকিয়ে আছে। “Manno’s attacker is in jail; there’s now less impunity in Haiti than there was a few years earlier. But that doesn’t help Manno get his left leg fixed. The bullet is still there, still lodged in his flesh, the fractures unpinned. Haiti does not guarantee its citizenry access to orthopedic hardware, although most anything can be bought for the right price. The word “insurance” is unknown among the poor.” একে ফার্মার বলছেন “স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স”।
আধুনিক মেডিসিন দেহের অঙ্গসংস্থান দিয়ে মানুষকে জানে, আর্থিক সঙ্গতির হদিস রাখেনা। নৈর্ব্যক্তিক মানুষকে জানে, তার সাফারিং বা ক্লিষ্টতাকে জানেনা। শুধু তাই নয়, অ্যানাটমির জ্ঞান নিবিড়ভাবে সংম্পৃক্ত হয় পণ্যজগতের মুনাফা উৎপাদনের কাজে। অ্যানাটমি দিয়ে জানা হয় পণ্য দুনিয়াকে, আবার পণ্যজগতের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার অ্যানাটমির ধারণা নতুন চেহারায় প্রতিভাত হয়। অ্যানাটমির এই বিশেষ ধারণাকে বলছি “তৃতীয় স্তরের” অ্যানাটমির জ্ঞান – মানুষের দেহ ও অস্তিত্ব যেখানে পণ্য, পণ্য তার দেহের সম্ভাব্য প্রতিটি অংশ।
যে কথা আগে বলা হয়েছে, দেহের ওপরে রাষ্ট্রের কর্তৃ্ত্ব খুব প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মৃত্যুদণ্ড দেবার সময়, এমনকি মৃত্যুদন্ড আইনব্যবস্থার আড়ালে চলে যাবার পরেও। একবিংশ শতাব্দীতেও এর খুব তীক্ষ্ণ, নির্মম এবং অভ্রান্ত চেহারা দেখা যাবে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের বিবর্তনের মাঝে। ১৯৭৬ অবধি আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত “death by firing squad”-এ। কিন্তু সময়ের সাথে বিচারব্যবস্থা দেখলো এধরনের মৃত্যু “too bloody and uncontrolled”। একাধিক মানুষকে গুলি করার পরেও তক্ষণাৎ মৃত্যু হয়নি। এ কেমনতরো কথা? গণতান্ত্রিক দেশে একজন “অপরাধীকে” মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে অথচ সে একবারে মারা যাচ্ছেনা। সমাজের চোখে খারাপ দেখানোর চাইতেও, আমার বিচারে, রাষ্ট্রের অভ্রান্ততা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এরকম মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের নির্ধারিত মৃত্যুদন্ড কেন নির্ভুল্ভাবে কার্যকর হবেনা এ প্রসঙ্গটি। রাষ্ট্র সবসময়েই নির্ভুল এবং অভ্রান্ত এরকম বোধ তো জনমানসে রক্ষা করতেই হবে। নাহলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাবে।
এরপরে এল ফাঁসী। কিন্তু এটাও “came to be regarded as still more inhumane”। তারপরে এলো নাৎসী হিটলারের মতো গ্যাস চেম্বারের মৃত্যু। কিন্তু ১৯৯২ সালে অ্যারিজোনা রাজ্যে ডোনাল্ড হার্ডিং-এর মৃত্যু ঘটতে ১১ মিনিট সময় লেগেছিলো। ১৯৭৬ থেকে আজ অব্দি ২ জন বন্দীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারা হয়েছে, ৩ জনকে ফাঁসীকাঠে ঝুলিয়ে এবং ১২ জনকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইলেক্ট্রিক শক (২৬০০ ভোল্ট) দিয়ে মারার পদ্ধতি চালু হল এবং এখানে এসে আবার একটি গোল বাঁধলো। ১৯৭৯-তে এক বন্দীকে ২৬০০ ভোল্টের শক পরপর দুবার দেবার পরেও ২০ মিনিট ধরে তীব্রতম যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন মুখ নিয়ে বেঁচে ছিল। রাষ্ট্রের অসম্পূর্ণতা, অকার্যকারিতা আরেকবার প্রমাণিত হল এ ঘটনার ফলে। দেহের ওপরে রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার এবং মৃত্যুদণ্ডের রাজনীতি পূর্ণত প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও “মুক্তচিন্তার” রাষ্ট্র কাজটি সুসম্পন্ন করতে পারছেনা। দেহের ওপরে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের সাফল্যের ক্ষেত্রে এক বড়োসড়ো প্রশ্ন চিহ্ন উঠে যায়। রাষ্ট্রের পক্ষে একে হজম করা সম্ভব নয়।
ফুকোর গবেষণার এক নতুন চিত্রনাট্য যেন দেখতে পাচ্ছি একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ আমেরিকায়। দেহের রাজনীতির এক নতুন চেহারাও বটে। গ্যাস চেম্বার পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড দানের পদ্ধতি হল “lethal injection”। কি দিয়ে তৈরি এ ইঞ্জেকশন? ২৫০০-৫০০০ মাইক্রোগ্রাম সোডিয়াম থায়োপেন্টাল (জীবিত দেহে অপারেশনের সময়ে এর সর্বাধিক ডোজ ২৫০ মাইক্রোগ্রাম), ৬০-১০০ মিলিগ্রাম pancurium বলে একটি রাসায়নিক পদার্থ যা সবকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশ করে দেয় এবং এই ডোজ স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এরপরেও দেওয়া হয় ১২০-২৪০ মি.ইকুইভ্যালেন্ট পটাশিয়াম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে মান্য পত্রিকা নিঊ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এর নিবন্ধে একটি মন্তব্য করা হল – “Officials liked the method”, কারণ মৃত্যু ঘটানোর জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলো অ্যানাস্থেসিয়াতে ব্যবহৃত হয়। আরেকটি বড়ো কারণও ছিল – আমেরিকার সংবিধানের ৮ম সংশোধনী “cruel and unusual” মৃত্যুকে নিষিদ্ধ করেছে।
এটা জেনেও ভালো লাগে যে, রাষ্ট্র-নির্ধারিত মৃত্যু, ব্যক্তি দেহের মৃত্যু, যাতে নিষ্ঠুর এবং অস্বাভাবিক না হয় সেজন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানকে সাথী করে রাষ্ট্রের কি গভীর “মানবিক” অনুভব! নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এর উদ্যোগে ২০০৮ সালে একটি প্যানেল ডিসকাশন হয়েছিল – “Discussion of Lethal Injection” শিরোনামে। সে আলোচনায় আইনের পরিচিত অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো খুব মিহি করে জানিয়েছিলেন – “pancuronium bromide is used in order to enhance the dignity of the inmate who’s dying, because without pancuronium, there might be some jerking or involuntary movements that would disturb some of the witnesses.” যে মানুষটির legalized killing হচ্ছে তার “dignity” ত্বরাণ্বিত করার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে ১০গুণ বেশি ডোজে দেওয়া হচ্ছে pancuronium! অথচ রাষ্ট্রের তরফে সজোরে এবং সগর্বে প্রকাশ করা এ যুক্তিকে অস্বীকারও করা যাবেনা। কারণ আমরা অর্থাৎ সামাজিক মানুষ ও নাগরিক আগেই এর পূর্ববর্তী স্তর দেহের ওপরে মৃত্যূদণ্ড কায়েম করার নৈতিক, আইনী ও সাংবিধানিক অধিকার মেনে নিয়েছি। সাধারণভাবে সামাজিক মান্যতা পেয়েছে রাষ্ট্রের operating techniques, রাষ্ট্র উৎপাদিত জ্ঞান বা logos। এখানে উল্লেখ করার যোগ্য যে JAMA-র মতো চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক জার্নালে ডাক্তারদের মধ্যে সার্ভে করে “Physicians’ Attitudes About Involvement in Lethal Injection for Capital Punishment” শিরোনামে একটি লেখায় সিদ্ধান্ত হিসেবে জানান হচ্ছে – Despite medical society policies, the majority of physicians surveyed approved of most disallowed actions involving capital punishment, indicating that they believed it is acceptable in some circumstances for physicians to kill individuals against their wishes. এখানে সমাজের স্বর এবং চিকিৎসকের স্বর মিশে যায়, মিলে যায়।
আমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করবো যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন করে সামনে এলো – (১) অ্যানাস্থেটিক এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত ওষুধ যখন মৃত্যু ঘটানোর কাজে ব্যবহার করা হয় তখন চিকিৎসক তথা অ্যানেস্থেটিস্টের উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়, (২) মেডিসিনের জ্ঞান – প্রধানত অ্যানাটমি, ফিজিওলজি এবং বায়োকেমিস্ট্রি – অভ্রান্তভাবে মিশে গেল রাষ্ট্রের হত্যাকাণ্ডের সাথে, (৩) একজন ব্যক্তি – নাগরিক, বন্দী কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আসামী যেই হোকনা কেন – তার ত্বকের সাহায্যে, ত্বকের নীচে মাংশপেশি দিয়ে, শরীরের অঙ্গসংস্থানের মাঝে এ যন্ত্রণা অনুভব করে।
আমরা এবার ত্বকের অ্যনাটমিক্যাল গুরুত্বের হদিশ পেলাম – দেহের আভ্যন্তরীন space বা অঞ্চল (corporal space) থেকে পৃথক করছে প্রতিটি আলাদা এবং একক ব্যক্তির মধ্যবর্তী অঞ্চল তথা non-corporal space তথা মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অঞ্চলকে। ১৯শ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া ও বিকশিত হওয়া medical policing (মেডিক্যাল পুলিশিগিরি) এবং স্যানিটারি সায়ান্সের প্রধান মনোযোগের স্থান হয়ে দাঁড়ালো corporal space এবং non-corporal space-এর মধ্যস্থিত এই ভৌগোলিক অঞ্চলটি। তাহলে একদিকে রইলো দেহের অ্যানাটমিক্যাল স্পেস যার বাইরের সচ্ছিদ্র (porous) আবরণ হল ত্বক; অন্যদিকে রইলো একটি non-corporal (অদেহী কিংবা দেহ-অতিরিক্ত) ধারণার স্থান বা স্পেস। এই দুটি স্পেসের মধ্যে নিরন্তর বস্তুসামগ্রীর যাতায়াত একধরণের নতুন অ্যানাটমিক্যাল চেহারা ধীরে ধীরে খোদাই করে তুললো। শাস্তিদান, মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদিকে অতিক্রম করে এক নতুন স্পেস নিরন্তর তৈরি হয়ে চলেছে অ্যানাটমিক্যাল জ্ঞানকে ব্যবহার করে পুঁজি, বাণিজ্য, মুনাফা, রাষ্ট্র এবং social psyche তথা সামাজিক মানসিকতা নির্মাণের কাজে। এই স্পেসটিই স্যানিটারি সায়ান্সে একদা ব্যবহৃত এবং চর্চিত non-corporal তথা দেহপতিরিক্ত স্পেস। এবং এই স্পেসটি এক অর্থে এবং বাস্তবত ভৌগোলিকও বটে।
এসবের সম্মিলিত ফলে দেহের একটি বিশেষ ধারণা ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকলো। সে ধারণা সচ্ছিদ্র দেহের ধারণা, “porous body”-র ধারণা। আমাদের ত্বক অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র নিয়ে তৈরি, আমাদের পায়ুদ্বার/যোনিদ্বার/মূত্রদ্বার, মুখ ইত্যাদি সবগুলোইতো প্রতিমুহূর্তে non-corporal ভৌগোলিক স্পেস-এর সাথে বিনিময় করে চলেছে। দেহের আভ্যন্তরীন অ্যানাটমি যেন উপরিতলে রয়েছে এরকম এক নতুন বোধ আপাতভাবে প্রতিভাত হতে লাগলো। এই porous বা সচ্ছিদ্র দেহ আবার নতুন সজ্জায় plastic বা নমনীয় দেহও বটে। নমনীয় দেহের ওপরে পণ্য, বিজ্ঞাপণ এবং বাজারের বিপুল চাপ জন্ম নেয় দেহকে ঘিরে। এবং দেহকে কেন্দ্র করে এক নতুন চরিত্রের identity বা আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে। স্যানিটারি সায়ান্সের ইতিহাস অতিক্রম করে দেহের বহিস্থঃ ভৌগলিক অঞ্চল গঠিত হতে শুরু করলো পণ্যসংস্কৃতির স্রোতে – এর চাহিদা, বৌদ্ধিক প্রভাব এবং আকাঙ্খা দিয়ে। আবার এই আকাঙ্খা বা desire-এর মাঝে সদা সক্রিয় হয়ে থাকে lack বা “অনুপস্থিত”-এর বোধ – আমার মালিকানায় অমুক পণ্যের সজ্জাটি বা বস্তুটি নেই।
যদি সমস্ত স্তরের এবং অবস্থানের মানুষের মাঝে পণ্যবাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসিকভাবে সে একজন কেবলই “ক্রেতা” বা “ভোক্তা” এরকম বোধ তৈরি করে ফেলা যায় তাহলে পণ্য দুনিয়ায় দেহের বোধের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ এমন একটি বোধকে সহজেই সঞ্চারিত করা সম্ভব যে জরাকে হারিয়ে দিয়ে চিরযৌবন লাভ করা হাতের নাগালের মধ্যে এবং সেটাও সম্ভব হবে anti-aging cream দিয়ে যা ত্বকে ব্যবহৃত হবে। সমস্ত পুরুষ দেহ হবে ডেভিডের মতো (সমসাময়িক পরিভাষায় 6-pack body) এবং সমস্ত নারী হবে ভেনাসের মতো। পণ্যদুনিয়ায় এসে সাবেকী অ্যানাটমির জ্ঞান এক নতুন চেহারা ও গঠন নিল, নতুন ব্যঞ্জনায় নির্মিত হল।
(মাইকেলেঞ্জেলোর নিজস্ব ডেভিড)
(আধুনিক ডেভিডের হাতে কালাশনিকভ)
(মিকেলেঞ্জেলোর আদি ভেনাস)
(ভেনাসের আধুনিক রূপ – বিজ্ঞাপনে যৌনতার প্রতীক)
(পণ্য দুনিয়ায় আমাদের সোশ্যাল সাইকি নির্মাণের আধুনিক ভেনাসের বিভিন্ন পরিবর্তিত/রূপান্তরিত চেহারা)
কার্যত, ফ্যাশনের সিস্টেম একটি মতাদর্শ হিসেবে কাজ করে। এখানে পছন্দগুলো অদৃশ্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন ধরুন একটি বিশেষ সময়ে সামাজিকভাবে পোষাক পরার বা বিশেষ ছাঁটে চুল ছাঁটার যে ঝোঁক, তাকে বলা যায় paradigmatic axis, যার অবস্থান লম্বরেখা বরাবর। আবার, উদাহরণ হিসেবে পোষাকের কথাই ধরে নিলে, একটি system of signification হিসেবে পোষাকের রঙ, ছাঁট, আকৃতি, স্টাইল ইত্যাদি সবকিছুই একে নিয়ন্ত্রণ করবে। ভাষাতত্ত্ব থেকে ধার করে নেওয়া আরেকটি অক্ষও কাজ করে যাকে বলা যায় syntagmatic axis, যার অবস্থান সমান্তরাল রেখা বরাবর। কোন পণ্যের use value বা ব্যবহার মূল্য ভোক্তার কাছে এক নতুন ধরনের exchange value বা বিনিময় মূল্য তৈরি করে (যেমনটা মার্ক্সীয় অর্থনীতি থেকে আমরা বুঝি)। আবার অন্যভাবে দেখলে পণ্যসম্ভারের মধ্য দিয়ে ভোক্তা সমাজ গ্রহণ করে “consumption of meaning”। এ স্তরটি হল একবার যদি সফলভাবে পণ্যের মাঝে নিহিত অর্থকে সামাজিক প্রবাহ বা circulation-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে অন্য পণ্যরাও একইভাবে “consumption of meaning” বাস্তব করে তুলতে পারবে। ফলে সুগম হবে, অনিবার্যভাবে, “consumption of goods”-এর পথ। আরেকটি বিজ্ঞাপনে চোখ রাখি।
এখানে মনোযোগ দেবার বিষয় হল, এই বিজ্ঞাপনটি (ঘটনাচক্রে ওপরের বিজ্ঞাপনে পূর্ণত অ্যনাটমিকাল চিত্রকল্পের ব্যবহার করা হয়েছে) বা অন্য সব বিজ্ঞাপন ব্যবহৃত পণ্যটি খুব নিখুঁতভাবে নিঃসারে একটি অর্থ নির্মাণ করে এবং ভোক্তা বা সামাজিক মানুষের সামগ্রিক সামাজিক চৈতন্যে অধিকতর অর্থ নিয়ে পৌঁছে যায় – surplus meaning বা উদ্বৃত্ত অর্থের জন্ম দেয়। উদ্বৃত্ত অর্থ ক্রমাগত তৈরি করে যেতে সফল হয় বলে পণ্য দুনিয়া সচল ও সক্রিয়ভাবে বেঁচে থাকে। যেমনটা এতক্ষণ দেখলাম আমরা যে একাজে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে কাজ করে প্রধানত অ্যানাটমি তথা মেডিসিনের জ্ঞান।
দেহের প্রতিটি অঞ্চল – মাথার উপরিতল থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত প্রতিটি অবস্থানে – একজন ব্যক্তির পছন্দ তৈরি হয়ে যায় কোন ধরনের স্টাইলকে সে বিশেষ কোন সময়ে সজ্জিত হবার কাজে ব্যবহার করবে।
সর্বোপরি ফলাফল? প্রথম স্তরের অ্যানাটমির জ্ঞানের বা “philosophical anatomy”-র ভিত্তিতে ছিল মনুষ্য দেহ সম্পর্কে স্বাভাবিক, বৌদ্ধিক, প্রশ্নদীপ্ত কৌতুহল। দ্বিতীয় স্তরের ক্ষেত্রে (medical anatomy) বৌদ্ধিক, প্রশ্নদীপ্ত কৌতুহলের সাথে যুক্ত হয়েছিল প্রাচীন শিক্ষার যাথার্থ্য বোঝা, রোগের নির্দিষ্ট ও সঠিক অস্তিত্ব যে মানুষের দেহের অঙ্গসংস্থানের মাঝেই আছে (organ localization of disease) বাইরের দেহোর্ধ কোন দৈব (divine) শক্তির মাঝে নেই এ ধারণাকে ঐতিহাসিকভাবে চিরকালের জন্য জ্ঞানের জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু তৃতীয় স্তরের জ্ঞান এতদিনের মেডিল্যাল শিক্ষায় অনুসৃত পদ্ধতির বিপরীতে যুক্ত হয়ে গেল নতুন চেহারার হাইপাররিয়াল বা বর্ধিত-করা বাস্তবের পণ্য দুনিয়ার সাথে যেখানে “the entire system of production generates a system of needs that are rationalized, homogenized, systematized and hierarchized”। তৃতীয় স্তরের অ্যানাটমির জ্ঞান দেহের এবং, পরিণতিতে পণ্যদুনিয়ায় দেহের রাজনীতির নতন অর্থের উৎপাদক হয়ে ওঠে। মানুষের শরীরের প্রতিটি surface anatomical part-কে ভাগ করা হয় ১০ বা ততোধিক sub-parts-এ এবং প্রতিটি অংশেরই use value রয়েছে। প্রতিটি অংশের জন্য রয়েছে একটি বিশেষ “ব্র্যান্ড” যা ঘোষিতভাবে (বিশ্বাসযোগ্যভাবেও) অবসন্ন, কুশ্রী, অগ্রহণীয় মুখাবয়বকে সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে এমন একটি প্রতীতি জনমানসে প্রোথিত করতে পারে। নতুন মেডিসিন ও দেহের পণ্যধারণা একদিকে সময়কে (time) লক্ষ্য করে কথা বলে, অন্যদিকে প্যাথলজিকে স্থানচ্যুত করে চলনশীল (movable/mobile) করে তোলে। দেহের প্যাথলজির বোধ আর দেহাভ্যন্তরে থাকেনা, দেহের উপরিতলে এবং ভৌগলিক স্পেসে যেন এর অবস্থান।
কয়েকটি ছবি আমার বক্তব্যকে আরেকটু স্পষ্ট করবে বলে। নীচের ছবিগুলোতে যে যে অংশগুলোকে দেখানো হয়েছে সবকটি অংশেরই ব্যবহার মূল্য বা use value রয়েছে। একটুখানি বিসদৃশ শোনানোর মতো বলা যায় তন্বী, আরো তন্বী দেহের ভেনাসের খোঁজে সবকিছু সমর্পন করার পরে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রকট হয়ে ওঠে Bulimia Nervosa-র মতো অসুখ যা, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেকসময়েই প্রাণঘাতী। দেহের রাজনীতির এ হল আরেক প্রকাশ।
(মুখের বিভিন্ন অংশ – ব্যবহার করা বিজ্ঞাপনের কাজে)
(পণ্য বিক্রির কোন বয়স নেই)
রাষ্ট্রের ও মেডিসিনের নিবিড় সহাবস্থানের ফলে দেহের রাজনীতির অনেকগুলো ডিসকোর্স আমাদের সামনে খুলে গেলো। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা ভেবে দেখবো। পণ্য দুনিয়া সামগ্রিকভাবে আমাদের যে সামাজিক মানসিকতা নির্মাণ করে তা ভীষণভাবে শুধু বর্তমান এবং তাৎক্ষণিকতা (presentness and immediacy) নির্ভর। এখানে অতীত বা ভবিষ্যৎ মননে বা চিন্তায় থাকেনা বললেই চলে। এ মানসিকতা থেকেই সামাজিক মানুষের বোধে ধীরে ধীরে জারিত হয় যে স্বাস্থ্যের যাবতীয় সমস্যার উৎস নিহিত আছে ডাক্তারদের কোন এক বিশেষ মুহূর্তের আচার-আচরণ আর রোগীর সাথে তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাঝে। এজন্য উপরিতলের চিন্তাসম্পন্ন (যারা আদৌ অতীত, ভবিষ্যৎ বা প্রেক্ষিত বোঝার ধার ধারেনা) জনতার হাতে ডাক্তাররা মার খায়। এমন একটা জনপিণ্ডই কর্পোরেট পুঁজি এবং রাষ্ট্রের কাম্য। তাহলে কেবল অপরিমেয় উদ্বায়ী এবং ভোক্তা মানুষ জন্ম নেবে। এবং যারা কোনভাবেই ভাবনাশীল মানুষ নয়, প্রধানত অনুকরণে সক্ষম।
এরকম পরিস্থিতিতে মেডিসিন-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অনেককিছুই আমাদের নতুনভাবে ভাবার সময় ও উপাদান এসেছে। আমরা আরেকটু প্রসারিত চেহারায় ভাবার চেষ্টা করি, চলুন!
































Excellent 🙏 🙏
Exceptionally well written