অরুণোদয়ের মৃত্যুর পর এটাই আমার এই সম্বন্ধে প্রথম এবং সম্ভবত শেষ পোস্ট।
আমি মুর্শিদাবাদে ছেলেবেলা কাটানো এক মানুষ। কোনও শহরে নয়। বেশ প্রত্যন্ত গ্রামে। থাকতাম অন্ত্যজদের পল্লীর গা লাগোয়া তথাকথিত বামুন পাড়ায়। দুপাশে তিয়োর পাড়া আর কুরোল পাড়া। আর একটু তফাতে মুসলমান পাড়া। আর বেশ কয়েক পা দূরে শ্যামসুন্দর মন্দির।
তো এপাড়ায় ওপাড়ায় বিশেষ করে গরীব পরিবারের কেউ মারা গেলে, আরও বিশেষ করে কম বয়সী খুব আদরের কেউ মারা গেলে, ডুকরে আর সুর করে কান্না আমি অনেক শুনেছি। দূর থেকে শুনলে মনে হত যেন গানই বা। ধর্ম নির্বিশেষে সেই শোক থেকে উদ্ভূত বিলাপ-সঙ্গীতে মিশে থাকত কত না স্মৃতি, আর আক্ষেপ।
অরুণোদয় মারা যাবার পর তার প্রিয়জনেরা (যারা হয় তো তথাকথিত অক্লেশে “অসামশালা” বলা বিদ্দ্বজ্জনদের মত নয়) উচ্চকিত শ্লোগানে আর গানে শেষ বিদায় জানিয়েছে। এই বিলাপ-সঙ্গীতে সেই বিদ্দ্বজ্জনদের বিরক্তি আর বিবমিষা জেগেছে। জাগতেই পারে। সেই বমন ছড়িয়ে পড়েছে স্বভাবতই।
তোমরা কী বোঝো এই চিৎকারের? এটা কোনও উল্লাস ছিল না। এটা ছিল প্রতিবাদ মেশানো হৃদয়ছেঁড়া আক্ষেপ-বার্তা। কীসের প্রতিবাদ? কেন আক্ষেপ? আদরের ছেলে অকালে অকারণে অবহেলায় চলে গেছে। সেই অকারণের আক্ষেপ, অবহেলার প্রতিবাদ।
সেই আক্ষেপ আর প্রতিবাদের সঙ্গে মিশেছিল পদাতিক কবির “বডি” দখল করে চটি ফটফটানো ঔদ্ধত্যের ছিটিয়ে দেওয়া অপমানের স্মৃতি। সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামের কবির দেহ দখল করে তখন ঘটানো সেই অপমানেরও বিরুদ্ধে এক সোচ্চার প্রতিবাদ মিশেছিল আমাদের এবারের কান্নায় আর চিৎকারে। আমাদের গানে। আমাদের স্মৃতিতে।
আপনাদের পরিচিত অতি এলিট ধূপের ধোঁয়া আর সাদা রজনীগন্ধার নিঃশব্দ শোক আমাদের জন্য নয়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আট নয় সেকেন্ডের মাথায় কারওর “হাসি”কে দাগিয়ে দিয়েছে কেউ কেউ। হাসি আর কান্নায় মুখের মাংসপেশিতে যে খুব কাছাকাছি একই ধরণের বিক্ষেপ হয় এই হাসি আবিষ্কার করা অতিচালাক মানুষগুলো গুলিয়ে দেয় সেই সত্যিটা। সেই জন্যেই তারা দেখে, জঙ্গল হাসছে, পাহাড় হাসছে। তারা দেখে চাকরি চুরি হল যাদের তারাও হাসছে। ক্রন্দনরত মানুষজনকে হাস্যময় দেখে ওরা।
এবং মূলত বাম-বিরোধী ছদ্ম “ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী” কেউ কেউ আছেন। তাদের বদমায়েশি এখানেই থামে না। তারা সরাসরি অন্য ধরণের আক্রমণ করে। নিভৃত কৌশলে।
প্রথমে বলে, “লাল পতাকা দেওয়া সমর্থন করি। অবশ্যই দেওয়া দরকার।”
এবং একই লেখার শেষের দিকে গিয়ে লেখে, হ্যাঁ, পুরোটাই দিচ্ছি, একটি শব্দও না বদলে, “মিডিয়া রোগ ভয়ঙ্কর।
মাথায় চশমা দিতে অভিনেত্রীদের দেখেছি।
আজকাল রাজনীতির লোকদের দেখি। কষ্ট হয়।
রূপালী পর্দার মানুষদের শুনেছি, গ্ল্যামার ধরে রাখতে মৃত ব্যক্তির বাড়ি গেলেও সাজগোজ করে যেতে হয়।
না হলে নাকি কেরিয়ারের ক্ষতি হয়। তবে ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর মেক আপ ছাড়া বহু অভিনেতা অভিনেত্রী দেখেছি। বিশেষ করে ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর পর। সাজগোজ ছাড়াও তো শোক হয়।
রাজনীতির ভালোলাগা মানুষরাও তাই যদি করেন। ভালো লাগবে।
একজনের শ্লোগান দেওয়া শুনেছিলাম, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফেসবুকে দেখে মুখটার নাম খুঁজতাম। অনেক খুঁজেছি। কী অসাধারণ শ্লোগান।
বছর দুয়েক খোঁজার পর সেই মুখটার নাম এখন জানি।
সেইজন্য কষ্ট পাচ্ছি। বেশি।
সময় ও পরিবেশ একটু যদি খেয়াল রাখেন।”
পাছে চিনতে ভুল হয়, সতর্ক ভাবে জেএনইউএর উল্লেখ নিশ্চয়ই চোখ এড়াবে না কারও।
শ্লেষ মাখানো ভাষায় “মাথায় চশমা” শব্দটার চতুর ব্যবহারে মুগ্ধ হলেন না আপনারা?
কার কথা বলেছে এই জীবন-রসিক(সর্ব অর্থেই, এর চরিত্রটি যারা চেনেন তাঁরা জানেন) মানুষটি?
আপনারা বুঝেছেন।
স্পষ্টতই তার কন্যার চেয়েও বয়সে ছোটো একজনকে কল্যাণ ব্যানার্জির ঢঙে নীচে নামানোর সময় নকল মুগ্ধতার ভান, হ্যাঁ তাও করা হয়েছে।
চশমা মাথায় দেওয়া আমার মেয়ের এই ভঙ্গি ভালো লাগেনি তার। কিন্তু এইটি তো আমার মেয়ের বহুদিনের চেনা চেহারা। সে কেন নিজের চেহারা পালটে এই পাল্টিবাজের মত বহুরূপী হতে যাবে? যেন সে কন্ট্রাক্ট নিয়েছে।
“সময় ও পরিবেশ”? অবশ্যই। রেড রোডে বিশেষ দিনে মাথায় ঘোমটা জড়িয়ে ভুল হিন্দি-উর্দুতে নাটকবাজি হয় যখন, “সময় ও পরিবেশ” মনে পড়ে না মহোদয়টির। সেই নাটকের বেলায় কখনও এই ভান-তৎপরের মনে পড়ে না, “মিডিয়া রোগ ভয়ঙ্কর”!
অতিসিলেক্টিভ এই ভানের হাফ লাইফ? আমি জানি না।
আমাদের চিৎকার, শ্লোগান আর গান শেষ হবে না। শোক আর প্রতিবাদের কোনও হাফলাইফ হয়?
★









