ডাক্তার ব্যাপারটায় বেশ একটা আলাদা ওজন আছে। দিন যত গড়ায়, যত রোগী দেখি, আমার মধ্যে একটা ডাক্তার ডাক্তার ভাব চলে আসে। কথাবার্তায়, চলাফেরায়, এমনকি চিন্তাভাবনাতেও।
না এসে উপায়ও নেই। খুপরিজীবী ডাক্তাররা কোনদিনই শান্তিতে থাকে না। এই মেঝ নেতার চামচে এসে চোখ রাঙিয়ে যাচ্ছে, এই দিব্যি সুস্থ সবল রোগী দুম করে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রোগীরা হামেশাই সুগার প্রেশারের ওষুধ বন্ধ করে চোখ, কিডনি ইত্যাদির বারোটা বাজিয়ে আসছেন।
আমি জানলা হীন খুপরিতে বসে বসে এইসব সামলাই। মানে সামলানোর চেষ্টা করি। সামলাতে সামলাতে মনের হাসি খুশি ভাব কেটে গিয়ে নিজের অজান্তেই ছদ্ম গাম্ভীর্যে আবৃত হই। সারাক্ষণ সিমপ্যাথেটিক নার্ভ উত্তেজিত হয়ে আমাকে ব্যস্ত করে রাখে।
সকালের দিকটা একটু গন্ডগোলের। বিশেষ করে যে রাতে রোগীরা দরজায় কড়া নাড়েন না। একঘুমে সকাল হয়।
আজ ছিল তেমনই একটি সকাল। রাত্রে বেহুশের মতো ঘুমিয়েছি। ভোর ৫:৩০ টায় উঠে ফুরফুরে মেজাজে চললাম গৌরের চেম্বারে।
গৌরের চেম্বারে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় বড় রাস্তা দিয়ে, চৌমাথা হয়ে যশোর রোড ধরে। বিকেলের দিক হলে, যখন আমি পুরোপুরি ডাক্তার হয়ে গেছি নিশ্চিত ভাবে তাই যেতাম। কারণ তখন সময়ের হেব্বি দাম। কিন্তু ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমি তখনো ডাক্তার নই। তাই ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যাওয়া মনস্থির করলাম।
ভোর বেলায় সাধারণত এই রাস্তা দিয়েই যাই। তখনো রাস্তায় লোকজন তেমন বেরোয় না। একটা আম বাগানের পাশ দিয়ে রাস্তা আছে। কিছুদিন আগেও ভোর বেলায় রাস্তার উপর আমের মুকুল ভেলভেটের মতো পড়ে থাকত।
বাইকের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক অদ্ভুত গন্ধ ছাড়াতো। এক রাতে কালবৈশাখীর পর দেখি সারা রাস্তায় আমের মুকুলের আস্তরণ পড়ে গেছে। সেদিন স্কুটারে পর্যন্ত গন্ধ হয়ে গেছিল। সারাদিন সেই গন্ধ ছিল।
তারপর আস্তে আস্তে আমের মুকুলের বদলে গুটি পড়ে থাকতে দেখতাম। এখন দেখি ছোট ছোট কাঁচা আম। বেলা বাড়লে, লোক চলাচল শুরু হলে এগুলো ভ্যানিশ হয়ে যাবে।
আজ যাচ্ছিলাম সাবধানে আমগুলো কাটিয়ে কাটিয়ে। কোনো একটা গাছে একটা কোকিল অনর্থক গলা ফাটাচ্ছে। আরো নানা রকম পাখি ডাকছে। আমি খুব বেশি পাখি চিনি না।
আমার ইলেকট্রিক বাইক। শব্দ হয় না বিশেষ। তাই বাইকে করে যাওয়ার সময়ও পাখির ডাক শুনতে পাই। বাতাসের শব্দ শুনতে পাই। ঝিঁ পোকার শব্দ শুনতে পাই।
একটা মোড় ঘুরেছি আম বাগানের পাশ দিয়ে, হঠাৎ দেখলাম দুদ্দাড় করে দুটি বাচ্চা ছেলে মেয়ে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে লুকালো। বেশ মজা লাগলো। নির্ঘাত আম কুড়াতে এসেছে। আমায় দেখে ভয়ে পালিয়েছে।
আমি বাইক থামালাম। লোকজন এসে আমাকে চমকে যায়। আমি ওদের একটু চমকে দিই।
ডেকে বললাম, এই বেরো।
ভয়ে ভয়ে ছেলে মেয়ে দুটি বেরিয়ে এলো। মাথা নিচু। বয়স তাদের ৯-১০। মেয়েটি একটু বড় ছেলেটির থেকে।
বললাম, কি করছিলি তোরা?
মেয়েটি জবাব দিল আম কুড়াচ্ছিলাম। আমরা কিন্তু রাস্তায় যা পড়ে আছে তাই কুড়াচ্ছিলাম। ভেতর থেকে নিই নি।
তাহলে পালালি কেন?
বড়রা দেখতে পেলে বকা দেয় অনেকে। বিশ্বাস করো কাকু, আমরা শুধু রাস্তা থেকেই আম নিয়েছি।
ছেলেটির পরনে শুধু হাফপ্যান্ট। সে দিদির কথায় ঘাড় নাড়ছে আর বলছে, হ্যাঁ হ্যাঁ, শুধু রাস্তার গুলো কুড়াইছি।
মেয়েটি বলল এই দেখেন সব ফেটে গেছে। এ আর বিক্রি হবে না। কেউ নেবে না।
বললাম, আমি দাঁড়াচ্ছি। রাস্তায় যে কটা আছে, তোরা টপাটপ কুড়িয়ে নিয়ে পালা।
দুজনে হাসিমুখে তাকালো। তারপর চার পাঁচটা আম কুড়িয়ে নিয়ে বলল, কাকু, তুমি কি করো গো?
আমি… আমি ম্যাজিক দেখাই… ম্যাজিশিয়ান… মানে বুঝিস- জাদুকর ।
দুজনের মুখ হাঁ হয়ে গেল। মেয়েটি বলল, তুমি একটা আম নাও। একটা ফাটেনি, এই খান নাও।
আমি বললাম, দিবি? তাহলে ফাটাই দে। ম্যাজিসিয়ান এর কাছে আস্ত ফাটা সব এক।
আম নিয়ে গন্ধ শুঁকলাম প্রাণ ভরে। এবার যেতে হবে। খুপরিতে ঢোকার সময় হয়ে এসেছে। আমটা গাড়ির ডিকিতে ঢোকালাম। এবার আস্তে আস্তে আমার পরিবর্তন হবে। ইংরেজিতে গালভরা একটা শব্দ আছে- মেটামরফোসিস। জাদুকরের থেকে খিটখিটে খুপরজীবী ডাক্তার হয়ে যাব।









