সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় ও নটরাজ মালাকার
৯ থেকে ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল পুষ্টি পক্ষ। শুধু তাই নয়, প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার পালিত হয় পুষ্টি দিবস। ক’জন এখবর রাখি? এটাও কি আমাদের জানা আছে যে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২৫–এ ভারত রয়েছে ১০২তম স্থানে। তার মানে দেশ এখন এক ‘গুরুতর’ বা ‘বিপজ্জনক’ ক্ষুধা পরিস্থিতির মুখে। পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও দেশের ১৭.২ কোটি মানুষ এখনও অপুষ্টির শিকার। আবার কী আশ্চর্য; বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম স্থূল জনসংখ্যাও ভারতেরই!
সুস্বাস্থ্যের জন্য দরকার যথাযথ পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য। পুষ্টিহীন খাবার অসুস্থতা ও রোগের অন্যতম কারণ, তাই পুষ্টি জনস্বাস্থ্যের মূল উপাদান। ব্যক্তিগতভাবে পুষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞান মানুষকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু বৃহত্তর খাদ্যব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া শুধুমাত্র জ্ঞান দিয়ে জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া যায়না। গবেষকরা যুক্তি দেন যে, জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার জরুরি।
ইতিহাস বলে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ খাদ্য ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছে। সপ্তদশ শতকে জানা যায়, লেবুর রসে স্কার্ভি প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে। এটি ছিল সহজ ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বিশ শতকের প্রথম দিকে ভিটামিন আবিষ্কারের মাধ্যমে পুষ্টিবিজ্ঞানে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তবে খাদ্য কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী রোগকে প্রভাবিত করে তা নিয়ে গবেষণার বেশিরভাগই হয়েছে গত তিন দশকে।
টমাস ম্যাককাউনের মতো গবেষক মৃত্যুহার হ্রাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদানকে লঘু করে দেখেন। তিনি মনে করেন প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে খাদ্যের যোগান বৃদ্ধি ও পুষ্টির সামগ্রিক উন্নতির ফলে। তবে বর্তমানে অপুষ্টির সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। আজ পুষ্টিহীনতার মূল কারণগুলোকে বোঝার জন্য বিশ্বজোড়া খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হয়। এই ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন। সবই মানুষের পুষ্টিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আগে মনে করা হত ধনী দেশের পুষ্টি সমস্যা স্থূলতা আর দরিদ্র দেশের ক্ষুধা। তবে মেরেডিথ টারশেন দেখিয়েছেন, এই দুই সমস্যাই পরস্পর-সম্পর্কিত, যার মূল কারণ বহুজাতিক খাদ্যশিল্প।
মানুষের ধারণা বড়লোকেরা বেশি খায়। তা কিন্তু নয়। সমস্যা হলো তারা যে খাবার খায় তা নিম্নমানের। বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো রাসায়নিক ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করে আর খাবার অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণ করে। মানুষের পুষ্টির কথা তারা ভাবে না। ফলে তৈরি হয় পুষ্টিহীন খাবার, যা স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, দরিদ্র দেশের সমস্যা পর্যাপ্ত খাবারের অভাব। ব্যবসার কারণে দরিদ্র দেশের উর্বর জমি বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য খাদ্যের যোগান কমে । তখন দরিদ্র দেশগুলো বাধ্য হয় আরও বেশি খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে। তবে এই আমদানি করা খাবারের দাম বেশি; গরীব মানুষ কিনতে পারেন না।
টারশেনের মতে, অনুন্নত দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও স্থূলতা দেখা যায়। তার কারণ তারা সস্তা ও কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে পেট ভরায়। আমাদের নুন-ভাত খেয়ে পেট ভরানোর গল্পটা ভেবে দেখুন! একইভাবে, উন্নত দেশেও অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশিরভাগ মানুষ খাবার কিনে খায়। আর গরীবরা সরকারি কর্মসূচি বা দাতব্য সংস্থার উপর নির্ভরশীল। পুরো মাস খাবার কিন্তু জোটে না। অন্যদিকে, নরওয়ে, সুইডেন, ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশ দেখিয়েছে যে কার্যকর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলে সবার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
“বেবিকিলারস” নামে পরিচিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো উন্নয়নশীল দেশে শিশুখাদ্য (ইনফ্যান্ট ফর্মুলা) বিক্রি করে। ১৯৭০-এর দশকে নেসলের এই কৌশল নিয়ে প্রথম উদ্বেগ দেখা দেয়। ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ এনজিও ওয়ার অন ওয়ান্ট “দ্য বেবি কিলার” নামের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। মাতৃদুগ্ধের বিকল্প হিসেবে কৌটোর দুধ বিক্রি করায় নেসলেকে বয়কট শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপে। এতো আন্দোলনের পরও কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বন্ধ হয়নি, ফলে বন্ধ হয়নি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি। অথচ বুকের দুধ খাওয়ানো, শৈশবের স্থূলতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্কুলে পুষ্টিকর খাবারের কর্মসূচি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে পুষ্টিকর খাবার পায়। এটা সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে। এদেশে ২০১৮ সালে চালু হওয়া ‘পোষণ অভিযান’-এর লক্ষ্য ছিল ভারত সরকারের অপুষ্টি-হ্রাস কর্মসূচিগুলিকে একত্রিত করা। পোষণ ২.০-এর জন্য ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ২১,৯৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও, রাজ্যভেদে ব্যয়ের হার অত্যন্ত অসম—কোথাও ৯০%-এর বেশি, আবার কোথাও ৫৫%-এরও কম।
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে গরীব বাবা-মা দামি শিশুখাদ্য কিনলেও আর্থিক কারণে সঠিক অনুপাতে মেশাতে পারে না। কম দুধে জল পড়ে বেশি, ফলে শিশুর পুষ্টিতে ফাঁক থেকে যায়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের পুষ্টি প্রতিবেদনে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতা, এই প্রথম কম ওজনের শিশুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ৫ বছরের কমবয়সী শিশুদের মধ্যে স্থূলতার বৃদ্ধি বিশেষ উদ্বেগের। কারণ এটি শিশুর বিকাশকে প্রভাবিত করে এবং সারা জীবনের জন্য স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে দেয়। এই প্রবণতা চললে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে স্থূলতার সমস্যা দেখা দেবে। খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলির চিপস, চিনিযুক্ত পানীয়, তাৎক্ষণিক নুডলস ও প্যাকেজজাত খাবারের প্রচার সমস্যা বাড়িয়ে চলেছে।
সেপ্টেম্বরে নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে পৃথিবীতে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি)কে প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতের অবস্থাও গুরুতর। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ-ইন্ডিয়ার ডায়াবেটিস-এর গবেষণা দেখাচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতার সমস্যা মারাত্মক। ভারতের মোট মৃত্যুর ৬৮% হয় অসংক্রামক রোগের কারণে। এর পিছনে ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করা হচ্ছে। এনএনএমবি ও এনএসএসও-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, অধিকাংশ ভারতীয় প্রাপ্তবয়স্ক দৈনিক ক্যালোরির ৬০–৭৫% পান কার্বোহাইড্রেট থেকে। প্রোটিন গ্রহণের মাত্রা মোটে ৯–১০%, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে। ফ্যাট খাওয়া হয় ১৪–২৩%, কিন্তু তার অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে মুবিন সৈয়দ তাঁর সাম্প্রতিক বই “হিলিং ফ্রম আওয়ার হিস্ট্রি”-তে দেখিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের দুর্ভিক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে আজ মেটাবলিক রোগের হার বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্য অতীতের দুর্ভিক্ষে বেঁচে থাকার জন্য উপকারী হলেও আজ রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে যাকে তিনি “ইভোলিউশনারি মিসম্যাচ” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে ক্ষুধা জিনে রাসায়নিক চিহ্ন রেখে যায়।
আজ অপুষ্টির দ্বিমুখী সংকট (ডাবল বার্ডেন অফ ম্যালনিউট্রিশন) উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে ব্যক্তি, পরিবার এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপুষ্টি এবং স্থূলত্ব একই সঙ্গে থাকে। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য খাদ্য অধিকার পুনর্গঠন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কার অপরিহার্য। শুধু তথাকথিত ‘হেলথ চেক-আপ’ বা শরীরচর্চা যথেষ্ট নয়।
লেখকদ্বয় যথাক্রমে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক এবং জনস্বাস্থ্য-গবেষক










