পশ্চিম বাঙলায় শতকরা কতো শতাংশ মানুষ ‘রেগুলার’ বেসিসে কাজ করে অর্থাৎ মাস গেলে মাইনে পায়? যারা আছেন তাদের মধ্য থেকে যদি আবার গৃহ সহায়ক/সহায়িকা, আয়া ও গাড়িচালকদের বাদ দেওয়া হয়, তাহলে হিসেবটা অতি মারাত্মক হবে। এর উপর রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিক সে অদক্ষ, অর্ধদক্ষ বা দক্ষ যাই হোক। সঠিক হিসেব আছে কিনা জানি না, কিন্তু এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই বাকি বিরাট সংখ্যক মানুষ যা সম্ভবতঃ overwhelming majority of the total working population, তারা প্রায় পুরোপুরিই নির্ভরশীল অনিয়মিত বা irregular কাজের উপর, সে অটো-টোটো চালক, আনাজ/ফল/মাছ-মাংস/টুকিটাকি জিনিস বিক্রেতা, ফেরিওয়ালা বা হকার যাই হোক। এদের মধ্যে ঠিক কতোজন সরকারি বা সাধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট জমি বা রাস্তা ব্যবহার না করে শুধুমাত্র আইনিভাবে নিজস্ব জমি ব্যবহার করেই অর্থোপার্জন বা জীবন নির্বাহের চেষ্টা করেন? শুধু হকার কেন টোটো অটো আনাজ-ফল বিক্রেতা প্রায় সকলেই তো নিজস্ব জমির বাইরে থেকেই তাদের অতি ছোটখাট ব্যবসা করেন যা কেবলমাত্র পেট ভরানোর জন্যও যথেষ্ট কিনা সন্দেহ! তাহলে তো তাদের সবাইকেই তুলে দিতে হয়!! একটা কথা খুব চালু আছে, ‘বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা যাবে না’। কথাটা নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু কী কী বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে? সবাইকে চাকরি দেওয়া হবে? কখনোই সম্ভব নয়। অন্য কোনো জায়গায় বসানো হবে? যেখানে বসানো হবে সে জমিটা কার হবে? সেটাও তো কোনো সাধারণের বা সরকারি জমিই হবে। আর সেই জায়গাটা যদি ব্যস্ত অঞ্চল বা পথচলতি রাস্তা থেকে দূরবর্তী স্থানে হয়, তাহলে সেখানে পসরা সাজানোর মানে থাকবে তো?
তাছাড়া, রাস্তা দখল কি শুধুমাত্র হকার বা বাস্তুহীন মানুষেরাই করেন? যত্রতত্র পার্কিং করা গাড়ির জন্য তো বহু রাস্তাই বদ্ধ হয়ে থাকে আংশিক ভাবে। সল্টলেক ও শহর কোলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তো বেশিরভাগ গাড়িই বোধহয় গ্যারেজে নয়, রাস্তায় থাকে। দুপাশে রেখে দেওয়া গাড়ির মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালানো আর ছুঁচে সুতো পড়ানো প্রায় সমার্থকই বলা যেতে পারে। সিকিমে এক সময়ে নিয়ম করা হয়েছিল, জানিনা এখনো আছে কিনা যে নতুন কোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করাতে গেলে গাড়ি রাখার জায়গা দেখাতে হবে। এখানে অবশ্য লোকে গ্যারেজ থাকলেও তা অন্য কাজে লাগায় বা গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে ঘটে সবিশেষ স্থান সঙ্কুলান। যথারীতি গাড়ি থাকে রাস্তায়, অবশ্যই দখল করে এবং যাতায়াতের পথ সঙ্কুচিত করেই। আবার শুধু গাড়ি নয়, বাড়িগুলির বিভিন্ন বর্দ্ধিত অংশও নানা ভাবে দখল করে রেখেছে সাধারণের ব্যবহৃত পথের একটা বড় অংশকে।
যদিও, এসব খুব একটা আলোচ্যসূচীতে আসার কথা নয়। কারণ, এক্ষেত্রে রাস্তা দখলকারীরা শুধু ধনবানই নন, যথেষ্ট ক্ষমতাবানও বটে!! তাই যত সহজে বা প্রায় অনায়াস ক্ষিপ্রতায় হকার উচ্ছেদ করা যায় তা কখনোই আশা করা যাবে না, এসব ক্ষেত্রে।
আসলে, কোনো সমস্যাই একমাত্রিক নয়। ‘দিন-আনি-দিন-খাই’ মানুষেরা কদিন আগেই স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলো এই ভেবে যে তাদের আর তোলা দিতে হবেনা। এই রাজ্যের আসমুদ্রহিমাচল সমস্ত অঞ্চল ছেয়ে গেলো গেরুয়া পতাকায়, প্রত্যাশা-ভয়-ভক্তি-উল্লাসের অদ্ভুত সমন্বয়ে।
আর আজ? তোলা নয়, তাদের একেবারে তুলেই দেওয়ার উপক্রম !!
অনেকের কাছে যা উপার্জনের বা বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, এক কথায় তা বাতিল হবার পথে..!! আশা ভরসার কী অসামান্য অদ্ভুত পরিণতি!!
একটা জিনিস পরিষ্কার করা উচিত সেটা হলো সুনির্দিষ্ট ভাবে হকার কাকে বলবো আর What’s the difference between hawker and shopkeeper.. হকার হলো মোবাইল ইউনিট, আর shopkeeper বা দোকানদার হলো স্থায়ী ইউনিট। হকারের কিন্তু স্থায়ী স্ট্রাকচার থাকার কথা নয়। বস্ততঃ, পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত শহরেই হকার আছে এবং ভালো ভাবেই আছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা দিনের শেষে পসরা গুছিয়ে চলে যায় সমস্ত কিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে। টুকিটাকি জিনিস, সস্তায় বা আয়ত্তের মধ্যে ভালো খাবার বা বিভিন্ন তুলনামূলক কম দামের art collection, পুরোনো বই, এ সব কিছুতে এই ‘হকার’দের ভূমিকা শুধু অসাধারণ নয় অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য। হকারি শুধু বিরাট সংখ্যক মানুষের জীবন জীবিকার একমাত্র উপায় তা নয়,আরো অনেক বিশাল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা ও প্রয়োজনের সঙ্গে ভীষণ ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনেক সময়েই তা যথেষ্ট অর্থ সাশ্রয়কারীও বটে সাধারণ মানুষের কাছে।
আসলে, কখনোই কোনো সমস্যার চটজলদি বা singletrack solution সম্ভব নয়। সমাধান বার করতে গেলে প্রশাসন ও সরকারকে বসতে হবে তাদের সঙ্গেই যাদের মাথার উপর ঝুলছে উচ্ছেদের নোটিশ..কথা বলতে হবে সরাসরি। অসুবিধাটা কোথায়, গণতন্ত্রে তো ‘বেসিক’ জিনিসই হলো ‘dialogue’, গ্রীক শব্দ dia(through) আর logos( discourse)এর স়ংমিশ্রণ। সরকার বা প্রশাসন অন্ততঃ, কথা তো বলুক হকারদের সঙ্গে। তাদের সমস্যা, সরকারের পরিকল্পনা, বাস্তব পটভূমিকা, এ সব কিছু নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা না করার কী আছে? এরা তো ঘুসপেটিয়াও নয়, দেশদ্রোহীও নয়, অন্ততঃ সেরকম কোনো অভিযোগ কেউই করেছেন বলে জানা নেই। তাহলে? সমস্যাটা কোথায়?
একটা কথা পরিষ্কার মাথায় রাখা ভালো। স্বাধীনতার পরে পরপর যে দলগুলি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, প্রত্যেকেই এসেছে প্রবল জনপ্রিয়তা নিয়ে, এবং রাজত্বও করেছে টানা বেশ কিছু বছর। কিন্তু, তাদের সকলেরই পতন শুরু হয়েছে যখন থেকে তারা মানুষের কথায় কর্ণপাত করা বন্ধ করে নিজেদের মতো করেই সব সিদ্ধান্তই নিতে লাগলো।
বস্তুতঃ, এটাকে অঙ্কের হিসাবে প্রায় স্বতঃসিদ্ধই বলা চলে, ব্যতিক্রমের বিন্দুমাত্র স্থান ব্যতিরেকেই।
যারাই শাসন করুক, এটা তাদের সকলের ক্ষেত্রেই statutory warning বা বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ……..
আর, সেটা মাথায় থাকলে সকলেরই মঙ্গল……..












