একটি রোগের এত নাম কেন। সেটায় আসব। সাধারণ মানুষ ম্যানিয়া বলতে বোঝে একটা মানুষ সবসময় একটিমাত্র চিন্তা করে যাচ্ছে, নোংরার বাতিকে খালি হাত পা ধুচ্ছে বা অল্পেতেই ঘাবড়ে গিয়ে কোনো রোগ হয়েছে ভেবে ডাক্তারের কাছে চলে যাচ্ছে, এগুলোকে। কিন্তু ডাক্তারি শাস্ত্রে ম্যানিয়া সম্পূর্ণ আলাদা একটা রোগ। এই রোগটিও ডিপ্রেসশানের মত একটি ‘মুড’ বা ‘মেজাজের’ রোগ। তাই আলোচনাটা প্রায় ডিপ্রেশনের সাথে সাথেই করা হয়। ডিপ্রেশানে যেমন অবসন্নতা বা মন খারাপ হচ্ছে মূল উপসর্গ এখানে ঠিক তার উলটো। মন অতি উৎফুল্ল থাকে। তাই একে উল্লাস রোগ বলে। আর এই এই উল্লাস রোগ সাধারণত একক ভাবে আসেনা তার আগে বা পরে ডিপ্রেশান আসে। তাই একে দ্বিমেরু বা বাইপোলার বলা হয়। ডাক্তারি পরিভাষায় ম্যানিয়া বা বাইপোলার ওয়ান রোগ। এই বাইপোলারের ‘ওয়ান’ থাকলে ‘টু’ কি আছে, সেটা নিয়ে আর একটু কথা পরে বলব।
উপসর্গঃ প্রধানতম উপসর্গ হচ্ছে অতি উৎফুল্ল মন। বিনা কারণে গান করে, চেঁচিয়ে কথা বলে। বাহ্যত এত আনন্দে থাকে সেই আনন্দ যেন অন্যকেও সংক্রামিত করে। যে জন্যে একে বলা হয় ‘ ইনফেকশাস মুড’। এরা নিজের মুডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খুব ঝলমলে জামাকাপড় পরে, পরিবেশ পরিস্থিতি মাথায় না রেখে অতিরিক্ত সাজগোজ করে যেগুলো সে আগে করত না। কথার পরিমাণ বেড়ে যায়। লোকজনের সংগে ডেকে ডেকে কথা বলে। কথা একটা প্রসংগে রাখতে পারেনা। দ্রুত প্রসংগান্তরে চলে যায়। চায় কাজ করতে কিন্তু একসাথে অনেকগুলো করতে গিয়ে কোনোটাই ঠিক করে করতে পারেনা। সবসময় উত্তেজিত থাকে। ছটফট করে, যেন এক জায়গায় স্থির হতে পারেনা। অনেক ক্ষেত্রেই নিজের সম্পর্কে ‘গ্রান্ডিওস ডেলিউশান’ বা ‘বাগাড়ম্বর ভ্রান্তি ‘ দেখা যায়। অর্থাৎ সে যা নয় নিজেকে সেরকম কিছু মনে হয়। কারোর মনে হয় তার বিশাল রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে, যখন তখন প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে পারে বা অনেকে নিজেকেই প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী ভাবেন। কেউ ভাবে তার কোটি কোটি টাকা আছে। অনেকে বিনা কারনে কেনাকাটা করে পয়সা নষ্ট করে। কেউ কেউ ব্যবসার নামে ভুল যায়গায় টাকা লগ্নি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদের ঘুম ভীষণ কমে যায় কিন্তু তার জন্যে ব্যক্তিগতভাবে কোনো ক্লান্তি অনুভব করেনা। অনেকে মদ গাঁজা বা সিগারেটে খাওয়া বাড়িয়ে দেয়। রোগের অতিরিক্ত তীব্রতায় কেউ কেউ যেন শৈশবে ফিরে যায়, মলমূত্র নিয়ে খেলা করে। পরবর্তী কালে এদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বিশেষ করে নানা কাজ বা ভুল ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে।
চিকিৎসাঃ এই রোগ একবার হলে অন্তত তিনমাস থাকে। আর শতকরা নব্বইভাগ ক্ষেত্রে তার রোগটি দ্বিতীয়বার ফিরে আসে। তাই চিকিৎসা সঠিকভাবে করা উচিৎ। মূলত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এক ধরণের ওষুধ আছে যাদের বলা হয় মুড স্টেবিলাইজার, যেমন লিথিয়াম, সোডিয়াম ভ্যালপ্রোয়েট, কারবামাজেপিন। আর আছে লোরাজেপাম বা ক্লোন্যাজেপামের মত বেনজোডায়াজেপিন। এছাড়া আছে বিভিন্ন উত্তেজনা নাশি অ্যান্টিসাইকোটিক্স, যেমন ওল্যানজাপিন, হ্যালোপেরিডল, এরিপিপ্রাজল ইত্যাদি।
আরো কয়েকটি কথাঃ
হাইপোম্যানিয়া: হাইপোম্যানিয়া হচ্ছে উল্লাস রোগেরই একটু নরম রূপ। উপসর্গ প্রায় এক। একটু কম মত্রায় কমসময়ের জন্যে হলে এই ডায়াগনসিস হয়। সাধারণত অন্তত তিনটি উপসর্গ অন্তত সাত দিন ধরে চললে ম্যানিয়া বলা হয় আর যদি ওই উপসর্গ অন্তত চারদিন থাকে তবে হাইপোম্যানিয়া বলা হয়।
বাইপোলার টু: এতক্ষণ যে ম্যানিয়ার কথা বলা হোল সেটাই হচ্ছে বাইপোলার ওয়ান। আর বাইপোলার টু বলা হবে যদি হাইপোম্যানিয়া এবং কিছু ডিপ্রেশানের উপসর্গ একসাথে মেশান থাকে তবে বলা হয় বাইপোলার টু। এটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এদের আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি।










