যে কোন মহানগরী সেটি যদি জনবহুল হয়, একাধারে বাণিজ্য কেন্দ্র হয়, পর্যটক বিদেশি রা আসেন সেখানে হকার নামক ভ্রাম্যমাণ ছোট ব্যবসায়ীরা থাকবেনই। লন্ডন, প্যারিস, রোম থেকে সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক, কুয়ালুলামপুর একই চিত্র। বিশ্বজুড়ে আর্থিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতি দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, উপনিবেশ থেকে অভিবাসন (Reverse Colonization) এগুলি বিষয়টিকে বাড়িয়ে তোলে। সারা পৃথিবীতে আপনারা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের হকার, ক্যাব ড্রাইভার, হোটেল ও দোকান কর্মচারী ইত্যাদি দেখতে পাবেন। বলকান, পূর্ব ইউরোপ, ইউক্রেন, উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি অশান্ত হয়ে ওঠায় সেখানকার প্রচুর উদ্বাস্তু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় চলে এসেছেন। লাতিন আমেরিকার অনেক অশান্ত রাষ্ট্র থেকে তারা চলে এসেছেন উত্তর আমেরিকায় এবং সস্তা শ্রমিক হিসাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। এদের একটি অংশ স্ট্রিট ভেন্ডর বা হকার।আবার উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে আর্থিক সংকট বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে সামাজিকভাবে অভিবাসী বিরোধী আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় দমন পীড়ন চলছে। তথাপি ধনী দেশ, পরিকল্পিত নগরী, কম জনসংখ্যা, আইনের শাসন ইত্যাদি থাকায় এই উন্নত দেশগুলি হকার সহ অভিবাসী সমস্যা অনেকটাই সমাধান করে ফেলেছেন।
সেখানে বাণিজ্যিক ও ট্যুরিস্ট এলাকার একটি নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে হকার দের বসতে দেওয়া হয়। স্থায়ী কাঠামো করতে দেওয়া হয়না। কর্পোরেশন ও মিউনিসিপালিটি থেকে অনুমতি নিতে ও লাইসেন্স করতে হয়। স্ট্রিট ফুডের ক্ষেত্রে ফুড হাইজিন বজায় রাখতে হয়। সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হয়। পুর নিগম লক্ষ্য রাখে ও বর্জ্য অপসারণ করে।
ভারতের মত দরিদ্র দেশে তারমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মত দরিদ্র, জনবহুল ও পশ্চাৎপদ রাজ্যে এমনটার সুযোগ নেই। আবার পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে এমন একটি রাজ্য যেখানে দেশ ভাগ হয়েছে কিন্তু পাঞ্জাবের মত জন বিনিময় হয় নি। পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু উদ্বাস্তু রা দলে দলে এসেছেন এবং এসেই চলেছেন। তার সঙ্গে দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মুসলমান জনসমাজও নিয়ত চলে আসছেন। এছাড়াও কাজের আশায় উত্তর প্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, অসম, নেপাল প্রভৃতি জায়গা থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ চলে এসেছেন। অথচ নানা কারণে বিগত প্রায় ৮০ বছরে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক ও অন্যান্য অবনতি ঘটে গেছে। শিল্পে সঙ্কট, পুঁজির স্থানান্তর, মাশুল সমীকরণ নীতি, কেন্দ্রের বৈষম্য, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য, কর্মসংস্কৃতির অভাব ইত্যাদি কারণে এখানে বেকারত্ব বেড়েছে। তার সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ফলে হকারের সংখ্যাও লাফিয়ে বেড়েছে। কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূল কোন সরকারিই আন্তরিক ভাবে এটির প্রতি দৃষ্টি দেননি। হাইকোর্টের নির্দেশিকা মানেন নি। স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে হকার ও অন্যদের রাস্তা ও ফুটপাথ দখল বেড়েই গেছে। সামাল দিতে অপারেশন সান সাইনের মত দমন মূলক পদ্ধতি নিতে ও অচিরেই বন্ধ করতে হয়েছে। সেখানেও দ্বি জাতি তত্ত্ব। গড়িয়াহাট ও হাতিবাগানের বাঙালি উদ্ভাস্তু হকারদের তুলে দেওয়া হয়েছে, অথচ ভোট ব্যাঙ্ক ধর্মতলা, চাঁদনি, বড় বাজারের অবাঙালি মুসলমান হকারদের তোলা হয়নি।
একটি শহরে ন্যূনতম ৩০% রাস্তা, ১৫% ফুটপাথ ও ১৫% সাইকেল ইত্যাদির পথ থাকা উচিত। কলকাতার রাস্তার পরিমাণ ৬% তার আবার একাংশ দখলীকৃত। ফুটপাথের ৮০% এর বেশি দখলীকৃত। হকারের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ৭, হকার রয়েছে ১৮৭০ জায়গায়। এক কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৩ লক্ষ হকার। প্রায় ৩%।
বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে একদিকে যেমন এই বিপুল সংখ্যক দরিদ্র হকার উচ্ছেদ অমানবিক ও অবাস্তব। অন্যদিকে রাজপথ যানবাহনের এবং ফুটপাথ পথচারীর জন্য। হাওড়া শিয়ালদা সহ স্টেশনগুলি, ধর্মতলা সহ বাস গুমটি ও বাস ষ্ট্যান্ড গুলি, বাজার ফুটপাথ রাস্তা গুলি আমরা দখলীকৃত, নোংরা ও জঞ্জাল এর স্তুপে পরিণত এবং সমগ্র কলকাতা – হাওড়া কে কদর্য বাজার, প্রস্রাবাগার, ডাস্টবিন ও ভাগার করে রাখতে পারিনা। জনগণকে বাধামুক্ত স্বাভাবিক চলাফেরা ও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারিনা। তাই সমস্যা সমাধানে একমাত্রিক সংকীর্ণ চিন্তা নয় সামগ্রিক (Holistic) ভাবনা ও অনুশীলনের প্রয়োজন।










