শুরুর কথা
আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বর্তমান সময়ে কিছু শোরগোল তৈরি হয়েছে। এর সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক চরিত্র ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু আয়ুর্বেদে বেশ কিছু কৌতুহূলোদ্দীপক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় যা আমাদের প্রচলিত এবং এতদিন ধরে মান্য ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আয়ুর্বেদ ছাড়াও এমনকি রামায়ণেও রাম এবং তাঁর ভ্রাতার মাংসভক্ষণের ক্ষেত্রে কয়েকটি নমুনা দেখে নেওয়া যেতে পারে। রামের বনবাসকালে, রাজশেখর বসুর অনুবাদে আমরা জানতে পারছি, “রাম-লক্ষ্মণ বরাহ, ঋষ্য পৃষত ও মহারুরু এই চার প্রকার পশু বধ করে তাদের পবিত্র মাংস নিয়ে ক্ষুধিত হয়ে সায়ংকালে বাসের নিমিত্ত বনে প্রবেশ করলেন।”[1]
পরবর্তীতে ভরদ্বাজের আতিথ্যগ্রহণকালে খাদ্যের এরকম বর্ণনা আছে – “স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে শুভ্র অন্ন, ফলরসের সহিত পক্ক সুগন্ধ সূপ, উত্তম ব্যঞ্জন এবং ছাগ ও বরাহের মাংস, স্থালীতে পক্ক উত্তপ্ত মৃগ ও ময়ূরের মাংস…।”[2]
ঋগবেদ-এ কোন কোন ক্ষেত্রে গো, ষাঁড় এবং ঘোড়ার মাংস ভক্ষণের উদাহরণ পাওয়া যায়।[3] কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির সামগ্রিক আধিপত্যের সময়ে এই ধারা অবদমিত হয় এবং ভিন্ন ধরনের খাদ্যবিধি, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের ক্ষেত্রে, আরোপিত হয়। Norbert Elias তাঁর বিখ্যাত পুস্তকে দেখিয়েছেন, কীভাবে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন “সিভিলাইজিং প্রোসেস”-এর সাথে যুক্ত হয়েছিল – অনেক শতাব্দির সময় কাল জুড়ে।[4]
এরকম এক প্রেক্ষিতে আমরা আয়ুর্বেদের বিশেষ কিছু অংশের পর্যালোচনা করতে পারি।
মূল আয়ুর্বেদের কথা
শারীরস্থানের ২য় অধ্যায়ের শিরোনাম “শুক্রশোণিতশুদ্ধিশারীর” অধ্যায়।
মিউলেনবেল্ড তাঁর নিজস্ব ধরনে সংক্ষেপে মূল অধ্যায়টির আলোচ্য বিষয় জানিয়েছেন – “নিবেদিত হয়েছে পুরুষ এবং নারীর শুক্র এবং শোণিত-এর (প্রজননকালীন তরল) শুদ্ধি নিয়ে এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে (যেমন গর্ভধারণ, ভ্রুণের বিকাশ ইত্যাদি)।”[5]
অধ্যায়ের শুরুতেই বিভিন্ন ধরনের রেত তথা শুক্রের বর্ণনা করা হয়েছে –
“বাত-পিত্ত-শ্লেষ্ম-কুণপ গ্রন্থিপূতিপূয়ক্ষীণমূত্রপুরীষরেতসঃ প্রজোৎপাদনে ন সমর্থা ভবতি” (২.৩)
বাংলায় – “বাত, পিত্ত ও শ্লেষ্মার প্রকোপ এবং কুণপ (মৃতদেহের গন্ধ), গ্রন্থি (a knot, bunch, protuberance in general[6]), পূতি-পূষবর্ণ, ক্ষীণতা ও মূত্র-পুরীষগন্ধ, এই সমস্ত দোষে শুক্র দূষিত হলে পুরুষ পুত্র উৎপাদনে সমর্থ হয় না (প্রজোৎপাদনে ন সমর্থা ভবতি)।”
আবার মিউলেনবেল্ডের শরণ নিই অল্প কথায় সমগ্র বিষয় প্রকাশ করার জন্য – “যখন রক্ত দ্বারা দূষিত হলে শুক্রের গন্ধ পচনশীল মৃতদেহের মতো হয় (কুণিপগন্ধিন) এবং এটি পরিমাণে প্রচুর হয়; বাত-দ্বারা দূষিত হলে শুক্র রক্তের ডেলার মতো (গ্রন্থিভূত) হয়; পিত্ত এবং কফ দ্বারা দূষিত হলে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজের মতো (পূতিপূয়নিভ) হয়; পিত্ত এবং বাত দ্বারা দূষিত হলে স্বল্প পরিমাণ (ক্ষীণ) হয় এবং যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হল সেগুলো দেখা যায়… (২.৪)”[7]
শুক্রের এসমস্ত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কুণপ-শুক্র, গ্রন্থি-শুক্র, পূতিপূয়-শুক্র ও ক্ষীণশুক্র কষ্টসাধ্য (কষ্টের সঙ্গে নিরাময়যোগ্য)। মূত্র-পুরীষ-গন্ধি শুক্র অসাধ্য (নিরাময়ের অসাধ্য). অন্যপ্রকার দূষিত শুক্র সাধ্য (নিরাময়যোগ্য)।
নারীদের আর্তব-এর (মাসিক স্রাব) শুক্রের মতো একইরকম দোষযুক্ত হয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাধ্য, কষ্টসাধ্য এবং অসাধ্য এই ৩ ভাগে বিভক্ত। (২.৫)
এখানে লক্ষ্য করলে দেখব, আর্তব শব্দটির ইংরেজি পরিভাষা হিসেবে কখনো menstrual discharge, কখনো mentstrual blood, আবার কখনো procrational substance ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রেক্ষিত-সাপেক্ষে এর অর্থান্তর ঘটছে, যেমনটা আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত বিপুলসংঝ্যক অথবা প্রায় সমস্ত শব্দের ক্ষেত্রেই আমরা বারংবার দেখছি।
আমাদের নজরে থাকবে বাংলায় অনুবাদের এই অংশগুলো –
“ঋতুকালে স্ত্রী দিবানিদ্রা-রত হলে তার সন্তান নিদ্রাশীল হয়। অঞ্জন (চোখের কাজল) ধারণ করলে সন্তান অন্ধ হয়। রোদন করলে বিকৃতদৃষ্টি হয়। স্নান ও অনুলেপন (দেহের ওপরে সুগন্ধি লেই কিংবা ভেষজ প্রস্তুতি প্রয়োগ করা) করলে দুঃশীল (কুস্বভাব) হয়, তৈলাভ্যঙ্গ (তেল দিয়ে অঙ্গমর্দন) করলে কুষ্ঠ হয়। নখ কাটলে কুনখী হয়। ধাবন করলে (দৌড়লে) চঞ্চল হয়। হাসলে সন্তানের দন্ত, ওষ্ঠ, তালু ও জিহ্বা শ্যামবর্ণ হয়। বেশি কথা বললে সন্তান বহুভাষী (বাচাল) হয়। অতিশব্দ শ্রবণ করলে সন্তান বধির হয়। অবলেখন (চুল আঁচড়ানো) করলে সন্তানের মাথায় টাক হয় এবং বায়ুসেবন ও কষ্টকর পরিশ্রম করলে সন্তান উন্মত্ত হয়। এজন্য এসব পরিহার করতে হয়।” (২.২৪)
ঋতুমতী নারী তিন রাত্রি ভর্তৃসমাগম (সহবাস) করবে না। “ঋতুস্নানের পরে নারী যাকেই প্রথম দর্শন করবে, সন্তান তার মতো হবে। এজন্য ভর্তার মুখই প্রথম দর্শন করতে হয় … পুরুষ পুত্র লাভ করতে হলে একমাস ব্রহ্মচারী থেকে রাত্রিতে ঋতুস্নাতা নারীতে গমন করবে। গমন করার আগে সর্পিঃ (ঘি) পান করে স্নিগ্ধ হবে এবং সর্পি দুধের সাথে শাল্যান্ন ভোজন করবে।” (২.২৫-২৬)
গর্ভস্থ সন্তান পুরুষ না নারী হবে সে বিষয়ে সুশ্রুত জোড় এবং বিজোড় সংখ্যক দিনের কথা উল্লেখ করেছেন – “পুত্র ইচ্ছা করলে ঋতুস্নানের চতুর্থ, ষষ্ঠ, অষ্টম, দশম বা দ্বাদশ দিনে স্ত্রীগমন করবে। সেসময়ে স্ত্রীগমন করলে আয়ু, আরোগ্য এবং পুত্রের সৌভাগ্য, ঐশর্য্য ও বল হয়ে থাকে।” (২.২৮-২৯)
“স্ত্রীকামী ব্যক্তি পঞ্চম, সপ্তম, নবম ও একাদশ দিবসেও স্ত্রীগমন করতে পারে। ত্রয়োদশ প্রভৃতি দিনে স্ত্রীগমন সঠিক নয়, নিন্দনীয়।” (২.৩০)
কীভাবে বর্তমান পরিভাষায় শুক্রাণু ও ডিম্বানু পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে যায়, সে বিষয়টি সুশ্রুত এভাবে বলছেন – “যেমন ঘৃতপিণ্ড অগ্নিকে আশ্রয় করলে গলে যায়, সেভাবে নারীর আর্ত্তব (এখানে procrational substance[8] অর্থে) পুরুষসমাগমে গলে গিয়ে বিসর্পিত (স্থানচ্যুত) হয় এবং শুক্রের সাথে মিলিত হয়ে থাকে।” (২.৩৬) আবার “সেই শুক্র বায়ুকর্তৃক দ্বিধা বিভক্ত হলে, মাতৃজঠরে অবতীর্ণ দুই জীব তাতে আশ্রয় করে থাকেস এবং এতেই যমজ সন্তান হয়। যমজেরা অধর্মকে সম্মুখীন করেই অবতীর্ণ হয়।” (২.৩৭)
“মাতা পিতার অল্পশুক্রতার কারণে আসেক্য[9] (শিথিলশিশ্ন – এক ধরনের নপুংসক অথবা ক্লীব মানুষ[10]) নামক পুরুষ তৈরি হয়। সেই পুরুষ শুক্র পান করলে ধ্বজোচ্ছ্রায় প্রাপ্ত হয় (পুরুষাঙ্গ খাড়া হয়)।” (২.৩৮)
এরপরে বলা হয়েছে – “যে সন্তান পূতিযোনিতে জন্মগ্রহণ করে, তাকে সৌগন্ধিক বলে। সে যোনি ও শেফের (পুরুষ জননাঙ্গ, বিশেষ করে শিশ্ন) গন্ধ পেলে বল লাভ করে অর্থাৎ শিথিলশিশ্ন দৃঢ় হয়, এ ধরনের নপুংসককে নাসাযোণি বলে।” (২.৩৯)
পরবর্তী শ্লোকে বলা হয়েছে – “আসেক্য, সৌগন্ধিক, কুম্ভীক ও ঈর্ষক, এই চারটি বিভাগের পুরুষ স-রেতাঃ (শুক্র থাকে) হয়ে থাকে। আর ষণ্ড নামক পুরুষ অশুক্র হয়।” (২.৪৪)
এরপরে যৌন সংসর্গের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে – একজন চিকিৎসকের চোখ দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্পৃহভাবে। “যে অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি স্ত্রীদের পায়ুতে পুরুষভাবে প্রবৃত্ত হয় তাকে কুম্ভীক বলে। যে ব্যক্তি অন্যদের ব্যবায় (যৌন সংসর্গ) দেখে ব্যবায়ে (যৌন সঙ্গমে) প্রবৃত্ত হয় তাকে ঈর্ষক বলে।
ঋতু হবার পরে যে পুরুষ ভার্য্যাতে মোহবশতঃ উত্তানভাবে শয়নপূর্বক গমন করে, তার সেই কর্ম থেকে স্ত্রীলোকের মতো আকারপ্রকারবিশিষ্ট ষণ্ড নামক সন্তান উৎপন্ন হয় – “যখন একজন পুরুষ নারীর অবস্থান গ্রহণ করে তার স্ত্রীর ঋতুস্রাবের সময়ে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়, তার ফলে এক ষণ্ডক জন্ম নিতে পারে। ষণ্ডক দেখতে এবং আচরণে নারীদের মতো”। যে অঙ্গনা পুরুষকে উত্তানভাবে স্থিত করে ব্যবায় (আগেই বলা হয়েছে যৌন সঙ্গমেচ্ছা) করে, তার সেই ব্যবায়ে কন্যা জন্ম নিলে সে কন্যার কার্যকলাপসমূহ (চেষ্টিত) পুরুষের মতো হয় (২.৩৮-৪৩)।
সংস্কৃত শ্লোকটি হল –
কতৌ পুরুষবদ্বাপি প্রবর্ত্তেতাঙ্গনে যদি।
তত্র কন্যা যদি ভবেৎ সা ভবেন্নরচেষ্টিতা।। (২.৪৩)”[11]
এখানে একটি উলেখযোগ্য শ্লোক আছে lesbian তথা সমকামী নারীদের বিষয়ে – “নারীদ্বয় রমণে ইচ্ছুক হয়ে যদি পরস্পর গমন করে এবং পরস্পর যদি শুক্রমোচন করে, তাহলে অস্থিহীন সন্তান উৎপন্ন হয়।” (২.৪৭)
পরের শ্লোকে বলা হয়েছে – “যে ঋতুস্নাতা নারী স্বপ্নে মৈথুন করে বায়ু তার আর্তব গ্রহণ করে কুক্ষিতে (গর্ভ) গর্ভ উৎপাদন করে। সেই গর্ভিণীর গর্ভলক্ষণ মাসে মাসে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু কলল (গর্ভধারণের অল্প পরে ভ্রুণের আকৃতি – জেলির মতো অথবা অর্ধ-কঠিন পিণ্ড, যা থুতুর মতো) পৈতৃকগুণ বিবর্জিত হয় (কললং জায়তে তস্যা বর্জিতং পৈতৃকৈর্গুণৈ)।” (২.৪৮)[12] এরপরে বলা হয়েছে – “অঙ্গবিহীন শিশুর জন্ম, দেখতে সাপ, কাঁকড়াবিছা অথবা লাউয়ের মতো হলে ধরে নিতে হবে খারাপ ক্রিয়ার (জ্ঞেয়াঃ পাপকৃতা) ফল হিসেবে হয়েছে (২.৫০)।”[13]
এই অধ্যায়ের শেষে কর্মফল এবং পূর্বজন্মের কথা বলা হয়েছে – “জীব যে কর্ম দ্বারা পৃথিবীতে আসে, পুনর্জন্মে তারই ফলাফল পায়। পুর্বজন্মে যেসব গুণ তাহার অভ্যস্ত থাকে, এ জন্মেও সেসব গুণ প্রাপ্ত হয়।” (২.৫৮)
সুশ্রুত সংহিতা-র শারীরস্থানে ৩য় অধ্যায়ের শিরোনাম “গর্ভাবক্রান্তি” – “নিবেদিত হয়েহে গর্ভধারণ, শিশুর বিকাশ এবং কিছু সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে।”[14]
বলা হয়েছে – “শুক্রের আধিক্য থাকলে পুরুষ এবং আর্তবের আধিক্য থাকলে কন্যাসন্তান উৎপন্ন হয়। আর শুক্র এবং আর্তবের সমতা থাকলে নপুংসক সন্তান হয়।” (৩.৫)
মিউলেনবেল্ড বলছেন – “গর্ভধারণের উপযুক্ত সময় হল মাসিক স্রাব বন্ধ হবা ১২ দিন পরে; কেউ কেউ এমন অভিমত দেন যে যখন দৃশ্যত নারীর ঋতুস্রাব হয় নি (অদৃষ্টাশ্রবা), সেক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য ৯৩.৬)।”[15]
“স্ত্রীলোকের দ্বাদশ বৎসর বয়সে আর্তব (ঋতুস্রাব) শুরু হয়, পঞ্চাশ বছরে বন্ধ হয়।” (৩.১১)
এখানেও আগের অধ্যায়ের মতো বলা হয়েছে – “জোড় দিবসহুলোতে যৌনসঙ্গসর্গ ক্রলে গর্ভে একজন পুরুষের গর্ভধারণ ঘটে, এবং বিজোড় দিনে গর্ভধারণ হলে নারী শিশুর গর্ভধারণ হয় (৩.১২)।”[16]
এরপরে গর্ভস্থ ভ্রূণের বৃদ্ধির বর্ণনা করা হয়েছে – “প্রথম মাসে কলল (তরল গর্ভ) উৎপন্ন হয়। ২য় মাসে মহাভূতের (শীত, উষ্মা ও অনিলের সংযোগে) প্রভাবে সংহত ও ঘনীভূত (ভ্রূণ) হয়। এই অবস্থায় গর্ভ পিণ্ডাকৃতি হলে পুরুষসন্তান হয়, দীর্ঘাকৃতি (পেশী) হলে কন্যাসন্তান এবং অর্বুদাকৃতি (শাল্মলী কুঁড়ির মতো) হলে নপুংসক সন্তান হয়। ৩য় মাসে হস্তদ্বয়, পদদ্বয় ও মস্তকের ৫টি পিণ্ড উৎপন্ন হয় এবং বুক্ক-পিঠের মতো অঙ্গ ও নাক চিবুক ইত্যাদি প্রত্যঙ্গের সূক্ষ্মভাবে উৎপত্তি হয়। ৪র্থ মাসে “প্রধান ও অপ্রধান অঙ্গ দৃশ্যমান হয়, এবং চেতনাধাতু (চেতনার মূল উৎস) নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করে কারণ ভ্রুণের হৃদয় তৈরি হয়েছে” – হৃদয় চেতনাধাতুর স্থান। এজন্য চতুর্থ মাসে বিষয়ে অভিলাষ করে (আকাঙ্খা) এবং এই সময় থেকে গর্ভিণীকে দ্বিহৃদয়া বা দৌহৃদিনী বলে – “শিশুর ত্রুটি, যার উৎপত্তি হয় গর্ভিণীর অভিলাষকে অবহেলা করাতে; অভিলাষ তৃপ্ত করার গুরুত্ব (৩.১৮-২১)”।”[17]
“৫ম মাসে মনের বোধশক্তি (মানস) অধিকতর বৃদ্ধি পায়। ৬ষ্ঠ মাসে বুদ্ধি হয়। ৭ম মাসে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিভাগ স্ফুটতর হয়। ৮ম মাসে “ওজস অব্যবস্থিত/অস্থির হয়; এই মাসে কোন শিশুর জন্ম হলে সে বাঁচবে না, কারণ ওজস-এর ঘাটতি হয় (নির্জোস্তব), এবং অধিকন্তু এটি নির্ঋতি-র[18] অংশ যার জন্য মাংসৌদন-এর (মাংস দিয়ে রান্না করা ভাত) বলি (এখানে নৈবেদ্য অর্থে) দিতে হয় এই পর্যায়ে…”[19]
এখানে প্রযুক্ত সংস্কৃত শ্লোকটি হল –
অষ্টমেহস্থিরীভব ত্যোজস্তত্র জীবেন্নিরোজসত্বা্ননৈর্ঝতভাগত্বাচ্চ ততো বলিং মাংসৌদনমস্মৈ দাপয়েৎ।
“নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ মাসের অন্যতম মাসই গর্ভ ভূমিষ্ঠ হবার সময়। এর অন্যথা হলে জন্মের পরে বিকার ঘটে (অস্বাভাবিকতা)।” (৩.৩০)
“গর্ভস্থ নাভীনাড়ী মা-র রসবহা নাড়ীতে সংযুক্ত থাকে। সেই গর্ভনাড়ী মাতার আহারের রসবীর্য গর্ভশরীরে বহন করে। মাতার সেই উপস্নেহ (পুষ্টিসমূহ) দিয়ে গর্ভের অভিবৃদ্ধি হয়। মাতার সর্বশরীরাবয়ব-গামিনী রসবহা ধমনী সমূহ গর্ভশরীরে গর্ভকে জীবিত রাখে।” (৩.৩১)
এর আগে একাধিক শ্লোকে গর্ভিণীর আকাঙ্খার ব্যাপারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে – “শিশুর ওপরে বিশেষ আকাঙ্খার প্রভাব (৩.২২-৩৮)।”
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – “যে গর্ভিণীর গোমাংসে দৌহৃদ (দু’টি হৃদয় – একটি মাতার এবং অপরটি ভ্রুণের) হয়, সে বলবান সর্বক্লেশসহ সন্তান প্রসব করে। মহিষমাংসে যার দৌহৃদ হয়, সে শূর (সাহসী), রক্তচক্ষু ও লোমশ সন্তান প্রসব করে। বরাহমাংসে যার দৌহৃদ হয়, তার নিদ্রালু এবং সাহসী সন্তান প্রসব করে। মৃগমাংসে যার দৌহৃদ হয়, সে লম্বা পা-বিশিষ্ট সাহসী, দ্রুত পদচারুণায় সক্ষম এবং বনচর পুত্র (জঙ্ঘালং সদা বনচরং সুতম্) প্রসব করে।”
এখানে সংস্কৃত শ্লোকের হুবহু উপস্থাপনা আমাদের যুক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। সংস্কৃত শ্লোকগুলো পরপর এরকম –
গোধামাংসাশনে পুত্রং সুষুপ্সুং ধারণকাত্মকম্।।
গবাং মাংসে চ বলিনং সর্বক্লেশসহং তথা।। (৩.২৫)
মাহিষে দৌহৃদাচ্ছুরং রক্তাক্ষং লোমসংযুক্তু।।
বরাহমাংসাৎ স্বপ্নালুং শূরং সঞ্জনয়েত্ সুতম্।। (৩.২৬)
মার্গাদ্বিক্রান্তজঙ্ঘালং সদা বনচরং সুতম্।। (৩.২৭)
এটুকু অংশ পাঠ করার পরে বোঝা যায়, আয়ুর্বেদের মাঝে নিবিষ্টভাবে স্তরায়িত হয়ে রয়েছে একদিকে যেমন পুনর্জন্ম, কর্মফল এবং ঐশ্বরিক বিশ্বাসের মতো উপাদান, আরেকদিকে তেমন গর্ভিণীর গোমাংস, মহিষমাংস, বরাহমাংস, মৃগমাংস ইত্যাদি কোন ধর্মীয় বিধান তথা বিধি-নিষেধ না-মানা খাদ্যবিধির উপাদান।
আয়ুর্বেদের মেধাবী, প্রজ্ঞাবান, উন্মুক্ত চিন্তার পূজারি রচয়িতাদের সেসময়ের উচ্চকিত এবং প্রবল শক্তিশালী ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে পদে পদে আপস করেও নিজেদের মুক্তচিন্তাকে প্রবাহিত করেছেন তাঁদের রচিত শাস্ত্রে – বিভিন্ন শতাব্দীতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির সংস্কারের পরেও অন্তর্ভুক্ত এই অংশগুলো রয়ে গেছে অদ্যাবধি।
যাহোক, শৌনক, মার্কণ্ডেয়, পরাশরের পুত্র (পারাশর্য্য), কৃতবীর্য, সুভূতি গৌতম প্রভৃতি ঋষিদের মধ্যে (এখানে সুশ্রুতের নাম অনুল্লেখিত) গর্ভে কী ক্রমানুসারে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উৎপত্তি হয় এই নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। কিন্তু চূড়ান্ত বিচার-নিষ্পত্তি আসে ধন্বন্তরির কাছ থেকে – “চূড়ান্ত রায় এসেছিল ধন্বন্তরির কাছ থেকে, যিনি ঘোষণা করলেন এসমস্ত মতামতই ভুল বা মিথ্যা এবং ব্যাখান করে বোঝালেন দেহের যাবতীয় প্রধান ও অপ্রধান অঙ্গ মাতৃগর্ভে একইসঙ্গে বিকশিত হয়, যদিও প্রাথমিক দশায় এদেরকে পার্থক্য করা যায় না (৩.৩২)।”[20]
মিউলেলেনবেল্ড ধন্বন্তরির যুক্তিকে পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করছেন এভাবে – “ভ্রূণের উপাদান আহরণ করা হয় পিতা, মাতা, রস, আত্মন এবং সাত্ম্য (স্বাস্থ্যকর, উপযুক্ততা ইত্যাদি) থেকে; পিতার থেকে জাত হল সমস্ত স্থির (দৃঢ় অর্থে) অংশ; মাথার কেশ, শ্মশ্রু (দাড়ি), দেহের লোমন (লোম), অস্থি, নখ এবেং দন্তরাজি, সিরা (বানানটি নজর করুন), স্নায়ুসমূহ (স্নায়ু) এবং ধমনী, রেতস (বীর্য/শুক্র), ইত্যাদি; মাতার থেকে আহরিত হল সমস্ত নরম (মৃদু) অংশ; মাংসপেশি, রক্ত, মেদস (চর্বি/বসা), অস্থির মজ্জা, হৃদয়, নাভি অঞ্চল, যকৃৎ, প্লীহা, অন্ত্র, পায়ু-গুহ্যদ্বার সংক্রান্ত অঞ্চল, ইত্যাদি; রস থেকে আহরিত হলঃ দেহের কঠিনতা (উপচয়), বল, বর্ণ, স্থিতি এবং হানি (ক্ষয়); আত্মন থেকে আহরিত হলঃ ইন্দ্রিয়ানুভূতি, জ্ঞান এবং বিজ্ঞান (আধ্যাত্মিক এবং বৈশ্বিক জ্ঞান), আয়ুস (জীবিত থাকার সময়), সুখ, দুঃখ, ইত্যাদি; সাত্ম্য থেকে আহরিত হলঃ বীর্য্য, স্বাস্থ্য, বল, বর্ণ (গায়ের রঙ) এবং মেধা (৩.৩৩)।”[21]
এরপরে বলছেন “শিশু পুরুষ, নারী অথবা একটি নপুংসক হবে তার বিভিন্ন লক্ষণসমূহ, যমজ সন্তান হবে কিনা তার লক্ষণ (৩.৩৪)।”
এই লক্ষণগুলো কী কী? “যে গর্ভিণীর দক্ষিণ স্তনে প্রথম দুগ্ধদর্শন হয়, দক্ষিণ কুক্ষি আকারে বৃহত্তর হয় (দক্ষিণকুক্ষিমহত্বং চ), দক্ষিণ পদ (পা) আগে চলে (হাঁটার সময়), স্বপ্নে পুরুষ-নামের দ্রব্যে প্রধানত দৌহৃদ হয় – যেমন, পদ্ম, জলপদ্ম, উৎপল (নীল পদ্ম), কুমুদ (লাল পদ্ম), আম্রাতক (আমের ঘন রস) ইত্যাদি দর্শন হলে মুখের বর্ণ প্রসন্ন হয়, সে পুরুষ সন্তান প্রসব করবে একথা বলা যায়। এর বিপরীত হলে কন্যা প্রসব করবে … ইত্যাদি। যে গর্ভিণীর পার্শ্বদ্বয় উন্নত, উদর সামনে উন্নত ও পূর্বোক্ত লক্ষণ-সম্পন্ন হয়, সে নপুংসক সন্তান প্রসব করে।”
শেষ শ্লোকটি হল – “অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সৌন্দর্য ইত্যাদি স্বভাব থেকে হয়। কিন্তু “এসব অংশের সুলক্ষণ কিংবা কুলক্ষণ আসে পূর্ব জন্মের ধর্ম ও অধর্মের ভারসাম্য থেকে (৩.৩৬)।”[22]
আধুনিক ভ্রূণবিদ্যার সাথে সুশ্রুত-বর্ণিত গর্ভাবস্থা এবং এর বিশদ বিবরণ যদি আমরা এক করে না দেখে ভালো করে খেয়াল করি, তাহলে আধুনিক পরিভাষায় অ্যানাটমি এবং ফিজিওলজি সংক্রান্ত উভয় ধরনের বর্ণনাই রয়েছে – একথা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়।
শারীরস্থানের ৪র্থ অধ্যায়ের শিরোনাম “গর্ভব্যাকরণ” – “নিবেদিত হয়েছে ভ্রূণের ব্যাখ্যানে।”
“যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে সেগুলো হলঃ প্রাণ (বিভিন্ন ধরনের প্রাণের বর্ণনা), যা অগ্নি, সোম, বায়ু, সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, এবং জ্ঞানেন্দ্রিয়/ইন্দ্রিয় এবং ভূআত্মন (৪.৩)।”
সংস্কৃতে শ্লোকটি হল – “অগ্নিঃ সোমো বায়ুঃ সত্ত্বং রজস্তমঃ পঞ্চেন্দ্রিয়াণি ভূতাত্মেতি প্রাণাঃ।”
এরপরে ভ্রূনের মধ্যে দুধের ওপরে সরের মতো (ক্ষীরস্যেব সন্তানিকাঃ) ৭টি ত্বকের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে – প্রথম ত্বকের নাম অবভসিনী যার স্থুলতা একটি ব্রীহির সমান (সম্ভবত একটি ব্রীহি ধান্য যার উল্লেখ বেদের সময় থেকে পাওয়া যায়) ১৮ ভাগের ১ ভাগ, এর নীচের ২য় ত্বককে লোহিতা বলে (ব্রীহির ১৬ ভাগের ১ ভাগ), ৩য় ত্বকের নাম শ্বেতা (ব্রীহির ১২ ভাগের ১ ভাগ), ৪র্থ ত্বকের নাম তাম্রা (ব্রীহির ৮ ভাগের ১ ভাগ), ৫ম ত্বকের নাম বেদিনী (ব্রীহির ৫ ভাগের ১ ভাগ), ৬ষ্ঠ ত্বকের নাম রোহিণী (১টি ব্রীহির সমান) এবং ৭ম ত্বকের নাম মাংসধরা (২টি ব্রীহির সমান)। এরপরে এদের যেসমস্ত “ব্যাধি” হয় তার কথা বলা হয়েছে (এত বিস্তারিত বিবরণ আমাদের আলোচনার জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় নয়)। (৪.৪)[23]
পরের শ্লোকে বলা হয়েছে – “কলাও সাতটি – “একটি কলা হল ধাতু এবং আশ্রয়-এর মধ্যেকার সীমানা গঠনকারী টিস্যু (৪.৫); মাংসল অংশ কেটে গভীরে গেলে ধাতু দেখা যায়; যাকে কলা বলা হয় সেটি স্নায়ু দ্বারা আবৃত, জরায়ু-তে আবদ্ধ, এবং শ্লেষ্মন দ্বারা ঘিরে থাকা বা বেষ্টিত থাকা (৪.৬)।”[24]
এখানে সুশ্রুত সংস্কৃতে যে শ্লোকটি বলেছেন তা হল –
যথা হি সারঃ কাষ্ঠেষু চ্ছিদ্যমানেষু দৃশ্যতে।
তথা ধাতুর্হি মাংসেষু চ্ছিদ্যমানেষু দৃশ্যতে।।
স্নায়ুভিশ্চ প্রতিচ্ছন্নান্ সন্ততাংশ জরায়ুণা।
শ্লেষ্মণা বেষ্টিতাংশ্চাপি কলাভাগাংস্তু তান্ বিদু।।
৭টি কলার ক্রমানুসারে বর্ণনা হলঃ মাংসধরা,[25] রক্তধরা, মেদোধরা, শ্লেশ্মধরা, পুরীষধরা, পিত্তধরা, এবং শুক্রধরা (৪.৮-২০)।”[26]
এখানে একটি কথা পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। কেন আমি বারংবার মিউলেনবেল্ডের অনুবাদ উদ্ধৃত করছি? তার একাধিক কারণ আছে – (১) মিউলেনবেল্ড শিক্ষার জগতে একজন চিকিৎসক এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (উট্রেক্ট বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস) এবং একই সঙ্গে Jan Gonda-র মতো সংস্কৃতজ্ঞ ভারতত্তত্ববিদের অধীনে বারতবিদ্যা নিয়ে নিবিড়তা এবং যতদূর সম্ভব গভীরতা নিয়ে সংস্কৃত চর্চা করা যায় ততদূর করেছেন। তাঁর পিএইচডি থিসিস হল বিখ্যাত The Madhavanidāna। (২) যে কোন সংস্কৃত, বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদে যে কথাগুলো অনেক বিস্তারে বলা আছে, মিউলেনবেল্ড সে কথাগুলোর সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য নির্যাস খুব অল্প কথায় তাঁর মিত বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে বলেছেন; (৩) মিউলেনবেল্ডের ম্যাগনাম ওপাস A History of Indian Medical Literature (HIML) ১৯৯৯-২০০২ সালের মধ্যে ৫টি বিপুলাকৃতির খণ্ডে (1A, 1B, IIA, IIB, III) প্রকাশিত আয়ুর্বেদের সবচেয়ে প্রামাণ্য ইতিহাস। এজন্য তাঁকে আন্তর্জাতিক জগতে স্কলারেরা “এনসিক্লোপিডিয়া অফ আয়ুর্বেদ” বলে থাকেন; (৪) ২০০২ সাল পর্যন্ত যত সংখ্যক ম্যানাসক্রিপ্ট, মুদ্রিত পুস্তক কিংবা অন্য যেকোন সম্ভার পেয়েছেন (ইংরেজি, ডাচ, ফরাসি, জার্মান, সংস্কৃত, পালি, তিব্বতি, হিন্দি, তামিল, বাংলা, শারদা লিপিতে রচিত গ্রন্থ ইত্যাকার সমস্তকিছু) তাঁর ৫ খণ্ডের রচনাসম্ভারে অন্তর্ভুক্ত করেছেন; (৫) ২০০২ সালের পরে যে ম্যানাসক্রিপ্টগুলো পাওয়া গিয়েছে সেগুলো নিয়ে এখন স্কলারেরা কাজ করছেন। কিন্তু সবারই “রেফারেন্স পয়েন্ট” হলেন মিউলেনবেল্ড। (৬) তিনি যেসব শব্দের উপযুক্ত ইংরেজি প্রতিশব্দ পেয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন সেগুলো ব্যবহার করেছেন। যেক্ষেত্রে পান নি সেসব ক্ষেত্রে সংস্কৃত শব্দটিই রেখে দিয়েছেন, কোন অবান্তর এবং ভুল ব্যাখ্যার চেষ্টা করেন নি; এবং, সর্বোপরি, (৬) তিনি “মেডিক্যাল লিটারেচার” (“মেডিক্যাল সায়ান্স” নয়) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অপ্রয়োজনীয় এবং অবান্তরভাবে একে বিজ্ঞানের অবিকল অনুকৃতি তথা রেপ্লিকা হিসেবে দেখেন নি।
মিউলেনবেল্ডের কথায় – “সমগ্র দেহে শুক্র বিরাজমান, ঠিক যেমনটা ঘি-তে দুধ থাকে এবং আখে রস থাকে (৪.২১); যে স্থান দিয়ে শুক্র মূত্রনালীতে প্রবেশ করে এবং নির্গত হয় (৪.২২); বীর্যপাতের প্রক্রিয়া (৪.২৩); গর্ভবতী নারীর ঋতুস্রাব হয় না কারণ স্রোতসমূহ যার দ্বারা আর্তব বাহিত হয় ভ্রূণ সে পথগুলো বন্ধ করে রাখে; আর্তব-র একটি অংশ হল সেই পদার্থ যার থেকে গর্ভের ফুল (অপরা), ইংরেজতে placenta) গঠিত হয়, বাকি অংশ স্ফীত বক্ষ তৈরি করে (৪.২৪); ভ্রূণের যকৃৎ এবং প্লীহা তৈরি হয় ভ্রূণের রক্ত থেকে, ফুপ্পুস (ফুসুফুস নয়)[27] তৈরি হয় রক্তের ফেনা থেকে, liver (যকৃৎ) and spleen (প্লীহা) of the foetus are formed from blood, the phuppusa (ফুপ্পুস – ফুসুফুস নয়)[28], উণ্ডুক (এর সঠিক প্রতিশব্দ আমি খুঁজে পাইনি। যশোদানন্দন এবং পি ভি শর্মা একে caecum বলেছেন, মিউলেনবেল্ড কোন ইংরেজি প্রতিশব্দ দেননি[29]) তৈরি হয় রক্তের কিট্ট (বর্জ্য পদার্থ) থেকে (৪.২৫); অন্ত্র, পায়ু-গুহ্যদ্বার অঞ্চল এবং মূত্রথলি তৈরি হয় রক্ত এবং কফ-এর প্রসাদ (বিশুদ্ধ অংশ) থেকে, এদের ওপরে বাত এবং পিত্ত ক্রিয়া করে (৪.২৬-২৭কখ); কফ, রক্ত এবং মাংস কলা থেকে জিহ্বা তৈরি হয় (৪.২৭গঘ-২৮কখ); স্রোত তৈরি হয় কফ, রক্ত এবং পেশি-র সম্মিলিত ক্রিয়া থেকে (৪.২৮গঘ), পেশি-ও একইভাবে তৈরি হয়; স্রোত জন্ম নেয় বাত এবং ঊষ্মন-এর (সম্ভবত পাচকাগ্নি) সম্মিলিত ক্রিয়া থেকে….”[30]
মিউলেনবেল্ড জানাচ্ছেন – “বাত এবং পিত্ত ও মেদ-এর স্নেহ-র সাহায্যে সিরা এবং স্নায়ু তৈরি করার ক্ষেত্রে পেশি অংশত রূপান্তরের “agents”; মৃদু পাক (গরম করা) থেকে সিরার উৎপত্তি সুগম হয়, খর (শক্তিশালী) পাক থেকে স্নায়ু-র উৎপত্তি হয় (৪.২৯-৩০কখ)”। এভাবে একে একে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গর্ভাবস্থায় উৎপত্তির বর্ণনা দেওয়া আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হৃদয় তথা heart-এর উৎপত্তি – “হৃদয় প্রাণবহ ধমনীসমূহের ভিত্তি।” (৪.৩১)
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গর্ভাবস্থায় উৎপত্তির ক্ষেত্রে দোষ-এর উপাদান রয়েছে। তার সাথে অন্য উপাদানের বিন্যাস-সমবায় হয়েছে।
যশোদানন্দন এক্ষেত্রে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন (উৎস অজানা) – “উণ্ডুক স্থুলান্ত্রের প্রথম সীমা। এরপরে স্থুলান্ত্র উর্ধমুখে উঠে যকৃৎ ও আমাশয়কে বেষ্টন করে ফুসফুসের (ফুপ্পুস নয়?) নীচ দিয়ে গিয়েছে। পরে প্লীহার কাছে গিয়ে নীচের দিকে মলদ্বার পর্য্যন্ত গিয়েছে। স্থুলান্ত্রের শেষভাগকে ইংরাজিতে রেক্টম ও সংস্কৃতে গুদ বলে অন্ত্র সকল যকৃৎ ও কোষ্ঠকে (আমাশয়কে) বেষ্টন করে গিয়েছে।”[31]
আবার মিউলেনবেল্ডের বয়ানে – “হৃদয় হল প্রাণবহ ধমনীসমূহ-এর আশ্রয়; হৃদয়-এর নীচে, বাম পার্শ্বে প্লীহা এবং ফুপ্পুস (বিস্তৃত আলোচনার জন্য পাদটীকা দ্রষ্টব্য)[32] (ফুপ্পুস – বিস্তৃত আলোচনার জন্য পাদটীকা দ্রষ্টব্য)[33], হৃদয়ের ডান দিকে থাকে যকৃৎ এবং ক্লোম); বিশেষ করে হৃদয় হল চেতনা-র অধিষ্ঠান (লক্ষ্যণীয় হল, আধুনিক মেডিসিনে অ্যানাটমি এবং ফিজিওলজি-র দৃষ্টিকোণ থেকে heart-কে আমরা যেভাবে বুঝতে অভ্যস্ত, আয়ুর্বেদে সে অর্থ ও ব্যঞ্জনা একেবারেই ভিন্ন), হৃদয়ের এই বৈশিষ্ট্যের জন্য সমস্ত জীবিত সত্তা নিদ্রামগ্ন হয় যখন এটি তমস দ্বারা আবৃত থাকে (৪.৩১)”[34]। যশোদানন্দন বলেছেন – “হৃদয়ের আকার পদ্মমুকুলের ন্যায় (পুণ্ডরীকেণ সদৃশং স্যাদধোমুখম্)। উহা অধোমুখে (উলটে) থাকে। উহা জাগ্রত অবস্থায় বিকশিত (খোলা) এবং নিদ্রিত অবস্থায় নিমীলিত (বন্ধ) থাকে। নিদ্রা বৈষ্ণবী মায়া।”[35]
মিউলেনবেল্ড বলছেন – “মাতার দেহের রস-এর জন্য এবং বাত-র আধ্মান-এর (ইংরেজি পরিভাষায় blowing inflation[36]) জন্য ভ্রূণ বৃদ্ধি পায় (৪.৫৭)।”[37]
এই অধ্যায়ে এরপরে সত্ত্ব, রজ ও তম বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষের চরিত্র বিস্তারিতভাবে বিচার করে সেগুলোর সুবিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া আছে, যা আমাদের আলোচনার জন্য যথেষ্ট প্রয়োজনীয় নয়।
এই অধ্যায়ের শেষ শ্লোকটি হল – “ভিন্ন ভিন্ন শরীরের প্রকৃতি স্থির করে সেভাবে চিকিৎসা করতে হবে। সত্ত্বরজস্তমঃকৃত এইসব মহপ্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণসমূহ বলা হল। ভিষক্ এগুলি সম্যকভাবে ভেবে দেখবেন।”[38] (৪.৯৭-৯৮)
____________________________________
[1] বাল্মিকী রামায়ণ, সারানুবাদঃ রাজশেখর বসু, ২০২৪, পৃঃ ৯২।
[2] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১০৮।
[3] Mahadev Chakravarti, “Beef Eating in Ancient India”, Social Scientist, Vol. 7, No. 11 (Jun., 1979), pp. 51-55.
[4] Norbert Elias, The Civilizing Process, Revised edition, 2008.
[5] Meulenbeld, History of Indian Medical Literarure (HIML in 5 volumes – IA, IB, IIA, IIB, III), IA, p. 244.
[6] আপ্তে, The Practical Sanskrit-English dictionary, 1890, পৃঃ ৪৭১।
[7] Meulenbeld, HIML, IA, p. 244.
[8] Meulenbeld, HIML, 1A, p. 245.
[9] রাহুল পিটার দাস বিষয়টিকে এভাবে দেখেছেন – “’perverted male’ called āsekya-, who attains the erection by drnking semen … by means of fellatio of someone else with his mouth, though Indu in his commentary on As,Ṥā 2,p.293 says that he drinks his own or someone else’s semen.” – The Origin of the Life of a Human Being: Conception and the Female according to Indian Medical and Sexological Literature, 2003, p. 527.
[10] আপ্তে, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৬৯।
[11] Meulenbeld, HIML, 1A, p. 245.
[12] এখানে দুটি ব্যাখ্যা আছে। যশোদানন্দন বলছেন – “অর্থাৎ তার কেশ, শ্মশ্রু, লোম, নখ, দাঁত, শিরা, স্নায়ু, ধমনী, রেতঃ প্রভৃতি হয় না।” – যশোদাননদন সরকার, অনু, সুশ্রুত-সংহিতা, পৃ ২০৮। মিউলেনবেল্ড বলছেন – “Ḍalhaṇa remarks that Jejjaṭa did not accept these verses.” – HIML, IB, p. 371.
[13] Meulenbeld, HIML, IA, p. 245.
[14] Meulenbeld, ibid, p. 246.
[15] Ibid, p. 246.
[16] Ibid, p. 246.
[17] Ibid, pp. 246-247.
[18] এখানে মিউলেনবেল্ড ব্যবহৃত নির্ঋতি শব্দটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মূল শ্লোকে থাকলেও যশোদানন্দন এর কোন কথাই উল্লেখ করেন নি, শর্মা একে demon বলেছেন। নির্ঋতি শব্দটির বাংলায় অর্থ অলক্ষ্মী বা উপদ্রব। এসমসস্ত বিভিন্ন কারণে text critical edition-এর প্রয়োজনীয়তা এত গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি তথ্যও আগ্রহী পাঠকের কাজে লাগতে পারে – নির্ঋতির উপযুক্ত ইংরেজি প্রতিশব্দ আপ্তে বা মনিয়ের-উইলিয়ামস-এর অভিধানে পাওয়া যায়নি। বাংলা অভিধানগুলোর মধ্যে সুবল মিত্রের, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বা বাংলাদেশ বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে ৩ খন্ডের অভিধানেও এর উল্লেখ নেই। কেবলমাত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের (১৯১৬ সালে প্রথম প্রকাশিত) বাঙ্গালা ভাষার অভিধান-এর ২য় খণ্ডে শব্দটির একটি অর্থ দেওয়া আছে “উপদ্রব” হিসেবে – বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, ২য় খণ্ড, ২০০৪, পৃঃ ১২৯২। মিউলেনবেল্ড এই শব্দটির বহুল ব্যবহারের অনেকসংখ্যক উদাহরণ দিয়েছেন – প্রাগুক্ত, IB, পৃঃ ৩৭১।
[19] Meulenbeld, IA, p. 247, IB, p. 371.
[20] Meulenbeld, ibid, p. 247. মিউলেনবেল্ডন তাঁর টীকায় যোগ করেছেন, চরক-সংহিতা-র শারীরস্থানের ৪র্থ অধ্যায়ের ২০-২১ নম্বর শ্লোকে সমধর্মী বক্তব্য পাওয়া যায় – IB, p. 371।
[21] মিউলেনবেল্ড, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৪৭। টীকায় ব্যাখ্যা করেছেন – চরক-সংহিতা-র শারীরস্থানের ৩য় অধ্যায়ের ৩-১৪ নম্বর শ্লোকে সমধর্মী ব্যাখ্যা পাওয়া যায় – প্রাগুক্ত, IB, পৃঃ ৩৭১।
[22] Meuleenbeld, ibid, IA, p. 247.
[23] এখানে মিউলেনবেল্ড তাঁর টীকায় যোগ করেছেন – “Compare Ca.Ṥā.7.4,” প্রাগুক্ত, IB, p. 372, নোটঃ ৬১।
[24] মিউলেনবেল্ড টীকায় বলছেন – “Compare Saṃgitaranākara 1.2.76-78” – ibid, IB, p. 372, n. 62.
[25] মিউলেনবেল্ড দেখিয়েছেন, সিঙ্ঘাল একে endo-, peri- and epimysium বলে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু কুঞ্জলাল ভিষগরত্ন একে facsia বলেহেন – IB, p. 372। আবার সেই শব্দার্থের সমস্যা
[26] Meulenbeld, ibid, p. 248.
[27] এখানে মিউলেনবেল্ড তাঁর টীকায় মন্তব্য করছেন – “সিঙ্ঘাল এবং ভিষগরত্ন একে lungs বলেছেন।” – প্রাগুক্ত, IIB, পৃঃ 372. এই প্রেক্ষিতে রাহুল পিটার দাসের ব্যাখ্যা প্রণিধানযোগ্য – “This organ has not been identified properly, though many scholars hold it to refer to the lungs, a lung, or part of a lung, in keeping with the meaning of its relatives in New Indo-Aryan today … Some texts say (e.g. Ādhamalla’s commentary ṤAR 1.5, 43 or Ḍalhaṇa’s commentary on SU, Ṥā 4,25) that is joined to the hṛdayanāḍikā (হৃদয়নাড়িকা)-, i.e. the tubule of the heart (hṛdaya-) or the like.” – Das, The Origin of ife of a Human Being, pp. 566-567.
[28] এখানে মিউলেনবেল্ড তাঁর টীকায় মন্তব্য করছেন – “সিঙ্ঘাল এবং ভিষগরত্ন একে lungs বলেছেন।” – প্রাগুক্ত, IIB, পৃঃ 372. এই প্রেক্ষিতে রাহুল পিটার দাসের ব্যাখ্যা প্রণিধানযোগ্য – “This organ has not been identified properly, though many scholars hold it to refer to the lungs, a lung, or part of a lung, in keeping with the meaning of its relatives in New Indo-Aryan today … Some texts say (e.g. Ādhamalla’s commentary ṤAR 1.5, 43 or Ḍalhaṇa’s commentary on SU, Ṥā 4,25) that is joined to the hṛdayanāḍikā (হৃদয়নাড়িকা)-, i.e. the tubule of the heart (hṛdaya-) or the like.” – Das, The Origin of ife of a Human Being, pp. 566-567.
[29] তাঁর টীকায় মিউলেনবেল্ড বলেছেন – “The maladhrā kalā bounds the uṇḍuka, which contains waste products derived from from the food. Ḍalhaṇa regards it as identical with Caraka’s purīṣādharā and mentions poṭṭalaka as its vernacular name …” – HIML, IB, p.372.
[30] ডলহণ একে পিত্ত বলেছেন – Meulenbeld, HIML, IB, p. 372, n. 90.
[31] সরকার, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২১৩।
[32] সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত বলেছেন – “Suśruta speaks of phuppusa as being on the left side of and kloma as being on the right. Sine the two lungs vary in size, it is quite possible that Suśruta called the left lung phuppusa and the right one kloma. Vāgbhaṭa I follows Suśruta. The Atharve-Veda, Caraka, Suśruta, Vāgbhaṭa and other authorities used the word in singular, but in Bṛhad-araṇyaka, I, the word kloma is used in the plural number…” – HIP, vol. 2, p. 288, fn. 1.
[33] সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত বলেছেন – “Suśruta speaks of phuppusa as being on the left side of and kloma as being on the right. Sine the two lungs vary in size, it is quite possible that Suśruta called the left lung phuppusa and the right one kloma. Vāgbhaṭa I follows Suśruta. The Atharve-Veda, Caraka, Suśruta, Vāgbhaṭa and other authorities used the word in singular, but in Bṛhad-araṇyaka, I, the word kloma is used in the plural number…” – HIP, vol. 2, p. 288, fn. 1.
[34] মিউলেনবেল্ড তাঁর নোটে সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, হরিপ্রপন্নর রসযোসাগর প্রভৃতিদের আলোচনা দেখতে বলেছেন – Meulenbeld, HIML, IB, p. 248, n. 71.
[35] যশোদানন্দন সরকার, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২১৪-২১৫।
[36] আপ্তে, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৪০।
[37] Meulenbeld, HIML, IA, p. 248.
[38] যশোদানন্দন সরকার, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২১৯।













