রবিবার বলে আজ দুপুরে কিছুক্ষণ বাড়িতে থাকতে পেরেছিলাম। দশ- পনেরো মিনিট টিভি দেখার সুযোগ পেলে আমি সাধারণত খবর দেখি এবং অভ্যাসবশত ১৩৬০ টিপে এবিপি আনন্দ প্রথমে ধরি।
দেখলাম সাংবাদিক ডিমের দোকান দেখাচ্ছেন। মুর্গির ডিম, হাঁসের ডিম, সাদা ডিম, লালচে ডিম সব পাওয়া যাচ্ছে, শুধু পচা ডিমের আকাল। সব পচা ডিম নাকি বিক্রি হয়ে গেছে ছুঁড়ে মারার জন্য৷ বলার সময় সাংবাদিকের মুখে হাসি। যাঁদের তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন পচা ডিম কিনছেন কিনা, তাঁদেরও মুখে হাসি। একজন বললেন যে তিনি কিনতে পারবেন না, কারণ পচা ডিমের চাহিদা আর দাম এখন তুঙ্গে।
এই পচা ডিম ছুঁড়ে মারার প্রবণতা যদি রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে কদিন পরে “Olfactory terrorism” কথাটা একটা রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, কারণ পচা ডিম শরীরের যেখানেই লাগুক, আক্রমণটা হয় নাকের ওপর। হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সাহায্যে রীতিমতো কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার বলা চলে। ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় চতুর ‘সাইলেন্সার’ রামলিঙ্গম যেমন ছিল অলফ্যাক্টরি টেররিস্ট। এই হাইড্রোজেন সালফাইড এবং স্ক্যাটোলের মিশ্রণ নিঃসরণ করে সে নিঃশব্দ ঘাতকের ভূমিকা পালন করত৷
জোকস ছেড়ে একটা সিরিয়াস কথাও বলি। তৃণমূল যেভাবে চুরি, দুর্নীতি করেছে, অত্যাচার করেছে সাধারণ মানুষের ওপর, আড়াল করেছে অপরাধীদের, তাতে মানুষের মনে সত্যিকারের ক্ষোভ, রাগ, ঘৃণা আছে নিঃসন্দেহে। সেই ক্ষোভ বা ক্রোধকে মবিলাইজ করে হিংসাত্মক পথে চালিত করার জন্য বিশেষ পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই এই মুহূর্তে৷ মেনে নিতে হবে যে ভয়ানক মারামারি বা প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের তুলনায় “চোর চোর” বা “গো ব্যাক” স্লোগান, কালো পতাকা, পচা ডিম, এমনকি খানিক ধাক্কাধাক্কিও অনেক নিরীহ বহিঃপ্রকাশ সম্মিলিত ক্ষোভের। এটাকে প্রেশার কুকারের সেফটি ভালভের সঙ্গে তুলনাও করা চলে। খানিক স্টিম এভাবে বেরিয়ে যেতে না দিলে হয়ত বিস্ফোরণ হতে পারে। জনরোষের বেশিরভাগটাই বাস্তবিকই স্বতঃস্ফূর্ত, এই অজুহাতে গ্যালারিতে বসে দেখাই যায়, কারণ রোষানলে পুড়তে থাকা লোকগুলো আদৌ পছন্দের নয়।
এখানেই শ্রেয় আর প্রেয়র প্রশ্ন আসে। ক্ষমতাদর্পে মত্ত অপছন্দের লোকগুলোকে ক্ষমতা হারানোর পর হেনস্থার শিকার হতে দেখার অনুভূতি হল ‘প্রেয়’। অস্বীকার করার উপায় নেই, অনেক সাধারণ মানুষই এসব দেখে কিছুটা আরাম পাচ্ছেন, সুতরাং ‘প্রেয়’ তো বটেই। অপরপক্ষে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং আইনের শাসন হল ‘শ্রেয়’। যা শ্রেয়, তা সবসময় তাৎক্ষণিক আরাম দেয় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দেয়।
দু’একটা ঘটনা ঘটেছে, ঠিক আছে, কিন্তু মবোক্রেসিকে জাঁকিয়ে বসতে দেওয়া ঠিক হবে না। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোট সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত নই, বরং মাথায় যেটা চেপে ধরা ছিল, সেটার মধ্যে সত্যিই বরফ থাকলে বুড়ো বয়সে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে বলে চিন্তিত। কিন্তু তিনি একজন সাংসদ। (বোতল ভাঙা সাংসদ হলেও সাংসদ।) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একজন সাংসদ এবং তাঁর ওপরে কিছু আক্রমণ সত্যিই হয়েছে, সেটা ফুটেজ খুঁজে দেখলাম। এঁরা দুজনেই জনতার সমালোচনা, বিরুদ্ধতা এবং বিরূপ স্লোগানের মুখে পড়ার যোগ্য৷ কিন্তু একজন সাংসদের ওপর শারীরিক আক্রমণ এক অর্থে ভারতের সংসদকে চ্যালেঞ্জ জানানোও বটে। এই জায়গাটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত সরকারের। পচা ডিমের আঘাতে কারো বিরাট ক্ষতি হয় না, কিন্তু মবোক্রেসি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এরকম কয়েকজন নেতার সঙ্গে মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারে, এতটাই ঘৃণা উপার্জন করেছেন এঁরা। সেটা আটকানো দরকার। এই নেতাদের অনেককে জেলে পচতে দেখলে খুবই খুশি হব কিন্তু রাস্তায় খু ন হতে দেখলে আদৌ খুশি হব না। তার একটা কারণ এও যে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আইনত কঠোর শাস্তি পাবার দ্বারাই এঁদের প্রকৃত অর্থে দেশের আইনের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নইলে এঁরা চুরি-ডাকাতি করে ফোকটে ‘শহীদ’ তকমা পাবেন।
তাছাড়া বাঙলার পুনর্গঠনের ব্যাপারে সত্যিই উদ্যোগী হতে হলেও আইনের শাসন, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রয়োজন। তৃণমূল জমানায় ছেনো মস্তানদের দাপাদাপি আর সিণ্ডিকেট রাজের যে সংস্কৃতি আমরা দেখেছি, সেটাই নতুন লেবেল সেঁটে পুনঃপ্রতিষ্টিত হলে অন্ধকার গাঢ়তরই হতে থাকবে৷ সুতরাং সরকার এবং সাধারণ মানুষকে যৌথ উদ্যোগে রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হবে। সেটাই হবে গুণ্ডারাজের ইতিহাসের বিরুদ্ধে প্রকৃত বিজয়।











