জনরোষের নানা ঘটনা ঘটছে চারপাশে। বিরোধীদলের শীর্ষনেতৃত্ব আক্রান্ত হয়েছেন। তৃণমূল বলছে বিজেপির চক্রান্ত, শাসক বলছে জনরোষ। এনিয়ে চাপান উতোর চলছে। সে যাই হোক, এই জনরোষ বা পরিকল্পিত রোষ সমর্থনযোগ্য নয়, মানুষের নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়াটা কাঙ্খিত নয় কোনোভাবেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানান দুর্নীতি যার অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক তার বিরুদ্ধে জনমানসে ভয়ংকর একটা পুঞ্জিভূত ক্ষোভ রয়েছে এটা একশো শতাংশ সত্যি। সেটাকে প্রশমিত করতে হলে শুধুমাত্র চুনোপুঁটি নয়, শীর্ষ নেতৃত্বকেও ধরতে হবে। মানুষকে প্রকৃত জাস্টিস দিতে হবে। আইনিভাবে এঁদের শাস্তি ছাড়া সেটা সম্ভব নয়।
এখানেই প্রশ্নচিহ্ন এসে দাঁড়াচ্ছে। বিজেপির নেতৃত্ব, মুখ্যমন্ত্রী, তৃণমূলের নানান নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে আপামর জনগণ, সবাই তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চোর বলছে, বিভিন্ন দুর্নীতির ইস্যুতে তাঁদের যুক্ত থাকার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পেশ করছে অথচ পুলিশ, প্রশাসন সিবিআই, ইডি গ্রেফতার করা তো দূরে থাক তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চেপেও ধরছে না।
কুনাল ঘোষ একেবারে প্রকাশ্যে, এবিপি চ্যানেলে বলেছিলেন নিয়োগ দুর্নীতিতে টাকা তোলা হচ্ছে সেকথা দলের নেতৃত্ব জানত। কই তাকে তো এ নিয়ে সিবিআই-ইডি-পুলিশ চেপে ধরল না কেউ! ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্স’-এর এত এত দুর্নীতি! তার ডিরেক্টর দু-জনের একজন অর্থাৎ কালিঘাটের কাকুকে গ্রেফতার করা হল অথচ আর একজন ডিরেক্টর অর্থাৎ ভাইপো, দিব্যি জেলের বাইরে। মার খাওয়ার আগে গতকালও তিনি হুঙ্কার দিয়েছেন, ‘সাধ্য থাকলে আমাকে গ্রেফতার করে দেখাক!’ কীসের জোরে এই আত্মবিশ্বাস? কালিঘাটের কাকুর সেই ভয়েস স্যাম্পেল যা নাকি ম্যাচ করে গেছে বলে এত লাফালাফি, কোথায় গেল সেসব?
অভয়া কাণ্ডে তৎকালীন শাসকদলের যোগসাজস দিনের আলোর মত পরিষ্কার। অথচ তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী, যিনি নাকি রিমোট কন্ট্রোলে মনিটর করেছিলেন খুনের পরের দিনের সকল ঘটনাবলী, তিনিই তো ঘটনার অন্যতম নাটের গুরু তৎকালীন প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষকেকে প্রাইজ পোস্টিং দিয়েছিলেন। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ নেই কেন? তখনকার নগরপাল বিনিত গোয়েল এবং আরও দুজন পুলিস অফিসারকে সাস্পেন্ড করা হয়েছে। ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু তাঁদের যিনি পরিচালনা করছিলেন অর্থাৎ তৎকালীন পুলিশমন্ত্রী, তাঁর ভূমিকা কী ছিল কেন সেটা কেন খতিয়ে দেখছে না পুলিশ কিংবা সিবিআই? সেসময় ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় প্রেস কনফারেন্সে অন্যতম সন্দেহভাজন অভীক দেকে বাঁচানোর জন্য ফিঙ্গারর্প্রিন্ট বিশেষজ্ঞ বলে কাঁচা মিথ্যে বলেছিলেন কার নির্দেশে? তৎকালীন পুলিশমন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি কেন? এসব অন্তত ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ তো করবে?
এরকম আরও অজস্র দুর্নীতির কথা বিজেপি নেতৃত্ব, বেসুরো তৃণমূল নেতা-কর্মী এবং আপামর জনগণ বলছেন এবং তৃণমূলের শীর্ষ-নেতৃত্ব যে সেসবের সঙ্গে যুক্ত সে কথা প্রবল চিৎকারে ব্যক্ত করছেন। অথচ পুলিশ কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, শুনতে পাচ্ছে না। তাঁদের ডেকে ন্যূনতম জিজ্ঞাসাবাদটুকুও করছে না। এই ধাঁধার জবাব কী? যে অপরিসীম অন্যায় আর অপরাধ তৃণমূল করেছে তাতে তাদের শীর্ষনেতৃত্বের অবশ্যই শাস্তি পাওয়া উচিত। না হলে আইন ব্যবস্থাটাই হাস্যকর হয়ে পড়ে। এঁদের শাস্তির কোনো বিকল্প নেই! আজকের এই পরিবর্তনের একটা বড় কারণ কিন্তু জনগণের একটা বড় অংশের এই আকাঙ্খার ভেতর লুকিয়ে আছে।
তা যদি না হয়, শুধু গড়িমসি চলতেই থাকে, যা ইডি সিবিআই করে এসেছে এতদিন তাহলে জনগণই বা কী করবেন? কোথায় যাবেন? কীভাবে বিচার পাবে অভয়া বা ন্যায্য চাকরী হারানো একটা পুরো প্রজন্ম কিংবা দুর্ণীতিতে ক্ষতিগ্রস্থ, হক্কের পাওনা হারানো লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ!












