সম্প্রতি ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং ডাঃ ইন্দ্রনীল খান মহাশয় ডাক্তারদের নিয়ে কিছু ভালো পরিকল্পনার আশ্বাস দিয়েছেন, শুনে ভালো লাগলো। ডাক্তারদের জন্য কেউ কোনোদিন কিছু করেনি। আপনারা কিছু করুন আর নাই করুন, এই ফ্যাক্টটাকে যে স্বীকার করেছেন এতেই আমার তৃপ্তি। আপনাদের নতুন সরকারের প্রতি কিছু দাবি জানিয়েছিলাম, সেগুলো বেশির ভাগই বিদ্রূপাত্মক ছিল, আশ্চর্য ভাবে তার বেশির ভাগই সম্পন্ন হয়েছে। একজন ডাক্তার হিসাবে আমি আরও কিছু দাবি জানালাম।
১. টাকার অঙ্ক নিয়ে যে কথাটা বলেছেন, সেটা ঠিক। কিন্তু সেটা আংশিক সত্য। আমাদের ডাক্তারি শিক্ষার শুরুতেই আমরা টাকা পয়সা নিয়ে কোনোদিন ভাবিনি। মেডিক্যাল কলেজে ইমার্জেন্সী বিভাগে হাউসস্টাফশিপ করিনি শুধুমাত্র প্রতিদিনের হুজ্জুতির জন্য। একটা ভালো অন কল রুম নেই, বাথরুম নেই, তার উপর সিকিউরিটির কোনো প্রশ্ন নেই। নীলরতনে ইন্টার্নের মাথা ফাটিয়ে চলে গেল, কেউ কিছু করতে পারল না। এই নিরাপত্তাহীনতা কিন্তু আদালতে একজন আইনজীবীর নেই, একজন ব্যাংক কর্মীর নেই, একজন পুলিশের নেই। যদিও অনেক সময়ই তাঁরা সর্বদা সবার দাবি পূরণ করতে পারেন না। এই নিরাপত্তা চাই, এই সম্মানটা চাই। আজ আপনারা ডাক্তারদের সম্মানের চোখে দেখতে শেখালে সমাজ সেটা শিখবে, কারণ যে শিক্ষকদের এটা শেখানোর কথা ছিল তৃণমূল তো তাদের এমনিই রাস্তায় বসিয়ে লাথি মারে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেছে…
২. কলকাতার কলেজগুলো পোস্টার বয়, এদের আগে ঢেলে সাজাতে হবে। মমতা ব্যানার্জির এই ভুলটার পুনরাবৃত্তি আপনারাও করছেন। এসব হাসপাতাল অনেক সেজে আছে। যে ব্যবস্থার ভিত কাঁচা তার ছাদে হাজার ডেকোরেশন করে কোনো লাভ হয় না। গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করুন। অন্তত ব্লক লেভেলে ৯০% রোগীর চিকিৎসা হয়ে যায়। সমস্ত বিভাগের ডাক্তারের ব্যবস্থা করুন, সাব স্পেশালিটি না হোক অন্তত স্পেশালিটির ডাক্তার তো নিয়োগ করাই যায়। সঠিক মাইনে দিতে হবে, প্রান্তিক জায়গায় পোস্টিংয়ের ইনসেনটিভ দিতে হবে। নিশ্চয়ই যাবে লোকে। পাশের রাজ্যেও এভাবেই লোকে যাচ্ছে। মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শুধু মাসের ওষুধটা নিতে লাখ লাখ লোক লাইন লাগাচ্ছে। কেন! সব হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ করুন। মানুষগুলোর হয়রানিও কমবে, মেডিক্যাল কলেজগুলো অন্য জটিল রোগীদের চিকিৎসায় মন দিতে পারবে, নতুন গবেষণা করতে পারবে।
৩. হাসপাতালগুলো যত নিম্ন মানের ওষুধ, যন্ত্রপাতিতে ভরে গেছে। অবিলম্বে এসব উদ্ভট কোম্পানির ওষুধগুলো বাতিল করে সরকারি জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করুন। ব্ল্যাকলিস্টেড স্যালাইন, মরচে পড়া ছুরি কাঁচি এসব আর দেখতে চাই না। ল্যাবের মেশিনগুলোতে একই রোগীর রক্ত দু’বার টেস্ট করলে দু’রকম রিপোর্ট আসে। মেশিনেরও দোষ নেই, যত লোকের রিপোর্ট হওয়ার কথা, তার কয়েকগুণ লোড চাপানো হলে দোষটা কার! অফ লোড করতে হবে, স্বাস্থ্যের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। নয়তো এই জনসংখ্যার লোকের পরিষেবা কলকাতার পোস্টার বয়দের দিয়ে চালানো সম্ভব নয়।
৪. ওপিডি তে স্বচ্ছ রেফারেলের ব্যবস্থা করতে হবে। আমার ইচ্ছা হলো গ্যাসের ব্যথার জন্য আমি দু’টাকা দিয়ে টিকিট বানিয়ে কার্ডিওলজি আউটডোরে দেখাবো, এই সিস্টেম চলতে পারে না। স্পেশালিটি থেকে সাব স্পেশালিটি এবং নীচের স্তরের হাসপাতাল থেকে উপরের স্তরের হাসপাতালে রেফার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, ঠিক হাব এন্ড স্পোক মডেলের মতো। এই রেফারেলের আপ স্ট্রিম যেমন হবে, ডাউন স্ট্রিমের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। নয়তো সঠিক বিকেন্দ্রীকরণ হবে না।
৫. সব জায়গায় রাজনীতি করতে যাবেন না। সব খেতে গিয়ে অম্বল হয়েই তৃণমূল ডুবেছে। ছাত্রছাত্রীদের ডেমোক্র্যাটিক পরিবেশ দিন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশ হতে দিন। সেখানে থ্রেট কালচার করবেন না। এই আপনাদের শঙ্কুদেব পণ্ডাই আমাদের সময় তৃণমূলের হয়ে এসব করে বেড়াত। কলেজে সুস্থ রাজনৈতিক বাতাবরণ সন্দীপ ঘোষের মতো রাক্ষসের উদয়ের পরিপন্থী। আরজিকরে সুস্থ ছাত্র রাজনীতি থাকলে সন্দীপ ঘোষ কবেই সোজা হয়ে যেতো! স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রশাসনিক পদে কাউকে ভরসা করবেন না, ক্রমাগত পরিবর্তন করা উচিত এসব পদ। নয়তো শ্যাওলা জমবে…
৬. যাদের আপনারা মনে করছেন সঠিক কাজ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল কমিটি করুন, তদন্ত করুন। সাসপেন্ড করুন। চাকরি খেয়ে নিন। যা খুশি করুন। কিন্তু এই বিধায়কদের দিয়ে হাসপাতালে মিডিয়া নিয়ে এই থ্রেট দেওয়ার কালচার বন্ধ করুন। আপনারাও অনেক কাজ করতে পারেন না। কেউ নবান্নে গিয়ে আপনাদের থ্রেট দিচ্ছে না। মমতাও এসব করেছে, এসব গিমিক মানুষ বেশিদিন খায় না। কাজের কাজ করুন, মানুষ ঠিক বুঝবে…
৭. কাজ করার প্রচুর লোক আছে। শুধু পরিবেশ ভালো করতে হবে। স্বজন পোষণ, পানিশমেন্ট পোস্টিং এসব কালচার সরাতে হবে। স্বচ্ছ বদলির নীতি আনতে হবে। যত উটকো লবি আছে এসব ভাঙতে হবে। সঠিক মাইনে, সঠিক কাজের পরিবেশ পেলে লোক উপচে পড়বে সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সেই পরিবেশটা দেওয়ার কাজ কিন্তু আপনাদের।
৮. পরিশেষে বলবো কিছু গঠনমূলক কাজ করুন, আপনাদের শুরুটা বড্ড ধ্বংসাত্মক হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু বুলডোজার। আমি এই বিধ্বংসের সমালোচনা করছি না, কিন্তু আমার এই সময়টা নিয়ে আপত্তি আছে। বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলছেন না তো? কাজ করুন। বাঙালি কিন্তু তেল দেওয়ার জাত, প্রচুর তেল দেবে। শরীরে চর্বি জমতে দেবেন না, এরা মুখ ঘোরাতেও বেশি সময় নেয় না কিন্তু 











