অধিকার না দয়া? ঠিক এই প্রশ্নই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বাংলার নারী সমাজে।
বহু অর্থনীতিবিদ ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম এবং সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার কথা বলে চলেছেন এবং পৃথিবীর উন্নততম দেশগুলিতে। উন্নয়ন যতটুকু হয়েছে, ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী কখনোই তা সামাজিক এবং আর্থিক সমতা আনতে পারে না। কয়েক দশকের পরিসংখ্যান দেখলেই এটা বোঝা যাবে। ওয়েলফেয়ার ইকনমিতে কর্মসংস্থান এবং অনুদান পরস্পরের পরিপূরক হবার কথা ছিল। কাজের বিকল্প অনুদান নয়।
কর্মসংকোচন তথা রোজগার সংকোচনের ফলে কাজের এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে পিছিয়ে থাকা অংশ আর্থ সামাজিক সুরক্ষাটুকু পেতে ব্যর্থ।
বাংলায় কাজের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ইত্যাদি ভর্তুকি ব্যবস্থার উপযোগিতা সামান্য কিছুটা হলেও ছিল। অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য হলেও এই প্রকল্পগুলি এমন এক অংশের কাছে অর্থ পৌঁছে দিচ্ছিল, যারা বহু আগে থেকে অর্থনৈতিক লেন দেন বা অর্থনৈতিক মূল সিদ্ধান্ত নেবার জায়গায় ব্রাত্য থেকেছেন। এখানে দুই ভাবে ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি সাময়িক ভাবে সমাধান করার চেষ্টা হয়েছিল। সর্বজনীন ন্যুন আয় আংশিক ভাবে নিশ্চিত করা গেল, এবং মেয়েরা, বিশেষ করে ও সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির মেয়েদের হাতে তার নামে, তাকে মাথায় রেখে সরকারি সাহায্য দেওয়া হল। সরকারের সামাজিক সমতার প্রশ্নে আন্তরিকতা প্রমাণিত করা হল যেমন তেমনি, বাজারে মেয়েদের একটা বিশাল অংশ, যারা ঐতিহাসিক ভাবে বিভিন্ন শ্রমের সাথে যুক্ত হলেও, কার্যত অদৃশ্য ছিলেন, তাদের সামনে নিয়ে আসা হল, ক্ষমতায়নের দিকে খুব সামান্য হলেও, একটু এগিয়ে আসা হল বৈকি।
ভাতা অর্থনীতি বা সংরক্ষণের বিরোধিতা করা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সর্বজনীন ন্যূনতম আয়, নিশ্চিত করার সরকারি দায়ও ঝেড়ে ফেলতে চান।
যে লক্ষ্মীর ভান্ডার বাংলার মেয়েদের মনে আত্মপ্রত্যয় তৈরি করেছিল,পরিবারের মধ্যেই নিজস্ব একটা স্বীকৃতির দাবি তৈরি করেছিল,সেটারই প্রলম্বিত ও পরিমার্জিত পরিবর্ধিত রূপ হবার কথা ছিল অন্নপূর্ণা ভান্ডার।যদিও সেটা প্রথম থেকেই সমাজের আর্থিক দিক থেকে দুর্বল পরিবারের মহিলার জন্য সুনির্দিষ্ট, কিন্তু ক্ষমতার নাগর দোলায় চড়তে তাতেই স্বপ্নের রঙিন ফানুস লাগিয়ে বঙ্গ বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল: ক্ষমতায় এলে তারা সকল লক্ষ্মী ভান্ডারের প্রাপকদের হাতেই অন্নপূর্ণা ভান্ডারের অর্থ দ্বিগুণ পরিমাণে তুলে দেবে। কিন্তু সেই সংকল্প যে এমন ত্রিশূল হয়ে বিঁধবে সেটা কে জানত?
ক্ষমতা বদলের মাসে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা দেওয়া হয় নি। রাজ্যের মহিলারা পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন,তার কথা কেউ তাই তোলেন নি।তারপর প্রতিদিন বলা হয়েছে লক্ষ্মীর ভান্ডারের সমস্ত প্রাপক পাবেন, সরাসরি ব্যাংকে চলে যাবে।এতদিন কোনো শর্ত দেওয়া হয় নি।এখন বলা হচ্ছে, পারিবারিক তথ্য পঞ্জির ১২ পাতার ফর্ম পূরণ করে জমা দিন,তারপর সরকার বিচার করে দেখবে যোগ্য কিনা।যোগ্যতার মাপকাঠি এখনো ঠিক কী সেটা বলা হয় নি।তবে ফর্মে অনেক রকম তথ্য উল্লেখ করতে হচ্ছে,সেটাকেই শর্ত বলে ভেবে নিচ্ছেন সকলে।তাতে লেখা আছে,কেউ যদি আয়কর দেন,সরকারি চাকরি করেন, তারা পাবেন না। তিন ঘরের পাকা বাড়িতে থাকলে, স্বাস্থ্য বীমা থাকলে ,জমি বাড়ি গাড়ি থাকলেও মিলবেই না। আয়কর না দিলেও পরিবারের সকলের রিটার্ন দেখবে সরকার। শুধু নিজের আয় জানালেই হবে না, পরিবারের সকলের ব্যাংকের পাশ বই ও লেনদেন শেষে আয়ের পরিমাণ উল্লেখিত হতে হবে,এক কথায় পরিবারের সকলেরই আয় , ব্যাংকের হিসেব দিতে হবে। মহিলাদের বক্তব্য,কেন বাপু, আমার পরিবারের সব তথ্য সরকারকে দেব? তারা উল্টে আতঙ্কিত।
এদিকে কেন্দ্রের এই প্রকল্পটি শুরুতেই নির্দিষ্ট ছিল শুধু তাদের জন্য যাঁদের পারিবারিক আয় সাকুল্যে বছরে দুলাখের কম। কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ জনের পরিবারের ক্ষেত্রে ধরা যাক মাথা পিছু আয় মাসে যাঁদের সাড়ে তিন হাজারের কম, তাঁরাই যোগ্য এই স্কিমের।মোটামুটি লোকের বাড়ি রান্না করে, বাসন মাজে যে মহিলারা পশ্চিমবঙ্গে তারাও এর চাইতে বেশি রোজগার করে।তাই এই হিসেবে প্রায় কাউকেই দিতে হবে না।
শুভেন্দু আসলে হিসেব করে দেখেছেন ২.২১ কোটি লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রাপক মহিলাকে যদি প্রতিশ্রুতি মতো তিন হাজার করে দিতে হয় তাহলে ৬৬৩০ কোটি টাকা খরচ হবে প্রতিমাসে। রাজ্যের কোষাগারে চাপ কমাতে যদি অর্ধেক প্রাপক কমিয়ে ফেলা যায়,তাহলে পূর্বতন সরকারের খরচেই ডবল ইঞ্জিন সরকারের ডবল ভাতার চমক জারি থাকে।তাই এই মুহুর্মুহু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ!
কেন যে বিজেপিকে ভারতীয় জুমলা পার্টি বলে,তার কারণ অচিরেই বাংলার মানুষের কাছে স্পষ্ট হবে। ভোটের আগে একরকম ফর্ম একরকম প্রস্তাব, ভোটের রেজাল্ট বেরোনোর পর আরেকরকম, সরকার গড়ার দিন এক রকম বলেন মুখ্যমন্ত্রী, সাত দিন যেতে না যেতেই অন্য সুর, লক্ষ্ণী ভান্ডারের সকল প্রাপকের নাম অটোমেটিক উঠে যাবে, ভেরিফিকেশন আপনাদের কিছুই করতে হবে না, এই জাতীয় আপ্ত বাক্য স্বয়ং উপমুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা গেছে দুদিন আগেও, বারবার সেটা তিনি বলার পর এবার মুখ্যমন্ত্রী বললেন ,” না সকলকে দেওয়া হবে না। ”
ফরম পূরণ হবে । যাচাই হবে । তিন মাস সময় লাগবে। এই তিন মাস লক্ষ্মীর ভান্ডার মিলবে। তারপর যারা যোগ্য কেবলমাত্র তারাই পাবেন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার। সরকারে আসতে না আসতেই ১৫ দিনের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ রকম এত রকম কথা এই সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়েছে।
বাংলার রাজনীতিতে ক্ষমতায় বসতে না বসতেই বিজেপি যা করছে সেটা যে ব্যুমেরাং হয়ে যেতে পারে বুঝতে পারছে না বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। বাংলার মাটিতে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব খুব পরিণত পদক্ষেপ ফেলতে পারছেন বলে মনে হয় না।নইলে জয়ের উল্লাসে শুভেন্দুকে ২৭৩ টা বুলডোজার পাঠিয়ে ভেট দেন যোগী আদিত্যনাথ ? শুভেন্দু অধিকারী কি করলেন?এটা নামানোতেই বিজেপির রাষ্ট্র চরিত্র পরিষ্কার হল।
হকার উচ্ছেদ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই সরকার কতটা নৃশংস এবং অগণতান্ত্রিক। ২৬ হাজার চাকরি চুরি গদি উল্টানোয় বড় ভূমিকা পালন করেছে। কাজ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে মানুষের রুটি রুজির অধিকার কেড়ে নিলে ভোটের বাক্স অক্ষত থাকবে কি? গোদের উপর বিষফোঁড়া — ১২ পাতার অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ফর্ম।ওটা বের করে কার্যত ছক্কা মারতে গিয়ে হিট উইকেট করে শুভেন্দু প্যাভিলিয়নে ফেরত আসবেন না তো ? ভাত কাপড়ে হাত পড়লে মানুষ সিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে দেয় সে তো প্রমাণিত সত্য।
আসলে বিজেপি ভেবেছিল লক্ষ্মীর ভান্ডার মানে কিছু টাকা ,কিন্তু টাকার বাইরেও মহিলাদের স্বনির্ভর স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই বিশেষ স্কিমটি। ভাতার রাজনীতি বলে অনেকে যেটাকে খাটো করে দেখেন,সেটা আসলে তারাই ভুল করেন। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের কাছ থেকে মানুষের প্রাপ্য ন্যূনতম সর্বজনীন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাতা। সেটা তার অধিকার। বাংলার মেয়েরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পেয়ে সেই অধিকারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।এখন তারা অধিকারটা বুঝে নিতে চায়, এই বোধ বোধহয় এখনও সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতির প্রভুদের বোধগম্য হয় নি। তাই পারিবারিক তথ্য ও অনুমোদনের সম্মতিতে ১২ পাতার অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ফর্ম পূরণের কথা বলেছেন। এর যোগ্য উত্তরটা দিয়ে গেলেন বাড়ি বাড়ি বাসন মাজা লতিকা : “আমি কি ভিখারি নাকি যে পরিবারের সবার তথ্য দিয়ে, বাড়ির দলিল দেখিয়ে টাকা নিতে যাব?”
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, বিভ্রান্তি ও পরিবারতন্ত্রের নিগড়ে বাঁধা অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ফর্মে এই রাজ্য সরকারের যে চরিত্র উন্মোচিত সেটা যে ভয়ঙ্কর রকমের আগ্রাসী পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতিরূপ তার চেহারা সুস্পষ্ট। পরিবারের সমগ্রের মধ্যেই মহিলাদের বেঁধে রাখতে চায়, পৃথক সত্তা ও স্বাধিকার সেখানে অস্বীকৃত। বলতে দ্বিধা নেই, কম বেশি দুর্নীতি হলেও বাংলার মেয়েদের কাছে বিনা শর্তের লক্ষ্মীর ভান্ডার আংশিক ভাবে হলেও নারীর একক অধিকার ও স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, অন্নপূর্ণা ভান্ডার তার বিপ্রতীপে বাংলার নারীকে ফের মনুবাদী পারিবারিক শাসনে বাঁধতে চায়! এটা বাংলার সর্ব শ্রেণীর নারী সত্তার কাছে রীতিমত অপমানজনক!











