জামাইষষ্ঠী শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমার দিদার মৃত্যুদিনের কথা মনে পড়ে যায়। সতের বছর বয়সে সেই প্রথম কোনও আপনজনের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার সাক্ষী হয়েছিলাম।
ভরা ভাদরের সঘন সন্ধ্যায় আমাদের শ্যামনগরের মিল কোয়ার্টারে স্থানীয় থানা মারফত দিদার মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছেছিল। (তখন কলকাতা-শ্যামনগর দূরভাষে জুড়তে গেলে ট্রাঙ্ককল বুক করতে হতো এক্সচেঞ্জে। আমাদের কোয়ার্টারে ল্যাণ্ডলাইনের কোনও সংযোগ না থাকায় মামার বাড়িকে থানার সাহায্য নিতে হয়েছিল খবর দিতে।)
বাবা ছিল কলকাতায়, লেবার কমিশনারের অফিসে — মিটিংয়ে। এক অনুগত শ্রমিকের ভাড়ার লঝঝড়ে জিপে চড়ে মা-কে নিয়ে আমি সোজা পৌঁছেছিলাম নিমতলা শ্মশানে। তার খানিক পরেই সামনের স্বল্পালোকিত পথ ধরে মামার কাঁধে চড়ে বিপুল হরিধ্বনির সঙ্গতে দিদা এসে পৌঁছেছিল নিমতলায়। বাড়ি ফিরে সহকর্মীদের কাছে খবর পেয়ে প্রায় মধ্যরাতে শেষ লোকাল ট্রেন ধরে বাবা যখন এসে পৌঁছলো, তখন দিদার দাহকাজ সবে আরম্ভ হয়েছে।
যে কোনও অনুভূতির প্রকাশ বড্ড কম ছিল বাবার, তবু ঐ কিশোরীবেলাতেই বাবার মেয়ে বুঝতে পেরেছিল বারো বছর বয়সে নিজের মাকে হারাবার পরে স্নেহের কাঙাল লোকটা দ্বিতীয়বার মাতৃহীন হয়েছিল সেদিন।
চারদিকে ঝকমকে আলো, খুশির উদযাপন, নতুন ভোরের আবাহনের মধ্যে নিতান্ত বিসদৃশ বিষাদের বারোমাস্যা সব বন্ধুদের খারাপ লাগছে, জানি। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কলমের মুখে আনন্দের ফুলঝুরি ছোটাতে পারছি না।
ছোটবেলার সহপাঠিনী প্রিয় বান্ধবীর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, সেই খবর পেয়েছি গত রাত্রে।
মেডিক্যাল কলেজ ব্লাডব্যাঙ্ক রক্তের জোগান দিয়েছে, কিন্তু মাসীমাকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি আমার চিরবিষণ্ণ মাতৃহারা মন। ফোনে যখন বন্ধুর মুখে শুনলাম, আজ জামাইষষ্ঠী জেনে মাসীমা রোগশয্যাতেই তাঁর বড় মেয়ের কাছে আবদার করেছেন — ‘জয়ন্ত, দীপক সবাই প্রণাম করতে আসবে — কিছু আশীর্বাদী তো দিতে হবে রে! তুই আমার হাতে একটু টাকা দিয়ে যাস।’ শুনতে শুনতে গাল গড়িয়ে জল নেমেছে আমার।
গতকালের মেঘভাঙা বৃষ্টিতে উঠোন, সামনের রাস্তা সব ডুবেছে। পাড়ার পথঘাট উঁচু করার জন্য সিইএসসির ছাই ফেলা হচ্ছিল — সেও বন্ধ। দ্বীপের মতো জেগে রয়েছে বাড়ি, আর আমি। দুই একাকী সত্তা পরস্পরকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছি — ভয় কী? আমি তো রয়েছি।
দু’জনেই জানি, কত ফাঁপা এই আশ্বাসবাক্য। তিন দশকের পুরোনো বাড়ির ভিতে ঘুণ ধরেছে, আর সাতান্নর বুড়ি ছুঁয়ে এগিয়ে যাওয়া খুকুরও বেলা ছোট হয়ে আসছে। কেউ কাউকে ফেলে যেতে রাজি নয় — তবু যেতে তো হবেই।
সন্ধে নামে। চারদিক ঘোর হয়ে আসে। আশপাশের ফাঁকা জমি দখল করে বেড়ে ওঠা হোগলা আর কচুবনে জ্বলতে নিভতে থাকে জোনাকপোকা। আমি শাঁখে ফুঁ দিই ঠাকুরঘরে। প্রদীপ দেখাই জগন্নাথকে, কুলদেবী জগদ্ধাত্রীকে, মায়ের গুরুদেব পরমানন্দ ব্রহ্মচারীকে। সিংহাসন থেকে স্মিতমুখে চেয়ে থাকে মা।
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করি –“আর কতদিন বলো তো?”
‘যখন জমবে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায় —
— ফুলের বাগান ঘন ঘাসের
পরবে শয্যা বনবাসের
শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায়’ —
এই বাড়িটা ছাড়া আকাশের তারার পানে চেয়ে চেয়ে আমাকে মনে রাখার দায় কারোর নেই, জানি।
তাই বুঝি পার্বতীদিকে রাতের আলু পটলের ডালনা আর মাছের ঝালের ফরমাশ দিতে দিতে জলে ভরে ওঠে বেয়াদব বেহায়া দু’চোখ। মায়া, বড্ড মায়া। এই কালচে ধূসর পৃথিবীটার জন্য বড় মায়া রয়ে গিয়েছে এখনও। জোলো আষাড়ু বাতাসে ভর করে সেই তীব্র মায়া ঢুকে পড়েছে আমার অভ্যন্তরে, ছড়িয়ে পড়ছে কোষে কোষে, অন্তরের তারে সুর তুলছে পুরিয়া কল্যাণ রাগে।
রাত এবারে নিজের মতো গভীর হবে। ঝিঁঝিরা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ক্লান্ত হয়ে থেমে যাবে একসময়। ঘোলাটে খেয়ো চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে ময়লা জ্যোৎস্না মেখে, আশপাশের বাড়িতে বাতি নিভে যাবে এক এক করে, দোতলার জানলার গ্রিলের এপারে আমি আর ওপারে জামগাছটা কেবল জেগে থাকব। আর আমাদের সঙ্গেই ভোরের অপেক্ষায় রাত জাগবে জমাট আঁধারে জ্বলতে নিভতে থাকা বাদুলে জোনাকপোকার দল।
শুভ রাত্রি।
ছবি ঋণ: আন্তর্জাল











