কারুর দাম ৪০ কোটি, কারুর দাম ৫০ কোটি!
আম জনতাকে বিজেপির অপশাসন মুক্তি দিয়ে যাঁরা সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ভারত গড়ার আদর্শ দেখিয়ে নির্বাচনে জিতে এসেছিল, গণতন্ত্রের হাটে আজ তারাই বিক্রি হচ্ছে ক্ষমতার লোভ কিংবা ভয়ে, প্রলম্বিত হচ্ছে হিন্দুত্বের কায়া।
আদর্শহীন রাজনীতি হলে কি আর রাজনীতির চরিত্র থাকে? নাকি গণতন্ত্রের চরিত্র থাকে? দলত্যাগী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের “বিশ্বাসঘাতক” বলছেন যাঁরা, তাঁরাই তো কোনো একদিন অন্য ভেঙে নিজেদের দল তৈরি করেছিলেন, আজ ভাঙনের যন্ত্রণা কী শিক্ষা দিচ্ছে?
এখন তাঁরা কার হাত শক্ত করছেন? এতদিন নিজের বিশ্বাসে যে দলকে বলেছেন দেশের শত্রু, মানুষের শত্রু, আজ সেই দলেই খুঁজে পাচ্ছেন দলত্যাগী বিধায়ক বা সাংসদ মানুষের জন্য কাজ করার জায়গা!!
কেন এই পাল্টি খাওয়া? কেন এভাবে দল ভাঙানো?
আসলে এটাই বিজেপির পাতা ফাঁদ, বিরোধী নিকেশের এমন রাজনীতি আগে কখনও দেশ দেখেনি — ভোট জনগণ দিক না দিক, যাকে দেবে, তাকেই কিনে নিয়ে ক্ষমতায় তো থেকে যাব!
এটাই এখন নতুন কৌশল।
মহিলা সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী ও আসন পুনর্বিন্যাস বিল পাশ করতে না পেরে মরিয়া হয়ে গেছে বিজেপি। দল ভাঙানোর খেলায় অমিত শাহ যে ফর্মুলায় অসম, মধ্যপ্রদেশ, গোয়ায় কংগ্রেস বিধায়কদের হাইজ্যাক করে সরকার গঠন করেছিল, এখন সেই একই ফর্মুলায় একে একে আপ, শিবসেনা, তৃণমূল, এন সি পি ভেঙে লোকসভায় অংশ সাংসদের সমর্থন জোগাড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। জল্পনা চলছে এরপর হয়তো টার্গেট সমাজবাদী পার্টি। ইন্ডিয়া জোটের একটার পর একটা শরিকের ঘর ভেঙে সঙ্গে ,কিছু ছোট দল এবং ডি এম কে-এর সমর্থন নিয়ে তারা গুছিয়ে নামতে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে প্রয়োজন তিনশ একষট্টি সাংসদের সমর্থন। বিপক্ষ ভেঙে টুকরো করে তৃণমূল, শিবসেনা (উদ্ধব) ও সমাজবাদী পার্টি থেকে ৫০-৫৫ জন সাংসদের সমর্থন কিংবা ডি এম কে – কে ভোটাভুটি থেকে সরিয়ে কিছু নির্দল বা ছোট ছোট দল থেকে সমর্থন নিয়ে যেনতেন প্রকারে বিল পাশ করে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে! অর্জিত হয়ে যাবে তখন সাংবিধানিকভাবেই একচ্ছত্র ক্ষমতা।
একের পর এক আইন করে সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বদলে দেশটাকে একদলীয় শাসনের অধীনে রেখে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এটাই তো তাদের টার্গেট! সেই কৌশলেই এর কোটি কোটি খরচ করে নিজের দলের বিপক্ষ দলকে রাজনীতি থেকেই মুছে দিতে এমন সর্বাত্মক আগ্রাসী প্রচেষ্টা! তাহলে এক দেশ এক ভোট, আসন পুনর্বিন্যাস আইন করে শুধু হিন্দি বলয়ের জোরেই দেশে নিজেদের ক্ষমতা প্রায় নিরঙ্কুশ করে তুলতে পারবে। তারপর প্রয়োজনে একটার পর একটা সংবিধান সংশোধন করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। সংবিধানের যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শ, তার অবসান ঘটিয়ে দেশকে হিন্দু রাষ্ট্র পরিণত করা হবে সময়ের অপেক্ষা।
মোক্ষ লাভ কী করে?
অপারেশন লোটাস হল বাংলায়, পদ্ম ফুটলো, বেরিয়ে এল গোখরো , এক ছোবলে কোমায় চলে গেল তৃণমূল! ৫৮ জন (শেষে৬৫) বিধায়ক নিয়ে টুকরো হল! আর ২০ জন সংসদ তৃণমূল ছেড়ে ঢুকে গেলেন অজানা এক দলে, সবই বিজেপির নেতৃত্বে।
শাসক ঠিক করে দিল বিরোধী চেয়ারে কে বসবে।
বিরোধী জন্ম নিল, উঠে দাঁড়ালো, হাঁটা শুরু করল শাসকের হাত ধরে।
এমন রঙ্গ কোথাও খুঁজে পাবে না তো কেউ
সকল দেশের সেরা বঙ্গ, আমার জন্ম ভূমি!
তৃণমূল অপারেশন শেষ।এরপর শুরু উদ্ধবের দল শেষ করা,
মুম্বাই জুড়ে অপারেশন টাইগারের হোর্ডিং ছড়িয়ে দিল্লিতে তখনও চলছে বাকি অপারেশন…
ছয় সাংসদকে বিজেপিতে নিয়ে উদ্ধবের শিবসেনা শেষ করা।এরপর অমিত শাহের কথা শুরু: উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী দলের বর্ষীয়ান নেতা রামগোপাল যাদবের সঙ্গে। খুনি দুর্নীতি গোমতী নদী সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প, এরকম হরেক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আসছে ইডি, সিবিআই।
জেল যাবেন? নাকি এখনই নেবেন ৫ কোটি! পরে মাসে মাসে এক কোটি! কিংবা একবারেই ৩০-৪০ কোটি! এই যদি বিরোধী দলের সাংসদদের প্রতি শাসকদলের আমন্ত্রণ হয়, কিনা সেই অভ্যর্থনা নিতে না চায়?
এভাবেই ভাঙলো তৃণমূল কংগ্রেস। তারপরেই শিবসেনা দলের (উদ্ধব) ন’জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ছ’জন এনডিএ-তে যোগ দেওয়া নিয়ে রাজধানী যখন সরগরম, তখন বোমাটি ফাটান রাজভড়। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন দুর্নীতির মামলার তদন্তে এসপি নেতারা কোণঠাসা। অনেক বড় নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাই এসপির বর্ষীয়ান নেতা রাম গোপাল যাদব সম্প্রতি অমিত শাহকে চিঠি লিখে বিজেপিতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যাদবের দাবি, তাঁর সঙ্গে আরও বেশ কিছু এসপি সাংসদ দল ছাড়তে প্রস্তুত।
এ কেমন গণতন্ত্র? কোথায় গলদ?
সরকারে থেকে বা না থেকে, দু তরফেই দুর্নীতি চলে। আর এই দুর্নীতির ইস্যু সামনে রেখে ভোট হয়, এমনকি ভোটে জেতা প্রার্থী ছিনতাই ও হয়ে যান! শাসক দলে যোগ দেওয়ার পরেই সকলেই ভুলে যায় সেই দুর্নীতির কথা।
এরপর সকলেই বলতে থাকে শুধু উন্নয়নের কথা।
এরই নাম গণতন্ত্র?
দল ভাঙ্গা বা অন্য দলে যোগ, যাইই ঘটুক ,আইন কী বলে? তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে একজোট হয়েছিলেন, সে সময় দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারকে চিঠি পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘তৃণমূল একটাই, কোনও পৃথক গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেবেন না।’ প্রশ্ন ওঠে: “কেউ এক দলের প্রতীকে জিতে এসে অন্য দলে যোগ দিতে পারে? তা হলে আর নির্বাচনের কী প্রয়োজন? কোনও সাংবিধানিক আইন এর নীতিগত অনুমতি দেয় না। এটা অসাংবিধানিক, অনৈতিক, বেআইনি। লড়াই আদালতে।” একটানা কথাগুলি বলে গেলেন বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিবাল।
লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পি ডি টি আচারি বলেন, “সাংসদরা অন্য দলে মিশে যেতে পারেন না। সংবিধানের দশম তফসিলে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনও রাজনৈতিক দল অন্য দলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস এনসিপিআই-তে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি।” এনসিপিআই-তে মিশে গেলেও বিদ্রোহী সাংসদদের প্রধান মুখ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, এর পরে তৃণমূলের নাম, প্রতীক, তহবিলের দাবি নিয়ে লড়াই হবে। কিন্তু প্রবীণ আইনজীবী বিশ্বজিৎ দেবের মতে, “এক জন ভিন্ন দলের সাংসদ কী ভাবে অন্য দলের নাম, প্রতীক, সম্পত্তির দাবি করতে পারেন? ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী এই দাবি করতে পারে। কারণ, তাঁরা করেছেন। তাঁদের এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন বা আদালতে যাওয়ার নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি অধিকার রয়েছে।”
ঘটনা যাই হোক, মূল প্রশ্ন: এরপর মানুষ কেন ভোট দেবে? ফোঁপড়া হয়ে গেছে ভারতের গণতন্ত্র।
কে কার বিদ্রোহী জানার দরকার নেই, এক দলের প্রতীকে ভোট নিয়ে নির্বাচনে জিতে অন্য দলের যোগদান করা মানে নির্বাচক জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। বদলে দিচ্ছে জনগণের রায়। কেন এরপর বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এই আচরণ? প্রার্থীকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে না নির্বাচন থেকে চিরতরে? অনৈতিক কাজও আইনি বৈধতা পেয়ে যাবে?
কোনও সাধারণ সদস্যের দলত্যাগ করা আর কোন দলের প্রতীকে নির্বাচিত হওয়ার পর সেই দল ত্যাগ করা কি এক? নৈতিকতায় যা সিদ্ধ নয় সেই আচরণ আইনের বৈধতা পায় কি করে?
জনমতের বিরুদ্ধে আচরণ করে যদি কোন নির্বাচিত প্রতিনিধি তার ইচ্ছেমতো অন্য দলে যোগ দেয়, সংসদে আইনসভায় আইন তৈরি করে তার নির্বাচনের মত দানের বিরুদ্ধে, তাহলে সেই গণতন্ত্রের সাধারণ ভোটারদের মূল্য কোথায়? মানুষের আস্থা থাকবে আর ভোটে?
যদি এভাবেই সাংসদ, বিধায়ক কেনাবেচা যদি চলে
এ দেশে গণতন্ত্রের মৃত্যু তাহলে অচিরেই!
কারণ মানুষও বিরক্ত আর হতাশ হয়ে আর ভোট চাইবে না।
আর সেটাই চায়, বিজেপি।
ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে দিলেও, সেই জয়ী প্রার্থী তো বিজেপির সমর্থনেই থাকবে।হয় বিজেপিতে ঢুকে, নয়ত বিজেপি মনোনীত দলে থেকে বিজেপির নেতৃত্বে বিরোধী দল হয়ে!
এ কেমন রঙ্গ জাদু! এ কেমন গণতন্ত্র!











