আরশোলাদের আরশোলাত্বের দায় কি তাদের?
৭ জুন ২০২৬ ‘প্রতিদিন’-এর রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্র ‘রোববার’-এর ‘ককরোচ’ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি লেখা।
আন্দোলন ঘটে কেন? এ নিয়ে তত্ত্বের কচকচানি যত আছে, তাদের সরলীকৃত করে এক জায়গায় রাখলে, যে সাধারণ ধাঁচাটা দেখা যায়, তা হল, অসাম্য, ক্ষোভ, বঞ্চনা থাকলে শুধু হবে না। বহু মানুষকে একসঙ্গে উপলব্ধি করতে হবে, সমস্যা তারও, সে-ও ভুক্তভোগী। অপরের উপকার করার জন্য আন্দোলনে অংশ নেন না অধিকাংশ মানুষ৷ বহু জন যখন একযোগে, একই সময়ে মনে করেন, ‘আমি ভাল নেই, আমার আরও ভাল থাকার কথা’, তখন সেই বহু ‘আমি’ মিলে ‘আমরা’ সৃষ্ট হয়। এই বোধ হয়ত বহুদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল একটু একটু করে। কোনো বিরূপ ঘটনা তারপর বারুদমুখে আগুনটুকু দেয়। ঘটনাটির তাৎক্ষণিক গুরুত্ব ওইটুকুই। নেতারাও সঠিক সময়ে ক্ষোভের কথা সশব্দে মনে করিয়ে দেন মাত্র। এইগুলি অনুঘটক বড়জোর, যা সুপ্ত সামূহিক ক্ষোভকে দৃশ্যমান করতে সাহায্য করে। সমাজমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র উত্থান, যাকে আদতে এখন অবধি একটা জেন জি ডিজিটাল আন্দোলন বলে মনে হচ্ছে, তা এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বিতর্কিত মন্তব্যটি এক্ষেত্রে ‘কারণ’ নয়, বারুদস্তূপে দেশলাই। আপাতভাবে তাঁর একটি মন্তব্যের ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুরু হয়েছিল একটা পেজ। কেন সেই মন্তব্য? সুপ্রিম কোর্টে এক আইনজীবী বারবার সিনিয়র অ্যাডভোকেট হওয়ার আবেদন করছিলেন। কেন তাঁরই তা হওয়ার কথা, কেন তার অন্যথা এক বঞ্চনার উদাহরণ, সে বিষয়ে শুনানি চলছিল। সেই শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, এখন এমন এক বেকার যুব সম্প্রদায় গজিয়েছে, যারা নাকি ‘আরশোলার মতো।’ এরা কখনও আইনজীবী, কখনও মিডিয়াজীবী, কখনও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট, কখনও আরটিআই কর্মী — গঠনমূলক কাজের বদলে এরা নানা উপায়ে প্রতিষ্ঠানের সমালোচক করে নজরে পড়তে চাইছেন। ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ আর কি! উক্ত মামলাকারী একজন আইনজ্ঞ হয়েও কি তাদের দলে যোগ দিলেন?
জনপরিসরে ব্যবহৃত ভাষার অভিঘাত যথেষ্ট, বিশেষত তা যদি ক্ষমতার অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মুখনিঃসৃত হয়। তাঁদের বক্তব্য প্রায়ই আদালত বা সংসদের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক অর্থ তৈরি করে। তাই সে সম্পর্কে তাঁদের সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিচারপতির তাচ্ছিল্যের কারণটি কী? এ কি তাচ্ছিল্য, না কি ছদ্মবেশী রাগ? সাংবাদিক, সমাজকর্মী বা আরটিআই কর্মীরা যে এদেশে সবসময় উচিত কর্তব্য করছেন তা নয়। কিন্তু তাদের পেশাগত কর্তব্যের মূল নির্যাস হল, গণতন্ত্রে সরকারকে প্রশ্নাধীন রাখতে হবে। তাহলে অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘিরেই কি প্রধান বিচারপতির সমস্যা? সমালোচনা সবসময় গ্রহীতার পক্ষে সুখকর হবে না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেটিই গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
যাই হোক, বিচারপতি সরকারের সমালোচনা চান না (যদিও বিচারব্যবস্থার কাজ হওয়া উচিত, সরজার নাগরিকের প্রতি সৎভাবে কর্তব্য পালন করছে কিনা, তা নজরে রাখা)। কিন্তু যে বেকার যুবগোষ্ঠী বিচারপতির দ্বারা সমালোচিত হলেন, তাঁরা রেগে গেলেন কেন? এ তো দুএকজন ব্যক্তি নন, প্রায় আড়াই কোটি মানুষের প্রতিক্রিয়া! এক্স হ্যান্ডেলটি সরকার বিকল করল বটে, কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির ইনস্টাগ্রাম পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ২.৪ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা যে কোনো সংসদীয় রাজনৈতিক দলের পেজের ফলোয়ার সংখ্যাকে মাত্র কয়েকদিনের আত্মপ্রকাশেই ছাপিয়ে গেছে। মূলত তরুণরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন৷ আরশোলাদের গান, তাঁদের চিহ্ন, তাঁদের স্লোগানের পর, আত্মপ্রকাশের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই এসেছিল তাঁদের দাবি সনদ। এখনও তরুণ-তরুণীরা নানা বিষয়ে ভিডিও দিচ্ছেন। কমেন্টে তা নিয়ে আলোচনা করছেন আরও অনেক তরুণ-তরুণী। রিল পেরিয়ে রিয়ালেও আরশোলাদের দেখা যাচ্ছে। কেউ নদী পরিষ্কার করছেন আরশোলা মুখোশ পরে। কেউ দেওয়াল লিখছেন। দাবি সনদ ও আলোচনার অভিমুখ খুবই প্রত্যাশিত— সেই বেকারত্ব, যাকে কেন্দ্র করে বিচারকের মন্তব্যটি ছিল। দাবিদাওয়া আর আলোচনাগুলি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, কাদের ক্ষোভ, কেনই বা এই ক্ষোভ? সেই বারুদের হদিশ পাওয়া যায়, যাতে বিচারপতি ভুল করে অগ্নিসংযোগ করে ফেলেছেন। বস্তুগত কারণগুলি মূলত হল: বেকারত্ব, নিয়োগে অনিয়ম, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস আর সরকারি চাকরির সংকট। প্রধান বিচারপতি যতই পরবর্তী সময়ে বলুন না কেন যে, তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে, তিনি নাকি সাধারণ বেকার যুবক যুবতীদের কথা বলছিলেন না, বলছিলেন জাল ডিগ্রিধারীদের কথা, তবু বহু তরুণ-তরুণী মনে করছেন, তাঁদের হতাশাকে, তাঁদের জীবনের অনিশ্চয়তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। মানুষকে পোকামাকড়ের সঙ্গে তুলনা করে হেয় করার প্রচেষ্টা নতুন নয়। কিন্তু সেই অপমানের চেয়ে যেন বেশি করে বেজেছে তাঁদের সমস্যার প্রতি অন্ধত্ব। সুতরাং, কেন এত অসন্তোষ, এর উত্তর খুঁজতে গেলে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে না তাকিয়ে উপায় নেই।
বিশ্বের মধ্যে ভারত এমন অন্যতম বৃহৎ যুব জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশ। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। অনেক বেশি জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, ডিপ্লোমা এবং পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করছেন। কিন্তু কর্মসংস্থানের মান বা পরিমাণ সেই হারে বাড়েনি।
সরকারি পরিসংখ্যানে অবশ্য রাস্তার দোকানদার বা গিগ অর্থনীতির ‘ডেলিভারি পার্টনার’-রাও ‘কর্মরত।’ কিন্তু আড়ালের কথাটি হল: কাজের অভাব যত আছে, তার চেয়ে ঢের বেশি প্রকট নিরাপদ, স্থায়ী এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের অভাব। ডেলিভারি কর্মীর কাজের কোনো দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নেই। ফুটপাথের হকার আজ কর্মরত, কিন্তু আগামীকাল উচ্ছেদ হয়ে যেতে পারেন। যে চাকরিগুলোকে একসময় স্থায়ী মনে করা হত, যেমন সরকারি চাকরি, সেগুলো দুর্লভ হয়ে উঠছে। একজন স্নাতক বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে কার্যত আমরণ বেকার জীবন কাটাতে পারেন। হয়ত এই জায়গায় কার্ল মার্কসের ‘রিজার্ভ আর্মি অব লেবার’-এর ধারণা এখনও প্রাসঙ্গিক। মার্কস দেখিয়েছিলেন, আধুনিক অর্থনীতি প্রায়ই এমন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী তৈরি করে, যারা কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকে বা অস্থায়ী, অসন্তোষজনক কর্মজগতে আটকে থাকে। এর ফলে সীমিত সুযোগের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। পুঁজিবাদ ইচ্ছে করেই এই প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখে। সমকালীন ভারতে অবশ্য মার্কসের সময়কার সরল শিল্প-পুঁজিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটছে না, কিন্তু শিক্ষিত যুবকদের অভিজ্ঞতার মধ্যে তাঁর বিশ্লেষণের কিছু প্রতিধ্বনি স্পষ্টভাবে শোনা যায়। সরকারি চাকরির জন্য বিপুল প্রতিযোগিতা তার একটি উদাহরণ। কয়েক হাজার শূন্যপদের জন্য লক্ষ লক্ষ আবেদন জমা পড়ে। বহু পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। তারপর হয় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নয় পরীক্ষা বাতিল, নয় নিয়োগে দীর্ঘ বিলম্বের সম্মুখীন হন। বিরোধী দল ‘প্রশাসনিক ব্যর্থতা’ বলে হাত ধুয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু কর্মপ্রার্থীরা যাবেন কোথায়? তাঁদের জীবনের মূল্যবান বছরগুলো হারিয়ে যায়।
প্রায়শ দাবি করা হয়, ভারত বিশ্বের দ্রুততম উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলির একটি। কিন্তু জিডিপি এবং কর্মসংস্থান এ দেশে সবসময় সমান তালে এগোয় না। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে, অথচ এর ফলে তুলনামূলকভাবে কম মানুষের কর্মসংস্থান ঘটতে পারে। বলা ভাল, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের ফলে কর্মসংকোচনও হতে পারে। ফলে জিডিপি বাড়লেও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে না। এ’হেন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরির আকর্ষণ আরও বেড়েছে। অবশ্য আগেও জনমানসে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে সরকারি চাকরি শুধু আয়ের উৎস নয়, তা সামাজিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং মর্যাদারও প্রতীক। কিন্তু সরকারি চাকরিই বা কোথায়? তাও এখন হয়ে গেছে সাময়িক ও চুক্তিভিত্তিক। বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বাড়ছে না, তা নয়। কিন্তু তার বড় অংশ চিরকালই ছিল চুক্তিভিত্তিক, অস্থায়ী বা অনিশ্চিত। তার উপর বেশিরভাগ বেসরকারি চাকরিতে পেশাগত বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম, মাইনেও কহতব্য নয়। সরকারি কলেজ শিক্ষক যা মাইনে পান, তাঁর চুক্তিভিত্তিক সহকর্মী পান তাঁর চার ভাগের এক ভাগ, একই সরকারের থেকে। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একজন মোটামুটি সিনয়র স্কুলশিক্ষকের থেকে কম মাইনে পেতে পারেন। সামঞ্জস্যের এক বিরাট অভাব পুরো ব্যবস্থা জুড়ে। এদিকে আবার শিক্ষিত মেয়েদের জন্য পরিবারে থাকে অদৃশ্য নিয়ম, যে চাকরিতে স্থায়ীত্ব নেই, মর্যাদা নেই, মাইনে বেশি নয়, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট নয়, সে কাজ করার থেকে ঘর সামলানো নাকি ঢের ভাল। তাই কাজের জগৎ থেকে ছেলেদের থেকেও দ্রুত হারিয়ে যেতে পারেন মেয়েরা।
ফলে ডুমুরের ফুল স্থায়ী সরকারি চাকরিটি এখনও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার শেষ নির্ভরযোগ্য পথ বৃহৎ যুবগোষ্ঠীর কাছে। এদিকে আবার, সরকারি চাকরিও যে সরকারেরই দুর্নীতির দোষে চলে যেতে পারে, এও ভারতীয় যুবসমাজের নতুন অভিজ্ঞতা। বার্ধ্যক্যে পেনশন যে সরকারি কর্মীর হক নয়, এই নতুন বাস্তবতার সম্মুখীনও আমরা সদ্য হচ্ছি। ফলে, মার্ক্স যাকে বলেন ‘এলিয়েনেশন’, সম্পদ ও উৎপাদকের মধ্যে ব্যবধান জনিত একাকীত্ব ও হতাশা, তাকে এই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আমার কাছে বৌদ্ধিক সম্পদ আছে, কিন্তু পাচ্ছি না তার উপযুক্ত মর্যাদা, এর থেকে হতাশা জন্ম নেওয়াই স্বাভাবিক।
মর্যাদার প্রশ্নই যখন উঠল, তখন বলে রাখা ভাল, শুধু অর্থনীতি দিয়ে এই ক্ষোভের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হয় না। আত্মমর্যাদার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আব্রাহাম মাসলোর ‘হায়ারার্কি অফ নিডস’-এর’ তত্ত্বটিও মনে করা যেতে পারে। মাসলো দেখিয়েছিলেন, মানুষের চাহিদা শুধু খাদ্য ও জীবিকা নয়, নিরাপত্তা, আত্মসম্মান, সামাজিক স্বীকৃতি এবং আত্মপ্রতিষ্ঠাও তার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী কর্মসংস্থান কেবল বেতন দেয় না। তাই কর্মসংস্থানের সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, মর্যাদার সংকট তৈরি করে। আর এই আত্মমর্যাদার জায়গাতেই ‘আরশোলা’ উপমাটি আঘাত করে ফেলেছিল। যে প্রজন্ম ইতিমধ্যেই অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা এবং উদ্বেগের মধ্যে বাস করছে, তাঁদের মাথায় এই মন্তব্য এসে পড়েছিল ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে। তাদের প্রতিবাদের ভাষ্য তাই সোজাসাপটা: আমার এই আরশোলাত্বর জন্য আমিই কি দায়ী? নাকি দায় রাষ্ট্রের? আমাকে কাজ দেওয়ার দায় রাষ্ট্রের নয় কেন? এ যেন নতুন এক ধরনের ভিক্টিম ব্লেমিং— কাঠামোগত সমস্যার শিকার মানুষদেরই সমস্যার উৎস হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এই জায়গায় পিয়ের বুর্দিয়ুর ধারণাও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বুর্দিয়ুর মতে, শিক্ষা এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’। ব্যক্তি সময়, শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করে শিক্ষা অর্জন করে, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে এই পুঁজি একদিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপান্তরিত হবে। ভারতের অসংখ্য পরিবার সেই বিশ্বাস নিয়েই সন্তানদের পড়াশোনায় বিনিয়োগ করে। কিন্তু পড়াশোনা প্রত্যাশিত সুযোগ এনে দিতে পারছে কই? পিয়েরো আরও বলেন ‘স্বীকৃতির রাজনীতি’-র কথা। বুর্দিয়োর মতে, সমাজে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদই গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতীকী ক্ষমতা—অর্থাৎ কে সম্মান পাবে, কাকে যোগ্য বলে মনে করা হবে, কার কথা গুরুত্ব পাবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা। বিচারপতি নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন তরুণ সমাজকে অন্তত মৌখিক অস্বীকৃতির আঁধারে ঠেলে দিতে, তাই তাঁদের রাগ।
অথচ সমকালীন জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তরুণের শিক্ষা ও কাজ, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের যে ফাঁক— তার প্রভাব স্পষ্ট। ধরা যাক, ‘পঞ্চায়েত’ নামক জনপ্রিয় সিরিজটির কথা। অভিষেক ত্রিপাঠী একজন ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক। বেকার নন, কিন্তু যে পেশাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তাঁর বাস্তব জীবন তার সঙ্গে মেলে না। তাঁর হতাশা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার নয়; বরং শিক্ষা ও সুযোগের মধ্যকার ব্যবধানের প্রতিফলন। একইভাবে ‘হোমবাউন্ড’ নামক বহু-আলোচিত চলচ্চিত্রের দুই চরিত্র একটু সামাজিক স্থিতিশীলতা, একটা সম্মানজনক জীবন খুঁজছে। একটা সরকারি চাকরি পেলেই আকাশের চাঁদ হাতে আসে। তাদের একজনের বর্ণগত ও আরেকজনের সংখ্যালঘুতাজনিত প্রান্তিকতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে ঠিকই, কিন্তু কাহিনিটি যুবসমাজের স্বপ্ন তাড়া করে ক্লান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাকে ঘিরেই ঘুরপাক খায়৷ সরকারি চাকরি প্রার্থী দুই শিক্ষিত বেকার ছেলে সুতোকলের শ্রমিক হয়ে যায়। একজন পরীক্ষায় পাশ করেছিল। কিন্তু নিয়োগে এত দেরি হয় যে সে শ্রমিক হতে বাধ্য হয়। কর্মসংস্থান হয়, কিন্তু মর্যাদা মেলে না। জীবনে স্থায়ীত্ব আসে না। এই প্রেক্ষাপটেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র উত্থান। একে শুধু এক ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড হিসেবে দেখা ভুল হবে।
এর জনপ্রিয়তার আরেক বড় কারণ, এটি অপমানকে পরিচয়ে রূপান্তর করেছে। পরিচিতির রাজনীতি এভাবেই ঘটেছে ইতিহাসে বারবার। প্রান্তিক গোষ্ঠী অপমানজনক অভিধাকে নিজেদের প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছে। এখানেও সমর্থকেরা ‘ককরোচ’ শব্দটিকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং তার অর্থ উল্টে দিয়েছেন। যে পতঙ্গকে অবাঞ্ছিত বলে মনে করা হয়, তাকে তাঁরা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার প্রতীকে পরিণত করেছেন।
ভারতের যুবসমাজ করুণা চান না, সুযোগ চান। তাঁরা উপহাস নয়, স্বীকৃতি চান। এমন সমাজ চান, যেখানে শিক্ষা, পরিশ্রম এবং যোগ্যতা বাস্তবিক অর্থেই উন্নতির পথ খুলে দিতে পারে। এ খুব বেশি চাওয়া নয়।











