২৫শে জুন। কলকাতা হাইকোর্টে অভয়া মামলার বহু প্রতীক্ষিত শুনানি ছিল।
গত শুনানিতে মাননীয় হাইকোর্ট সিবিআইকে নতুন করে SIT গঠন করে তদন্তের অগ্রগতি রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর গত কয়েক সপ্তাহে তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দেখা যায়। দীর্ঘদিনের দাবির পর আর জি কর হাসপাতালের বিতর্কিত OT Complex-এর Instrument Room-এর ভিডিওগ্রাফি সম্পন্ন হয়। আর জি কর হাসপাতাল ও পানিহাটি শ্মশানে গিয়ে নতুন করে একাধিক ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। দীর্ঘদিনের দাবি মেনে সাসপেন্ড হওয়া তিন পুলিশ আধিকারিক অভিষেক গুপ্তা, ইন্দিরা মুখার্জি ও বিনীত গোয়েলকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর হয়তো তদন্ত নতুন করে সঠিক পথে এগোতে শুরু করেছে।
কিন্তু আজ সিবিআই যে রিপোর্ট আদালতে পেশ করেছে, তাতে সেই অগ্রগতির কোনও প্রতিফলনই দেখা গেল না। এমনকি মাননীয় বিচারপতিরা প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকেই স্পষ্ট, তদন্তের গতি ও অগ্রগতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ সরাসরি মন্তব্য করেছেন যে এই মামলায় সিবিআই “গা-ছাড়া মনোভাব” দেখাচ্ছে। চার্জশিট দাখিলের প্রায় এক বছর সাত মাস পরেও তদন্তের এই অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ায়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হল, একজন নির্বাচিত বিধায়িকাকেও আদালতে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে যে সিবিআই-এর হাত কেউ বেঁধে রেখেছে। দেশের সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থাকে নিয়ে এর চেয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য আর কী হতে পারে?
আমরা বারবার মনে করিয়ে দিতে চাই, এই তদন্ত ও মামলার নিষ্পত্তি এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি শুধু অভয়ার পরিবার বা সহকর্মীদের দাবি নয়। এই দাবি বাংলার মানুষের দাবি। এই দাবি সেই ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে অংশগ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের দাবি। এই দাবি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ন্যায়বিচারের পক্ষে সরব হওয়া প্রতিটি মানুষের দাবি।
সিবিআই-এর অকর্মণ্যতা বহু আগেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। খুন ও ধর্ষণের প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে গ্রেফতার সন্দীপ ঘোষ ও টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলের বিরুদ্ধে এতদিনেও কোনও সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দাখিল করা যায়নি। তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন।
আরও বড় প্রশ্ন হল, যদি আজ নতুন SIT-কে আবার আর জি কর হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে যেতে হয়, যদি পানিহাটি শ্মশানে গিয়ে নতুন করে সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে হয়, যদি বহু মানুষকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়, তাহলে গত দুই বছর ধরে তদন্তকারী সংস্থা ঠিক কী করছিল?
আজকের শুনানিতে আদালত আরও স্পষ্ট করেছে যে নবগঠিত SIT-এ আগের তদন্তকারী আধিকারিকদের রাখা যাবে না। এই পর্যবেক্ষণ নিজেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মধ্যেই প্রতিফলিত হচ্ছে তদন্তের পূর্ববর্তী ধাপগুলি নিয়ে আদালতের অসন্তোষ এবং নতুন করে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা।
দীর্ঘ জনমতের চাপ, লাগাতার আন্দোলন এবং নিরন্তর আইনি লড়াইয়ের পর যখন হাইকোর্টের বেঞ্চকে সিবিআইয়ের তদন্তের ধরন নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলতে হয়, যখন আদালতকে পর্যন্ত বলতে হয় যে তদন্তকারী আধিকারিকরা আদালতের নির্দেশ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন পরিস্থিতির গুরুত্ব আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।
আমরা সত্য চাই।
আমরা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাই।
আমরা শুধু অপরাধীদের শাস্তি নয়, তদন্তে ব্যর্থতা, গাফিলতি বা ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তার জন্য দায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির জবাবদিহিও চাই।
হাইকোর্ট নবগঠিত SIT-কে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও সময় দিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে ৬ আগস্ট। আগামী শুনানির আগে তদন্তে প্রকৃত অগ্রগতি, নতুন তথ্য এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলির উত্তর সামনে আসবে বলেই আমরা আশা করি। বাংলার মানুষ সেই জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
#wbjdf #justiceforabhaya #CBI #HighCourt











