একটার পর একটা প্রতিশ্রুতি, কিন্তু অর্থ নেই। এমন জুমলার বাজেট ইতিহাসে কোনো দিন দেখেনি বাংলা।
দেখা যাক,এই সরকারের বাজেট কতটা প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবের ফারাক ঘটাচ্ছে। বাজেট প্রস্তুতি পর্বে জনকল্যাণ কর্মসূচি শিবির থেকে যত ফর্ম দিয়েছে সেই সব সামাজিক প্রকল্পে বরাদ্দ ততই কমিয়েছে।ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, সকল লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রাপককে দেবে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ভাতা, ক্ষমতায় আসার পর তাই নিয়ে দশ বার দশ রকম শর্ত দিয়ে শেষে বাজেটে বরাদ্দ মাত্র ৩৬ হাজার কোটি, তাই দিয়ে ৩ হাজার করে ৮ মাসে দেওয়া যাবে ১.৫ কোটি মহিলাকে, অর্থাৎ আগের সরকারের সময়ে যে ২.৪২ কোটি পেতেন, তার থেকে ৯০ হাজার মহিলা বঞ্চিত হবেন। একই কথা যুব সাথী প্রকল্প নিয়ে। সে প্রকল্পটিকে নিয়ে কোনো কথাই হল না, বদলে একটি প্রকল্পের কথা বলা হল, তার নাম ভরসা। সেই প্রকল্পের জন্য কর্মহীন গ্র্যাজুয়েটরা পাবে ৩ হাজার, আর কর্মহীন নন গ্রাজুয়েটদের জন্য ২ হাজার। পূর্বতন সরকারের কাছে যুব সাথী প্রকল্পের জন্য আবেদন করেছিলেন ৮২ লক্ষ যুব, তাদের সকলকে ন্যূনতম ২ -৩ হাজার করে দিতে হলেই বরাদ্দ করতে হতো মাসে প্রায় ২ কোটি করে আগামী ৮ মাসের জন্য ন্যূনতম ১৫-১৬ কোটি, কিন্তু ভরসা প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ এখানেও বাদ যাবে ৮০% যুব।
আরও আছে। এই বাজেটে বিশাল বিশাল প্রতিশ্রুতি আছে, বরাদ্দ নেই। যেমন ১ লক্ষ চাকরি, নতুন বিমানবন্দর, নতুন জেলা। বলা হল এসব করা হবে, কিন্তু বরাদ্দ এত সামান্য যে প্রয়োজনের দশ শতাংশ হবে না। বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক ঘোষণা করা হলেও প্রত্যেকটির জন্য আলাদা করে কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, তা বাজেটের সারাংশে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি। কোনও সরকার নতুন প্রকল্প বা চাকরির প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, কিন্তু তার সম্পূর্ণ আর্থিক দায় এক বছরের বাজেটে দেখানো নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ব্যয় ধাপে ধাপে বিভিন্ন দপ্তরের বাজেটের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। এই বাজেটে চার লাখ কোটি টাকার সামান্য বেশি বহর। তবু স্পষ্ট করে তার উল্লেখ নেই।
একটা বাজেট শুরু থেকেই অস্পষ্টতায় ভরা। যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল তার জন্য বরাদ্দ যৎসামান্য। নব্বই শতাংশ প্রকল্প অর্থ সংস্থানহীন। বাজেটের আয় ও ব্যয়ের প্রস্তাবিত চিত্রের সঙ্গে মেলে না প্রস্তাব।
রাজস্ব ঘাটতি কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কী করে সেটা হবে বলা হয়নি। ব্যয়ের চাইতে আয় বাড়লে যে উদ্বৃত্ত তৈরি হয় তাই দিয়ে মূলধনী ব্যয় করা যায়, তখন উন্নয়নের পরিকাঠামো তৈরি হয়। বাজেটে উন্নয়নের জন্য লগ্নির পরিবেশ গড়ে তুলতে কেন্দ্রের টাকা, প্রকল্প দিয়ে করার কথা বলা হয়েছে। তাতে কর্মসংস্থান ঘটবে। বিভিন্ন রেল প্রকল্পে ও ফ্রেইট করিডর তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে, উত্তরবঙ্গে আইআইটি, আইআইএম, শিলিগুড়িতে আইটি পার্ক, মেট্রো রেল, এই ধরনের উন্নয়ন কেন্দ্রের অর্থে হবে। ক্ষমতায় এসে বিজেপি যে বাজেট পেশ করেছে তাতে বেশিটাই কেন্দ্রীয় প্রকল্প নির্ভর, নিজের খরচ সেসব ক্ষেত্রে অর্ধেক বা আরও কম। নিজস্ব সূত্রে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব নেই। পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, এই বাজেটে পুরোনো ঋণ আর কিস্তিতে খরচ হবে শতকরা ৩৭ টাকা। হাতে থাকবে শতকরা ৬৩ টাকা। তাই দিয়ে বেতন, ভাতা, নিয়মিত নিয়মমাফিক খরচ করে যা সামান্য কিছু থাকে তাই দিয়ে এত কিছু বাস্তবে হবে? সম্ভাবনা কম। তাই এর এডডিবি ও বিশ্ব ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঋণের উপর ঋণ জমতে জমতে রাজ্য ক্রমশ ঋণের চক্রে জড়িয়ে পড়তে চলেছে। বাজেটে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের আনুপাতিক পরিমাণ হ্রাস হবে এক দশমিকেরও কম বলে জানানো হয়েছে।
বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ প্রস্তাব ৪.৩৮ লক্ষ কোটি টাকা, তাতে রাজস্ব ঘাটতি এস জিডিপি-র ১.০২%-এ নেমে এসেছে (যা আগে ২.০৭% ছিল।) আর্থিক ঘাটতি জিডিপি-র ২.৯১%-এ নেমে এসেছে। সামগ্রিক ঋণের বোঝা প্রায় ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকা তবে ঋণের অনুপাত (Debt-to-GSDP) ৩৭.৯৮%-এ নেমে আসার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। সবটাই প্রস্তাবিত, কীভাবে হবে জানানো হয় নি। সম্ভবত রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রের প্রকল্প চালু করার বহু প্রস্তাব বাজেটে রাখা হল যাতে কেন্দ্রের টাকায় প্রকল্প চালিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়। সেজন্য কৃষক কল্যাণ থেকে স্বাস্থ্য ক্ষেত্র, আবাস যোজনা, সড়ক পরিবহন, বিমান বন্দর থেকে শিল্প পরিকাঠামো সবেতেই কেন্দ্রীয় প্রকল্প! যে কথা ঘোষণা হয় কেন্দ্রের বাজেটে সেটাই রাজ্যের বাজেট ভর্তি করে ছাড়া হল। কেন্দ্র রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে নেই ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে রাজ্যের স্বাধিকার, বদলে কেন্দ্রের সহায়তায় রাজ্যকে টেনে নিয়ে যাওয়া! এরই নাম ডবল ইঞ্জিন যেখানে রাজ্য নিজ অর্থে বিকশিত হয় না, কেন্দ্রের কল্যাণে চলে!
কৃষকদের জন্য বার্ষিক ৩,০০০ টাকার আর্থিক সহায়তা এবং কেন্দ্রীয় ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সাথে অতিরিক্ত ২০০ টাকা ইনসেনটিভ ঘোষণা করা হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ২৪,৭৫৩.৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে,আয়ুষ্মান ভারত কার্যকর করার জন্য ৩,১০০ কোটি টাকা এবং বিনামূল্যে/কম খরচে জীবনদায়ী ওষুধের জন্য জনঔষধি কেন্দ্র খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, রাজ্যে তৈরি হবে নতুন এইমস-সহ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল — সব কেন্দ্রের টাকায়!
বাজেটে গুচ্ছ গুচ্ছ পরিকাঠামো ও প্রকল্প নির্মাণের কথা বলা হল যাদের জন্য মাটি ফেলার টাকাটাও বরাদ্দ হয়নি।
রাজ্যকে ঘুরে দাঁড় করানোর কোনো ভাবনা নেই। নেই অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সঙ্গে ঋণের অনুপাত কমিয়ে রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো উদ্যোগ। এই বাজেট পূর্বতন সরকারের ভাবনায় জনপ্রিয় হতে চেয়ে আরও রাজ্যকে গাড্ডায় ফেলার যাত্রা! বেসরকারি কর্পোরেট দিয়ে শিল্পায়নের নামে জমির সিলিং তুলে জমি কেড়ে নিয়ে প্রান্তিক চাষিদের পথে বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এই বাজেট সর্বোতভাবে কৃষক শ্রমিক বিরোধী কর্পোরেট স্বার্থে তৈরি, উন্নয়নের শরিক করা হয়েছে সরকারি কর্মী আর উচ্চ মধ্যবিত্তকে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দ ৬০% কমিয়ে রাজ্যে হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলতে ধর্মীয় পর্যটনের পরিকল্পনা ও সাংস্কৃতিক উদযাপন, এই হোক বিজেপির নতুন বাংলা গড়ার রূপরেখা!










