বড়ো পাপ হে: স্বাধীনতার আগে পরে ভারতের সবচাইতে শিল্পোন্নত রাজ্য যা কর্মসংস্থানের জন্য সারা ভারতের কর্ম প্রার্থীদের আহ্বান করত, আমাদের সেই রাজ্য বাংলা (অবিভক্ত) এবং পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ, বিভিন্ন কারণে ক্রমশঃ রুগ্ন ও অশান্ত হয়ে তিন দশকের মধ্যেই দেশের একটি পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র সমস্যাদীর্ণ সংকটময় রাজ্যে পরিণত হল।
এর বহুবিধ কারণ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
(১) যে হুগলী নদী নির্ভর বৃহত্তর কলকাতা – হাওড়া শিল্পাঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে তার মধ্যে চরা পড়ে নাব্যতা কমিয়ে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর দুর্বল হয়ে পড়া, বিপরীতে পূর্ব ভারতীয় উপকূলের ওড়িশার পারাদ্বীপ এবং অন্ধ্রের ভাইজাগ সমুদ্র বন্দরের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশ;
(২) বিভিন্ন কৃত্রিম তন্তুর আবিষ্কারের ফলে বাংলার বৃহত্তর পাট শিল্পে ধাক্কা এবং প্রাচীন চটকল গুলি রুগ্ন হয়ে পড়া;
(৩) সময়ের সঙ্গে ও প্রযুক্তির পরিবর্তনে পুরনো ধাঁচের বিস্তৃত ম্যানুফ্যাকচারিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, ফাউন্ড্রি, টেক্সটাইলস, চর্ম, ওষুধ, রাসায়নিক প্রভৃতি শিল্পগুলির পিছিয়ে পড়া;
(৪) কেন্দ্রের অবাঙালি নেতৃত্বের ধারাবাহিক বঞ্চনা ও অসহযোগিতা;.
(৫) কেন্দ্রের তদানীন্তন মাসুল সমীকরণ নীতি;
(৬) দেশের পশ্চিম উপকূলে মুম্বাই ও কান্দলা বন্দর ও মহারাষ্ট্র – গুজরাত শিল্পাঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধি;
(৭) পূর্ব ভারত থেকে পুঁজির পশ্চিম ভারতে স্থানান্তর;
(৮) পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ করে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭ অবধি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা;
(৯) ১৯৭০ – ‘৭২ পর্যায়ে রাজ্যজুড়ে নৈরাজ্যবাদী হিংসা এবং নিষ্ঠুর রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা ও দমনপীড়ন;
(১০) দায়িত্বহীন একাংশ শ্রমিক ইউনিয়ন এবং আত্মঘাতী শ্রমিক আন্দোলন;.
(১১) সামগ্রিক শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্কৃতির ব্যাপক অবনতি;.
(১২) নোংরা রাজনীতি এবং ক্রমাগত বন্ধ, ঘেরাও, লক আউট, লে অফ, ক্লোজার, কর্ম দিবস নষ্ট;
(১৩) এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও দালালের উত্থান এবং অবশিষ্ট শিল্পগুলি ধ্বংস;
(১৪) শিল্প কারখানার জমিতে প্রমোটিং এবং নির্মাণের লাভজনক ব্যবসা;
(১৫) ইসলামি পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক নৃশংস অত্যাচারের কারণে কয়েক কোটি বাঙালি হিন্দুর উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতে পালিয়ে আসা এবং সামগ্রিক জনসংখ্যা, জমি, নাগরিক পরিষেবা ও অর্থনীতির উপর চাপ বৃদ্ধি।
ঈশান কোণে ঝড় – প্লাবন: এরপর ১৯৭৭ থেকে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক স্থিরতা ও সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় থাকলেও সঠিক, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শ্রম ও শিল্পনীতি এবং উদ্যোগের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও অর্থনীতির ধারাবাহিক অবনতি চলতেই থাকে। বামফ্রন্টের শেষ দিকে জমি আন্দোলন এবং অচলাবস্থার পরিবর্তনের ডাক দিয়ে, বামফ্রন্টের অদক্ষ ও অপশাসনের সুযোগ নিয়ে, তৃণমুল নামক লুম্পেন দলটি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় চলে আসে এবং দীর্ঘ ১৫ বছর শাসন ক্ষমতা চালায়। এইসময় তাদের মন্ত্রী-নেতা-কর্মীবাহিনী র নৈরাজ্য ও সীমাহীন লুটপাট এবং তার সঙ্গে ধার করে উপভোক্তা ভোটারদের কিছু ডোল প্রদান পশ্চিমবঙ্গের রুগ্ন অর্থনীতিকে একেবারে ঋণগ্রস্ত ঝরঝরে অর্থনীতিতে পরিণত করে।
মেকি লড়াই আর কাজে ফাঁকি: বাম ও তৃণমূল শাসন মিলিয়ে এই ৪৯ বছরে আরেকটি অদ্ভুত বিষয় দেখা যায় যে পশ্চিমবঙ্গে যা ভূ ভারতে কোথাও দেখা যায়না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রের শাসক দল কংগ্রেস ও রাজ্যের প্রধান শাসক দল সিপিআই এমের এবং পরবর্তীকালে বিজেপি ও তৃণমূলের প্রবল বোঝাপড়া সত্ত্বেও এই দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে রাজ্যের ভোট রাজনীতির কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার গুলির মধ্যে প্রবল ও অবিরত দ্বন্দ্ব এবং যার ফলে নির্ধারিত কেন্দ্রীয় আর্থিক ও প্রকল্পগত বরাদ্দ গুলি ঠিকমত না পাওয়া। তৃণমূল সরকার আবার প্রধানমন্ত্রীর নাম যুক্ত সহ প্রতিটি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বিপ্রতীপে রাজ্যের সীমিত আর্থিক বরাদ্দ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর নামে একের পর এক নিজস্ব প্রকল্প সৃষ্টি করে আর্থিক বোঝা বাড়ায়। তাদের ‘সবজান্তা’ নেত্রী শিয়ালদা-সেন্ট্রাল-বিবাদি বাগ রুটে মেট্রো প্রকল্পের নকশা পাল্টে উক্ত মেট্রো প্রকল্পে এবং বউবাজার অঞ্চলে বিপর্যয় ও দেরি ডেকে আনে। চিংড়িহাটার সামান্য মেট্রো সংযোগের কাজ দীর্ঘদিন আটকে রেখে, এমনকি রাজ্যের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে সুপ্রিম কোর্টে এই কাজের বিপক্ষে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন এবং জনস্বার্থের অভাবনীয় ক্ষতি করে। কংগ্রেস আমলে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া, বাম আমলে অবনমনের পথে যাওয়া যাবতীয় কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বিনোদন শিল্প, সংস্কৃতি একেবারে ধ্বংস হয়ে রসাতলে চলে যায় তৃণমূল অপশাসনে। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ওঠে সারা দেশ এমনকি বিদেশে পরিযায়ী-ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক ও কর্মচারী সরবরাহের কেন্দ্র।
জল্লাদের উল্লাস ক্ষেত্র: এরসঙ্গে রাজনৈতিক সন্ত্রাস, হিংসাময় নির্বাচন, আইন শৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি ও মহিলাদের বিরুদ্ধে সহ সার্বিক অপরাধের বৃদ্ধি, সর্বস্তরে দুর্নীতি ও কাটমানি, দলদাস অসহযোগী পুলিস – প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দুর্নীতি ও নাগরিক অসহযোগিতা, সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের ঢেউ, জনমিতির পরিবর্তন, রাষ্ট্র পোষিত ধর্মীয় পুনরুত্থান এবং সম্প্রদায়িক বিভাজন ও একের পর এক সম্প্রদায়িক দাঙ্গা, এক অজ্ঞ স্বৈরাচারী খামখেয়ালি মুখ্যমন্ত্রী এবং তার তালেবর ও ডাকাত ভাইপোর ইচ্ছামাফিক রাজ্যপাট পরিচালনা ইত্যাদি পশ্চিমবঙ্গকে এক সর্বগ্রাসী অন্ধকারে নিমজ্জিত করে ফেলে।
সব কিছু খারাপ নয়: অথচ এরকমটি হওয়ার কথা ছিল না। স্বাধীনতার পরে দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী জাতীয় কংগ্রেস নেতা ডা: বিধানচন্দ্র রায় এর ১৪ বছরের শাসনকালে (১৯৪৮-‘৫০ প্রিমিয়ার এবং ১৯৫০-১৯৬২ মুখ্যমন্ত্রী) পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়নের সমাহার ঘটে। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের বিতর্কিত শাসনের সময়েও (১৯৭২-‘৭৭) সল্ট লেক স্টেডিয়াম, দ্বিতীয় হুগলী সেতু, ভারতে প্রথম মেট্রো রেল, নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়াম ও বিশ্ব টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ, শিয়ালদা উড়ালপুল প্রভৃতি রূপায়িত হয়। বামফ্রন্টের শেষ লগ্নে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শহর জুড়ে উড়ালপুল গড়েন এবং সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষিজমিতে শিল্পায়নের উদ্যোগ নিয়ে বিরোধীদের বাধায় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন।
পশ্চিমবঙ্গের সংক্ষিপ্ত নির্বাচনী ইতিবৃত্ত: ১৯৪৭ এ স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে ১৮ বার নির্বাচিত সরকার (দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার সহ) ক্ষমতায় এসেছে এবং চারবার রাষ্ট্রপতি শাসন বলবৎ হয়েছে (১৯৬৯, ‘৭১, ‘৭২ ও ‘৭৭)। ১৯৪৭ থেকে ‘৬৭ মনোনীত ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে (প্রিমিয়ার ১৯৪৭-‘৪৮) সরকারের পর দুবার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় (১৯৫২ ও ‘৫৭) এবং একবার প্রফুল্লচন্দ্র সেনের (১৯৬২) নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেসের সরকার নির্বাচিত হয়। এরপর কৃষি, খাদ্য, উদ্বাস্তু, শিল্প, রাজনৈতিক (১৯৬৭-‘৭২ নকশাল আন্দোলন, ১৯৭০-‘৭১ বাংলাদেশ যুদ্ধ, ১৯৭৫-‘৭৭ জরুরি অবস্থা সহ) বিভিন্ন কারণে জনজীবনের সংকট কে ঘিরে বাম সহ বিবিধ দলের আন্দোলন – বিক্ষোভ ১৯৬৭ থেকে ‘৭৭ অবধি পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে এবং এই সময় চারটি স্বল্পায়ু সরকার গঠিত হয়। ১৯৬৭ তে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেস ও বামদের নির্বাচিত প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার, ১৯৬৭-‘৬৮ ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে মনোনীত পিডিএ সরকার, ১৯৬৯-‘৭০ পুনরায় অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নির্বাচিত দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং ১৯৭০ এ আবার অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মনোনীত পিডিএস সরকার। ১৯৭২ এর বিতর্কিত নির্বাচনের পর সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে আবার জাতীয় কংগ্রেস সরকার।
দক্ষিণ ইউরোপের সান মারিনোর পর দীর্ঘতম নির্বাচিত বাম সরকার: ১৯৭৭ থেকে ২০১১ অবধি পাঁচ বার সিপিআইএম নেতা জ্যোতি বসু (১৯৭৭, ‘৮২, ‘৮৭, ‘৯১ ও ‘৯৬) এবং দুবার সিপিআইএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য র (২০০১ ও ‘০৬) নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার গঠনের মাধ্যমে ৩৪ বছরের দীর্ঘ বাম শাসন। স্থিতাবস্থার এক রেজিমেন্টেড সমাজগণতান্ত্রী শাসন যার শেষ দিকে প্রবল অবক্ষয় ও জনবিরোধী ভূমিকা।
পরিবর্তন এবং পরিবর্তনের পরিবর্তন: তারপর ২০১১ – ‘২৬ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তিন বার নির্বাচিত তৃণমূল সরকার এবং ২০২৬ এ নির্বাচিত প্রথম বিজেপি সরকার। বামফ্রন্ট ও তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কোন নির্বাচন যে নিরপেক্ষ হয়েছে কেউ বলবেনা, তার উপর তৃণমূল আমলে নির্বাচনে হিংসা, সন্ত্রাস, বিরোধীদের খুন ধর্ষণ উৎখাত ইত্যাদির ঘটনা বহুগুণ বেড়ে যায়। আর সামগ্রিকভাবে একবারে উপরতলা থেকে নিচুতলা অবধি পুকুর চুরি, লুঠ, তোলাবাজি; বিশৃঙ্খল অপরাধময় অপশাসন, অপসংস্কৃতি এবং অনুন্নয়ন পশ্চিমবঙ্গকে সব দিক দিয়ে পিছিয়ে দেয়, প্রচলিত ব্যবস্থা গুলিকে ধ্বংস করে দেয়, রাজ্যকে বিশাল ঋণের সখাত সলিলে নিক্ষেপ করে এবং দুটি প্রজন্মের ভবিষ্যত অন্ধকার করে দেয়। নেশার দ্রব্য মদ হয়ে ওঠে তৃণমূল শাসনের প্রধান রাজস্ব।
বিজেপি – আর এস এসের উত্থান: একদিকে এই অমানিশা, সেই কারণে মানুষের ক্ষোভ হতাশা, বিজেপি – আরএসএসের ধারাবাহিক প্রচার, তৃণমূল – বাম – কংগ্রেসের মুসলমান ভোটব্যাংককে তৈলমর্দনের বিরূদ্ধে হিন্দু ঐক্যের ডাক, অন্য কোন বিকল্পের অভাব এবং তার সঙ্গে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে কৌশল ও ‘ শান্তিপূর্ণ ‘ বল প্রয়োগ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি কে দুই তৃতীয়াংশ র বেশি আসনে জয়ী করে। এসআইআর, ডিজিটাল ভোটিং, গণনা ইত্যাদিকে কে কেন্দ্র করে ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন মোটেই সন্দেহাতীত নয়। আবার এক ক্ষমতালোভী, স্বৈরাচারী, চরম দুর্নীতিগ্রস্ত নেত্রী ও তার পরিবার কে নিয়ে অশিক্ষিত, সুবিধাবাদী, চোর আর সমাজবিরোধীদের দল তৃণমূল দল নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়তে থাকে যা বিজেপির যাত্রাকে সহজতর করে দেয়।
নতুন সরকারের নতুন বাজেট: পশ্চিমবঙ্গের এই রকম এক সংকটময় ও অতিরুগ্ন আর্থিক পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের আশীর্বাদধন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের ২২ জুন বিধানসভায় ২০২৬-‘২৭ আর্থিক বাজেট পেশ।
এটি ঠিকই একটি বাজেটে সব কিছু প্রতিভাত হয় না, বাজেট নিয়েও নানানরকম ছলচাতুরি থাকে। যেরকম কেন্দ্র সরকার রেল বাজেট কে মূল বাজেটে নিয়ে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করছেন যেখানে কোন জনমুখী বরাদ্দ থেকে অন্যত্র অর্থ সাইফন হচ্ছে কিংবা প্রাক্তন রাজ্য সরকার এমন সব জনবাদী প্রকল্প ঘোষণা করে বাহবা নিয়েছিলেন অথচ সেগুলির উপর যেমন প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ছিল না, তেমনই অর্থের উৎস নিয়েও প্রবল ধোঁয়াশা থেকে গেছে। এটিও ঠিক একটি বাজেটে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না। আবার এটিও ঠিক যে কোন সরকার তার বাজেটের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেই তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তথাপি কোন সরকারের বাজেট তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, দিশা, কর্মনীতি ও কর্মসূচি অনেকটাই নির্দেশিত করে।
এক নজরে পশ্চিমবঙ্গ বাজেট: উচ্চশিক্ষিত ও বিশিষ্ট সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত মোট চার লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫.২৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করলেন যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, কৃষি, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান প্রভৃতিতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সামগ্রিক ভারসাম্য রাখার প্রচেষ্টা, পাশাপাশি ঋণের বোঝা কমিয়ে আয় বাড়ানোর পথ খোঁজা, স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি এবং পরিকাঠামোয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিল্প – বিনিয়োগের প্রচেষ্টা রয়েছে ।
সরকারি শূন্য পদে এক লক্ষ চাকরির ঘোষণা: পুলিশে ২০ হাজার, শিক্ষাক্ষেত্রে ৫০ হাজার … । ৩৩% মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। বয়সের ঊর্ধসীমা দুবছরের জন্য ছাড়।
অন্নপূর্ণা যোজনা: মহিলাদের জন্য সর্বজনীন তৃণমূলের মাসিক ২০০০ টাকার পরিবর্তে মাসিক ৩০০০ টাকা। ঝাড়াই বাছাই করে প্রকৃত প্রাপকদের দেয়া হবে। বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
সরকার ও সরকার পোশিত বিদ্যালয়গুলিকে আদর্শ বিদ্যালয়ে রূপান্তর। এর জন্য ২১০০ কোটি। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ঝাড়গ্রামে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয়।
বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগে চারটি নতুন জেলার সৃষ্টি।
কল্যাণীতে নতুন বিমানবন্দর এবং উড়ান প্রকল্পে পুরুলিয়া, কোচবিহার, মালদা ও বালুরঘাট বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ।
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের অক্টোবর ‘ ২৬ থেকে ২০% ডি এ বৃদ্ধি। জানুয়ারিতে সপ্তম বেতন কমিশন।
মিড ডে মিলে প্রাথমিকে দৈনিক মাথাপিছু বরাদ্দ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১o টাকা করা। মিড ডে মিলের রান্ধুনিদের ভাতা মাসিক এক হাজার টাকা বৃদ্ধি।
আলু সংগ্রহে চাষিদের ভর্তুকি (টপ আপ) কুইন্টাল প্রতি দুশো টাকা এবং ধান সংগ্রহে অতিরিক্ত সহায়ক কুইন্টাল প্রতি মূল্য দুশো টাকা বৃদ্ধি।
অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের পাঁচ হাজার টাকা করে মাসিক পেনশন।
আশা – অঙ্গনওয়ারি কর্মী ও সহায়িকাদের ৫০০০; সিভিক পুলিশ, ভিলেজ পুলিশ, গ্রিন পুলিশ, হোম গার্ড, এন ভি এফ কর্মীদের ২০০০; প্যারা টিচারদের ৫০০০; প্রাণীবন্ধু সহ পশু পালনে যুক্ত কর্মীদের ২০০০; সরকার পোশিত ও ভোকেশনাল শিক্ষকদের ২০০০ – টাকা করে মাসিক বেতন – ভাতা বৃদ্ধি।
বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, বিশেষভাবে সক্ষম দের পেনশন মাসিক ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি।
২১ – ৪৫ বছর বয়সী শিক্ষিত বেকারদের স্নাতক পর্যায়ে ৩০০০ এবং তার কম শিক্ষিতদের ২০০০ টাকা করে মাসিক ভাতা।
স্বাস্থ্য বাজেটে আড়াই হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২৪,৭৫৩.৭২ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ। দৈনিক রোগী পিছু খাদ্যের বরাদ্দ ৫৬ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে এক লাফে বেড়ে ১১০ টাকা। আলিপুরদুয়ারে মেডিকেল কলেজ; দার্জিলিং, ফারাক্কা ও দিঘাতে ট্রমা সেন্টার; জঙ্গিপুর বিড়ি শ্রমিক কারখানার আধুনিকীকরণ; সুন্দরবনে মোটর বোট অ্যাম্বুল্যান্স ও দ্বীপ কেন্দ্রিক প্রসূতি কেন্দ্র। উত্তরবঙ্গের জন্য এআইআইএমএস। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের জন্য ৩১০০ কোটি।
সাগরমালা প্রকল্পে পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্র বন্দর এবং হুগলী নদী তে ওয়াটার মেট্রো পরিষেবা। ডানকুনি – সুরাত রেল পণ্য করিডর; কালনা – শান্তিপুর ভাগীরথী র উপর সেতু; কলকাতা বন্দর – হাওড়া হুগলী নদীর নিচ দিয়ে পণ্য করিডর; চিংড়িহাটা – নিউ টাউন উড়ালপুল।
কেন্দ্রের ১০০০ এবং রাজ্যের ২০০ কোটি টাকা যোগ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কে দেশের ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ গড়ে তোলা।
উত্তরবঙ্গের জন্য আইআইটি ও আইআইএম; শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও ইনডোর স্টেডিয়াম; তিস্তা সেচ প্রকল্পে ১১০০০ কোটি টাকা; চা শ্রমিকদের জন্য নতুন বোর্ড; চাঁচল, গাজল, জয়গাঁ, শিব মন্দির ও টুঙ্গিদিঘি তে নতুন পুরসভা; হেমতাবাদে ডিগ্রি কলেজ, কালিয়াগঞ্জে মহিলা কলেজ।
রাজ্যের নিজস্ব প্রশিক্ষিত বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী গঠন। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাঁচিয়ে ‘ কার্বন ক্রেডিট ‘ পদ্ধতিতে রাজস্ব অর্জন।
পরিযায়ী শ্রমিকদের আয়ুষ্মান ভারত, কেন্দ্রীয় রেশন ব্যবস্থা প্রভৃতি প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা; রাজ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
অন্যান্য আর্থিক প্রবাহ ও প্রকল্প: জলজীবন মিশনে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ২৭৭৫.৪৩ কোটি টাকা; ১২৫ দিনের কাজের ‘ জি – রাম – জি ‘ প্রকল্প ও গ্রামোন্নয়ন খাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ১৬,০০০ কোটি টাকা।
২০২৬ – ‘২৭ এ ১৪,২০৫ কোটি টাকা সহ এক লক্ষ কোটি টাকার রেল প্রকল্প; শিলিগুড়ি-নয়াদিল্লি ছয় ঘন্টার বুলেট ট্রেন।
রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায়: বাজেটে রাজস্ব ঘাটতি, রাজকোষ ঘাটতি এবং ঋণের হার মোট জিএসডিপি র নিরিখে যথাক্রমে ২.০৭% থেকে ১.০২%, ৩.৪০% থেকে ২.৯১% এবং ৩৮.২৯% থেকে আপাতত ৩৭.৯৮% করা। রাজ্যের মোট আয় ৮২,১১১.৬৪ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪,২৮,৭৭৩.২৯ কোটি টাকা ও মূলধনী খাতে বরাদ্দ ২৫,৬৪৪.৭৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৮৬,৩০৬.০৩ টাকা। কেন্দ্রীয় অনুদান ৪৯,৩২৪.৩৪ কোটি টাকা বেড়ে ৭১,৩৯৩.১৯ কোটি টাকা।
অর্থের উৎস: মূলত কেন্দ্রীয় বরাদ্দ, কেন্দ্রিয় প্রকল্পগুলি গ্রহণের ফলে আর্থিক সাশ্রয়, উপভোক্তা যাচাই এ কড়াকড়ি, রাজস্ব এবং ঋণ।
বিরোধীদের একাংশের সমালোচনা: আয়ের উৎস অস্বচ্ছ। মিড ডে মিল সহ বিভিন্ন প্রকল্পে পি পি পি মডেলের মাধ্যমে বেসরকারিকরণ। গৃহ সহায়িকাদের বিষয় অনুল্লেখ।
২৬.০৬.২০২৬










