বাংলায় একটা কথা চালু আছে, “ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই”। দশকের পর দশক ধরে, হকার সমস্যা নিয়ে সরকারগুলোর মনোভাব আমাদের বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দেয়। অভিজ্ঞতা আমাদের বলে, যে কোনও পুঁজিবাদী সরকারেরই নাম হওয়া উচিত ‘গোঁসাই সরকার’।
কোনও কোটিপতির সন্তান কখনোই সাধ করে হকার হয়ে রাস্তায় বসেন না। তা সে যে রাজ্যেই হোক না কেনো। সারা বছর রোদ বৃষ্টি ঠাণ্ডার মধ্যে, কোন সাধে মানুষ হকারি করে? সরকারি মাতব্বরদের চোখরাঙানি, পুলিশের ঠ্যাঙানি, স্থানীয় রাজনৈতিক (!) তোলাবাজদের জুলুম, শহুরে পয়সাওয়ালা নাক-উঁচু ‘বাবু’দের অসভ্যের মতো কথাবার্তা, সবকিছুই হজম করতে হয় তাঁদের। তবেই সংসার চালাবার রসদ জোটানো যায় কিছুটা। মানুষের মতো ইজ্জত ও অধিকার নিয়ে এঁদের বাঁচার কোনও রাস্তাই দেখাতে পারে না কোনও‘নির্বাচিত’ সরকার। মনে রাখা দরকার, ‘হকার’-দের অনেকেই অনেক ‘রাজনৈতিক’ মোড়লদের থেকে বেশি শিক্ষিত। কিন্তু সরকার না পারে এইসব অসহায় মানুষগুলির কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নিতে; না পারে এঁদের হাতে ভদ্রস্থ কোনও কারবার করার মতো পুঁজির জোগান দিতে; না পারে ব্যবসা চালাবার মতো উপযুক্ত কোনও জায়গার ব্যবস্থা করতে। শুধু পারে বেহায়ার মতো ‘ভোট’ চাইতে। তাদের শুধুই অর্থহীন কথার ঝাঁজ, “বে-আইনি দখলদারি চলবে না।” বাঁচার জন্য সরকার ও ‘আইন’ যেখানে পথ দেখাতে পারে না, লক্ষলক্ষ মানুষ সেখানে কী করবে? সপরিবারে গণ-আত্মহত্যা? নাকি, গণবিদ্রোহ? সরকার কোনটা চায়? সরকারকেই সেকথা স্পষ্টভাবে বলতে হবে।
হকার প্রশ্নে ‘সরকার’ সবসময়েই এক বিচিত্র বহুরূপী সত্তা! অন্য সরকারের আমলে যে সংসদবাদী দলগুলো ‘হকার উচ্ছেদ’ নিয়ে সাঙ্ঘাতিক বিরোধিতা করে, নিজেরা ক্ষমতায় বসলে তাঁরাও সেই একই ‘হকার উচ্ছেদ’ করে! বামফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, এব্যাপারে সকলেই এক গোয়ালের গরু। একবার পশ্চিমবঙ্গে হকার উচ্ছেদ অভিযানের পর (‘অপারেশন সানশাইন’-১৯৯৬), এক বছরের মধ্যেই সাত জন হকার আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন; প্রতীক হিসাবে সাতটি কফিন নিয়ে হকাররা মিছিল করেছিলেন কলকাতার রাস্তায়। তখন যে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ‘প্রতিবাদ’ করেছিলেন, পরে তাঁরা নিজেরা (তৃণমূল কংগ্রেস) সরকারে এসেই বিভিন্ন রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদ শুরু করেন! তবে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারকে অনেক বেশি আগ্রাসী দাপটের সঙ্গে হকার উচ্ছেদ করতে দেখা যাচ্ছে। রাস্তায়, রেলস্টেশনে, যেখানে সেখানে “বে-আইনি জবরদখল” মুক্ত করতে যখনতখন বুলডোজার-পে লোডার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পুলিশ। মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে শতশত হকারদের একমাত্র আয়ের জায়গা, আর তাঁদের বাসস্থান। এই অগুণতি মানুষ কোথায় যাবে, কী করবে, থাকবে কোথায়, তাঁদের বাচ্চাকাচ্চাদের পড়াশোনার কী হবে, অসুখেবিসুখে চিকিৎসা কীভাবে হবে, … এসব কোনোকিছু্রই দায় সরকারের নেই! শুধুই বুলডোজার-পে লোডারের হামলাবাজি।
কোথা থেকে আসছে হকারি পেশায় যুক্ত এই লক্ষলক্ষ মানুষ? তারা কী চাঁদ বা মঙ্গলগ্রহ থেকে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বুকে নেমে এসেছেন! নাকি আফ্রিকা মহাদেশের অনাহারক্লিষ্ট ইথিওপিয়া থেকে? ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি সরকার যখন নাগরিকদের খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়, মানুষ তখন স্বাভাবিকভাবেই যাহোক করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। সাংবিধানিক অভয়বাণী অথবা আইনের মারপ্যাঁচ যখন কাউকে বাঁচার রাস্তা দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন নিজের বাঁচার রাস্তা নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। চুরি-জালিয়াতি-ছিনতাই-রাহাজানির পথে না হেঁটে, তাঁরা সুস্থভাবে হকারি করে বাঁচতে চান। ফুটপাথ, রাস্তা, রেলস্টেশন, মাঠঘাট, … জায়গা বাছাইয়ের বিলাসিতা তাঁদের বাঁচতে সাহায্য করে না।
অনুৎপাদক বিধায়ক বা সাংসদদের বছরে কোটিকোটি টাকা ‘রাজনীতি করার জন্য’ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মাগনা আয় যদি বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেইসব তথাকথিত ‘জনপ্রতিনিধি’-দের অনেকেও রাস্তায় হকারি করতে বাধ্য হবেন। কারণ তোলাবাজি বা জালিয়াতি করার অথবা ঘুষ খাবার সুযোগও তাদের তখন থাকবে না। অন্যভাবে ভদ্রস্থ আয়ের যোগ্যতাও তাঁদের অনেকেরই নেই। নিজের পিঠের চামড়া দিয়ে রোদ-বৃষ্টি-ঠাণ্ডায় হকারির সুখ তাঁরা তখন বুঝতে পারবেন। বাতেলাবাজিও বন্ধ হয়ে যাবে তাঁদের।
নানারকম আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বিপুল সংখ্যক অসংগঠিত হকারদের বাঁচার চেষ্টা কার্যত একধরণের প্রহসন। রবীন্দ্রনাথের ভাষা ব্যবহার করে বলা যায়, “মোকদ্দমার যুযুৎসু খেলা” মাত্র। তা হকারদের মিথ্যা আশায় ভোলাবে হয়তো, কিন্তু বাঁচার পথ দেখাতে পারবে না। আজ পর্যন্ত পারে নি। কারণ মানুষের মতো ইজ্জত ও অধিকার নিয়ে বাঁচার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান বাধা আসলে ‘আইন’ নয়, শাসকের ‘মানসিকতা’; রাষ্ট্রযন্ত্রের জনবিরোধী চরিত্র। যাঁরা নানারকম কথার মারপ্যাঁচ চালায়, কিন্তু হকারদের কার্যত ‘মানুষ’ বলেই গণ্য করে না; শুধু কিছু ‘সামাজিক উপদ্রব’ ভাবে। মুশকিল হলো “শুকনো কথায় চিড়ে ভেজে না”। রাজনৈতিক মাতব্বরদের ভাষণ আর ‘প্রতিশ্রুতি’ কখনোই হকারদের বাঁচার পথ দেখাতে পারেনি; পারবে না; সারা সম্ভবই না।
‘স্ট্রীট ভেণ্ডারস্ (প্রোটেকশন অব্ লাইভলিহুড অ্যাণ্ড রেগুলেশন অব্ স্ট্রীট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট ২০১৪’ ভারতে লাগু আছে। কিন্তু এই ‘আইনি’ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও হকার উচ্ছেদ হয়; এবং দলে দলে হকারদের আর তাঁদের সহযোদ্ধাদের মিটিং মিছিল আন্দোলনও চলে। ‘হাউজিং অ্যাণ্ড ল্যান্ড রাইটস্ নেটওয়ার্ক’ (HLRN)-এর ফেব্রুয়ারি ২০১৮-য় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, কাশ্মীর থেকে তামিলনাড়ু আর অরুনাচল প্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্র, সারা ভারতবর্ষের শহর ও গ্রাম জুড়ে শুধু ২০১৭ সালেই জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ২১৩ বার। বাড়ি ও কাঠামো ভাঙা পড়েছে ৫৩,৭৮১টি; উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সংখ্যা (আনুমানিক) ২,৫৮,১৯৬ জন। বলাবাহুল্য, এটাই পূর্ণাঙ্গ হিসাব না। এইসব ছিন্নমূল মানুষ কোথায় গেলেন, কতজন উন্মাদ হয়েছেন বা আত্মহত্যা করেছেন কিংবা সংসার ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, কতজন নারী পেটের দায়ে দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, তার কোনও হিসাব ‘সরকার’ অথবা রাষ্ট্রের কাছে নেই!
শুধু কলকাতা বা পশ্চিমবাংলা অথবা ভারতবর্ষ না। নানারকম ‘উন্নয়ন’-এর জন্য সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে মানুষের অনিচ্ছাকৃত স্থানচ্যুতির ঘটনা। কোথাও ‘রেলের সম্প্রসারণ’; কোথাও ‘সৌন্দর্যায়ন’; কখনও ‘খাল সংস্কার’; কখনও ‘কারখানা’ স্থাপন; কোথাও ‘পার্ক তৈরি’; কখনও ‘বাঁধ’ বা ‘জলাধার নির্মান’; কখনও বা ‘বিদ্যুৎ প্রকল্প’ গড়ে তোলা; কিংবা অন্য কোনও তাগিদে। শুধু যে মানুষগুলো এই বৃহৎ পুঁজিবাদী কর্মকাণ্ডের ফলে উচ্ছেদ হন, তাঁদের পুনর্বাসন নিয়ে বিন্দুমাত্র তাগিদও দেখা যায় না উচ্ছেদকারী সরকারের আর তাদের তাঁবেদারদের! উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ গোলার্ধ, সারা পৃথিবীই আজ কোটিকোটি ‘উন্নয়ন উদ্বাস্তু’ (ডিভেলপমেন্ট রিফিউজি)-তে ছয়লাপ! এটা হলো পুঁজিবাদী উন্নয়নের অনিবার্য দিক। আধুনিক ‘সভ্যতা’র অসভ্য চরিত্র। কলকাতার পাশেই, পয়সাওয়ালা লোকেদের জন্য অত্যাধুনিক ‘নিউটাউন’ তৈরির সময়ে লক্ষলক্ষ কৃষক-মৎসজীবী মানুষকে তাঁদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা, যে অসভ্যতার অন্যতম উদাহরণ। সেখানকার বাসিন্দা মানুষগুলোর কী হলো, ‘বাম’-ডান নির্বিশেষে কোনও ‘নির্বাচিত’ সরকার তার খোঁজটুকু রাখাও প্রয়োজন মনে করেনি। শুধু ‘হকার’ না, পুঁজিবাদের সেবক সরকারগুলোর আমলে সকল শ্রমজীবী মানুষই অস্তিত্বের সঙ্কটে নাজেহাল থাকে।
পুঁজিবাদের সেবক যে ‘নির্বাচিত’ প্রশাসন ধর্ষকদের মুক্তিতে উল্লাস করে অথবা ধর্ষিতাদের অপমান আর ধর্ষকদের রক্ষা করতে সংগঠিতভাবে তৎপর হয়ে ওঠে, সেই প্রশাসনের কাছে সাধারণ মেহনতী মানুষ আর কী-ই বা আশা করতে পারে! ‘হাতে কাজ, পেটে ভাত, মাথায় ছাদ’-এর ব্যবস্থা করতে না পেরে যেসব প্রশাসন শুধুই ‘ভাতা ভাষণ ভাঁওতা’ দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাঁদের শেষদিন শুধুই সময়ের অপেক্ষায় থাকে।
উচ্ছেদ হওয়া মানুষের জীবনযন্ত্রণা পুঁজিবাদের স্তাবকরা কোনোদিনই দূর করতে পারবে না। কারণ সেই ইচ্ছাই তাদের নেই। পুঁজিবাদ বেঁচেই থাকে শ্রমজীবীদের শোষণ করে। কোনও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সুস্থ, সংস্কৃতিবান সরকার পুঁজিবাদ দিতেই পারে না। শতশত বছরের বিশ্ব-ইতিহাস তা তর্কাতীত ভাবে প্রমাণ করেছে। একমাত্র শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যক্ষ শাসনই পারে উচ্ছেদের দানবীয় কর্মকাণ্ডকে স্তব্ধ করতে। এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। বুলডোজার-পে লোডারের তাণ্ডব যেনো এই মূল কথাটা আমাদের চেতনায় গুলিয়ে দিতে না-পারে।।পছন্দসই ‘রাজনৈতিক দল’ অথবা ‘সরকার’ যেন আমাদের সুস্থ বিচারবুদ্ধিকে গুলিয়ে না দেয়, প্রকৃত মানবিক মূল্যবোধ যেনো আমাদের সকলেরই অটুট থাকে।।









