প্রতি ১০০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৯৩ জন এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। রাজ্যের ইতিহাসে এটি সর্বকালীন রেকর্ড। কেন মানুষের মধ্যে এবার ভোটদানের এত উৎসাহ ছিল? নাগরিকত্ব হারানোর ভয় তো ছিলই; কিন্তু এটাও সত্যি যে মানুষ দুর্নীতি, সন্ত্রাস, এবং স্বৈরাচারের অবসান চাইছিল।
কিন্তু যে দলকে মানুষ ৪৬ শতাংশ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে, তাদের শাসনের মাত্র দু’মাসেই সাতটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একটি কাস্টডিয়াল ডেথও হয়েছে। এর পর আসছে গুন্ডা দমন বিল—যে আইনে বিনা বিচারে একজন মানুষকে এক বছর পর্যন্ত জেলে রাখা যেতে পারে। যে দুর্নীতি ও স্বৈরাচারকে সরাতে মানুষ এত উৎসাহ নিয়ে ভোট দিলেন, সেই দলের ৬৫ জন বিধায়ক এবং ২০ জন সাংসদের বিরুদ্ধে থাকা সব অভিযোগও কার্যত ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। হাতে গোনা কয়েকজনকে বাদ দিলে, বাকিটা তো সেই “নতুন বোতলে পুরোনো মদ”। তার বড় উদাহরণ—নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মন্ত্রিসভা গঠনের আগে থেকেই এরা তাদের আসল রূপ দেখাতে শুরু করেছে। একজন তো প্রকাশ্যেই বলেছেন, আরএসএস-এর লোকেরা স্কুলে স্কুলে কী পড়ানো হচ্ছে, তা তদারক করবে। আবার জানতে ইচ্ছে করে, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত তিন হাজার টাকা ক’জন মানুষ সত্যিই পেলেন?
মাত্র দু’মাসেই যদি এই চেহারা হয়, তাহলে পাঁচ বছরে তাদের রূপ কী হবে? আর মানুষ তখন কী করবে? পাঁচ বছরে একবার ভোট দিয়েই কি ভোটারের দায়িত্ব শেষ?
আসলে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে ট্রেডিং কোম্পানি ভেবে বসি। যেন ভোট হলো একটি পঞ্চবার্ষিকী লেনদেন—আমি ভোট দিলাম, আর আগামী পাঁচ বছরের জন্য আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা, দাবি-দাওয়া, নিরাপত্তা, অধিকার—সবকিছুর দায়িত্ব একটি দলের হাতে তুলে দিলাম। কিন্তু রাজনীতি কোনো পণ্য কেনাবেচার বাজার নয়। এখানে নাগরিকের ভূমিকা ভোটের দিন শেষ হয়ে যায় না; বরং সেখান থেকেই তার শুরু।
গণতন্ত্রের প্রাণ কেবল ব্যালট বাক্সে নয়, মানুষের নিরন্তর অংশগ্রহণে। নির্বাচনের পরে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, ন্যায়ের দাবিতে সংগঠিত হওয়া—এসবই গণতন্ত্রেরই অংশ। মানুষ যদি নীরব হয়ে যায়, তবে ক্ষমতা খুব দ্রুতই নিজের সীমা ভুলে যায়। ইতিহাস তাই বলে ।
তাই এই অসময়ে শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের নয়, সাধারণ মানুষেরও উচিত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো। যে অন্যায় দেখবে, তার বিরুদ্ধে কথা বলা; যে অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে, তার জন্য পথে নামা; যে প্রতিশ্রুতি ভাঙা হবে, তার হিসাব চাওয়া—এটাই নাগরিকের কাজ। গণতন্ত্রে দর্শকের কোনো আসন নেই; এখানে প্রত্যেক নাগরিকই একজন অংশগ্রহণকারী।
ভোট ছিল শুরু। পথচলা এখনও বাকি।
তাই—পথে এবার নামো, সাথী। শুধু সরকার বদলাতে নয়, রাজনীতির চরিত্র বদলাতে। শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নয়, সমাজের পরিবর্তনের জন্য। নইলে পাঁচ বছর পরে আবারও আমরা একই মোড়ে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করব, একই হতাশা নিয়ে। আর অন্ধকার তখন আরও অনেকটাই ঘন হয়ে যাবে ।










