২০ জুলাই, ২০২৬
দিনভর দেশ সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নের। দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশ নির্বিচারে লাঠি চালাচ্ছে, লুটিয়ে পড়ছে প্রতিবাদী যুবক, তবুও এগিয়ে চলেছে পার্লামেন্ট স্ট্রিট ধরে শত শত যুবক যুবতী, হাতে বাবা সাহেব আম্বেদকরের ছবি, সংবিধানের শপথ নিয়ে শতশত দর্পিত যুবা চলেছে সংসদের দিকে, লাঠিচার্জ টিয়ার গ্যাস, রাষ্ট্রের লাল চোখে চোখ রেখে ধীর স্থির পদক্ষেপে শির উঁচিয়ে বাতাস মুখরিত করে তারা এগিয়ে গেল সংসদ ভবনের দিকে, কণ্ঠে স্লোগান: আজাদীর। তারা চেয়েছে বেকারি থেকে আজাদী, প্রশ্ন ফাঁস থেকে আজাদী। খুব সামান্য একটা দাবি:শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
আজ তো চাইছে না, বহুদিন ধরেই এই দাবি উঠছে। এই দাবি নিয়েই গত ২০ দিন ধরে ছাত্রযুব রাস্তায় আন্দোলনে, প্রায় ২৫ জন বসেছেন আমরণ অনশনে, তাঁদের সমর্থনে অনশনে সোনাম ওয়াংচুক যন্তর মন্তরে। কিন্তু একটা আলোচনার প্রস্তাবও আসেনি গত ২০ দিনে তাদের কাছে সরকারের কাছ থেকে। আসলে তাদের কোনো মূল্য নেই। এটা প্রমাণিত হওয়ার পরেই আজ ছিল সেই দিন যেদিন তারা ঠিক করেছিল, এবার যুবরা বুঝে নেবে সরকার কী চায়!
মিছিল যত সংসদের দিকে এগিয়েছে আজ, বাধ্য হয়েছে সরকার আলোচনায় বসতে। সকালে ওয়াংচুককে নিয়ে এবং দুপুরে সংসদ অভিযানের মুখে পড়ে প্রমাদ গুণে কথা বলতে চায় সরকার।
কথা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, সোনম ওয়াংচুককে মুক্তি এবং নিট প্রশ্ন ফাঁসে আত্মহত্যা করা ১৭ জনের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ। সরকারের সাথে আলোচনা করবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেপি নাড্ডা।
সংসদে বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন আলোচনা ভন্ডুল হয়ে গেল ককরোচ জনতা পার্টির দাবি এবং নানা ইস্যুতে। বিরোধীদের প্রতিবাদে বন্ধ করে দিতে হলো সংসদের কাজকর্ম। দেশে স্বাধীনতার পর এই প্রথম যুব আন্দোলনে বন্ধ হল সংসদ এবং দখল হল দিল্লি রাজপথ।
টলে গেল কি মোদির সিংহাসন?
হ্যাঁ, আজ থেকেই।
সারাদেশ আজ সমাজ মাধ্যমে দেখেছে ভাইরাল হওয়া রক্তাক্ত যুবকের ছবি। মিছিলে আক্রান্ত যুবক বলছে, মারো আমাকে মারো আরো মারো। দেখি কত মারতে পারো।
প্রতিবাদী যুবক ঘুরে দাঁড়িয়েছে শাসকের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে। পুলিশের লাঠিতে মাথা থেকে রক্ত ঝরছে, সেই অবস্থায় বলছে: মরে যাব আবার জন্ম নেব আমি যুগে যুগে ক্রান্তিকারী হয়ে ফিরে আসবো। মোদির সরকার উৎখাত করবই।
হ্যাঁ, দিকে দিকে লক্ষ কন্ঠে আজ সারা ভারতের প্রান্তরে প্রান্তরে শহরে নগরে গ্রামে দেশের যুবসমাজ শপথ গ্রহণ করল মোদিকে উৎখাত করে তারা ছাড়বেই।
মোদি ও তার দল কি বাতাসে সে বার্তা পেয়েছে?
বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এতদিন যে দাবি ছিল কেবলমাত্র শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে, আর যন্ত্রর মন্তরে বিহার উত্তর প্রদেশ মধ্যপ্রদেশ গুজরাট মহারাষ্ট্র রাজস্থান থেকে আসার ছেলেরা মোদির ইস্তফা দাবি তুলেছে।।
এভাবেই বোধহয় একটা দল সরকারে থাকার জনসমর্থন ও নৈতিকতা হারায়।
যুব সমাজকে উপেক্ষা করতে গিয়ে সরকারকেই যে নিজের পায়ের তলার মাটি খসিয়ে ফেলতে হয়, ইতিহাস সে কথা বার প্রমাণ করেছে। তাই ককরোচ ভেবে উপেক্ষা করতে গিয়ে মোদি সরকার তার নিজের পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে। কোন বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়াই সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে ১৮ থেকে ২৮ এদেশের বুকে যে বিপ্লবের পদচিহ্ন এঁকে গেল সেই পথ দিয়েই আসছে আগামী দিনে পরিবর্তন নিশ্চিত করে।
২০ শে জুলাই ২০২৬ লিখে দিয়ে গেল ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল। এখনো যদি কেউ সেই দেওয়াল লিখন না পড়তে পারে তাহলে তারাই হারাবে মানুষের সমর্থন! দেশের তামাম বিরোধী দল আজ সে কথা বুঝেছে।
শাবানা আজমি প্রকাশ ঝা থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্টজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এই প্রতিবাদী যুব সম্প্রদায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। শশী থারুর থেকে শুরু করে কংগ্রেস সভাপতি ব্যক্তিগতভাবে এবং কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। বামদের সমর্থন তো প্রথম থেকে ছিলই। এখনো বিরোধীরা যদি এই ইস্যুতে এক জোট না হতে পারেন, তাহলে আগামী দিনে তাঁরা নিজেদেরই সমর্থন হারাবেন।
কার্যত এই প্রতিবাদী যুবসমাজ আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ স্থির করে দিয়ে গেল যন্তর মন্তর থেকে। এরা কেউ সরকার বদলাতে দাবি তোলেনি, কিন্তু বুঝিয়ে দিয়ে গেল সরকার বদলই এক মাত্র পথ। সরকার এদের উপেক্ষা করে নিজেদের যে যোগ্যতা নেই শাসক হওয়ার সেটাই প্রমাণ করে দিয়ে গেল। রাষ্ট্র যেখানে দখল করে নেয় গণমাধ্যম, পুলিশ যেখানে নির্মম অত্যাচারী, তখন জনগণ বুঝতে পারে সরকার কী চায়। জনগণও বুঝতে পারে সরকার বদল না হলে তাদের ও পরবর্তী প্রজন্মের অস্তিত্ব সংকটে। মানুষ বুঝে নিয়েছে হিন্দু মুসলমানের খেলা করে দেশ লুট করতে নেমেছে এই শাসক। যন্তর মন্তরে জমায়েত থেকে উঠে এসেছে সম্প্রীতির ভারতের প্রতিশ্রুতি। তখনই আরও খসে পড়েছে মোদি অমিত শাহের মুখোশ। এভাবেই তৈরি হয় ক্রান্তিকাল। স্বাধীনতার পর নতুন করে এক ক্রান্তির মুখে ভারত।
একে কি শুধুই ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন বলা যায়? না। সমগ্র দেশের যুব সমাজ মিশে গেছে এদের আন্দোলনে। নামে এরা শুধুই কিছু ছেলে, কিন্তু এদের সঙ্গে মিশে আছে গোটা দেশের যুবসমাজের জমে থাকা তীব্র বিক্ষোভ, অভিমান। তীব্র বেকারি, বারবার পরীক্ষা বন্ধের হতাশা তাদের দিশেহারা করেছে। এই আগ্নেয় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে দিচ্ছে দেশের রাজনীতি। পথ দেখাচ্ছে দেশের বিরোধী দলগুলোকে। বিরোধীরা সেই বার্তা পেয়েই একজোট হয়ে আক্রমণ করেছে মোদিকে, আজ নীরবে প্রস্থান করতে হয়েছে সংসদ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে।
প্রশ্ন এখানেই। কে আটকে দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে? প্রশ্ন ফাঁস রুখতে, একটা সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তাকে ছাত্র যুব স্বার্থে সঠিকভাবে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা কী? বিশেষত যেখানে তার মন্ত্রী বারংবার ব্যর্থ। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে নতুন শিক্ষামন্ত্রী আনতে মোদির বাধা কোথায়?
দেশের যুব সমাজের দাবি মানতে লজ্জা কোথায়, মোদি জি?
আজকের দিল্লির ঘটনায় প্রমাণিত হল: দেশের সরকার যুব সমাজকে চরম উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে শেষপর্যন্ত তাদের আস্থা হারিয়েছে। ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। দেউলিয়া হয়ে গেছে।










