এক সময় খবরের কাগজের অনেক খবরের ভিড়ে ছোট্ট কয়েক কলমের কিছু বিজ্ঞাপন থাকতো যার শিরোনাম — নিরুদ্দিষ্টের প্রতি পত্র অর্থাৎ বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষের উদ্দেশ্যে চিঠি। সেই বিজ্ঞাপন জুড়ে লেখা হতো আবেগঘন কিছু কথা যেমন –বাবা ভোম্বল, তুমি কোথায় আছো জানাও। তোমার চিন্তায় মা শয্যাশায়ী। টাকার প্রয়োজন হলে জানিও। শীঘ্রই বাড়ি ফিরে এসো – বাবা।
এমনতরো বিজ্ঞাপন আজও নিশ্চয়ই ছাপা হয় তবে এই বুড়ো বয়সে এসে কিশোর বেলার উৎসাহে ভাটা পড়েছে,তাই কাগজের আনাচেকানাচে চোখ বুলিয়ে তেমন কিছু আজ আর খোঁজা হয়না। তা বলে কি মানুষের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে? উঁহু, তেমনটা মোটেই নয়। আমাদের চারপাশের কতকিছুই তো প্রতিদিন নজর এড়িয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। সেসব আবার কোনো এক কালে ফিরে আসবে তেমনটাও বুঝি নয়। যদি ফিরে আসে বা তার দেখা মেলে হঠাৎ করেই , তা হলে কিন্তু রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যাবে। 
জীবজগতের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে। হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া প্রাণিদের দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে খুঁজে পাওয়া গেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানকারী গবেষকরা। এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া প্রাণি এবং তাদের খুঁজে পাওয়ার কথা নিয়েই এই পর্বের আলোচনা। মোট ছয়টি পর্বের এই আলোচনার আজ পঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্ব। আজকের অতিথি দুটি সামুদ্রিক সাপ – Leaf Scaled Sea Snake এবং Short Nosed Sea Snake.
সাপ – এই নামটা শুনলেই আমাদের শরীরে শিহরণ জাগে, অল্পেতেই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ি আমরা। অথচ আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে সাপও কিন্তু সমান ভাবে আমাদের ভয় পায়, এড়িয়ে চলতে চায় মানুষের সান্নিধ্য। আমাদের রাজ্যে প্রতিবছর বেশ কিছু মানুষের জীবনহানির কারণ সর্পাঘাত। শুনতে অবাক লাগলেও একথা একেবারেই ১০০% সত্যি যে দুনিয়ার সমস্ত সাপেদের মধ্যে মাত্র ১০% সাপ বিষধর , আর বাকি সবাই নির্বিষ। ডাঙায় থাকা সাপেদের পাশাপাশি সমুদ্রের জলকে বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে বেশ কয়েক প্রজাতির সাপ। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এই সাপেদের অনেকেই অত্যন্ত বিষধর।
আমাদের আজকের দুই অতিথি যেহেতু সরীসৃপ গোষ্ঠীর Sarpentes পরিবারের সদস্য সেহেতু তাদের আবির্ভাব তথাকথিত সুবিশাল সরীসৃপদের বিবর্তনের মধ্য দিয়েই ঘটেছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সাপেদের পা নেই। ঠিক কবে এই পদস্খলন হলো তা নিয়েও রয়েছে নানান কথা। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে লিজার্ড বা টিকটিকিরাই হলো সাপেদের নিকটতম আত্মীয়। বিবর্তনের জটিল পথ বেয়ে লিজার্ডদের একাংশের রূপান্তর ঘটেছে সাপে। তবে বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন জুরাসিক যুগেই জলচর লিজার্ড অথবা মাটিতে গর্ত খুঁড়ে থাকা লিজার্ডদের থেকেই সাপেদের আবির্ভাব ধরিত্রীর রঙ্গমঞ্চে। এ পর্যন্ত পাওয়া জীবাশ্ম নমুনা দেখে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে আনুমানিক ১৪৩ থেকে ১৬৭ মিলিয়ন বছর আগে সরীসৃপের একটি শাখা সাপের চেহারা পায়। তবে Cretaceous- Paleogene Extinction Event এর পরবর্তী সময়ে নতুন চেহারায় ফিরে এলো অহিকুল। এসব অবশ্য আজ থেকে প্রায় ৬৬ থেকে ৫৬ মিলিয়ন বছর আগের কথা। আন্টার্কটিকা বাদে আর সব মহাদেশেই সাপেদের দেখা মিলবে। ডাঙার মতো জলেও রয়েছে সার্পেন্টেস পরিবারের সদস্যরা।


১৯৯৮ সাল অবধি লিফ স্কেলডদের এবং ২০০২ পর্যন্ত শর্ট নোজ সমুদ্র সাপেদের কমবেশি নিয়মিত দেখা মিললেও তার পরবর্তী সময়ে এরা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। Timor Sea র প্রবাল ভরা অগভীর সমুদ্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও দেখা মেলেনি লিফ্ স্কেলড বা শর্ট নোজ সমুদ্র সাপেদের। বিজ্ঞানীরা পড়লেন মহা দ্বন্দ্বে। সাপগুলো তাহলে গেল কোথায়?
বলে মনে হয়নি। পরিশেষে ২০০৯ সালে একরকম হাল ছেড়ে দিয়ে বিজ্ঞানীরা সাপ দুটিকে অত্যন্ত বিপন্ন বলে ঘোষণা করে দায়মুক্তির চেষ্টা করলেন। কিন্তু মন তো মানে না।
ছয় বছর পর ২০১৫ সালে আবার অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন বিজ্ঞানীরা। সমুদ্রের ওপরের অংশের জলে তাদের দেখা না পেয়ে এবার খোঁজ শুরু হলো সমুদ্রের গভীরতর অঞ্চলে। Ashmore Reef এর প্রায় ৬৭ মিটার নিচের গোধূলি ছায়া অংশে কিছু শর্ট নোজ সাপের দেখা মিললো। নতুন আশায় বুক বাঁধতে শুরু করলেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের কাছে এও এক গোলকধাঁধার মতো।
s p.। অবশেষে প্রকৃত শর্ট নোজদের দেখা মিললো এক গভীর সমুদ্র অভিযানের সময়। বিজ্ঞানীরা এবার বেজায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এই ভেবে যে হারিয়ে যায়নি কেউই। কেবল বাসা বদল করেছে।
আমার কথাটি ফুরলো
টানা পাঁচটি লেখায় আট দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত ছয় ছয়টি হারিয়ে যাওয়া প্রাণিকে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে আবার খুঁজে পাওয়ার কাহিনি প্রকাশিত হলো। এই কিস্তির লেখায় দুই সাপের কথা বলা হয়েছে।আলোচ্য লেখাগুলো লিখতে বসে অনেকটা পড়াশোনা করতে হয়েছে কেননা প্রাণিবিদ্যা আমার অধিগত নয় যদিও এদের সম্পর্কে জানতে ও শুনতে আমি ভীষণ আগ্রহী। এদের খোঁজে কাগজ কলম নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন দেশ ঘুরে বেড়ানো হলো। এই মুহূর্তে এটাই আমার পরম পাওয়া। এ ধরনের লেখা পাঠকদের অনুগ্রহ খুব বেশি পায়না। এই ধারাবাহিকটির ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে আমার কখনোই মনে হয় নি। তবুও যাঁরা লেখাগুলো পড়েছেন এবং মতামত জানিয়েছেন তাঁদের সকলকেই নমস্কার জানাই। ধন্যবাদ জানাই পত্রিকার পরিচালকমন্ডলীকে এই পত্রিকার পাতায় আমাকে এই লেখাগুলো প্রকাশ করার সুযোগ করে দেবার জন্য।ভালো থাকবেন সবাই সবসময়। আর ভালো রাখবেন আমাদের পরিবেশকে।
জুলাই ১২, ২০২৬













Opurbo shundor lekha ! Chhobir moto sab shamney bheshey uthlo jano! Jeney bhalo laglo, jey era keu hariye jay ni, sthan badal korechey matro. Prokriti ebhabeyi bhalo thakuk. Aro ei dhoroner lekha pathan !
গত ১৬ ই জুলাই ছিল আন্তর্জাতিক সর্প দিবস। প্রায় কাছাকাছি সময়ে এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ায় বেশ ভালো লাগছে। এই মুহূর্তে এদের ফিরে আসায় আমরা খুশি, কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে আমাদের কৃতকর্মের ফল ভুগতে হচ্ছে এইসব সংখ্যায় কমে আসা প্রাণিদের। সর্ব স্তরের সচেতনতাই পারে এদের টিকিয়ে রাখতে। মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।
এই ধরনের প্রবন্ধ খুব সচরাচর চোখে পড়ে না। তাই লেখাটি বেশ অন্যরকম আর আকর্ষণীয়। খুব ভালো লাগলো পড়ে। সাপেদের ভিটে বদলানোর ব্যাপারটাও বেশ মজার। ধন্যবাদ দাদা লেখাটির জন্যে।
ধন্যবাদ রইলো। সবকিছুই যখন বদলে যাচ্ছে তখন ভিটে বদলকে আর ব্যতিক্রম বলি কি করে। বেঁচে থাক আমাদের বুনো বাছারা!