দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিকল্প শক্তির উত্থান এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ নতুন কিছু নয়। তবে নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র, প্রকৌশলী ও জনপ্রিয় র্যাপ শিল্পী তথা লড়াকু জননেতা বালেন শাহ যখন দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসেন, তখন তা এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এই পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল। বালেন শাহের নেতৃত্বাধীন সরকার এক নতুন আশার আলো নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমান সময়ে এসে এই নতুন বিকল্প প্রশাসন কিছুদিন আগে তার কার্যকালের প্রথম একশ দিন অতিক্রম করেছে। কিন্তু প্রথম এই একশ দিনেই জনপ্রিয়তার আবরণ সরে বাস্তব সংকট সামনে এসেছে। ক্ষমতার অলিন্দে পা রাখার পর যে মসৃণ পথের আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা এখন নানামুখী জটিল সমস্যা এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের বেড়াজালে আটকে গিয়েছে।
বালেন শাহ সরকারের জন্য বড় ধাক্কাটি এসেছে বাইরে থেকে নয়, বরং তাদের নিজেদের রাজনৈতিক শিবিরের অভ্যন্তরীণ মহল থেকে। যে দলের ওপর ভর করে এই নতুন সরকারের জয়যাত্রা নিশ্চিত হয়েছিল, সেই দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যেই এখন ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পার্লামেন্টের সাম্প্রতিক অধিবেশনে দলের একাধিক শীর্ষস্থানীয় আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যেই প্রধানমন্ত্রীর শাসনপদ্ধতি এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে বলে তাঁদের মূল অভিযোগ হলো। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কিংবা সংসদ সদস্যদের মতামতকে প্রায় কোনও গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না। সুশাসন এবং জবাবদিহিতার যে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, দলের অন্দরেই এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ দোদুল্যমানতা ও সমন্বয়হীনতা সরকারের প্রতিদিনের জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা ডেকে আনছে।
এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের তীব্র মোহভঙ্গ যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শহরের ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কোনও বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী জুড়ে যে নাগরিক অসন্তোষ ও তরুণদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে, তা বালেন সরকারের জনমুখী ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যে যুবসমাজ ও জেন-জেড ভোটারদের অকুণ্ঠ সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে বালেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে আরোহণ করেছিলেন, আজ তারাই রাজপথে সরকারের মানবিকতাহীন ও একতরফা নীতি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সরব। নির্বাচনী প্রচারের সময় তরুণদের সামনে যে কাঠামোগত বদলের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার রূপায়ণ অধরাই থেকে গেছে। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রধান সমস্যাগুলো, যেমন ঊর্ধ্বমুখী মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম এবং নতুন কর্মসংস্থানের অভাব মেটাতে সরকার কোনও কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করতে পারেনি, যা তরুণ সমাজকে ক্রমশ হতাশা ও ক্ষোভের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকারের প্রশাসনিক অপক্কতা প্রকট হয়েছে নগর পরিকাঠামো ও সড়ক সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে দেশের উচ্চতর আদালতের সঙ্গে সরকারের প্রকাশ্য সংঘাতে। বিচার বিভাগের আইনি স্থগিতাদেশ ও গাইডলাইনকে অগ্রাহ্য করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বালেন শাহ সরকারকে এক বড়সড় সাংবিধানিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে গ্রামীণ স্তরে সময়মতো রাসায়নিক সার বণ্টন করতে না পারায় কৃষকদের ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে আদালতের নির্দেশিকাকে অবজ্ঞা করার একগুঁয়ে প্রবণতা সুশাসনের মৌলিক ধারণাকেই আঘাত করছে। পার্লামেন্টের ভেতরেও খোদ শাসক দলের সংসদ সদস্যরা নিজেদের সরকারের এই সমন্বয়হীনতা ও হঠকারিতার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। গ্রামীণ ও নগর প্রশাসনের এই জোড়া ব্যর্থতা নতুন সরকারের ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে এবং দেশজুড়ে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে।
অভ্যন্তরীণ এই সমস্ত সংকটের পাশাপাশি বালেন শাহ সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে এক জটিল আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান সংবেদনশীল এবং ঐতিহাসিকভাবেই দেশটিকে দুই বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও চীনের মধ্যে একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। নতুন এবং তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ এই সরকারের জন্য এই দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বজায় রাখা একটি কঠিন পরীক্ষা। একদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে অক্ষুণ্ণ রাখা, অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে নতুন প্রশাসনকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা নেপালের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। এই আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক টানাপড়েন সামাল দেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী বিদেশনীতির অভাব এই সরকারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ইতিহাসের পাতা ও সমকালীন বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, অতি অল্প সময়ের মধ্যে নতুন কোনও জনমুখী সরকারের এমন সংকটে পড়ার ঘটনা কেবল নেপালেই প্রথম নয়। লাতিন আমেরিকার দেশ চিলির সাম্প্রতিক পট পরিবর্তনের দিকে তাকালে আমরা এর একটি সমান্তরাল উদাহরণ দেখতে পাই। সেখানেও বিপুল জনসমর্থন এবং তরুণ প্রজন্মের বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের ওপর ভর করে অত্যন্ত কম বয়সে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে ক্ষমতায় এসেছিলেন গ্যাব্রিয়েল বোরিক। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই বোরিক সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং নতুন সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তীব্র জনবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ইউরোপের বেশ কিছু দেশেও প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থেকে আসা বিকল্প শক্তির সরকারগুলো প্রশাসনের মসনদে বসার পরপরই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাস্তবসম্মত আর্থিক নীতির অভাবে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এই সমস্ত উদাহরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, বিরোধী আসনে বসে আন্দোলন পরিচালনা করা আর রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে জটিল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কলকাঠি নাড়ানো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।
এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তির জন্য বালেন শাহ সরকারকে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োগমুখী সমাধানসূত্র খুঁজে বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দলীয় সতীর্থ ও সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি শামিল করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র এবং দলের অভ্যন্তরে মুক্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাই হবে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দূর করার একমাত্র পথ। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক একগুঁয়েমি দূর করে নগর উন্নয়ন ও হকার পুনর্বাসনের মতো মানবিক বিষয়গুলোতে আদালতের নির্দেশ মেনে আইনি পথে হাঁটা প্রয়োজন। যুব সমাজের ক্ষোভ প্রশমিত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি কিছু স্বল্পমেয়াদি দৃশ্যমান কল্যাণমূলক কাজ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা আবশ্যক। ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনও আবেগ তাড়িত সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের পরামর্শ অনুযায়ী জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ভারত ও চীনের সঙ্গে বাস্তবসম্মত দ্বিপাক্ষিক নীতি অনুসরণ করতে হবে। নেপালের সামনে আজ আসল পরীক্ষা বিরোধী রাজনীতির নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার। জনআবেগকে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতায় রূপ দিতে না পারলে বিকল্প রাজনীতির আকর্ষণও খুব দ্রুত ফিকে হয়ে যেতে পারে।









