সেই দুই বিনুনির ছোটবেলা থেকেই মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের রসায়ন এমন অনবদ্যভাবে জমে গিয়েছিল যে সমস্ত জীবনে আমি আমার বাবার কাছের বন্ধু হয়ে উঠতে পারিনি। তখন এই নিয়ে আফশোস ছিল না। আজকাল সে কথা ভাবতে গেলে অনুতাপে ভেঙে আসে মন।
যখন ক্লেদহীন, অনাঘ্রাত শৈশবের চৌকাঠ ডিঙিয়ে সদ্য পা রাখছি কৈশোরের সুঁড়িপথে, একটি খেলা এসে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। ক্রিকেট। তখন তাই ভাবতাম বটে কিন্তু আজ বুঝি, খেলার চেয়ে শতগুণ বেশি আকর্ষণ করতেন খেলোয়াড়েরা। আমার কৈশোরে তো আর ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন ছিল না — প্রিয় নায়কদের খেলার (মাঠের এবং মাঠের বাইরের, দুইয়েরই) আকর্ষণীয় মুহূর্তগুলি মুঠোবন্দি করে রাখার কল্পনা সফল হয়নি তাই। সাদাকালো টিভির পর্দার কাঁপা কাঁপা ছবি আর স্পোর্টসওয়ার্লড কিংবা স্পোর্টস্টার ম্যাগাজ়িনের জগমগে রঙিন সেন্টারস্প্রেড — এতেই সীমাবদ্ধ ছিল পছন্দের প্লেয়ারদের নিয়ে আনাড়ি কিশোরীর অকালপক্ক স্বপ্নবিলাস।
এই ক্রিকেটপ্রেমই কিন্তু আমার আর অনেক দূরের গ্রহের বাসিন্দা বাবার মধ্যে অদ্ভুত এক সেতু হয়ে রয়ে গিয়েছিল বেশ কয়েক বছর।
দূরদর্শনে পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচের সিরিজ়ের লাইভ টেলিকাস্ট হবে কিনা, সে খবর প্রথম পেতাম বাবারই কাছে। ইশকুলের জন্য সেই দৃশ্যমান ধারাবিবরণী ‘মিস’ হয়ে গেলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো খেলার আধঘন্টার হাইলাইটসই বা কখন দেখতে পাব, সেটা বলে দেবার জন্যও বাবা ছাড়া কে-ই বা ছিল?
‘৮৩-র ২৫শে জুনের রাতে লর্ডসের শেষ কয়েক ওভারের খেলা যখন অসহ টেনশনের চোটে দেখতে না পেরে মায়ের সঙ্গে সেঁধিয়ে গিয়েছি বিছানায়, রাত বারোটার আশেপাশে মশারির কোণ তুলে, আমাকে ধাক্কা দিয়ে ডেকে — ‘আমরা জিতে গেছি বাপি, উই আর ওয়ার্লড চ্যাম্পিয়নস! আয় চলে আয় টিভির ঘরে’ বলে আশ্বস্ত করা লোকটাও তো বাবাই ছিল।
টিভিতে খেলা দেখার অবকাশে কতরকম গল্প যে করত বাবা তার ইয়ত্তা নেই। ডব্লু জি গ্রেসের কিংবদন্তী খেলা, ডগলাস জার্ডিন আর তাঁর কুখ্যাত ‘বডিলাইন’ সিরিজ, রয় গিলক্রিস্টের খুনে বাউন্সার আর বিমার, হেলমেটবিহীন যুগে নরি কন্ট্র্যাকটরের মাথায় মারাত্মক চোট আর তাঁকে বাঁচাতে স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেলের রক্ত দেওয়া, সরফরাজ় নওয়াজ় আর ইমরানের খানের মারকুটে ফাস্ট বোলিং, কলিন কাউড্রের মন্থর ব্যাটিং — কত রকমারি গল্পই না ছিল বাবার ঝুলিতে। বাবার কাছে শুনে শুনে আমিও শিখে গিয়েছিলাম ক্রিকেটের খুঁটিনাটি টুকিটাকি — কোন ফিল্ডিং পজ়িশনকে বলে ফরওয়ার্ড শর্ট লেগ, কাকে বলে অফস্পিন, হিট উইকেট কী বস্তু, এলবিডব্লু আউটই বা কী ভাবে হয়, — এইরকম নানা বর্ণনা আর বিবরণে ভ’রে থাকত আমাদের বাপবেটির আলাপচারিতা।
জন্মদিনে ‘সানি ডেজ়’ আর ‘আইডলস’ উপহার পাওয়ার আনন্দটা ফিকে হয়ে যেতে আরম্ভ করল ইশকুল পেরোনোর পরপরই। তার কতটা সিরিয়াস পড়াশোনার চাপে আর কতখানি বন্ধুবান্ধবদের চোখে ‘ফেমিনিন’ হয়ে ওঠার তাগিদে সেটা আজ আর মাপা সম্ভব নয়।
এই সময় থেকেই একটু একটু করে বাবার কাছ থেকে মানসিকভাবে সরে আসতে আরম্ভ করি আমি। তার সমস্ত আধিপত্যবোধ (এবং অধিকারবোধ) নিয়ে মা প্রবলভাবে ঢুকে পড়ে আমার মনোজগতে — সেই আকর্ষণ-বিকর্ষণের দোলাচলে কেটে যায় আমার শেষ কৈশোর আর প্রথম তারুণ্যের দিনগুলি।
কিছুটা ঔদাসীন্য আর অনেকখানি অভিমান নিয়ে বাবা চলে যায় অন্তরালে। আর কখনও ফিরে আসেনি।
আমার এ হেন বাবার প্রিয়তম ক্রিকেটার ছিলেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স। কালো মানুষের উত্তরণের কাহিনী বাবার বড় প্রিয় ছিল। প্রায় সমস্ত ওয়েস্ট ইণ্ডিয়ান টিমকেই পছন্দ করত বাবা। সোবার্স ছিলেন বাবার কাছে নায়ক-চূড়ামণি। ষাটের দশকে ইংল্যাণ্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহামশায়ারের হয়ে স্যার গ্যারির এক ওভারে ছ’টা ছয় মারার কাহিনী যে কতবার শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। সোবার্সের খেলা আমি টিভিতে দেখিনি। ১৯৭৪ সালে তিনি যখন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট থেকে অবসর নেন, তখনও দূরদর্শন আসেনি কলকাতায়।
গতকাল চলে গেলেন এই অতুলনীয় ক্রীড়াশিল্পী – যাঁকে আর এক প্রবাদপ্রতিম স্যার ডন ব্র্যাডম্যান অভিহিত করেছিলেন ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ নামে —
যাঁর প্রয়াণে আমার প্রিয়তম ক্রিকেট খেলোয়াড় সুনীল গাভাসকর শোকাহত হয়ে বলেছেন, দ্য বেস্ট ক্রিকেটার ওয়ার্লড হ্যাজ় এভার সিন পাসড অ্যাওয়ে টুডে —
যে কৃতী সন্তান চলে যাওয়ার পরে তাঁর দেশ বার্বাডোজ় দু’দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে, সেই স্যার গারফিল্ড সোবার্সের জন্মও জুলাই মাসে, আমার বাবারই মতো। বাবার চেয়ে ঠিক পনের দিনের ছোট ছিলেন তিনি। দু’জনের উচ্চতাও এক — পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি!
মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থান আমার অজ্ঞাত, তবে অন্তরীক্ষে যদি কখনও ভগবান আর তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তের দেখা হয়ে যায়, তোমার এই অতীতচারী, একলা পাগল মেয়েটা বড্ড খুশি হবে বাবা, ভীষণ খুশি হবে।











