সুমিত্রা দেবী সারাদিনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটা কাটাচ্ছেন। রাত্রে তিনি অল্পই খান। ভাত ডাল আরেকটু তরকারি। কিন্তু খাওয়ার পরের সময়টাই তার সবচেয়ে সুখের সময়। যত্ন করে অল্প একটু চুন, কুচো সুপুরি, চবন, কিমাম আর একশো বিশ জর্দা দিয়ে একটা পান সেজে মুখের ডান দিকে গুঁজে দেন।
তারপর টুকটাক কাজকর্ম শুরু করেন। বেসিনের বাসনপত্র ধুয়ে ফেলেন। জামাকাপড় গোছান। ঘরের জিনিসপত্র এদিক-ওদিক করেন। পান থেকে অল্প অল্প রস বেরোয়। জর্দার মিষ্টি গন্ধ। সুমিত্রা দেবীর পুরো সময়টাই অলৌকিক লাগে।
ওনার বর একজন নামকরা ডাক্তার। বেশিরভাগ নামকরা ডাক্তার যেমন হয়, ওনার বর প্রদ্যোত বাবু মোটেও তেমন নয়। সারাদিন ধরে রোগী দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে তিনি বই নিয়ে বসেন। তবে হ্যারিসনের মেডিসিনের বই নয়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা। ওই শশী ডাক্তারের কাহিনীই তার মাথা খারাপ করে দিয়েছে। সুটেড বুটেড ডাক্তার তাঁর এ জীবনে হওয়া হলো না। সারাদিন ধরে তিনি অজস্র রোগী দেখেন। কিন্তু বেশিরভাগ রোগীই নিম্নবিত্ত শ্রেণীর। তবে তাই নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। যা হয় দিব্যি চলে যায়।
স্ত্রী সুমিত্রা দেবী একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। একমাত্র ছেলে রোহনকে হিরের টুকরো বললেও কম বলা হয়। সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। মাধ্যমিকে সে রাজ্যের মধ্যে পঞ্চম হয়ে সকলকে চমকে দিয়েছিল। উচ্চমাধ্যমিকেও তার ওপর শিক্ষকদের অনেক আশা।
যারা মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করে, তারা সাধারণত অত্যন্ত ভদ্র- সভ্য- শান্ত স্বভাবের ছেলে হয়। রোহন ও ভদ্র সভ্য। তবে মুশকিল হলো ওর স্বভাবটা ঠিক শান্তশিষ্ট বলা চলে না। স্কুল টিমের ও অ্যাটাকিং মিড ফিল্ডার। বস্তুত ওর ঘাড়ের উপর ভর করেই ওদের স্কুল দু’বছর আগে সুব্রত কাপের মূল পর্বে সুযোগ পেয়েছিল। মাধ্যমিকে ঠিক পাঁচ মাস আগে রোহন দিল্লি গেছিল সুব্রত কাপ খেলার জন্য। এবং প্রায় একক দক্ষতায় নিজের স্কুলকে ফাইনালে তুলেছিল। ফাইনালে জিততে পারেনি, কিন্তু এই মফস্বল এলাকায় ফিরে প্রায় রাজকীয় সংবর্ধনা পেয়েছিল।
সেই ছেলেই আবার মাধ্যমিকে পঞ্চম হওয়ার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ঘাবড়ে গেছিলেন। অংকের শিক্ষক বলাইবাবু বারবার বলছিলেন, রোহন যদি সুব্রত কাপে খেলতে না যেত, তাহলে নিশ্চিতভাবে পশ্চিমবঙ্গে মাধ্যমিকে প্রথম হত।
বলাইবাবুর অনেক বয়স। ডাক্তার প্রদ্যোত মজুমদারও তাঁর ছাত্র। তিনি বললেন, প্রদ্যোত তোরে বহুবার কয়েছি, ছেলের যত্ন নে। নিজে একটু ছেলেরে অঙ্ক কষা। আহা তোর সেই অংক কষা এখনো আমার চোখে ভাসে রে। সেই ক্যালকুলাস, সেই ত্রিকোণমিতি। তুই ওরে সুব্রত কাপ খেলতে পাঠাইয়েই সর্বনাশটা করলি।
প্রদ্যোত বাবু মুচকি মুচকি হাসেন। নিজের শিক্ষকের কথার প্রতিবাদ করেন না। শুধু ফিসফিস করে বলেন, জানেন স্যার, আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমাদের সময় স্কুল সুব্রত কাপে খেলবে। চ্যাম্পিয়ন হবে। সেই দলে আমি থাকবো। রোহন আমার সেই স্বপ্ন প্রায় পূরণ করে ফেলেছিল।
বলাইবাবু কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, আমার কথা ধরিস না। আমি বুড়া মানুষ। অংক ছাড়া কিছু বুঝি নাই। তবে টিভিতে তোর ছেলের ফাইনাল খেলা দেখতে দেখতে, গালি দিয়ে ফেলেছিলুম। ওর একটা দূরপাল্লার শট যখন বার ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। কেন ও বলটা সামনের শৈলেশ কে বাড়ালো না। পরে হিসেব করে বুঝেছি শৈলেশ রে বাড়ালে গোলের সম্ভাবনা কমে যেত।
স্কুলের শিক্ষকরা একদম নিশ্চিত, উচ্চ মাধ্যমিকেও রোহন কিছু একটা করবে। সুমিত্রা দেবী রোহনের পড়াশোনার খেয়াল রাখেন। এবং খেয়াল রাখতে গিয়ে বুঝতে পারেন তিনি তাঁর দীর্ঘ শিক্ষিকা জীবনে এমন মেধাবী ছাত্র আগে দেখেননি।
অতএব তিনিও নিশ্চিন্তে আছেন। একশো বিশ জর্দার পান খাওয়ার জন্য তাঁর স্বামী তাকে কিছু বলেন না। উলটে আজকাল নিজেই হাত বাড়িয়ে পান চেয়ে নেন। রোহন খিট খিট করত। একদিন সুমিত্রা দেবী রোহন কে হেব্বি ঝাড় দিয়েছেন। বলেছেন, তুই আমার ছেলে। ছেলে ছেলের মতো থাকবি। অত নিখুঁত হয়ে বাঁচা যায় না, বুঝলি। এবং নিজের ছেলেকে ঝাড় দিয়ে অত্যন্ত পুলক অনুভব করেছেন। ঠিক করেছেন মাঝে মাঝে ছেলেকে এরকম ঝাড় দেবেন। কিন্তু তার জন্য একটা উপলক্ষ দরকার।
সেই সুমিত্রা দেবীই আজ পান মুখে দিয়েও সেই আমেজ অনুভব করতে পারলেন না। জর্দায় কি ভেজাল মেশানো? সম্ভবত তা নয়। তিনি রোহনের একটি খুঁত খুঁজে পেয়েছেন। তারপর থেকে মনে শান্তি নেই।
আজ যখন রোহন স্কুলে ছিল, তিনি ওর বই পত্র গোছাতে গিয়ে একটি ডায়েরি খুঁজে পেয়েছেন। সেখানে রোহন প্রতিদিনের দিনলিপি লিখে রাখে।
অন্য একজনের ডাইরি পড়া গর্হিত অপরাধ। বিশেষ করে তিনি একজন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। তাকেই বহু মেয়ে আদর্শ করে বড় হয়। তবে ডায়রিটা দেখার পর তার মাতৃ হৃদয়ের কৌতূহলের জয় হলো। তিনি পড়তে শুরু করলেন। কিন্তু রোহন এ কী লিখেছে। সে একটি মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
১ লা জানুয়ারি রোহন লিখেছে
অর্থ নয়, যশ নয়, এই জীবনে একটাই সফলতা। একটাই লক্ষ্য। তোমাকে নিজের করে পাওয়া। তোমাকে জীবনের ধ্রুবতারা করা।
আমাকে আমি যতখানি ভালোবাসি, বিশ্বাস করি তার চেয়ে অনেক বেশি তুমি আমাকে ভালবাসবে।
২ তারিখে লিখেছে
বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর গতিপথ আমাকে ধাঁধায় ফেলতে পারে না। কিন্তু তোমার চিন্তার গতিপথ যে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে, তার থেকে বের হব কী করে?
৩ তারিখের লেখা পড়ে সুমিত্রা দেবীর অস্বস্তি শুরু হলো
তোমার সাথে তোমার বাড়ি যাব বলে বেলঘরিয়ার টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু যেতে পারলাম কই।
ট্রেন ঢোকার সাথে সাথে তুমি ম্যাজিকের মতো উঠে গেলে। আমি ইতস্তত করছিলাম। জানলার পাশে গিয়ে বসলে। প্ল্যাটফর্ম থেকে তোমায় খুঁজছিলাম।
এত সহজে তোমাকে খুঁজে পেয়ে যাব বুঝিনি। জানলায় তোমার মুখ দেখে এগিয়ে গেলাম। বললে, উঠলেন না?
আমি বললাম না, ঠিক করেছি আর যাব না।
তুমি হেসে বললে এত সহজে অ্যাডভেঞ্চার এর শখ মিটে গেল ।
যার সাথে যাবো সেই যখন এমন ভদ্রতা করতে পারল…
তুমি বললে, ও কথা আপনার মুখে মানায় না।
কোন কথা?
ভদ্রতা।
কেন? আমি কি আপনার সাথে কোনরকম অভদ্রতা করেছি?
এতক্ষণ যাকে অনুসরণ করে এলেন, কথা বললেন, বাড়ি যেতে চাইলেন, একবারও তার নাম জানতে ইচ্ছে করলো না? আমি মেয়ে এটাই কি আপনার কাছে আমার পরিচয়?
আমি তোমার মুখের দিকে সোজাসুজি তাকালাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। তুমি বললে, নিজে কখনো ছোট হইনি, আজ হচ্ছি। আমার নাম মাধবীলতা মুখার্জি।
আমি অস্ফুটে বললাম মাধবী?
উহু, ফুল নয়। শুধুই লতা। আমি বড্ড বেশি জড়িয়ে ধরি।
আমি বহুক্ষণ অবশ হয়ে আজ স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তারপর বেশ কয়েকদিন পরে আবার লেখা
১২ জানুয়ারি রোহন লিখেছে
আজ তুমি বসন্ত কেবিনে এসেছিলে। আমরা কেউই পর্দা টানতে চাইনি। কিন্তু দোকানের ফচকে ছেলেটিই পর্দা টেনে দিয়ে চলে গেল। এই প্রথম আমরা দুজন একেবারে একা।
আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তুমি আমার হাত টেনে নিলে। আমাদের প্রথম স্পর্শ…
সুমিত্রা দেবী আর পড়তে পারলেন না। ডাইরি বন্ধ করে বেশ কিছুক্ষণ আচ্ছন্নের মত বসে রইলেন। রোহন কে নিয়ে তাঁর কত স্বপ্ন। সব স্বপ্নই এখন অলীক মনের হচ্ছে। রোহন কে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর স্বামী প্রদ্যোত বাবু আসুন। প্রদ্যোত রোহনের সাথে প্রায় বন্ধুর মতো মেশেন। তিনি সহজে জিজ্ঞেস করতে পারবেন।
রাতে প্রদ্যোত বাবু বিভূতিভূষণ রচনাবলী খুলে বসেছেন। সুমিত্রা দেবী দুম করে ডাইরিটা প্রদ্যোত বাবুর কোলে ছুড়ে মারলেন। বললেন, পড়ে দেখো।
প্রদ্যোত বাবু অবাক হয়ে বললেন, কী এটা?
তোমার গুণধর ছেলের ডাইরি।
রোহনের ডায়েরি? আমি পড়বো কেন? অন্যের ডাইরি পড়া উচিত নয়।
আমি পড়তে বলছি পড়ো।
প্রদ্যোত বাবু ডাইরিটা খুললেন। পড়তে পড়তে তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
সুমিত্রা দেবী অবাক হয়ে বললেন তুমি হাসছো?
প্রদ্যোত বাবু বললেন এমন একটা ছেলের জন্য হাসবো না? এ বড় আনন্দের হাসি। ছেলেটা মানুষের মতো মানুষের হচ্ছে।
সুমিত্রা দেবী আহত স্বরে বললেন, কেমন বাবা তুমি? ছেলেটা রাস্তা ঘাটে, রেল স্টেশনে, রেস্টুরেন্টের পর্দা ঢাকা কেবিনে ছোটলোকের মতো প্রেম করছে। আর তুমি হাসছো?
প্রদ্যোত বাবু বললেন, মধুর সাথে যে প্রেম করে সে ছোটলোক নয়। হতে পারে না।
মধু কে?
মাধবীলতা মুখার্জি।
তুমি চেনো?
সে যে আমারও প্রেম সুমিত্রা। খারাপ ভাবে নিও না। এখনও সেই আমার জীবনের ধ্রুবতারা। তোমাকে যে মধু বলে মাঝে মাঝে ডেকে ফেলি, সেটা আসলে মাধবীলতাকেই ডেকে ফেলি।
সুমিত্রা দেবী অবাক হতেও ভুলে গেছেন। তিনি আর্তনাদ বললেন, কী আবোল তাবোল বকছো। বাবা আর ছেলে কোনোদিনও এক মেয়ের প্রেমে পড়তে পারে? একেবারে লম্পট না হলে?
প্রদ্যুতবাবু বললেন, পারে পারে। তার প্রমাণ তো হাতেনাতেই পাচ্ছ।
দোহাই তোমায়।, আর রহস্য কোরো না। আমায় সব খুলে বল।
প্রদ্যোত বাবু বইয়ের আলমারি থেকে একটা বই খুঁজে বের করলেন। তারপর সুমিত্রা দেবীর হাতে দিয়ে বললেন, এই বইটা পড়ে দেখ। তাহলে সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।
সুমিত্রা দেবী বইটির নাম পড়লেন। কালবেলা- লেখক সমরেশ মজুমদার।










