একটা কাদার দৈত্য/রাক্ষস। বিকট, বড়, ঘন কাদার রাক্ষস ছুটে আসছিল। আমি ঐটুকু দেখেই প্রাণ নিয়ে সামনের পাহাড়ের উপর দৌড়ে চড়তে থাকি। চড়তেই থাকি। এতটা ছুটে শরীর যতক্ষণ না অবসন্ন হয়ে থেমে যায় ,আমি এক নিঃশ্বাসে পাহাড়ে চড়তেই থাকি। এতোটুকু বলে ৭০ এর বৃদ্ধ ফুকা তামাঙ থামলেন। ঢুঙ্গি বাজার শেষ করেই বড় রাস্তার ধার থেকে অনেকগুলো ছোট রাস্তা ত্রিশূলী নদীর ধার বরাবর গেছে। নদীর ধারে পাহাড়ের কোল ঘেশা এমনই একটা বসতিতে ছিল এই তামাঙ বৃদ্ধের বাড়ি। রোজকারের মতোই বাড়ির আঙিনায় গাছগুলোকে যত্ন করছিল। প্রতিদিনের মতই ঝকঝকে সকাল ছিল সেটা। কোন বৃষ্টি বাদলা বা তার পূর্বাভাস ছিল না। একটু আগে ছোট নাতি স্কুলে বেরোলো। বৃদ্ধা তামাঙনির সঙ্গে দু একটা হাসি মশকরা সেরে পোষা মুরগি গুলোকে চড়তে ছেড়ে দিয়ে মাটিতে হাত লাগিয়েছে সবে।

কাছেপিঠে খুব জোরে বোম ফাটার মতো শব্দে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ভূমিকম্প হচ্ছে বলে মনে হয়েছিল তাঁর। সেটা বুঝেই দৌড়াতে শুরু করেই খুব জোরে চেঁচিয়ে সামনের উঁচু জায়গায় পৌঁছাতে বলল বাড়ির সবাইকে। সামনের পাহাড়ের দিকে দৌড় লাগিয়েছিল সে। কিন্তু ভূমিকম্প হলে কি এমন দৈত্যের মতো কাদা ছুটে আসে? প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় ছিল না। চোখের পলকে নিমিষে গ্রামটা গুঁড়িয়ে গেল। ত্রিশুলি ব্রিজ ভেঙে নদীর সঙ্গে মিশে গেল। নিপাত্তা হল অসংখ্য মানুষ। তামাং এর পরিবার তার বৃদ্ধ বাবা মা কারো খোঁজ নেই। তারই মতন গ্রামের আরো কিছু মানুষ দৌড়ে পাহাড়ে গিয়ে বাঁচতে পেরেছিল। যারা পারেনি, তারা আজও নিখোঁজ। একমাত্র স্কুলে যাওয়া নাতিটিকে পাঁচ দিন পর হোল্ডিং সেন্টার থেকে খুঁজে পেয়েছে সে। মানুষটা বুঝে গিয়েছে পৃথিবীতে এখন তার পরিবার বলতে শুধু ঐটুকুই । আমাদের সঙ্গে তার দেখা হয় ঢুঙ্গী বাজার পেরিয়ে এক অস্থায়ী খাবার দেওয়ার শিবিরের ধারে। ঘটনার পর আর ছোট নাতিকে কাছ ছাড়া করতে চাইছেন না তিনি। ৫-৬ বছরের শিশু টি কথা বলার সময় ফড়িং এর মত গোল হয়ে দাদুকে ঘিরে ঘুরেই চলেছে। শিশু মন বিপর্যয়ের গাম্ভীর্য বোঝেনা। হারানোর গভীরতাও বোঝেনা। নিছক খেলার ছলেই সে দাদুকে ঘিরে গোল গোল করে ঘুরেই চলেছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তার উৎসাহী চোখ বুঝে নেওয়ার জন্য স্থির হয়। অস্থির ভাবে দাদুকে জানায় আমাদের বাড়ি কোথায় ছিল ওদের দেখাও দেখাও। তামাং বৃদ্ধ অসহায় চোখে জানায় “আমাদের বাড়িই তো নেই। আর কি দেখাবো?”
এরকম অসহায় মানুষ অনেক। দুর্ঘটনা গ্রস্থ এলাকার যেসব বাড়ি থেকে কিছু মানুষকে উদ্ধার করা গেছে, তাদেরকে হোল্ডিং সেন্টারে রেখেছে নেপাল সরকার। আর কিছু মানুষ স্হানীয় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে । কিছু মানুষ কাঠমান্ডুতে বা নেপালের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। প্রত্যেকেই জানেনা সামনে কি করার আছে। এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ। পরিবারগুলো জানে না কোথায় যেতে হবে, কোথায় গেলে নিখোঁজ বা জীবিত বা মৃত দের কোন খোঁজ পাওয়া যাবে। বিদুরের বেশ কয়েকটি হোল্ডিং সেন্টারে আমরা গিয়েছিলাম। ঢুঙ্গি বাজারের হোল্ডিং সেন্টারে দুর্ঘটনাগ্রস্থ পরিবারের অনেকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ।
বিদুর নগরপালিকার ঢুঙ্গি বাজারের প্রাণকেন্দ্রে নুয়াকোট আদর্শ বহুমুখী ক্যাম্পাস একটি সরকারি কার্যালয়। সেখানে অস্থায়ীভাবে রেডক্রস তাদের চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করেছে। ওই কেন্দ্রের বিপরীত দিকের এক সরু পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বেশ কিছুটা ওপরের দিকে উঠে দুটি বড় হোল্ডিং সেন্টার। এখানে বেশিরভাগ হোল্ডিং সেন্টার গুলি হল তাইকোন্ডো প্রশিক্ষণের কেন্দ্র। মানে বিপর্যয়ের সময় অস্থায়ীভাবে এগুলোকেই হোল্ডিং সেন্টার বানানো হয়েছে। দু পাশে গ্যালারী দেওয়া। মাঝখানে প্রায় দু আড়াই হাজার স্কয়ার ফুট মতন এলাকা। মাঝখানের সমতল অংশতেই ভাগ ভাগ করে দুর্ঘটনা গ্রস্থ এলাকার মানুষদের রাখা হয়েছে। বর্ষাকাল। এই সময়ে নেপালেও বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের তরফে আগে থেকেই ঘোষণা করা হয়েছে যে ফের এরকম বিপর্যয় হতে পারে। বিদুর এক নম্বরে হোল্ডিং সেন্টারটি তে গিয়ে দেখলাম কোথাও কোথাও চাল থেকে জল পরছে। আপাতত সেই জায়গা গুলিতে বালতি বসিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে মানুষেরা।
মানুষগুলো অসহায়, মানুষগুলো সব হারিয়েছে, মানুষগুলো জানে না কি তাদের ভবিষ্যৎ! আর সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো মানুষগুলো ঠিক করে উঠতে পারছে না যে কাল তাদের পরিবারের যে মানুষগুলো তাদের সঙ্গেই ছিল আজ তাদেরকে মৃত বলে মনে করবে নাকি নিখোঁজ ভাববে?? যাদের মৃতদেহ যেটুকু শনাক্ত করা গেছে তাদের একরকম। কিন্তু যে মানুষগুলো তাদের প্রিয়জনদের খুঁজে পাচ্ছে না তারা কি ভাববে? কি ভেবে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেবে? হোল্ডিং সেন্টারে মানুষগুলোকে দেখে মনে হল ওরা যেন থমকে আছে। আসা যাওয়ার মাঝখানের একটা ট্রানজিট, সেই ট্রানজিট পেরিয়ে প্রিয়জনকে মৃত মেনে নেওয়ার সাহস তারা দেখাতে পারছে না। অন্যদিকে সহায়- স্বস্তি দেওয়ার মতো কাধগুলোও আর খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছেনা না। ওরা থমকেই আছে। ঘটনাটা সকাল বেলায় ঘটেছিল। ওই সময় অনেকেই একসঙ্গে বাড়িতে। ঘটনার আকস্মিকতায় নিজের প্রাণ বাঁচানো টাই অনেক জায়গায় একমাত্র চয়েজ ছিল। এই অসহায়ত্বকে বোঝা যায়, কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। ফেলেও দেওয়া যায় না। বয়ে বাড়াতে হয়। তেমনই একজন নরেশ তামাক। চোখের সামনে স্ত্রীকে ভেসে যেতে দেখেও সাহায্য জন্য হাত এগিয়ে দিতে পারেনি। বাঁচাতে পারেনি সন্তানদের কেও। অপরাধবোধ আর অসহায়ত্বে নরেশ ভাষা হারিয়ে চুপ করে গেছে সে।
আমি এই সেন্টারগুলোতে এমন অনেক থমকে থাকা মানুষ দেখেছি। তাদের অসহায়ত্ব হতাশা ভরা চোখ, হতোদ্যম শরীর। তারা আছে, অথচ নেই। তারা চেষ্টা চালাচ্ছে ভীষণ রকম ভাবে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। মা তার সন্তানকে হারিয়ে চোখের জল ফেলার মতন অবস্থায় নেই, কারণ তাকে অন্য জীবিত সন্তানের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। এক মুহূর্তে শান্ত জীবন ছেড়ে লড়াইয়ের কঠিন ময়দানে নামতে হয়েছে মানুষগুলোকে। নামতে বাধ্য হয়েছে আর কি! বাড়ির যে প্রিয় মানুষটা বা মানুষগুলো আজ নিখোঁজ হয়ে গেল, তার জন্য শোক করার অবকাশ টুকু পেল না। কারণ তাদের আরো কঠিন লড়াইয়ে নেমে পড়তে হয়েছে। প্রিয় মানুষটিকে রেখে জীবন তাদেরকে এগিয়ে দিয়েছে। তাদের কাছে আর দ্বিতীয় সুযোগ নেই মিছিলে পিছিয়ে পড়া সেই মানুষগুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার। অবকাশ নেই কোন অভিমান বা আত্মসম্মান দেখানোর। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদেরকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রিয় মানুষটির জন্য কাঁদতে পারা বা শোক করতে পারাও যে আসলে একটা রিলিফ আমি সেটা বুঝলাম ওদের দেখেই। আগামী সময়ে টিকে থাকাই এখন ওদের মূল চিন্তা। বিদুরের ওই হোল্ডিং সেন্টারেরই আর এক দুর্ঘটনাগ্রস্ত মা তারা তামাঙের এর মূল আশঙ্কা এখন এটাই। সামনের দিন চলবে কি করে। তারার স্বামী ও একটি সন্তান নিখোঁজ। বাপের বাড়িতে তার নিজের মা বাবা এবং দাদাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির অস্থায়ী কর্মী ছিল সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। আগামী দিনের রুজি রোজকারের কি অবস্থা হবে জানা নেই। সরকার আগামী দিনে দুর্ঘটনা গ্রস্থ প্রতিটি পরিবারকে মাত্র ৫০০০ টাকা করে মাসিক অর্থ সাহায্য করবে বলে ঘোষণা করেছে। যা প্রয়োজনের থেকে অনেক কম। মানুষগুলো ভয়ে দিন গুনছে। কারণ যেদিন সরকার হোল্ডিংসেন্টার গুলি বন্ধ করে দেবে তারার মতন অসংখ্য পরিবারকে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে।











