‘মুছে দেওয়া’ শাসকের অত্যন্ত প্রিয় অস্ত্র। সময় যায়, শাসকের মুখ পাল্টায়, কিন্তু এই অস্ত্রের ব্যবহার বদলায় না। নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের চিহ্ন মুছে দিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া, ইতিহাসকে গুলিয়ে দেওয়া, অপরাধকে আড়াল করা, শাসকের এই পুরনো কৌশল।
বিগত শাসকের আমলে স্মৃতি মুছে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো ‘ছোট্ট ঘটনা’, ‘মেয়েটির চরিত্রে দোষ ছিল’ এরকম শব্দবন্ধ। অন্যায়কে তুচ্ছ করে, মানুষকে মেলা, খেলা, উৎসবে ব্যস্ত রেখে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলত।
তারপর এল ৯ আগস্ট। ঘটে গেল সেই নৃশংস ঘটনা। আর তার পরেই শুরু হলো ফের ‘মুছে দেওয়ার’ খেলা।
শাসকের থ্রেট সংস্কৃতির ধারক বাহকরা নেমে পড়ল প্রমাণ মুছে ফেলতে, প্রতিবাদের ভাষা মুছে ফেলতে, মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলতে। ১৪ আগস্টের গভীর রাতে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর চালানো হলো। প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদতে যেন সম্পূর্ণ করে দেওয়া যায় সেই মুছে ফেলার কাজ।
কিন্তু ততদিনে বাংলা তথা বিশ্বের মানুষ জেগে উঠেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, সেটিকে দেওয়াল ভেঙে, প্রমাণ মুছে, হুমকি দিয়ে আর নেভানো যায়নি। বারবার শাসকের ‘মুছে দেওয়ার’ চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
তারপরও চেষ্টা থামেনি।আন্দোলনের চিহ্ন মুছে দিতে স্বাস্থ্যভবনের সামনের রাস্তা ও দেওয়াল থেকে মুছে ফেলা হলো প্রতিবাদের লেখা। কিন্তু মানুষ সেই মুছে দেওয়ার জবাব দিয়েছে। দিয়েছে ভোটবাক্সে।
শাসকের মুখ বদলেছে। সরকার বদলেছে। আর মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছে, এবার হয়তো অভয়ার বিচার হবে। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন কমিটি। মুখ্যমন্ত্রী বারবার চিৎকার করে বলেছেন, ‘অভয়া ভুলিনি।’
কিন্তু আজ আমরা প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি, ভুলে না গেলে এই আচরণ কেন?
কোথাও যেন আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছি, যখন দেখি সেই সরকারেরই কর্তাব্যক্তি ও মন্ত্রীরা একের পর এক এমন আচরণ করছেন, যা তাঁদের প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের দেওয়াল তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন।
কিছুদিন আগেই রাতের অন্ধকারে মুছে ফেলা হলো অভয়াকে নিয়ে তৈরি গ্রাফিতি ও চিত্রগুলি। পরদিন ছাত্রছাত্রীদের তীব্র প্রতিবাদের চাপে সেগুলি আবার আঁকার অনুমতি দেওয়া হলো। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন থেকেই গেল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া একা একজন প্রিন্সিপালের পক্ষে কি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব?
আর আজ সেই প্রশ্নের উত্তর যেন নিজের মুখেই দিয়ে দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ক্যাম্পাসে ঢুকে দেওয়ালের ছবিগুলি দেখে হঠাৎ চিৎকার করে সেগুলি দ্রুত মুছে ফেলার নির্দেশ!
সংবাদমাধ্যমে সেই দৃশ্য দেখে আমরা হতচকিত। কারণ এই একই মানুষকে আমরা একসময় অভয়া আন্দোলনের পাশে দেখেছি। মেডিক্যাল কাউন্সিল নির্বাচনে তাঁকে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবেও দেখেছি।
তাহলে আজ এই বদল কেন?
ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই কি প্রতিবাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়?
ছাত্রছাত্রীদের দ্বিতীয় ঘর তাদের ক্যাম্পাস। সেই ক্যাম্পাসে যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্বাধীনতা না থাকে, যদি কর্তৃপক্ষের অঙ্গুলিহেলনে ঠিক করে দিতে হয় কোথায় কী লেখা যাবে, কোন ছবি আঁকা যাবে, কোন স্মৃতি থাকবে আর কোন স্মৃতি মুছে ফেলা হবে, তাহলে সেটি শুধু ছাত্রছাত্রীদের অধিকারের প্রশ্ন নয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
দেওয়ালের ওই ছবি, ওই লেখা, ওই গ্রাফিতি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলি একটি প্রজন্মের ক্ষোভ, যন্ত্রণা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এগুলিই আগামী প্রজন্মকে শেখাবে অন্যায় দেখলে চুপ না থাকতে, ধর্ষণকে ঘৃণা করতে, ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করতে।
তাই প্রশ্নটা শুধু দেওয়াল মুছে ফেলার নয়।প্রশ্নটা হলো, ক্ষমতায় এলেই কি প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর মুছে ফেলতে হবে? শাসকের গদিতে বসলেই কি গতকালের প্রতিবাদী মানুষ আজকের প্রতিবাদকে ভয় পেতে শুরু করবেন? ক্ষমতার রং বদলালেই কি ‘মুছে দেওয়ার’ রাজনীতি একই থেকে যাবে?
আমরা এই রাজনীতি মানি না।
কারণ দেওয়াল মুছে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। গ্রাফিতির রং মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তার ভিতরে থাকা প্রশ্ন মুছে ফেলা যায় না। প্রতিবাদের অক্ষর মুছে ফেলা যায়, কিন্তু প্রতিবাদী প্রজন্মকে মুছে ফেলা যায় না।
ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের কণ্ঠ আরও জোরালো হবে। গণতন্ত্রপ্রিয় সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের লড়াই থামবে না। উদ্ধত শাসকের রক্তচক্ষুর সামনে শিরদাঁড়া সোজা রাখার লড়াই চলবেই।
কারণ অভয়ার বিচার শুধু আদালতের কাঠগড়ায় নয়, মানুষের স্মৃতিতেও লড়াই হচ্ছে।
আর সেই স্মৃতি কেউ মুছে দিতে পারবে না।










