
অথচ উৎপাদনের জন্য সম্ভাব্য আধুনিক পরিকাঠামোর সুযোগ সুবিধাগুলোকে লিঙ্গ নিরপেক্ষভাবে সম্প্রসারণ করা হলে কৃষির সঙ্গে যুক্ত মহিলারাও যে কৃতিত্বের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন, তার অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে। সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য নতুন নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হলেও তার সুযোগ সুবিধাগুলোকে আজও সকলের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয় নি। এই কারণে সবক্ষেত্রেই ব্যবধান বাড়ছে। কৃষির সাফল্য একান্তভাবে নির্ভর করে জলবায়ুগত পরিবেশের ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন চিরন্তন কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকট শুধু পুরুষ বা মহিলা কৃষিজীবীদের নয়, এইটি নিঃসন্দেহে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এই মুহূর্তে লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াইয়ে সামিল হতে হবে কেননা এই সমস্যা সমগ্র মানবজাতির। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষিক্ষেত্রসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী সশক্তিকরণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এমনই এক সমস্যাঘন পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে একবার আমাদের দেশের মহিলা কৃষিজীবীদের হালহকিকত যাচাই করে দেখে নেওয়া যাক।
এই রিপোর্টের শিরোনাম Her Harvest 2026 । এদেশের একান্ত গ্রামীণ পরিমণ্ডলে কৃষি হলো প্রথাগতভাবে একটি অনন্য পারিবারিক সংস্কৃতিরই অংশ। অথচ এই ব্যবস্থাপনায় খুব বড়ো রকমের অসঙ্গতি যে রয়েছে তা রিপোর্টে খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে । পরিবারের সদস্য হলেও দেশের ৫০.৫ % মহিলা সদস্যাকে বিণা বেতনের সহকারী হিসেবেই গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে পুরুষ সদস্যের অনুপাত হলো ২১.৭% । অর্থাৎ প্রায় ৩০% অতিরিক্ত মহিলা এই বঞ্চনার শিকার।
ভিন্নতর কর্মক্ষেত্রের সুযোগ বাড়লেও ভারতে মোট কর্মরতা মহিলাদের ৬৪.৪% এবং গ্রামীণ কর্মরতা মহিলাদের ৭৬.৯% কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। ভারত এখনও কৃষি নির্ভর দেশ ফলে এই পরিসংখ্যানে হয়তো খুব বেশি অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু এটি কখনোই একটি উৎসাহব্যঞ্জক পরিসংখ্যান নয়। দেশের কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মোট শ্রমশক্তির ৪৮% হলো মহিলা। এতো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও মহিলা কৃষিজীবীদের অবস্থান মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়, কেননা দেশের মোট কৃষিজমির মাত্র ১১.৭২ % এলাকায় মহিলাদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে এবং মাত্র ১৩.৯৬% জমির মালিকানা ন্যস্ত রয়েছে মহিলাদের ওপর। এক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্রটি সত্যিই ভয়াবহ।
রিপোর্টে পরিস্কার করে বলা হয়েছে যে এই সমস্যার কারণ কৃষির মতো শ্রমসাধ্য কাজে মহিলাদের অসামর্থ্য নয় বরং বলা যায় যে প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা থেকে তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করার কারণেই উৎপাদনের মাত্রা কমছে। কৃষির কতোগুলো কাজে মহিলাদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত অথচ পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে মহিলাদের দূরে সরিয়ে রাখার এই অনিয়ম গোটা ব্যবস্থাকেই পশ্চাৎপদ করে রেখেছে। একই কাজের জন্য পুরুষ ও মহিলাদের মজুরির বৈষম্য এই অন্যায়ের অন্যতম দিক। যে কাজের জন্য একজন পুরুষ শ্রমিককে ১০০ টাকা দেওয়া হয় সেই একই কাজের জন্য একজন মহিলা সদস্যাকে দেওয়া হয় ৮২ টাকা। এই ফারাক প্রভাব ফেলে আয়স্তরের ওপর।
এই বৈষম্যের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। আজ
সেই আশ্চর্য পংক্তিগুলো বারবার মনে পড়ে –
“যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”
স্বাধীনতার আট দশক পরেও কি এই বৈষম্যের ধারা বজায় রেখে চলবো আমরা? আজ এটাই সব থেকে বড়ো প্রশ্ন।
আগস্ট ২০, ২০২৬












