নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলার মনীষী, সংস্কৃতি ও শিক্ষাঙ্গনের উপর লাগাতার গৈরিক হামলা ঘটেই চলেছে। বাঁকুড়ার ইন্দাসে সিজেপি-র সমর্থকের বাবাকে বাড়িতে ঢুকে পিটিয়ে মারা, তারপর সিজেপি-র অনুষ্ঠানের জন্য কলকাতায় হল না পাওয়া, যাদবপুরে লেনিন মূর্তি ভাঙার হুমকির পর বিশ্ববিদ্যালয়ে সারারাত হামলা চালিয়ে ক্যাম্পাস দখল করবার চেষ্টা, তারপর ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের ঘরেই এনআইএ-র নোটিশ! মুখ্যমন্ত্রীর সদর্পে ঘোষণা : এখানে সনাতন হিন্দু সংস্কৃতি করে ছাড়ব, মেদিনীপুর কলেজ, বারাসাতে তিতুমীর হল গৈরিক বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত , এতেও কি বোঝ যাচ্ছে না বিজেপি সরকার কি চায়?
পরপর সব কটা ঘটনাকে একসঙ্গে বিচার করলে এটা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট : সবটাই পূর্ব পরিকল্পিত।
এই কাজগুলো প্রমাণ করে এটা ফ্যাসিস্ট দল ও সরকারের সুচিন্তিত কাজ। ফ্যাসিস্ট কারা ? যাঁরা নিজের নীতি, পছন্দের মানুষ ও নিজের আদর্শের বাইরের সকলকেই শত্রু বলে মনে করে, এবং তাদের প্রতিবাদীদের নিকেশ করে দেওয়ার মধ্যেই রাজনৈতিক লক্ষ্য সম্পূর্ণ হয়। তারা নিজেদের ধর্ম সংস্কৃতি বিশ্বাস অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়, অথবা যাঁরা বিরোধী তাদের সমাজ ও দেশ থেকে কমপক্ষে তাড়ানোর চেষ্টা করে, অথবা সম্পূর্ণ নিকেশ করাকেই পবিত্র কর্ম বলে মনে করে। বিরোধী যা কিছু সবকিছু তাদের শত্রু। এদের আদর্শ মানবিক নয়। তাদের লক্ষ্য কেবলই ক্ষমতা। ক্ষমতায় এসে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করাটাই তাদের লক্ষ্য। তাদের কর্মকাণ্ড তাই সেভাবেই পরিচালিত হতে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসবার পর শিক্ষাঙ্গনগুলিতে আজকে যে হামলা হচ্ছে, সেটা ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটাচ্ছে। তারা হিন্দুত্ববাদী।এই বাংলায় তারা হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলতে চায় প্রতিটা বাড়িতে। অনেক আগে থেকেই এই নিয়ে পরিকল্পনা করেই এগিয়ে চলেছে। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা মানুষের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে এবং ৩২ লক্ষ মানুষকে সুকৌশলে ভোটে দেওয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে নির্বাচনে জিতে সরকারে এসেছে। কিন্তু ভোটে জিতে আসবার আগেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই রাজ্যে ভোট প্রচারে এসে সরাসরি যাদবপুরকে টার্গেট করে বলেছিলেন , বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কেন? কারণ এই বিশ্ববিদ্যালেয়ের ছাত্র – শিক্ষকরা রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে তার দায়িত্ব নিয়ে , কার স্বার্থে দেশ চালানো হচ্ছে সেটা জানতে চায়।আনুগত্যের দাসত্বে নয়, যুক্তি তথ্য প্রমাণ নিয়ে বিজ্ঞানের চেতনায় মুক্তমনে বাংলার ছাত্র যুব সমাজ সেটা করুক, এই বিজেপির সরকার ও সকল হিন্দুত্ববাদী দল মোটেই চায় না । তাই ক্ষমতা দখল করেও এদের লক্ষ্য পূরণ হয় না। কারণ ক্ষমতা নয়, এরা চায়, বাঙালির চেতনা বদলে দিতে। বাংলায় যে প্রগতিশীল ও মানবিক ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজ সংস্কৃতি তার খোল নলচে বদল করে হিন্দুত্ববাদী জাতিগঠনের পক্ষে আলোচনা ,লেখালেখি, সাহিত্য সংস্কৃতি চালু করতে চায়। তাই নবান্নের ক্ষমতা দখল করার পর এখন তাদের টার্গেট প্রগতিশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে বাম মনষ্ক ছাত্রদের হটিয়ে ছাত্র ইউনিয়নগুলো নিয়ন্ত্রণ করা।সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষ মূল্যবোধের চর্চা বন্ধ করে ছাত্র যুব মনে হিন্দুত্ববাদ থেকে সমস্ত রকম রাষ্ট্রবাদী একনায়কতন্ত্রের পক্ষে একটা যুব বাহিনী তৈরি করা।
তাই বাংলার মনীষীদের গলায় জুতোর মালাটা এরা ছাড়া আর কারা দেবে? যারা বিপ্লব করতে চায় তারা এদের শত্রু ছাড়া আর কি হবে? যারা মুক্ত চিন্তায় সমাজ গড়তে চায় তারা এদের সবচাইতে বড় চোখের বালি ছাড়া আর কি হবে? তাই আলাদা করে যাদবপুরে কেন আক্রমণ এটা ভাবলে ভুল হবে। সুকান্তের গলায় কেন জুতার মালা? বারাসাতে তিতুমীর নামাঙ্কিত হল থেকে তিতুমীরের নাম মুছে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদ হল করে দেওয়ার যে রাজনৈতিক আগ্রাসন ঘটছে , এগুলো কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিচ্ছিন্নভাবে ভাবার কোনো কারণ নেই। গোটাটাই একটাই ন্যারেটিভ, হিন্দুত্ববাদ কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে গণতন্ত্র বাক স্বাধীনতা নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্লুপ্রিন্ট। হিন্দুবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যারা তাদের তাই দেশবিরোধী বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তারা জাতি বিরোধী, তারা দেশবিরোধী। তারা পাকিস্তানপন্থী , চীনপন্থী , দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু। এভাবেই বলতে বলতে সমাজে বিভাজন ঘটাচ্ছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের বিভাজন, পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, ঘৃণা প্রবেশ করাচ্ছে । এরপর যে কোনো দিন যে কোনো জায়গায় হামলা, উত্তেজনা সৃষ্টি করে দাঙ্গা লাগানোর আশঙ্কা। এই রাজনীতি গৃহযুদ্ধের মত পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যাতে হিন্দুর সঙ্গে মুসলমান, ধর্ম নিরপেক্ষের সাথে হিন্দুত্ববাদীর, বামেদের সাথে ডানপন্থী, পরস্পর নিজেদের মধ্যে লড়াই করা শুরু করে দেয় ,তার জন্য একটা বাতাবরণ তৈরি করার জন্য এভাবে একটা একটা পদক্ষেপ! পরিকল্পনা করেই প্রশাসনকে ব্যবহার করছে।
বিরোধী দলগুলো যথেষ্ট ছিন্নভিন্ন। বাম দলগুলি ঐক্যবদ্ধ নয়। বিরোধিতা করলেই মানুষ ভাবে দলীয় স্বার্থ, বাঙালি নিজের সত্তা ও সংস্কৃতিকে এখনো বিপন্ন বলেই ভাবছে না, সমস্যা ও বিপদের কারণ সেটাই। মানুষের কাছে গিয়ে বোঝাতে পারবে কিনা সেটা বিরোধী দলগুলি জানে। কতটা প্রতিরোধ বিরোধীরা সত্যিই তৈরি করে তুলতে পারবে,সেটা রাজপথের লড়াইয়ে ঠিক হবে। তাই আগামী দিনগুলো এই রাজ্যের পরিস্থিতি আরও আগ্রাসী ও হিংসাত্মক রাজনীতির কবলে পড়তে চলেছে। সরকার ও ক্ষমতাসীন দল ও তাদের হিন্দুত্ববাদী সহযোগী আর এস এস, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দল যৌথভাবে বাংলায় হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তার নামে বাঙালির নিজের সংস্কৃতি ধ্বংস করে হিন্দি বলয়ের চিন্তা ও সংস্কৃতি চালু করতে চলেছে, তাকে কি আদৌ মধ্যবিত্ত বাঙালি প্রতিহত করতে চায়? মনে হয় না। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাঙালি নিজেও বদলে গেছে। গুজরাট কর্ণাটক পুনা নয়ডার মতো উন্নয়ন চায় বলে মনে মনে সেইসব রাজ্যের সংস্কৃতিপ্রিয় হয়ে উঠছে দ্রুত।
বাঙালি কি তার বাঙালিয়ানা, মুক্তচিন্তা,প্রগতিশীল বামপন্থী সংস্কৃতি বহন করতে চায়? এই প্রশ্ন মধ্যবিত্তের সামনে।
আমজনতার চেতনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শেষপর্যন্ত ঠিক করবে কোন বাংলা আগামীদিনে দেখব।
বিজেপি ছাড়া অন্য দল সকলেই ক্ষমতার রাজনীতি করে,এবং ক্ষমতা পেয়ে নিজেদের দলীয় সংগঠনের শ্রীবৃদ্ধিতে মন দেয়। বিজেপির উদ্দেশ্য পৃথক।তারা এই দেশের জনমনে হিন্দু ধর্মের নামে মৌলবাদের বীজ বোনে। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে চায়।এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসে তারা সেটাই করছে ।মুখ্যমন্ত্রী পদে থেকে শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলছেন, যাদবপুরকে তারা জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবর্তন করে ছাড়বেন।যাঁরা বাধা দেবে তারা যেন পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যায়।এই কথাটির দুটি অর্থ: এক শিক্ষা হবে জাতীয়তাবাদী।দুই সমাজ হবে রাষ্ট্র বাদী। অর্থাৎ জাতির নামে মুক্তচিন্তার ধ্বংস যার বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। এবং সরকারের নীতি পছন্দ না হলে রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে, এই হুমকি কি কোনো সংবিধানে শপথ নেওয়া কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলতে পারেন? আইনত পারেন না।শুভেন্দু অধিকারী সেটা জানেন।কিন্তু আইনসভায় বসে সংখ্যালঘুদের প্রতি যে হুমকি তিনি বেআইনিভাবে প্রায়ই দেন, তার প্রতিরোধে কে আছে? স্পিকার না আদালত ? রাস্তায় নেমে বামপন্থীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছে। মানুষকে সচেতন করছে। কিন্তু মানুষ কি চায় তার অধিকার? চায় কি মানবিক সমাজ ? ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতি? হিন্দুত্বের নামে ধর্মীয় মৌলবাদ? আজ সেটা ঠিক করার সময় এসেছে বাংলার সাধারণ মানুষের।এটা ভোটের রাজনীতির ইস্যু নয়। এটা জাতির চেতনা, সংস্কৃতি ও সমাজ নির্মাণের প্রশ্ন।
রুখে দাঁড়াতে হবে জনগণকেই।
সেটাই শুরু হয়েছে। যন্তর মন্তর থেকে।শিক্ষার হাল তুলে ধরার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কোকরোচ পার্টির স্কুল অভিযান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে,দেশ কোথায় দাঁড়িয়ে।
এরপরেও আমরা হিন্দু মুসলমান করব??











