মাননীয় তথাগত রায় জানেন না এরকম জিনিস খুব কম আছে। যা কেউ জানে না সে সম্পর্কেও তার জ্ঞান অসাধারণ। এবং, সবসময় বলেন খুব জোর দিয়ে যাতে মনে হয় এটা প্রমাণিত সত্য, যেমন অঙ্কে থাকে LHS = RHS ( Proved )।
উনি বহুকাল যাবত শাসক দলের সঙ্গে জড়িত আছেন, একবার বোধহয় রাজ্য সভাপতিও হয়েছিলেন। তারপর অবশ্য সসম্মানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো রাজ্যপাল করে ত্রিপুরায়, এরপরে আর রাজ্যে সেভাবে সুবিধা করতে পারেন নি, জেতার পরে তো নয়ই। অনেক দিন আগে একবার ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন ‘কামিনী কাঞ্চন যোগ’ নিয়ে, এখন চেষ্টা করে চলেছেন যে কোনো ভাবেই হোক প্রাসঙ্গিক থাকতে।
Latest দিয়েছেন লেনিন ও তার সিফিলিসে মৃত্যু নিয়ে। এ আলোচনা নতুন নয়, আগেও হয়েছে। অভিনবত্ব হলো লেনিন নাকি নিয়মিত যেতেন প্যারিসের নিষিদ্ধ পল্লীতে। লেনিন কোথায় কোথায় যেতেন বা কেন যেতেন তার সমস্ত তথ্য নিশ্চয়ই আমাদের জানার কথা নয়, তবে তার বিরুদ্ধ মতের বা কমিউনিস্ট বিরোধীদের কারুর এই ধরণের অভিযোগ ছিল, এটা তো আগে শুনেছি বা পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। যদিও নিষিদ্ধ পল্লীতে গেলেই কোনো মানুষ খারাপ হয়ে যাবে, এটারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। মেডিকেল কলেজের বিপরীতে so called red light area হাড়কাটা লেনের আশেপাশে আমাদের অত্যন্ত কাছের কিছু মানুষ থাকতেন, এবং তাদের বাড়িতে নিয়মিতই যেতাম! আমাদের মেন হোস্টেলের পাশ দিয়ে ঢোকার রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে থাকতেন বেশ কয়েকজন মহিলা, যদিও তারা কোনোদিনই আমাদের কাউকে বিরক্ত করেন নি।
যাহোক, লেনিন সেই তল্লাটে গেছেন এই তথ্যই কোথাও নেই, তাই এতো কথার দরকারই বা কী?!
লেনিনকে নিয়ে যে গল্পটা আছে, সেটা ইনেসা আর্মান্দ নামের এক মহিলাকে নিয়ে। তার জন্ম প্যারিসে হলেও এক রুশ অভিজাতকে বিয়ে করেন।প্রচণ্ড প্রগতিশীল,অসম্ভব মুক্তমনা এবং রাজনীতি – সমাজনীতি-সঙ্গীতে দারুণ জ্ঞানসম্পন্ন মহিলা, যিনি অনেক বারই লেনিন ও ক্রুপস্কায়ার সঙ্গে এসে থাকতেন তাদের exile এর দিনগুলিতে। অনেক সময়ে তাদের সঙ্গে ক্রুপস্কায়ার মাও থাকতেন। লেনিনের সঙ্গে নাকি তার দীর্ঘ আলোচনা হতো রাজনীতি ও সঙ্গীত নিয়ে( বিশেষত বিটোফেন যার অসম্ভব ভক্ত ছিলেন দুজনেই)। ১৯২০ সালে সেই মহিলা কলেরাতে মারা গেলে, লেনিন ভীষণ ভাবে ভেঙে পড়েন। যেহেতু, মহিলা অত্যন্ত মুক্তমনা ছিলেন, পণ্ডিতেরা ধরেই নিতে পারেন তিনি ‘মুক্ত চরিত্রের’ বা সোজা কথায় দুশ্চরিত্রই হবেন। লেনিনের ‘সিফিলিসের’ গল্পটা কিন্তু ইনেসা ও লেনিনের সম্পর্ককেই নিয়ে। লেনিনের সঙ্গে ইনেসার সম্পর্ক ঠিক কোন পর্যায় জানা না থাকলেও একটি নারী ও একটি পুরুষের স্বাভাবিক বন্ধুত্বের বিষয় নিয়ে আমরা সবসময়েই ঘোরতর সন্দিহান। তাই, বাকিটা উপসংহার টেনে নিতে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা নেই। আমাদের দেশে গান্ধীজির সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির কন্যা সরলা দেবীর চিঠিপত্রের গভীর সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই এতোটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন যে শেষমেশ রাজাগোপালাচারীজীকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হয় এই বিষয়ে দাঁড়ি টানতে। এখন এই নিয়ে যদি কেউ এই সময়ে মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শুরু করেন, তাহলে অন্তত অবাক হবার কিছু নেই। আতস কাঁচের তলায় এখন নতুন করে কতো যে চরিত্র বিশ্লেষণ হচ্ছে, তার হিসাব রাখাই অসম্ভব।
তবে, লেনিনের নিউরোসিফিলিসের উপাখ্যানটির মূল ভিত্তি হলো দুটি জিনিস। এক, একজন জার্মান চিকিৎসককে ডাকা হয়েছিল’ যিনি নাকি নিউরোসিফিলিসে বিশেষজ্ঞ ; আর দুই, লেনিনের এক চিকিৎসক তাঁকে Salvarsan ওষুধ প্রয়োগ করেন। এই ওষুধটি তখন মাত্র কয়েক বছর চালু হয়েছে পল এলরিখ ও তাঁর জাপানি ছাত্র সাহাচিরো হাতার আবিষ্কারে। সেই যুগে সিফিলিসের চিকিৎসায় যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিপন্ন হলেও,এই ওষুধ নিউরোসিফিলিসে আদৌ কার্যকরী কিনা তাও জানা ছিল না। লেনিনের কি সত্যিই নিউরোসিফিলিস হয়েছিল? তৎকালীন প্রচলিত পরীক্ষা ‘ওয়াসারম্যান টেস্ট’ কিন্তু নেগেটিভ ছিল। সেযুগে নিউরোলজির প্রসার এতোটা ছিল না যে ব্রেনের কোনো অসুখের একেবারে সঠিক diagnosis সম্ভবপর হতো। অনেকটাই হতো অনুমানসাপেক্ষে বা বিভিন্ন লক্ষণ মিলিয়ে। অনেক বিখ্যাত মানুষের সম্পর্কেই এই নিউরোসিফিলিসের তত্ত্বটা এসেছিলো। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এডুয়ার্ড মানে, সাহিত্যিক মোঁপাসা, কবি বোদলেয়ার, দার্শনিক নীৎসে, এমনকি আব্রাহাম লিঙ্কনের স্ত্রী, লিও তলস্তয়কে নিয়েও এই নিউরোসিফিলিসের গল্পটা আছে। আমাদের নজরুল ইসলামকে নিয়ে নিউরোসিফিলিসের উপাখ্যান এখনো শেষ হয়েছে কিনা জানি না। কিছুটা স্তিমিত হলেও যে কোনো সময়ে যে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে না, তারও কোনো গ্যারান্টি নেই।
এখন, প্রশ্ন হলো নিশ্চিত না হলে কি চিকিৎসক কোনো সুনির্দিষ্ট রোগের ওষুধ প্রয়োগ করতে পারেন? উত্তরটা হলো অবশ্যই পারেন যেখানে differential diagnosis (সম্ভাব্য রোগের তালিকা)-এ এমন কোনো রোগ আছে যার কিছুটা হলেও চিকিৎসা আছে, আর বাকি কারণগুলোর সেভাবে কোনো চিকিৎসা নেই। এটা শুধু সেই যুগে যখন পরীক্ষার সুযোগ ছিল অতি সীমিত তখনই নয়, এখনো প্রযোজ্য যখন investigation এর সুযোগ অনেক বেশি উপলব্ধ। এটাকে বলা হয় empirical treatment, বাঙলায় ‘অনুমানভিত্তিক চিকিৎসা’। এটার মধ্যে কোনো বদমাইশি বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নেই, সবটাই করা হয় রোগীর ভালোর জন্য, বলা যেতে পারে একটা মরিয়া প্রচেষ্টা। লেনিনের চিকিৎসকও সম্ভবত চেষ্টা করেছিলেন এই ভেবে, যদি নিউরোসিফিলিস হয় তাহলে হয়তো নতুন ওষুধে কাজ করবে। না, ওষুধ প্রয়োগে কোনো লাভ হয়নি, লেনিনের অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটেছে। Salvarsan প্রয়োগ করা হয়েছে ১৯২২ সালে, লেনিন মারা যান ১৯২৪ সালে।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে ১৯১৮ সালের আগষ্ট মাসে ফ্যানি কাপলান নামের এক প্রাক্তন অ্যানার্কিষ্ট মহিলা ব্রাউনিং পিস্তল থেকে পরপর তিনটি গুলি করেন লেনিনকে হত্যার উদ্দেশ্যে। Socialist Revolutionary Party নামে এক বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি দাবি করেন এই সিদ্ধান্ত তার নিজের, কারণ লেনিন বেঁচে থাকলে বিপ্লব ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনটি গুলির মধ্যে দুটি লেনিনের দেহ বিদ্ধ করে, একটি বাঁ দিকের গলা দিয়ে প্রবেশ করে বাঁ দিকের ফুসফুসকে আহত করে ডান দিকের কলার বোনের নিচে অবস্থান করে, আর একটি বুলেট থাকে বাঁ কাঁধে। প্রাথমিক ভাবে ক্ষতস্থানের চিকিৎসা হলেও বুলেট দুটি শরীরে থেকে যায়। ১৯২২ সালে লেনিনের স্বাস্থ্যের অবনতিতে ইউলিয়াস বোরখার্ট নামের এক জার্মান সার্জেন কলার বোনের তলার গুলিটি বার করেন ২৩শে এপ্রিল,১৯২২ সালে (তাঁর জন্মদিনের পরের দিন)। অপারেশন সফল ছিল, কিন্তু পরের মাসেই লেনিনের প্রথম ‘ব্রেন স্ট্রোক’ হয়, শরীরের ডান দিক দুর্বল হয়ে যায়। এর সাত মাস পরে এবং পরের বছরের ‘স্ট্রোকে’ লেনিন পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও বাকশক্তিহীন হয়ে যান। ২১ জানুয়ারী, ১৯২৪ এ তো মারাই যান।
তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর autopsyতে দেখা যায়, gross atherosclerosis of large arteries of brain almost in calcified condition (hard like stone)। এটা কিন্তু নিউরোসিফিলিসের characteristic feature এর মধ্যে পড়ে না। লেনিনের মৃত্যু হয় cerebral atherosclerosis এ। তাঁর বাবার মৃত্যু হয় মধ্য বয়সে ব্রেন স্ট্রোকে। অন্য ভাইদেরও মৃত্যু হয় অপরিণত বয়সে, তাদেরও মস্তিষ্কের সমস্যা ছিল, অর্থাৎ অত্যন্ত শক্তিশালী পারিবারিক যোগাযোগ (strong family history)। সম্ভবত তাদের জিনগত lipid disorder এর সমস্যা ছিল। লেনিনের ব্রেনের বিভিন্ন অংশ কিন্তু এখনো সযত্নে রক্ষিত আছে Moscow Brain Institute এ। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি পুতিনের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর তো খুবই সখ্যতা, তথাগত বাবুরা গিয়ে রিসার্চ করলে তো ভালোই হয়। অবশ্য, ওনাদের ‘রিসার্চ’ সবই হাওয়ায় বা অতি দুর্বল গল্পকথা বা narrative এর উপর নিদারুণ ভাবে নির্ভরশীল, যাদবপুর, জে এন ইউ, জামিয়া মিলিয়া যেখানে তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারবে না।
আসলে মানুষের অকারণে চরিত্রহননে এদের বড়ই উৎসাহ। তবে, ভক্তগণ সাবধানে থাকবেন, এদের কথায় হঠাৎ উৎসাহিত হলে বিপদ আছে। তথাগত রায়, সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর ন্যায় পণ্ডিতবর্গ বিপক্ষের দিকে গোলানিক্ষেপ করতে করতে কখন যে স্বপক্ষের দিকেই কামানের মুখ ঘুরিয়ে দেন, বলা খুবই মুশকিল। কার সিফিলিস আছে বা নেই প্রশ্নটা সেটা নয়, প্রশ্নটা এই ‘সিফিলিটিক দৃষ্টিভঙ্গি’তে আক্রান্ত কারা কারা, সমস্ত জিনিসেই নোংরামো করাই যাদের প্রধান লক্ষ্য!!আসলে, এরা চায়ই না কোনো সুস্থ বিতর্ক হোক। সমস্ত জিনিসকে কর্দমাক্ত করে পুরো বিষয়টাকে অতি নিম্নস্তরে নিয়ে আসাই এদের একমাত্র কর্মসূচি।
আবেদন একটাই, দয়া করে সেই ফাঁদে পা দেবেন না, পাল্টা কাদাছোঁড়ার রাস্তায় গিয়ে। এটা যাদের মানায়, তাদেরই করতে দিন।
লেনিনের চরিত্রহননে বা তাঁর বই শারদোৎসবে বা দুর্গাপূজোয় বিক্রি করা আটকালেই কি বিপ্লবী লেনিনকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যাবে?
কী মনে হয়? সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের মস্তিষ্কে হৃদয়ে যার নাম চিরস্থায়ীভাবে খোদিত হয়ে আছে, তাকে মুছে ফেলা কি এতোই সহজ?!!!……..
নিচের ছবি দুটির প্রথমটি যেখানে লেনিনকে গুলি করা হয়েছিল, সেই জায়গাতেই তৈরি স্মারক প্রস্তর | আর দ্বিতীয়টি তার ৫০ মিটার দূরে তৈরি লেনিনের মূর্তি, প্রথম ছবিতেই যা দেখা যাচ্ছে একটু দূরত্বে।










