ক্রমশই জোরদার হয়ে উঠছে দুই রঙের দ্বৈরথ! গেরুয়া ও লাল। দুটো রঙ-ই বহুদিন যাবৎ সমাজে আছে। তবে সম্প্রতি গেরুয়া ঝাণ্ডার অনুগামীরা তেড়েফুঁড়ে উঠে বলছেন, এটা “মহান সনাতনী ধর্মের ঝাণ্ডা”। লালঝাণ্ডা পন্থীরা গর্বের সঙ্গে বলেন, এটা “শ্রমিকশ্রেণীর তথা শ্রমজীবীদের আন্তর্জাতিক ঝাণ্ডা”।
পশ্চিমবাংলায় এবং ইউনিয়ন স্তরে এখন গেরুয়া শিবিরের ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’। এই অবস্থায় কিছুদিন যাবৎ তেজোদীপ্ত ভাবে শুরু হয়েছে গেরুয়া শিবিরের নেতানেত্রীদের তরফ থেকে সরাসরি হুমকি; সংগঠিত হচ্ছে মিছিল। সর্বত্র বেশিবেশি করে জমা হচ্ছে সাধুসন্তরা। রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ; রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-অরবিন্দ; ক্ষুদিরাম-বাঘাযতীন-মাস্টারদা; গান্ধী-নেতাজী-বিধান রায়; জগদীশচন্দ্র বসু-প্রফুল্লচন্দ্র রায়-মেঘনাদ সাহা… বাংলায় উচ্চশিক্ষার পীঠস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শাসক-মদতপুষ্ট গেরুয়া কৌপিনধারী আধা-ন্যাংটা সাধুদের লাফালাফি দেখলে কী করতেন, জানা নেই!
গেরুয়াপন্থী (আরএসএস-বিজেপি)-দের মজা হলো, তাঁরা বর্তমানে রাজনীতির জগতে ২৪×৭ অতি সক্রিয় থাকলেও, এঁদের পূর্বসূরিরা কখনোই রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। সেইজন্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আমলে এঁরা ব্রিটিশ-বিরোধী কোনো কাজকর্মের ধারেকাছেও কখনো থাকেন নি। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক – কোনোকিছু নিয়েই এঁদের মাথাব্যথা ছিলো না। শুধু সামাজিক ব্যাপার নিয়ে আরএসএস-এর সরসঙ্ঘচালক মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর (ওঁদের ‘গুরুজি’) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে কিছু না-বললেও, বলেছিলেন: খ্রিস্টান, মুসলমান আর কমিউনিস্টরা হচ্ছে ভারতের “আভ্যন্তরীণ শত্রু” (Internal Enemy)। (‘বাঞ্চ্ অব্ থট্’ দেখুন।) সেদিক থেকে বিচার করলে, দুই পুত্র ফিলিপ আর টিমোথি সহ খ্রিস্টান পাদ্রি গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইনস-কে যখন জীবন্ত পুড়িয়ে মারলো সঙ্ঘপরিবারের শাখা ‘বজরঙ্গ্ দল’, তার একটা ‘আদর্শিক’ যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় ‘গুরুজি’-র শিক্ষায়!
আজ যখন পশ্চিমবাংলায় তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমান-বিরোধী নানাধরনের কাজকর্মে নব-জোয়ার এসেছে, তারও ‘আদর্শিক’ শিকড় বোঝা যায়! যত্রতত্র ‘মুসলমান নাম’ পাল্টে দেবার আহাম্মকী কর্মযজ্ঞ তারই অনিবার্য অঙ্গ।
ভাগোয়া ঝাণ্ডাধারি ছত্রপতি শিবাজীর সেনাপতিগণ যে ছিলেন মুসলমান, সেই সিদ্দি হিলাল বা সিদ্দি ওয়াহওয়াহ কিংবা ইব্রাহিম খান অথবা দৌলত খান, এসব কথা আরএসএস-পন্থীরা ভুলেও বলেন না মানুষের সামনে। মুসলমান সম্রাট আকবরের যেসব সেনাপতি ছিলেন হিন্দু, সেই রাজা মান সিং বা রাজা টোডরমল কিংবা রাজা ভগবান দাস অথবা রাজপুত রাজা ভরমল, তাঁদের কথাও ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে কখনোই বলতে শোনা যায় না।
কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে গত চারমাস ধরে আরএসএস পন্থীদের যে তাণ্ডব শুরু হয়েছে এখানে-ওখানে, তাতেও ‘গুরুজি’-র কমিউনিস্ট-বিরোধী শিক্ষার তাৎপর্য পরিস্কার! রাস্তায়-মাঠে-বিধানসভায়, সর্বত্রই আমরা লাল-বিরোধী কর্মসূচির বহর দেখতে পাচ্ছি। ভাঙচুর, পোড়ানো, হুমকি, জবরদখল, – সবই চলছে।
আমাদের আশঙ্কা, এইসব কাণ্ডকারখানার পরিণতি কী হতে পারে!
বাহুবলে কেউ-ই কোনোদিন কোনো আদর্শকে শেষ করতে পারে নি। কারণ তা একেবারেই অসম্ভব। যুগযুগ ধরে বিশ্বের মহাশক্তিধর মাতব্বরগণ আপ্রাণ চেষ্টা করেও কমিউনিস্টদের শেষ করতে পারে নি। হুমকি অত্যাচার খুন, কিছুই কাজে আসে নি তাদের। ক্ষমতা থেকে কোথাও কোথাও কমিউনিস্টদের হঠে যেতে হলেও, মানবসমাজে কমিউনিস্ট মতবাদের বা লালঝাণ্ডার গৌরবময় উপস্থিতি আজও পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদেরে কাছে মহা দুশ্চিন্তার কারণ।
ভারতবর্ষ যখন আন্তর্জাতিক ‘ব্রিকস’ (BRICS) মঞ্চে নিজেদের ভূমিকা আরও প্রাসঙ্গিক – আরও গৌরবময় করে তুলতে সক্রিয়, তখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার সংকীর্ণ ধর্মীয় ভূমিকা অত্যন্ত বেমানান। এটা-ওটা-সেটা, সবকিছুর সঙ্গেই ‘ধর্ম’-কে জুড়ে দেবার বালখিল্য আর অপরিণত প্রয়াসও হাসির উদ্রেক করে! ‘অন্যায় রোধ’ সংক্রান্ত নানারকম মনোহারি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি, ডাঃ ‘অভয়া’-র প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত মূল ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে এখনও কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না-নেবার ঘটনাও বড়োই বেখাপ্পা। কাদের কী লিখতে হবে, কাদের কী খেতে হবে, কাদের কী বলতে হবে, – এসব নিয়ে নিদান দেবার মোড়লিতেই বেশি ব্যাস্ত হয়ে পড়ছে গেরুয়া শিবির!
পরস্পর বিরোধী মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিরকালই সমাজে বিতর্ক থাকে। সেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ যদি বাহুবলে সেক্ষেত্রে জিততে চায়, তখনই মহা গণ্ডগোল ঘটে।
গেরুয়া-লালের মতপার্থক্য বা বিতর্ক নিয়েও সেই একই কথা। আরএসএস-পন্থীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যদি পেশিশক্তির জোরে কমিউনিস্টদের বিনাশ করতে চায়, তার অনিবার্য পরিণতি যা হবার তা-ই হবে। আর যদি তারা সংগঠনে-সংগঠনে সংঘাত সংঘর্ষের পথে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আবাহনকেই শ্রেয় মনে করেন, তবে তার পরিণতিও মোটেই সুখকর হবে না। এটুকু বলাই যায়।
ইতিহাসের শিক্ষা, সামাজিক বোধ, সাংস্কৃতিক পরম্পরা, – এগুলিই আমাদের পথ দেখাবে, সেটাই আশা। সাময়িক অথবা তাৎক্ষণিক ক্রোধের পরিবর্তে, শুভবুদ্ধির চেতনা শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করবে, এটাই কামনা।
পশ্চিমবাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগৎ বঙ্গীয় তথা ভারতীয় বহুমাত্রিক ঐতিহ্যকে যথাযথ মর্যাদা দেবে, এটাই একবিংশ শতাব্দীর বাসনা।।











