বাংলা সাহিত্যে ভন্ড বাবার ইতিহাস বেশ পুরনো। পরশুরাম আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে তাঁর ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পে দেখিয়েছিলেন, কিভাবে একজন অতি সাধারণ, স্কুলের দপ্তরী থেকে আসা লোক, শুধুমাত্র দাড়ি রেখে, চোখে একটু ভক্তির ঘোর লাগিয়ে, আর মুখে দু-চারটে গালভরা বুলি আউড়ে ‘অবতার’ হয়ে যায়। বিরিঞ্চিবাবার ভক্তরা ছিল কলকাতার শিক্ষিত বাঙালি – উকিল, ডাক্তার, প্রফেসর। যারা বিজ্ঞান পড়েছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অলৌকিকের লোভ সামলাতে পারে না। পরশুরাম দেখিয়েছিলেন, বাবার আসল শক্তি অলৌকিকতায় নয়, মানুষের ভয় আর লোভকে ব্যবসা করার কৌশলে।
এর ঠিক চল্লিশ বছর পর সত্যজিৎ রায় এলেন ‘মহাপুরুষ’ নিয়ে। সেখানকার বিরিঞ্চি বাবা আরও আধুনিক। গেরুয়া নয়, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, সোফায় বসেন, ইংরেজিতে দু-একটা শব্দ বলেন, আর তাঁর ম্যানেজার আছে। তাঁর ভক্তও আরও বড়লোক – ধনী ব্যবসায়ী। মহাপুরুষের বাবা আর শুধু ভক্তি বেচেন না, তিনি বিয়ে দেন, সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করেন, রাজনীতির যোগাযোগ ঘটান। সত্যজিৎ দেখালেন, ভন্ডামি যখন কর্পোরেট হয়, তখন তার নাম হয় ‘মহাপুরুষ’। বিরিঞ্চিবাবা যদি কুটির শিল্প হয়, মহাপুরুষ হল তার লিমিটেড কোম্পানি।
আর এখন ২০২৬ সালে আমাদের সামনে বাগেশ্বরবাবা। তিনি এই বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ – বিরিঞ্চিবাবা ও মহাপুরুষের ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল। এখানে আর লুকোছাপা নেই, সরাসরি দরবার বসে, ইউটিউব লাইভ হয়, প্রেত দরবারে নাম ধরে ডাকা হয়, আর ভক্তের তথ্য আগেই হোয়াটসঅ্যাপে চলে আসে। পরশুরামের বাবা ভয় দেখাতেন পরজন্মের, সত্যজিতের বাবা ভয় দেখাতেন ব্যবসায় লোকসানের, আর এখনকার বাবা ভয় দেখান ধর্ম চলে গেল বলে। ভক্তের প্রোফাইলও বদলেছে – আগে ছিল কলকাতার বাবু, এখন গোটা দেশের হতাশ, বেকার যুবক, যার হাতে চাকরি নেই, কিন্তু হাতে স্মার্টফোন আছে, আর বুকে একটা কাল্পনিক হিন্দু খতরে মে হ্যায়-এর আতঙ্ক আছে।
এই তিন বাবার মধ্যে মিল একটাই – তারা কেউই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, তারা শুধু উত্তর বেচে। বিরিঞ্চিবাবা বলতেন, “আমি ত্রিকালজ্ঞ”, মহাপুরুষ বলতেন, “আমি সব জানি”, আর বাগেশ্বরবাবা বলেন, “তোমার বাপের নাম বলব?” তিনজনই জানেন, এই দেশে প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর শোনা অনেক সহজ।
সমস্যা হল, পরশুরাম ও সত্যজিৎ বাবাদের নিয়ে হাসতে পেরেছিলেন, কারণ তখন বাবারা শুধু বৈঠকখানায় ছিলেন। এখন বাবারা আদেশনামা দেন। আর সেই আদেশনামা যখন বাঙালির দুর্গাপূজা নিয়ে আসে, তখন আর হাসি থাকে না, রাগ হয়।
শুনছি, বাগেশ্বরবাবার ভক্তকুল থেকে, বা তাঁদেরই আদর্শে অনুপ্রাণিত কিছু সংগঠন থেকে বাঙালির দুর্গাপূজা নিয়ে জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে – পুজোয় আমিষ কেন, ঢাকের আওয়াজে অশ্লীলতা কেন, অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে শাড়ি কেন পরতে হবে, দশমীতে সিঁদুর খেলা কেন বন্ধ হওয়া উচিত, প্রতিমার পোশাক আরও ‘শালীন’ হওয়া উচিত। অর্থাৎ, বাঙালিকে শেখানো হচ্ছে, দুর্গাপূজা কিভাবে করতে হয়।
এটা অনেকটা আরবের কোনো শেখ এসে বাঙালিকে ইলিশ মাছ কিভাবে ভাজতে হয় শেখানোর মতো।
বাঙালির দুর্গাপূজা কোনো বৈদিক যজ্ঞ নয়। এটা কোনো বাগেশ্বরী ধামও নয়। এটা একটা মাতৃকা উপাসনার উৎসব, যেখানে দুর্গা আমাদের ঘরের মেয়ে। সে উমা, বছরে একবার বাপের বাড়ি আসে। তাই তার পুজোয় ঘি-মন্ত্রের চেয়ে ঢাকের বাদ্যি বড়, শাস্ত্রের চেয়ে আড্ডা বড়, উপবাসের চেয়ে ভোগ বড়। এই পুজোয় মদ্যপানকারীও অঞ্জলি দেয়, নিরামিষাশীও দেয়, যে সারা বছর আমিষ খায় না সেও নবমীতে পাঁঠার মাংস খায়, আর যে সারা বছর মাংস খায় সে-ও অষ্টমীতে নিরামিষ খায়। এটাই বাংলার সহজিয়া ধর্ম – এখানে পাপ-পুণ্যের হিসেব খাতা-কলমে হয় না, হৃদয়ে হয়।
বাঙালির দুর্গা কোনো যুদ্ধং দেহি মূর্তি নন, যিনি শুধু অসুর বধ করছেন। তিনি ঘরের মেয়ে, তাঁর কোলে গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক। তাঁর পুজোয় পুরোহিত মন্ত্র ভুল করলে বাঙালি হাসে, তাকে তাড়িয়ে দেয় না। কারণ বাঙালি জানে, ভক্তিটাই আসল, উচ্চারণ নয়।
এই পুজোকে যারা ‘পবিত্র’ করতে চান, তারা আসলে পুজোটাকে বাঙালির হাত থেকে কেড়ে নিতে চান। তারা চান, দুর্গাপূজাও হিন্দি বলয়ের মতো একটা ভয় দেখানো, গম্ভীর, নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা ইভেন্ট হয়ে যাক, যেখানে ভক্ত মাথা নিচু করে থাকবে আর বাবা ওপর থেকে আদেশ দেবেন।
কিন্তু বাঙালি তা হতে দেবে না। কারণ বাঙালির পুজোয় বাবাদের কোনো জায়গা নেই। এখানে পুরোহিত আছে, কিন্তু বাবা নেই। এখানে ঢাকি আছে, কিন্তু দরবার নেই। এখানে মা আছেন, আর তাঁর ছেলেমেয়েরা আছে।
বিরিঞ্চিবাবা ধরা পড়ে গিয়েছিলেন, কারণ নিতাইবাবু তাঁর ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছিলেন। মহাপুরুষ ধরা পড়ে গিয়েছিলেন, কারণ সত্যরঞ্জনবাবু তাঁর ভন্ডামি ধরে ফেলেছিলেন। আর বাগেশ্বরবাবারাও ধরা পড়ে যাবেন, যখন বাঙালি তার প্যান্ডেলে গিয়ে বলবে, “বাবা, আপনি আপনার ধাম সামলান, আমাদের উমাকে আমরা বুঝে নেব।”
দুর্গাপূজা বাঙালির শেষ প্রগতিশীল দুর্গ। এই দুর্গে কোনো আদেশনামা ঢোকে না, ঢুকতে দেওয়া উচিতও নয়।










