শরৎ তর্পণঃ রত্নগর্ভা বাংলা সাহিত্য জগতের মণিমাণিক্যের ভাণ্ডারে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র গদ্য সাহিত্যের অগ্রদূত হিসাবে যদি শুকতারা হন, তাহলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও প্রকাণ্ড সাহিত্য সৃজন নিয়ে মধ্যগগনের সূর্য। আর শরৎচন্দ্র হলেন শরৎশশী। তাঁর সাহিত্যরস শরৎঋতুর মনোমুগ্ধকর মনোরম স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার মত আবিষ্ট পাঠকের হৃদয় চরাচরে প্রবহমান। তাঁর ভাষা ও গল্প বলার শৈলি সহজ সুন্দর প্রাঞ্জল এবং সর্বজনীন। তাঁর লেখার অর্থ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ব্যখ্যা করে থাকেন, কিন্তু সেগুলির মূল ভাব নিহিত সুধা সাধারণের মননে সহজে প্রতীয়মান। তাই তো তাঁকে সেরা কথা সাহিত্যিক বলা হয়ে থাকে। শরৎচন্দ্রের যখন বাংলা সাহিত্য জগতে আবির্ভাব তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ – ১৯৪১), দিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩ – ১৯১৩) প্রমুখ বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার রা মধ্যগগনে। স্বীয় প্রতিভায় তাঁদের মধ্যেও শরৎচন্দ্র উদ্ভাসিত। এই বছর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (জন্মঃ ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ – মৃত্যুঃ ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) জন্মের সার্ধ শতবর্ষ এবং তাঁর অনন্য সৃষ্টি পথের দাবী প্রকাশের শতবর্ষ।
শরৎ সাহিত্যঃ উপমহাদেশের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র। বিশিষ্ট কবি ও সুরকার সলিল চৌধুরীর নেওয়া স্বনামধন্যা কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলের সাক্ষাতকার এবং অন্যান্য মারাঠা সাহিত্যিকদের থেকে জানা যায় যে শরৎচন্দ্র মহারাষ্ট্রের ঘরে ঘরে বহুল পঠিত ও জনপ্রিয়। কবি ও গীতিকার ওএন কুরুপের লেখা থেকেও জানা যায় শরৎচন্দ্র মালয়ালাম সাহিত্যেও একটি বিশিষ্ট নাম। অসম তথা দেশের অন্যতম সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী ড. ভূপেন হাজারিকা সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কথাকার শরৎবাবুকে সঙ্গীতের মাধ্যমে শ্রদ্ধানম্র খোলা চিঠি লেখেন। তাঁর রচিত প্রবল জনপ্রিয় উপন্যাস দেবদাস বিভিন্ন ভাষায় ২০ বারের বেশি চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯১৭ তে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্ত কোন ব্যক্তি যখন প্রথম পড়েন তখন চমকে ওঠেন। কিভাবে তিনি ইন্দ্রনাথের মত অদ্বিতীয় চরিত্রটি সৃষ্টি করলেন? কিশোর – কিশোরী থেকে বৃদ্ধ – বৃদ্ধা সব বয়সী পাঠকদের তাঁর লেখা আকর্ষণ করে। তাঁর প্রগতিশীল লেখনী সোয়াশত বছর আগে পিসিমা, অন্নদা দিদি, রাজলক্ষী, অভয়া, গফর, কমললতা, গফুর, আমিনা, মহেশ প্রমুখ চরিত্রগুলি কিভাবে সৃষ্টি করল বিস্ময় জাগায়। আবার পথের দাবী পড়ার সময়ও সব্যসাচী, ভারতী চরিত্রগুলির বর্ণনায় শিহরিত হতে হয়। তাঁর পল্লীসমাজ, গৃহদাহ, চরিত্রহীন, বড়দিদি, মেজদিদি, রামের সুমতি, মহেশ, দেনাপাওনা, বিন্দুর ছেলে, একাদশী বৈরাগী, অভাগীর স্বর্গ, পরিণীতা প্রভৃতি উপন্যাস ও গল্প গুলি পড়ে মোহিত হন নি এমন লোক পাওয়া যাবে না। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস ৩০, নাটক তিন, গল্প ২২ এবং বেশ কিছু প্রবন্ধ রয়েছে। তাঁর বেশিরভাগ রচনা বহু ভাষায় অনুদিত এবং চলচ্চিত্রায়িত।
শরৎচন্দ্রের সমাজ বীক্ষাঃ রবীন্দ্রনাথের অসামান্য ছোট গল্প এবং চিন্তাশীল প্রবন্ধ গুলিতে ভারতীয় বিশেষ করে বাংলার সমাজজীবন, সমাজমনস্তত্ব, সমাজসংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জানা যায়। এছাড়া বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, সতীনাথ ভাদুড়ি, সুবোধ ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সমরেশ বসু, রমাপদ চৌধুরী প্রমুখের লেখায় আমরা পূর্ব বাংলা, পশ্চিম বাংলা, উত্তর বাংলা ও বর্তমান বিহার ও ঝাড়খণ্ড কে নিয়ে তদানীন্তন বৃহত্তর বাংলার বিশেষ করে একেকটা অঞ্চলের সমাজজীবন কে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু সমাজের সাধারণের মধ্যে গিয়ে, দীর্ঘসময় থেকে, উপলব্ধি করে, তাকে সাহিত্যসুধায় পরিপুষ্ট করে প্রকাশ করায় শরৎচন্দ্র তুলনাহীন। তাঁর পল্লী সমাজ পড়লেই গ্রাম বাংলার সমাজ জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়া যায়।
শরৎচন্দ্রের দেশপ্রেমঃ তাঁর লেখা পড়লেই বোঝা যায় তিনি মনে প্রাণে কতটা দেশপ্রেমী ও জাতীয়তাবাদী ছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসকদের শোষণ – বৈষম্যের বিরুদ্ধে বলতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর বিখ্যাত পথের দাবী উপন্যাসটি তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেশবাসীকে উদ্দীপ্ত করে চলেছে। মহাবিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু, বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (সি আর মারটিন, মানবেন্দ্র রায়), তারকনাথ দাস, যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, সতীশ চক্রবর্তী দের আদলে ডাঃ সব্যসাচী চরিত্রটি তো বাঙালির চিরকালের নায়ক। ‘বিপজ্জনক’ উপন্যাস অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার পথের দাবীকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আহবানে শরৎচন্দ্র ১৯২১ এ অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন এবং জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং তাঁর কাজে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন। এছাড়াও ১৯২১ – ‘৩৬ অবধি তিনি হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। শরৎচন্দ্র দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। একবার এক বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশের গুলি থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পান। তবে কংগ্রেসের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নাতীত ছিল না। খিলাফত সহ কংগ্রেস নেতৃত্বের বেশ কিছু সিদ্ধান্তে অংশ নিলেও তাঁর অন্যমত ছিল। ১৯২৫ এ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অকাল মৃত্যুর পর তিনি কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
বেঙ্গল ভলান্টিয়ারস সহ সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাঁদের আখড়ায় যেতেন এবং অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে তাঁদের সাহায্য করতেন। বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ, শচীন সান্যাল, উপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, চারু রায়, অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি প্রমুখের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। মহাবিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ র চট্টগ্রাম অভ্যুত্থানে অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
শরৎচন্দ্রের বিস্ময়কর অভিযাত্রা, দেবানন্দপুর ও ভাগল্পুর পর্বঃ পুনরাবৃত্তি হলেও শরৎচন্দ্রের বিস্ময়কর জীবন নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা তাঁকে উপলব্ধির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। হুগলী জেলার দেবানন্দপুরে শরৎচন্দ্রের পৈতৃক গৃহ হলেও দারিদ্রের কারণে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি ভাগলপুরে মাতুলালয়ে প্রতিপালিত। সেখানে তাঁর বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের অনেকগুলি বছর কাটে। এরপর ভাগ্যান্বেষণে বহু জায়গায় ভ্রমণ, বিভিন্ন পেশার কাজ, সন্ন্যাসীর আশ্রম থেকে নিশীথের শ্মশান, সাহিত্যের অনুবাদক থেকে রাজ এস্টেটের কর্মচারী – বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা।
ইস্টার্ন রেলের ব্যান্ডেল স্টেশনের চার কিমি উত্তর – পশ্চিমে সরস্বতী নদীর তীরে দেবানন্দপুর গ্রাম। সেখানে ১৮৭৬ এর ১৫ সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্রের জন্ম। পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা ভূবনমোহিনী দেবী। পিতা শিক্ষিত ও সাহিত্যপ্রেমী হলেও অস্থিরচিত্ত ও ভবঘুরে স্বভাবের কারণে জীবনে কখনও থিতু হতে পারেন নি। সংসারে প্রবল অভাব ও অনটনের কারণে পরিবার নিয়ে ভাগলপুরে শ্বশুরালয়ে চলে যান এবং সেখানে থাকতে শুরু করেন। শরৎচন্দ্রের মাতামহ হালিশহরের কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ভাগলপুরের কালেক্টর অফিসের কেরানি ছিলেন। ভাগলপুর শহরে ছিল তাঁর একান্নবর্তী পরিবার।
শরৎচন্দ্র শৈশবে দেবানন্দপুরে প্রথমে প্যারী পন্ডিতের পাঠশালায় এবং তারপর সিদ্ধেশ্বর মাস্টারের বাংলা স্কুলে কয়েকবছর পড়েন। জানা যায় তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং দুরন্ত বালক ছিলেন। ভাগলপুরে তিনি দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয় এবং জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। সেইসময় তাঁর পিতা দেহরি তে কিছুদিন চাকরি করে তারপর চাকরি হারিয়ে পরিবারকে নিয়ে দেবানন্দপুরে ফিরে যান। সেখানে শরৎচন্দ্র হুগলী ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হয়েও অর্থাভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারলেন না। ঐ সময়ে তাঁর লেখা কাশীনাথ ও ব্রহ্মদৈত্য গল্প দুটির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে ভাগলপুরে মাতুলালয়ে ফিরে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে ১৯৮৮ তে সেভেন্থ ক্লাস থেকে ডাবল প্রমোশন পেয়ে ফিফথ ক্লাসে উঠেছিলেন। ঐ স্কুল থেকে ১৮৯৪ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
এরপর প্রথমে অর্থ জোগাড় করে কলেজে ভর্তি হতে ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁর মাতুল ধারদেনা করে তাঁকে তেজনারায়ন জুবিলি কলেজে ভর্তি করে দেন। প্রবল অর্থকষ্টে টিউশনি করে, বই কিনতে না পেরে অন্যের থেকে বই নিয়ে রাতে পড়ে পরেরদিন সকালে ফেরত দিয়ে পড়াশুনা চালিয়েও ২০ টাকা পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না পেরে এফ.এ. পরীক্ষায় বসতে পারেন না। ফলে পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ততদিনে তাঁর মাতৃ দেবী, মাতামহ, মাতুলদের একে একে মৃত্যু হয়ে ভাগলপুরের একান্নবর্তী পরিবারটি ভেঙ্গে গেছে। শরৎচন্দ্র রা নিকটবর্তী খঞ্জরপুর গ্রামে একটি খোলার ঘরে বসবাস করতে থাকেন এবং সংসার চালানোর জন্য শরৎচন্দ্র বনেলি এস্টেটে কিছুদিন কাজ করেন। শরৎচন্দ্র ক্রমশ স্থানীয় আদমপুর ক্লাবের সঙ্গে খুব জড়িয়ে পড়েন। নাটক, খেলাধূলা, সমাজ সেবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেইসময় নির্ভীক, আদর্শবাদী, পরোপকারী যুবক রাজেন মজুমদারের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা হয়। পরে তাঁর আদলেই ইন্দ্রনাথ চরিত্র নির্মাণ। সেই সময় তিনি একটি সাহিত্য সভা এবং ছায়া নামক একটি হাতে লেখা পত্রিকা পরিচালনা করতেন। ঐ পর্বেই বড়দিদি, দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদা ইত্যাদি লেখা হলেও এগুলি প্রকাশিত হয়েছিল বহু বছর পর শরৎচন্দ্র সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিতি পাওয়ার পর।
পিতার সঙ্গে মনোমালিন্য ঘটার ফলে তিনি গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসীর বেশে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে শুরু করেন। মজঃফরপুরে পরিব্রজনের সময় পিতৃবিয়োগের খবর পেয়ে খঞ্জরপুরে ফিরে পারলৌকিক কাজ সেরে, কনিষ্ঠ ভ্রাতাদ্বয় প্রভাসচন্দ্র ও প্রকাশচন্দ্র এবং ভগিনী সুশীলা দেবীর আত্মীয় দের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে আয়ের উদ্দেশ্যে কলকাতার এক পরিচিত প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীর গৃহে অনুবাদকের কাজ নেন। তাঁর বড়দিদি অনিলা দেবীর আগেই বিবাহ হয়ে গেছিল। কলকাতায় থাকাকালীন এক সুহৃদের অনুরোধে কুন্তলীন প্রতিযোগিতায় অন্য নামে পাঠানো মন্দির গল্পটি প্রথম স্থান অধিকার করে। মাস ছয়েক কলকাতায় থেকে তিনি ভাগ্যান্বেষণে ১৯০৩ সালে জাহাজে করে বর্মায় পাড়ি দেন।
শরৎচন্দ্রের বিস্ময়কর অভিযাত্রা, বর্মা ও হাওড়া পর্বঃ ভবঘুরে জীবনের এই পর্যায়ে তিনি প্রথমে কিছুদিন বেকার থাকার পর বর্মা মুলুকের রেঙ্গুনে রেলের অডিট অফিসের কেরানির কাজ নেন। কিছুকাল পরে প্রথমে পেগুতে তারপর লাঙ্গলাবীনে থাকেন। পরে রেঙ্গুনে ফিরে এসে অডিট অ্যান্ড একাউন্টস বিভাগে কেরানির কাজ নেন। কর্মসূত্রে সেখানেই ১৯১৬ পর্যন্ত ছিলেন। মাঝে ১৯১২ তে একবার এক মাসের জন্য দেশে এসেছিলেন। সেই সময় যমুনা পত্রিকার সম্পাদকের অনুরোধে রেঙ্গুনে ফিরে রামের সুমতি লেখাটি পাঠান। তারপর থেকে বর্মায় থাকাকালীন শরৎচন্দ্র নিয়মিত লেখা পাঠাতেন এবং যমুনা, ভারতবর্ষ প্রভৃতি পত্রিকায় সেগুলি প্রকাশিত হত। তাঁর জনপ্রিয় গল্প উপন্যাসগুলি পাঠকদের হৃদয় জয় করতে থাকে এবং সাহিত্যিক হিসাবে তিনি প্রতিষ্ঠা পান।
রেঙ্গুনের উপকণ্ঠে বোটাটং – পোজংডং অঞ্চলে শরৎচন্দ্র দরিদ্র মিস্ত্রিদের পল্লীতে তাদের সঙ্গেই মিলেমিশে থাকতেন এবং তাদের দরখাস্ত লেখা, তাদের মধ্যেকার বিবাদ – বিস্বম্বাদ মেটানো, তাদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, তাদের বিপদে সাহায্য করা, তাদের নিয়ে গানের দল তৈরি করে নাম সঙ্কীর্তন করা ইত্যাদিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। শরৎচন্দ্র ভাল গান গাইতেন এবং বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। সেখানেই এক বিপদগ্রস্ত নারীকে তাঁর অনুরোধে উদ্ধার করতে গিয়ে তাঁকে বিবাহ (১৯০৬)। অচিরেই (১৯০৭) সেই সময়কার কালান্তক প্লেগ রোগে তাঁর স্ত্রী শান্তি দেবী এবং এক বছরের শিশু পুত্রের মৃত্যু হয়। শোকে বিধ্বস্ত শরৎচন্দ্র নানারকম পড়াশুনা, অঙ্কন ইত্যাদির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। পরে তাঁর গৃহে আগুন লেগে তাঁর সংগৃহীত প্রচুর বই, অয়েল পেন্টিং এবং বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়।
১৯১০ এ আরেক অরক্ষণীয়া বিধবা নারীকে তাঁর পিতার অনুরোধে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর (হিরন্ময়ী দেবী) সঙ্গে বিবাহ। তাঁরা নিঃসন্তান হলেও তাঁদের দাম্পত্য সুখের ছিল। শরৎচন্দ্র হিরন্ময়ী দেবীকে শিক্ষিত করে তোলেন এবং হিরন্ময়ী দেবী পরে লেখালেখি করতেন। ১৯১৬ তে শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনের পাঠ চুকিয়ে সস্ত্রীক দেশে ফিরে হাওড়া শহরের বাজে শিবপুর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। ইতিমধ্যে তিনি একজন যশস্বী সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। বাজে শিবপুর পর্ব তাঁর সাহিত্য জীবনের স্বর্ণ যুগ। এরপর শরৎচন্দ্র তাঁর বড়দিদি অনিলা দেবীর শ্বশুরবাড়ি হাওড়া জেলার বাগনানের কাছে ১৯২৩ এ রূপনারায়ণ নদের তীরে সামতাবেড় বা পানিত্রাসে বাগান ও পুকুর সহ একটি মনোরম কুটির নির্মাণ করে ১৯২৬ থেকে সেখানে থাকতে শুরু করেন। বাজে শিবপুর এবং সামতাবেড়ে থাকাকালীন শরৎচন্দ্র দুঃস্থ মানুষদের সহায়তা, অনাথ ও বিধবাদের আর্থিক সাহায্য, অসুস্থদের চিকিৎসা ও পথ্যের ব্যবস্থার কাজ নীরবে করে যেতেন। তিনি একজন পশু প্রেমী হিসাবেও পরিচিত। দীর্ঘদিন হাওড়া পশু ক্লেশ নিবারণী সংস্থার সভাপতি ছিলেন। ১৯৩৪ এ কলকাতার বালিগঞ্জে অশ্বিনী দত্ত রোডে একটি সুন্দর দ্বিতল গৃহ নির্মাণ করেন। তারপর থেকে অশ্বিনী দত্ত রোডের গৃহ ও সামতাবেড়ের গৃহ মিলিয়ে থাকতেন। ১৯৩৬ এর পর থেকে তিনি যকৃতের ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কলকাতার পার্ক নার্সিং হোমে ভর্তি করে অস্ত্রোপচার করতে হয়। ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮ এ সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
শরৎচন্দ্রের কৃতিত্বঃ ১৯১৬ সালে দেশে ফিরে তিনি পুরোদস্তুর সাহিত্য সাধনা শুরু করেছিলেন। তিনি একসময় বিভিন্ন ছদ্মনামে লিখতেন। ক্রমশ সাহিত্যিক হিসাবে তাঁর খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। বহু অনুষ্ঠানে ও সাহিত্য সভায় তাঁকে সম্মানিত করা হয়। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিনী পুরষ্কার পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি লিট উপাধি দেয়। নিজে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেলেও তাঁর লেখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠক্রমে স্থান পায়।
শরৎচন্দ্র তাঁর সাহিত্যকৃতীর জন্য রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ ও স্নেহের পাত্র হয়ে ওঠেন। বহুবার তিনি শান্তিনিকেতন ও জোড়াসাঁকো তে কবির সঙ্গে দেখা করেছেন। আবার কোন কোন বিষয়ে তাঁরা দ্বিমত পোষণ করতেন। শরৎচন্দ্রের অসুস্থতার খবর শুনে রবীন্দ্রনাথ খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুরও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মানবতাবাদী বৈষ্ণব ধর্ম এবং তার অপূর্ব কীরতনাঙ্গন ধারার প্রতি শরৎচন্দ্রের বিশেষ আকর্ষণ ছিল। হুগলী ও বর্ধমান জেলার বৈষ্ণব আখড়াগুলিতে নিয়মিত যেতেন। এভাবেই কমললতার মত অসাধারণ চরিত্রের সৃষ্টি। আজ থেকে এত বছর আগে পশ্চাদপর পুরুষতান্ত্রিক সামন্ত সমাজেও লেখা ও জীবন অনুশীলনে তিনি নারীর সমানাধিকার কে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
হিন্দু – মুসলমান সম্পর্কে শরৎচন্দ্রঃ শরৎচন্দ্র প্রচলিত জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীদের হিন্দু ও মুসলমান পরস্পর বিরোধী দুই ধর্মের ও সম্প্রদায়ের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কৃত্রিম ও অবাস্তব ঐক্যের ধারণার পরিপন্থী ছিলেন। তাঁর কাছে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যে থাকা মানুষজনের মিলন ছিল স্বাভাবিক জীবনবোধ, জীবনযাত্রা ও কর্মানুশীলনের মাধ্যমে বাস্তব মিলন। গভীর সমাজ চেতনা, স্বচ্ছ দৃষ্টি এবং নিজের জীবন তাঁকে এই শিক্ষা দিয়েছিল। শ্রীকান্ত উপন্যাসের শ্রীকান্তের হরিহর – আত্মা বন্ধু অতুলনীয় গফর চরিত্রটি তার একটি উদাহরণ। শরৎচন্দ্র গান্ধীর খিলাফত আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেসকে সামিল করার বিরোধী ছিলেন। এমনকি পরম শ্রদ্ধেয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের ‘হিন্দু – মুসলিম প্যাক্ট’ নিয়েও দ্বিমত পোষণ করতেন।
“ বছর কয়েক পূর্বে, মহাত্মার অহিংস অসহযোগের যুগে এমনি একটা কথা এদেশের বহু নেতায় মিলিয়া তারস্বরে ঘোষণা করেছিলেন যে, হিন্দু – মুসলিম মিলন চাই-ই। … চাই-ই এইজন্য যে, এ না হইলে স্বরাজ বল, স্বাধীনতা বল, তাহার কল্পনা করাও পাগলামি। … তারপর এই মিলন ছায়া – বাজীর রোশনাই যোগাতেই হিন্দুর প্রাণান্ত হইল। সময় ও শক্তি কত যে বিফলে গেল তাহার ত হিসাব নাই। ইহারই ফলে মহাত্মাজীর খিলাফত আন্দোলন, ইহার ফলে দেশবন্ধুর প্যাক্ট। অথচ এত বড় দুটা ভুয়া জিনিসও ভারতের রাষ্ট্রনীতিক ক্ষেত্রে কম আছে। … খিলাফত – আন্দোলন হিন্দুর পক্ষে শুধু অর্থহীন নয়, অসত্য। কোন মিথ্যাকেই অবলম্বন করিয়া জয়ী হওয়া যায় না। এবং যে মিথ্যার জগদ্দল পাথর গলায় বাঁধিয়া এত বড় অসহযোগ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রসাতলে গেল, সে খিলাফত। “ – বর্তমান হিন্দু – মুসলমান সমস্যা (১৯২৭)।
—————————————————————————————–
কৃতজ্ঞতাঃ শরৎ রচনাবলী জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, শ্রী গোপাল চন্দ্র রায়, ‘শরৎ সমিতি’, ‘প্রকৃতি ভালো পাহাড়’ শরৎ সংখ্যা, ‘দেশ’ শরৎ সার্ধ শতবর্ষ সংখ্যা।
২৫.০৯.২০২৬










