উৎসবের পরিবর্তে শঙ্কা: শরৎ ঋতুর আগমন এবং শারদীয় উৎসব শুধু বাংলায় নয় সর্বত্র বিভিন্ন রূপে প্রতীয়মান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউক্রেন, ইজরায়েল, ইরান যুযুধান দেশগুলির বেশ কিছু অঞ্চলেও এই সময় পর্ণমোচী বৃক্ষরাজির পাতা ঝরে বর্ণালী নবপত্রে চরাচর রঙিন হয়ে ওঠে। আবহাওয়া হয় মনোরম। নানারকম সামাজিক উৎসব, ভ্রমণ, আত্মীয় বান্ধবের গৃহে গমনাগমনের এই সময়। তার সঙ্গে কঠিন শীতের প্রস্তুতি। কিন্তু বিগত কয়েকটি শরতের মত এবারের শরতে এই দেশগুলির এবং সংলগ্ন দেশগুলির ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষদের শুধু উদ্বেগ আর আশঙ্কা।
যুদ্ধ যেখানে ঘরের আঙিনায়: ২০১৪ থেকে রাশিয়া – ইউক্রেন সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ এ রাশিয়ার সরাসরি ইউক্রেন আক্রমণের পর এই অত্যাধুনিক ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কোন বিরাম নেই। সাতটি দেশের সীমান্ত এবং আজভ ও কৃষ্ণ সাগর বেষ্টিত একদা স্বচ্ছল সুন্দর শান্তির পূর্ব ইউরোপীয় দেশ ইউক্রেন এখন পুড়ে ছারখার।
যুদ্ধ যত এগিয়েছে তত মৃত্যু, আঘাত, সম্পত্তি নষ্ট, গৃহহীনতা, বন্দিত্ব, শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। উর্বর সবুজ কৃষি জমি পুড়ে খাক কালো হয়ে গেছে, শহরের দেখার মত সব ঐতিহাসিক স্থাপত্য গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে গেছে, ভেঙ্গে গেছে পরিবার, একাকী অনাথ শিশু শরণার্থী শিবিরে। চার বছরের এই যুদ্ধে ইউক্রেনের ৩.২৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে মৃত ১০ লক্ষের বেশি নাগরিক এবং নানা দেশে ছড়িয়ে পড়া উদ্বাস্তুর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। একদা সম্পন্ন সুখী পারিবারিক তারা কেউ একাকী সস্তা শ্রমিক বা বারবনিতা র মনোবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
রাশিয়া ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ ক্রাইমিয়া, প্রায় সম্পূর্ণ লুহানস্ক, ডোনাস্কের ৮০%, ঝাপারঝিয়া ও খেরসানের ৭৫% এবং খার্কিভ ও খেরসানের একটা বড় অংশ মিলিয়ে ইউক্রেনের ২০% এর বেশি জমি এবং আজভ ও কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী বেশ কিছু বন্দর সহ নৌ চলাচলের পথ দখল করে ফেলেছে। সুমি, ওদেশা বন্দরের কাছে মাইকোলায়েভ প্রভৃতি অঞ্চলে তুমুল যুদ্ধ চলছে। এখন রাশিয়া জমি দখলের চাইতে বেশি জোর দিয়েছে নিজেদের তৈরি এবং উত্তর কোরিয়া ও ইরান থেকে আমদানি করা মিসাইল আর ড্রোন দিয়ে রাজধানী কিভ সহ সমগ্র ইউক্রেনকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে। মধ্য ইউক্রেনে নিপার নদীর পাড়ে অবস্হিত রাজধানী কিভ কে দিনের বেলায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হানায় বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও গ্যাসের প্রয়োগ। আর ঝাপারঝিয়া দখলের যুদ্ধে বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কতটা বিকিরণ ছড়িয়েছে আমাদের জানা নেই।
অন্তহীন এই যুদ্ধ: অন্যদিকে মার্কিন ও ন্যাটোর যুদ্ধাস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং রণকৌশলে বলীয়ান ইউক্রেনের যুদ্ধে সাফল্য বলতে কুরস্ত ওব্লাস্ট দখল এবং মাঝেমাঝে গেরিলা কায়দায় ড্রোনের ঝাঁক ছেড়ে মস্কো সহ কিছু শহর, তৈল শোধনাগার, কিছু সেনা ঘাঁটি ও ক্রাইমিয়া বন্দরের ক্ষয়ক্ষতি করা। এরমধ্যে সবচাইতে বড় আক্রমণটি ছিল ২০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার নিবার্চনের দিন ১৬০০ ড্রোন ছুঁড়ে মস্কোর শহরতলি ও কিছু শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে ক্ষয়ক্ষতি। তারপর রাশিয়া ক্রমাগত ড্রোন ও মিসাইল ছুঁড়ে ইউক্রেনের বাদবাকি জনজীবনকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে।
যুদ্ধে ইউক্রেন বিপর্যস্ত। মার্কিন ও ন্যাটোর বিপুল অর্থ ও মারণ অস্ত্র তাকে বাঁচাতে পারছেনা। বাঙ্কারে বাঙ্কারে অবশিষ্ট নাগরিকদের কাটছে নিদ্রাহীন আতঙ্কের কষ্টসাধ্য জীবন।
অন্যদিকে রাশিয়ার যেগুলি প্রধান সমস্যা: (১) দীর্ঘ যুদ্ধের ধাক্কা ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার দরুণ ভঙ্গুর অর্থনীতি। এটি কাটাতে রাশিয়া পুতিন পৃষ্ঠপোষক রুশ ক্রনি একচেটিয়া বড় ব্যবসায়ী, যাদের বেনামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা আছে, তাদের এবং কালো অর্থনীতির সাহায্য নিচ্ছে; ঘুরপথে তেল ও গ্যাস বিক্রি করছে পশ্চিমকে। মার্কিন রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে চিন, ইরান, ভারত, ভিয়েতনাম প্রমুখ বন্ধু দেশগুলির সঙ্গে ব্যবসা, তেল বিক্রি এবং ডলারের বিরুদ্ধে রুবলের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। (২) অস্ত্রের ঘাটতি। এগুলি নিজেদের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উত্তর কোরিয়া, চিন ও ইরানের থেকে আনিয়ে মেটাচ্ছে। (৩) সৈন্য ঘাটতি। প্রবল শীতের দেশ রাশিয়ার জনসংখ্যা এমনিতেই কম, তার উপর যুদ্ধে বহু সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘাটতি সে পূরণ করতে চেষ্টা করছে ভারত সহ গরীব দেশগুলি থেকে স্থল সেনা ভাড়া করে এবং উত্তর কোরিয়ার পাঠানো সেনাদের দিয়ে। (৪) রাশিয়ার অনেকগুলি তৈল শোধনাগার ধ্বংস হওয়ায় শক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম আম্বানির মালিকাধীন রিলায়েন্সের জামনগর (গুজরাত) শোধনাগার এবং রসনেফট ও কেসানিদের মালিকাধীন নায়ারা এনার্জির ভাদিনার (গুজরাত) শোধনাগার থেকে প্রয়োজনীয় তেল শোধন করে নিয়ে যাচ্ছে এবং সস্তায় পাওয়া বাদবাকি তেল চড়া দামে বিদেশে বিক্রি করে আম্বানি – কেসানি রা মুনাফার পাহাড় গড়ছে।
মার্কিন ফাঁদে পা দিয়ে জেলেনেস্কি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ সামরিক শক্তি রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে ইউক্রেনকে জড়িয়ে ফেলার পর, তার সঙ্গে রুশ ভীতির কারণে ন্যাটোর তাতে জড়িয়ে পড়ার পর, চার বছর পশ্চিমের অঢেল অর্থ ও অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ চলার পরেও ইউক্রেন দেশটি কার্যত ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পর সকলেই বুঝতে পারছেন ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়াকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। এছাড়া যা রক্ষাকবচ হতে পারত ইউক্রেনে থাকা সমস্ত পরমাণু অস্ত্র ও বোমা ইউক্রেন ১৯৯৪ সালে রাশিয়াকে দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন ফাঁদ থেকে এখন আর একদা হাস্যকৌতুক অভিনেতা জেলেনেস্কির বেরিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছেনা। এই সুযোগে মার্কিন ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের মত নিরপেক্ষ নর্ডিক দেশকেও রুশ বিরোধী ন্যাটো জোটে অন্তর্ভুক্ত করে সদস্য সংখ্যা ৩২ এ নিয়ে গেছে, একদা সোভিয়েত অঙ্গরাজ্য জর্জিয়া সহ অনেক দেশকে প্রার্থী সভ্যর জায়গায় নিয়ে এসেছে। পোল্যান্ডে নতুন মার্কিন ঘাঁটি তৈরি করেছে, ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি করে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে সেখানে সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা বাড়াতে চলেছে। ইতিমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের কিছু ড্রোন রোমানিয়ায় পৌঁছে গেছে। জার্মানিতে অতি দক্ষিণপন্থী AfD – র উত্থান ঘটেছে। ট্রাম্পের মূল শক্তি মার্কিনের সমরাস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী শিল্পপতিরা তার আগ্রাসী বিদেশ নীতি ও সমর নীতির মাধ্যমে চলমান বিশ্ব যুদ্ধকে সারা বিশ্বে এইভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল বনাম হিজবুল্লা – হামাস যুদ্ধকে তারা সরাসরি মার্কিন – ইজরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধে পরিণত করে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে। তাতে অন্য আরব দেশগুলির সঙ্গে তুরস্ক ও পাকিস্তান কেও পরোক্ষে জড়িয়ে ফেলেছে। সৌদি ও ইয়েমেন বনাম ইরানের প্রতিরোধ অক্ষের ইয়েমেনি হুথি – ইরাকি কাতেইব হিজবুল্লা ও পিএমএফের ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে। সাইপ্রাস, লেবানন ও সিরিয়া নিয়ে তুরস্ক ও ইজরায়েলের মধ্যে অশান্তি শুরু হয়েছে। যুদ্ধ চলছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এবং আফ্রিকা মহাদেশের বৃহৎ সাহারাকে ঘিরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে গরীব দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশগুলিতে। এরসঙ্গে গৃহযুদ্ধ ও ইসলামি ধর্মীয় মৌলবাদী আগ্রাসনে সেখানে অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্রের ছড়াছড়ি। মায়ানমারের গৃহ যুদ্ধের বিরাম নেই। তাইল্যান্ড – কম্বোডিয়া মাঝেমাঝেই সীমান্ত সংঘর্ষ হচ্ছে। ফকল্যান্ড নিয়ে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ভেনেজুয়েলা দখলের পর ট্রাম্প – হেগশেথের মার্কিন ওয়ার মেসিন কুবা ও কানাডা কে হুমকি দিয়ে চলেছে।
মার্কিন, রাশিয়া, চিন এই তিন বৃহৎ শক্তি এবং উত্তর কোরিয়া আরও ধ্বংসাত্মক সব পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। জাপান পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুত করতে চলেছে। ইরান গোপনে তার পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইজরায়েল তার পরমাণু অস্ত্র ভান্ডারকে তৈরি রাখছে। চিন তাইওয়ান কে ঘিরে এবং সমগ্র দক্ষিণ চিন সাগরে তার দাপাদাপি বাড়িয়েছে। মার্কিন জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত কে নিয়ে তার কাছাকাছি কোয়াডের সামরিক মহড়া দিচ্ছে। এই সমস্ত কিছুর কাছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ, জি ২০, ব্রিকস সহ আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলির ভূমিকা হাস্যকর।
ভঙ্গুর ইতিহাসের সাক্ষী ইউক্রেন: সমগ্র রাশিয়ার প্রায় এক চতুর্থাংশ পশ্চিম অংশ ইউরোপে পড়েছে। রাশিয়ার মধ্য, উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বের অংশ এশিয়ায় যার এক বড় অংশ তুষারাবৃত তুন্দ্রা, তাইগা, সাইবেরিয়ান নিচু ভূমি ইত্যাদি চরম আবহাওয়া ও ভূ প্রকৃতির জায়গা। তাই রাশিয়ার জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্প ইত্যাদি প্রায় বেশিরভাগই তার পশ্চিমের ইউরোপীয় অংশে। আর তারমধ্যে ইউক্রেন ছিল তার সেরা অঞ্চল।
অতীতের ইস্ট স্লাভ; কিয়েভান রাস; মঙ্গোল আগ্রাসন; লিথুনিয়া, পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার দখলদারি এবং অটোমান সাম্রাজ্যের দখলদারি ছাড়াও কসাক হেমান্তের থেকে ১৬৫৪ তে রাশিয়ান জারের (Tsar) কার্যত ইউক্রেন দখল করার পর থেকে মাঝে অল্প সময় ১৯১৭ – ‘১৮ র ইউক্রেনের স্বাধীনতার পর আবার ১৯১৮ – ১৯৯১ অবধি সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) একটি প্রজাতন্ত্র হিসাবে ইউক্রেন বিরাজিত ছিল। আর রাশিয়ার পর বর্তমান ইওরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেন ছিল সমগ্র রাশিয়া এবং ইওরোপের গম ও অন্যান্য শস্যের বৃহত্তম উৎপাদনকারী হিসাবে শস্য ভান্ডার। প্রচুর কয়লা, টাইটেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, লিথিয়াম ইত্যাদি নিয়ে খনিজ ভান্ডার। কৃষিজাত খাদ্য, লৌহ ইস্পাত, সামরিক সরঞ্জাম, জাহাজ নির্মাণ, বিমান নির্মাণ, তথ্য প্রযুক্তি প্রভৃতি শিল্পের মূল কেন্দ্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের সারা বছর ব্যবহার করতে সক্ষম ২৭ টি উষ্ণ সমুদ্র বন্দর, ১৫ টি নদী বন্দরের অধিকারী। এখানে ছিল চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ অনেকগুলি তাপ, জল ও অপ্রচলিত বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র। সবুজ পাহাড়, অরণ্য, নদী, সমুদ্র সব কিছু থাকা ইউক্রেন ছিল নামী সব পর্যটন ও ভ্রমণ কেন্দ্রের অধিকারী। এছাড়াও বিশ্বের অন্যতম রেলওয়ে পরিবহন ব্যবস্থার অধিকারী। ছিল তার দক্ষ মানব সম্পদ এবং ক্রীড়া সম্পদ। ইউক্রেন পরিচিত ছিল সুন্দর স্বাস্থ্যবান মানুষের দেশ হিসাবে। ইউক্রেনের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা কেন্দ্রে ভারত সহ বিভিন্ন দেশের ছাত্র ছাত্রী রা পড়তে আসত।
এহেন সোনার হাঁস কে ১৯৯১ তে সোভিয়েত পতনের পর হারিয়ে বারবার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেও অরেঞ্জ রেভলিউশন, ইউরোমেইডেন, রেভলিউশনস অফ ডিগনিটি প্রভৃতি গণ আন্দোলন এবং পাশ্চাত্যের সমর্থনের ফলে রাশিয়া বিফল হয়। এরপর তারা পূর্ব ইউক্রেনের রুশ সীমান্ত সংলগ্ন রুশভাষী অঞ্চল গুলি দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু জেলেনেস্কি যখন একেবারে মার্কিন ক্যাম্পে যোগ দিয়ে ন্যাটোর সভ্যপদ চেয়ে বসলেন এবং মার্কিন ইউক্রেনে রাশিয়ার দিকে তাক করে আইসিবিএম ক্ষেপনাস্ত্র বসানোর পরিকল্পনা করল তখন পুতিনের রাশিয়া সরাসরি ইউক্রেন আক্রমণের পথ নিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নাৎসি বাহিনীর রাশিয়া আগ্রাসন ও পশ্চাদপসরণের পথে এবং তাদের তাড়া করে রুশ লাল সেনার জার্মানি যাতায়াতের পথে ভয়ংকর সব তাণ্ডব, গণহত্যা, অত্যাচার, গণধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, গোলাগুলি, বোমা বর্ষণ, ধ্বংসের যেন পুনরাবৃত্তি শুরু হয়ে হল।
চলমান বিশ্বযুদ্ধের শারদীয় ধ্বংসোৎসব: আমরা আগের প্রবন্ধগুলিতে লিখেছি বিশ্বের সবচাইতে বড় সামরিক শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সহযোগী শক্তিদের নিয়ে ১৯৯০ – ‘৯১ এর উপসাগরীয় যুদ্ধে রণতরী থেকে বোমারু বিমান ও ক্ষেপনাস্ত্র পাঠিয়ে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী ইরাক কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬ এর যুদ্ধে ইজরায়েল কে সঙ্গে নিয়ে ইরানের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করতে পারলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া, চিন ও উত্তর কোরিয়ায় সাহায্যপুষ্ট বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অধিকারী, প্রাকৃতিকভাবে অনেকটাই সংরক্ষিত বিশাল দেশ ইরানের ৩২ টা সেক্টর ভাগ করে অপ্রতিসম যুদ্ধ, আইআরজিসির নেতৃত্বে শিয়া ধর্মীয় মৌলবাদী – সামরিক নেতৃত্বের হার না মানা মনোভাব ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে কঠোর হাতে সামলে নেওয়া এবং পারস্য সাগরে নৌ গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের কাছে কার্যত পরাজিত হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী বিরাট ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে পড়েছে, মধ্য এশিয়ায় থাকা ১৬ টি ঘাঁটির প্রচণ্ড ক্ষতি হয়েছে, সেখানে থাকা প্রচুর স্থল সেনা মারা গেছে। মার্কিনের নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল আরবের কোন বন্ধু দেশকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হানা থেকে রক্ষা করতে পারে নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উপরন্তু মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বিশাল চাপে পড়ে গেছে।
তথাপি ভিয়েতনাম আর আফগানিস্তানের মত মার্কিনের পক্ষে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে পুরোপুরি সরে আসা সম্ভব নয় কারণ এখানকার তেল, পেট্রো ডলার, এখানকার বিশাল ব্যবসা ও লগ্নি, এতগুলি সামরিক ঘাঁটি, এখানকার ভূকৌশলগত অবস্থান এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তার কারণে। তাই সে প্রস্তুত হচ্ছে ইরানকে আরও বড় ধরনের আঘাত করে এই অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব অর্জন করতে। ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেস দখল রাখতে দেশের মাটিতে জনপ্রিয়তা হারানো ট্রাম্পের মরিয়া চেষ্টা চলছে। অপরদিকে ২৭ অক্টোবর পরবর্তী নেসেট নির্বাচনে নেতানিয়াহু র জনপ্রিয়তা রক্ষারও মরিয়া চেষ্টা চলছে। সেইসঙ্গে ইউক্রেন কে কিছুতেই রাশিয়ার হাতে না দেওয়ার মার্কিন – ন্যাটো জোটেরও আরেক মরিয়া চেষ্টা।
অন্যদিকে অপর দুই বৃহৎ শক্তি রাশিয়া আর চিনের আপ্রাণ চেষ্টা কিছুতেই ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধে যথাক্রমে মার্কিন – ন্যাটো এবং মার্কিন – ইজরায়েল কে জিততে না দেওয়া এবং বিশ্ব জুড়ে মার্কিন সামরিক প্রতিপত্তিকে খর্ব করা। মার্কিন অর্থনৈতিক প্রতিপত্তিকে অনেকটা খর্ব করে অর্থনৈতিক মহাশক্তি হিসাবে চিন নিজেকে তুলে ধরতে অনেকটাই সফল। দুই মহাশক্তিধর যুযুধান পক্ষের এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ নিরস্ত করার কোন মঞ্চ, দেশ বা ব্যক্তি এই মুহূর্তে অনুপস্থিত।
ফলে চলমান বিশ্ব যুদ্ধের শারদীয় ধ্বংসোৎসব চলছে এবং আপাতত চলবে। তাতে আরও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন যে দেশগুলিতে যুদ্ধ চালানো হচ্ছে সেখানকার সাধারণ মানুষ। আর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভারত সহ সারা বিশ্বের মানুষ। প্রকৃতি ও পরিবেশের দূষণ এবং ক্ষয়ক্ষতির কথা তো কহতব্য নয়।
২৯.০৯.২০২৬











