ফুন্টসোলিং হয়ে জয়গা থেকে বাসে উঠে ফেরার সময় পাভেল কর্চাগিন এর হোটেল জীবনে বুঁদ হয়ে কষ্ট পেতে পেতে ফেরা উত্তরবঙ্গের অখ্যাত মফস্বল শহরের বাসিন্দা বালকটির কখনো মনে হয় নি যে বাসে ওঠার ঠিক আগে বাসস্ট্যান্ড এর যে হোটেলটায় পেট পুরে খেয়ে এলো সেই দোকানের টেবিল মোছা ছেলেটির বয়েসও ঠিক পাভেল এর মতো, রাশিয়ার মতো আমাদের দেশেও কিছু একটা হয়ে গেলে হয়তো সেই ছেলেটির হাতে ভিজে টেবিল মোছার ন্যাকড়ার বদলে হয়তো একটা বই থাকতো, হয়তো বইটার নাম হতে পারতো ইস্পাত।
ইস্পাত উপন্যাসের রচয়িতা নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে রোম্যাঁ রঁলা’ বলেছিলেন, “যন্ত্রণাবিদ্ধ অস্থির পৃথিবীকে বিদীর্ণ করে দিয়ে যে নবজীবনের বিস্ফোরণ ঘটে, তারই মধ্যে দিয়ে একটা উদাত্ত সংগীতের মতো কতগুলি অগ্নিময় প্রাণকে নতুন বিশ্বাসের ঘোষণায় আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলে উৎসারিত হতে দেখি। সেই মানুষগুলো এই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেওয়ার পরেও, বহুদিন পর্যন্ত তাঁদের সেই বিশ্বাসের বাণী দিকে দিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে।”
করলা ব্রিজ ছাড়িয়ে নেতাজির স্ট্যাচুর সামনের ফাঁকা জায়গায় বসে আড্ডা দেওয়া মফস্বল শহরের সেই কিশোরের সামনে ইস্কুল ফেরত, বুকের কাছে সযত্নে আঁকড়ে ধরা বইখাতা সহ একঝাঁক লাল পাড় সাদা শাড়ির মধ্যে চোখ যখন খুঁজে বেড়াতো কে হতে পারে তার সেই ইস্পাতের তানিয়া, তখন নতমুখে জঞ্জাল কাচড়া হাটকে বেড়ানো, কাগজ কুড়ানো সেই ছেঁড়া ফ্রকে সেফটিপিন আটকানো কিশোরী তার চোখে ধরা পড়েনি, রাশিয়ার মতো আমাদের দেশেও কিছু একটা হয়ে গেলে হয়তো সেই মেয়েটির কাঁধে মলিন চটের বস্তার বদলে হয়তো বইয়ের ব্যাগ থাকতো যার মধ্যে হয়তো লুকিয়ে থাকতো একখণ্ড ইস্পাত।
ইস্পাত উপন্যাসকে পড়ার আগে বোধ করি তার রচয়িতা সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা দরকার। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় এই লেখকের বয়েস ছিল মায় তেরো। তবু কঠোর শ্রম আর দারিদ্রের অর্থটা তাঁর জানা ছিল তার আগেই। একটা রেল স্টেশনের রেস্তোরাঁয় , তাঁকে কাজ করতে হতো দিনে বারো চোদ্দ ঘণ্টা, সরু আঁকাবাঁকা সিঁড়ি দিয়ে ভারী ভারী সামোভার তুলতে নামাতে হতো, চুল্লিতে জ্বালানির যোগানের কাজ করতে হতো। পনেরো বছর বয়সে তিনি গৃহ যুদ্ধে লড়তে নেমেছিলেন। পরে কিয়েভ রেলওয়ে মেরামতির কারখানা আর রেল পথ নির্মাণের কাজে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। অস্ত্রোভস্কি ইউক্রেনে একজন উৎসাহী কমসমল সংগঠক ছিলেন। যে কোনো কাজে তিনি হাত দিতেন তাতে তিনি ঢেলে দিতেন নিজের অন্তর মন।
গভীর রাতে পার্টির মিটিং সেরে বেনিয়াপুকুর স্ট্রিটের হোস্টেলে ফিরে টকটক করে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠতে উঠতে মফস্বল শহরের সেই যুবকের মনে হত সব ঠিকই তো আছে, দারুণ আলোচনা হল আজ, কেবল কয়েকটা বন্দুক পেলেই, সেই ইস্পাতের কোন চাষীর চালাঘরে বন্দুকের পাঁজা ছিল না, তেমনটা যদি পাওয়া যেত, দুহাতের মুঠোয় একটা বন্দুক। সেই যুবকের খেয়াল হয় নি যে হোস্টেলের গেটের কাছেই বস্তির ঘরে এখনও আলো জ্বেলে যে যুবকটি একমনে জুতো সেলাই করে যাচ্ছে তার হাতে সেলাইকলের বদলে বন্দুক উঠে আসার কথা ছিল যদি রাশিয়ার মতো আমাদের দেশেও কিছু একটা হয়ে গিয়ে থাকতো।
১৯২৪ সালের শেষের দিকে নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দেখা গেল সেটা মেরুদণ্ডের ক্ষয় রোগ। বাল্যে অপুষ্টি আর মাত্রাতিরিক্ত শ্রম, গৃহযুদ্ধের ফ্রন্টে জখম, দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনঃ সংস্থাপনের কাজে তাঁর অমানুষিক পরিশ্রম – এই সবের ই ফল হল ঐ রোগ। এই সাহসী যোদ্ধা সহসা দেখতে পেলেন তিনি অচল – সারা সোভিয়েত দেশ তখন পুনরুজ্জীবনের সৃজনী আগুনে উদ্দীপ্ত। নওজোয়ানরা তখন সামনের সারিগুলিতে – দেশের নতুন নতুন সম্পদ আর নতুন জীবন গড়ার কাজে তারা ব্যাপৃত। সোভিয়েত ইউনিয়নের সেরা সেরা ক্লিনিকের সেরা সেরা ডাক্তাররা অস্ত্রোভস্কির চিকিৎসা করেছিলেন কিন্তু রোগের অবস্থা ছিল চিকিৎসার অসাধ্য। এই তরুণের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে গেল, তারপরে গেল দৃষ্টিশক্তি ও। রোগই জিতে গেল, – রোগ তাকে যোদ্ধা শ্রেনী থেকে সরিয়ে তাঁর ‘শয্যা সমাধি’ অবধারিত করে দিল। কী করবেন তিনি তখন? কী ভাবে বেঁচে থাকবেন? ওই ভাবে কি বেঁচে থাকা যায়?
তাঁর উপন্যাসের নায়ক পাভেল করচাগিনের সামনে এলো এই সব মর্মান্তিক প্রশ্ন। এইসব প্রশ্নের উত্তর বের করবার জন্য চললো অস্ত্রোভস্কির অতি কষ্টকর প্রচেষ্টা। উদ্ধার পাওয়ার একটা চিন্তা এলো: আত্মহনন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি দৃঢ ভাবে সেই উপায়কে বাতিল করলেন, ” জীবন যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন কি করে বাঁচতে হয় সেটা শেখো, জীবনটাকে কাজে লাগাও।”
অখ্যাত মফস্বল শহরের সেই বালক, সেই কিশোর, সেই যুবক এখন প্রৌঢ় হয়ে গেছে। সে জেনে গেছে রাশিয়ার মতো আমাদের দেশেও কিছু একটা আর বোধহয় হবে না। তবুও কেন কে জানে, তার যখনই মন খারাপ হয় সেই ন্যাতা হাতে বালক, সেই কাগজ কুড়ানো কিশোরী, সেই সেলাই কলে ঝুঁকে পড়া যুবকের কথা ভেবে, অজান্তে তার হাত চলে যায় বইয়ের আলমারির দিকে। এটা ওটা সরিয়ে তাক থেকে নামিয়ে আনে দুখন্ড ইস্পাত। সযত্নে ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে বালিশের পাশে রেখে দেয়। বইটা খুলে পড়তে শুরু করে না, বরঞ্চ প্রেসারের ওষুধটা খায়, তারপরে আলো নিভিয়ে শুয়ে পরে। স্বপ্নে চুঁইয়ে যদি দেখা দেয় আরেকবার, শেষবারের মতো পাভেল কর্চাগীন। আজ নিজের জন্মদিনে নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি এসে উপহার দিয়ে যাবেন সেই স্বপ্ন, যেমনটা দিয়েছিলেন সেই অনেক দিন আগে। দিনবদলের স্বপ্ন দেখতে না পেলে মানুষ বাঁচবে কি করে।
১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অতি নিদারুণ শেষ আঘাত হয়ে এলো সম্পূর্ণ অন্ধত্ব – তখন অস্ত্রোভস্কি তাঁর বন্ধু পিওতর নভিকভ এর কাছে চিঠিতে লিখেছিলেন, “নিজের জীবনটাকে অর্থপূর্ণ করে তোলার একটা পরিকল্পনা আমার আছে। ….. শয্যাশায়ী হলেও আমি অসুস্থ নই। ওসব ভুল। একগাদা বাজে কথা। আমি একদম সুস্থ। আমার পা চলে না, দেখতে পাইনা ছাই কিছুই – সব ই একটা নিদারুণ ভুল।”
তিনি উঠে দাঁড়াতে পারবেন না, ভোরের আলোয় তাঁর চোখ মেলবে না আর কখনও। তাহলে কী উপায় ? তিনি উঠে দাঁড়াবেন, দাঁড়িয়ে হেঁটে এসে যাবেন সোজা জীবনের মাঝখানে – নিজের বইয়ের পৃষ্ঠা গুলি থেকে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অস্ত্রোভস্কি কি বলতে চান সেটা তাঁর জানা ছিল। বিপ্লবের এক যোদ্ধা, তাঁকে কখনও জোর করে পিছু হটা নো যায় না, তাঁরই জবানবন্দি হবে সেটা। বইখানি লেখা শেষ হলে অস্ত্রোভস্কি বলেছিলেন, ” এবার বেরিয়ে পড়েছি লৌহ কঠোর বেষ্টনীর ভেতর থেকে …… এখন আমি আবার এসে দাঁড়িয়েছি যোদ্ধাদের সারিতে।
“জীবন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এই জীবন সে পায় মাত্র একটি বার। তাই, এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে বছরের পর বছর লক্ষ্যহীন জীবন যাপন করার যন্ত্রণা ভরা অনুশোচনায় ভুগতে না হয়, যাতে মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষ বলতে পারে আমার সমগ্র জীবন, সমগ্র শক্তি আমি ব্যয় করেছি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য— মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রামে।”
সংঘর্ষ ও নির্মাণের কাজে ব্যাপৃত প্রতিটি মানুষের জীবনের অনুপ্রেরণা সমাজতান্ত্রিক নতুন মানুষ পাভেল করচাগিন এর স্রষ্টা নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির এর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা।













কি যে সুন্দর লেখাটা। বহুদিন পর কমরেড ✊❤️
লেখাটা পড়ে বইটায়পড়া ইচ্ছে জাগে।
অনেক অনেক দিন পর পুরোনো লেখার সেই
স্বাদ।এমন নতুন নতুনও আসুক কলম।