আমার ইসিজি একদম নর্মাল হওয়া সত্ত্বেও আমাকে আরো টেস্ট করতে দিয়েছেন ডাক্তারবাবু। কেন?
এই প্রশ্নটা চিরন্তন। অনেক রোগী তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ইসিজি ধরিয়ে জিজ্ঞেস করেন ইসিজিতে কিছু গণ্ডগোল আছে কিনা! ইসিজি নর্মাল শুনলে তাঁরা আশ্বস্ত হন, এই পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু ইসিজি ঠিক আছে মানে আপনার কোনো সমস্যা নেই এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বস্তুত যে কোনো রোগীর উপসর্গের প্রেক্ষিতে কোনো নর্মাল রিপোর্টই আশ্বাসবাণী নয়, বরং অন্য কারণ সন্ধানের দিকনির্দেশমাত্র।
কথায় আছে “A good speech should be like a woman’s skirt: long enough to cover the subject and short enough to create interest”, ইসিজি হলো হার্টের সেরকমই একটা তাৎক্ষণিক বক্তৃতা মাত্র, দশ সেকেন্ডের খতিয়ান। এই দশ সেকেন্ডের মধ্যে সে রোগীর রোগনির্ণয় করে ফেলতে পারে, আবার এমন হতে পারে সে কোনো সূক্ষ্ম সূত্র দিতে পারে যা পরবর্তী রোগনির্ণয় করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এমনও হতে পারে সে কোনো কিছুই বলতে পারলো না এই দশ সেকেন্ডের গল্পে। সেই জন্য অন্যান্য পরীক্ষা অনেক সময়ই দরকার হয়।
ইসিজি ঠিক কী? আমাদের স্যার পড়াতেন, আমি হয়তো এই বড় হলের মাঝখানে বসে একটা র্যাকেট নিয়ে শট মেরে চলেছি। এবার ঘরের আট কোণায় আট জন বসে সেটা দেখছে। এখন স্বভাবতই এই আটজনের প্রত্যেকের কাছেই আমার হাতের চলনটা বিভিন্ন রূপে ধরা দেবে। শটটা কারো দিকে যাচ্ছে, কারো থেকে দূরে যাচ্ছে, কারো সাপেক্ষে ডানদিকে যাচ্ছে, কারো বাঁদিকে, কারো উপরে, কারো নিচে ইত্যাদি ইত্যাদি।
হার্টের মধ্যেও যে তড়িৎ সঞ্চালন হচ্ছে প্রতিনিয়ত, তাকে বারোটা বিভিন্ন কোণ থেকে জাজ করাই ইসিজির কাজ। এখন হার্টে তো একটা হৃৎপেশী নেই, একটা ইলেকট্রিক্যাল সার্কিটও নেই। লক্ষ লক্ষ হৃৎপেশীর মধ্যে একেকরকম তড়িৎ প্রবাহ হচ্ছে – লক্ষ্যশূণ্য লক্ষ বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে। এই সব বাসনার যে রেসালটেন্ট ভেক্টর, এই ভেক্টরটাই হচ্ছে স্যারের সেই র্যাকেটের শট, যেটাকে আমরা বিভিন্ন দিক থেকে দেখছি।
এখন সমস্যা কী কী? আসল সমস্যা হলো ইসিজি একটা খুবই অ্যাবস্ট্র্যাক্ট জিনিস। লক্ষ লক্ষ তড়িৎপ্রবাহের রেসাল্টেন্ট কার্ভ হলো ইসিজি। স্বভাবতই কোনো নির্দিষ্ট স্থানের সমস্যা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে ইসিজি দেখে অনেক সময়ই বলা যায় না, আন্দাজ করা যায় হয়তোবা। ইসিজি করা হয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য, তার বাইরের হাল হকিকত জানতে গেলে অনেক সময় ধরে ইসিজি করতে হবে, সেটাকে আমরা হল্টার পরীক্ষা বলি। আবার ইসিজি তো বিছানায় শুয়ে করা হয়, কিন্তু মানুষটার বুকে ব্যথা হয় হাঁটতে গেলে। তাই হাঁটতে হাঁটতে ইসিজি করে দেখতে হতে পারে, তাকে আমরা বলি টিএমটি বা ট্রেডমিল টেস্ট। ইসিজি থেকে হার্টের কোনো গঠনগত সমস্যা প্রমাণিত হয় না, তার আভাস পাওয়া যেতে পারে খুব বেশি হলে। তাই সেরকম কিছু সমস্যা আছে কিনা বুঝতে ইকোকার্ডিওগ্রাফি পরীক্ষা প্রয়োজন। অনেক দিনের সুগার, মাঝে মধ্যে হাঁটতে গেলে বুকে ব্যথা হয়, ট্রেডমিলে হাঁটার ক্ষমতা নেই – ইসিজি নর্মাল হলেও এই রোগীর অ্যাঞ্জিওগ্রাফি প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর হঠাৎ খুব বুকে ব্যথা, ইসিজি নর্মাল, ইকো নর্মাল – ট্রপনিন টেস্ট করার দরকার হতে পারে। রোগীর ইসিজি, ইকো নর্মাল হলেও অ্যাঞ্জিওগ্রাফিতে মারাত্মক ব্লকেজ থাকতে পারে, এই ধারণাটার সাথে পরিচিত হতে হবে, এটাই আমরা মানতে চাই না।
তাহলে কি হার্টের রোগের সন্দেহ হলে কি আপাদমস্তক এই সব টেস্ট করতে হবে? না, সবার ক্ষেত্রে সব টেস্ট লাগে না। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে উপরোক্ত সব টেস্টই লাগতে পারে। রোগীর কী কী পরীক্ষা প্রয়োজন সেটা নির্ভর করে রোগীর উপসর্গের উপর, তার সামগ্রিক ক্লিনিকাল পিকচারের উপর। ইসিজি সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি, কিন্তু ইসিজি ই শেষ কথা নয়।











