পুজোর মুখে একটা ভালো খবর। (খেয়াল করুন, অর্বাচীন মাকুদের মতো করে – মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আজ যাদের বইয়ের স্টল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, সেই মাকুদের মতো করে – আমি কিন্তু শারদোৎসব বলিনি, সরাসরি পুজো-ই বলছি।)
তো খবরটা এই, দেবীর অকালবোধনের দিনেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ভেসে এলো – আরজিকরে আর্থিক দুর্নীতির মামলায় জামিন পাচ্ছেন মহামান্য সন্দীপ ঘোষ।
ভালো খবর, বলা-ই বাহুল্য। সবাই যখন দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরছেন – মেডিকেল কাউন্সিলের হর্তাকর্তা থেকে স্বাস্থ্যভবনের হোমরাচোমরা সবাই যখন বহাল তবিয়তে আছেন – চোর-চিটিংবাজ-দুর্নীতিপরায়ণ নেতারাও যখন দিব্যি জামা বদলে বা একটু এদিক-ওদিক করে সুখে-শান্তিতে বিরাজ করছেন – তখন আশ্বিনের এই শারদপ্রাতে, যখন দিকে দিকে শুধুই ইয়ে, যখন মানুষের মন তো বটেই এমনকি রাস্তাঘাটও অনেক বেশী সতেজ স্বাস্থ্যে ভরা, যখন সকলই শোভন, সকলই নবীন, সকলই বিমল (গুটখা নয়), সুনীল আকাশ শ্যামল কানন বিশদ জোছনা কুসুম, যাকে বলে সকই ইয়ে – তখন একা সন্দীপ ঘোষ জেলে থাকবেন, তা-ও আবার তুচ্ছ আর্থিক দুর্নীতির দায়ে – এই অবিচার এমনকি মহামান্য আদালতও সইতে পারেননি।
দেখুন, কোনও এক রাত্তিরে কোনও এক তরুণী ডাক্তার দেবনাথ হাসপাতালে ডিউটি করতে করতে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হন – ডা দেবনাথ রাতারাতি অভয়ায় রূপান্তরিত হন – সে ঘটনা আদৌ ঘটেছিল কিনা, তা নিয়েই আজকাল সংশয় হয়। অন্তত ধর্ষণ যে হয়নি, সে তো এমএলএ-কাকীমা, যিনি পূর্বাশ্রমে মেয়েটির মা ছিলেন, তিনিই বলেছেন – খুনটাও হয়েছিল কিনা সেবিষয়ে এখনও তিনি নিঃসংশয়, পরের টার্ম আসতে আসতে সেটাও হয়ত… যাক গে!
তিনি এ-ও বলেছেন যে সুবিচার পেতে ধৈর্য ধরতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়।
খুবই ঠিক কথা।
অনেক দিন – অনেক সপ্তাহ – অনেক মাস – অনেক বছর – অপেক্ষা করতে না হলে স্মৃতি তেমন ঝাপসা হয় না, যাতে ক্ষতবিক্ষত এক তরুণীর মুখ ভুলে যাওয়া যায়।
অনেক দিন – অনেক সপ্তাহ – অনেক মাস – অনেক বছর – অপেক্ষা করতে না হলে স্মৃতি তেমন ঝাপসা হয় না, যাতে যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল এবং ঘটতে দিয়েছিল এবং ঘটার পর চিহ্ন উধাও করেছিল তাদের নাম ভুলে যাওয়া যায়। এমনকি যাদের জামিনের খবরেও স্তম্ভিত না হয়ে উৎসবে গা ভাসানো যায়।
অনেক দিন – অনেক সপ্তাহ – অনেক মাস – অনেক বছর – অপেক্ষা করতে না হলে স্মৃতি তেমন ঝাপসা হয় না, যাতে কোনও এক নেতার সুর-করে-বলা ভুলিনি-ভুলিনি-ভুলিনি আমি-কমিটেড আমি-কমিটেড আমি-কমিটেড ধ্বনি নিয়ে খিল্লি হতে হতে, সস্তা নাটুকেপনার প্রতি ঘেন্না পেতে পেতে সবকিছুর প্রতি একেবারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠা যায়।
কিন্তু…
কিন্তু…
সবকিছু তো সবসময় প্ল্যানমাফিক চলে না।
বিশ্বাস করুন, সময়ের প্রলেপে সব ঘেন্না, সব ক্রোধ একইভাবে তীব্রতা হারায় না।
প্রশাসনের পরিকল্পিত অপদার্থতা, পবিত্র ক্রোধের প্রশমনের আশায় ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রিতা – একইসঙ্গে সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দেয় ও যাবতীয় পবিত্র আবেগকে খিল্লিতে পর্যবসিত করে যে রাজনৈতিক নাটুকেপনা, সেই অন্তঃসারশূন্য প্রতিশ্রুতি ও দেউলিয়া নাটুকেপনা – এই সমস্ত অন্ধকারের ওপারেই থাকে সত্যের নিজস্ব শক্তি, সত্যের নিজেকে প্রকাশ করার উদগ্র বাসনা।
শেষের এই কথাটা, এই বিশ্বাসটুকু হয়তো আপাতত আপনার হাস্যকর বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস রাখুন, শেষ কথা ওইটাই।












