জনগণকে ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, এক তরুণীর মর্মান্তিক মৃত্যুকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার করে তোলা এবং সাধারণ মানুষের আবেগ ও ন্যায়বিচারের দাবিকে ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যবহার করা—সব মিলিয়ে ডবল ইঞ্জিনের রাজনৈতিক অভিসন্ধি ক্রমশ নগ্ন হচ্ছে। একদিকে সাধারণ মানুষের রুটিরুজির ওপর বুলডোজার, অন্যদিকে অভয়ার বিচার নিয়ে “কমিটেড” হওয়ার প্রতিশ্রুতির আড়ালে তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা ও জবাবদিহির অভাব। এরই মধ্যে আর্থিক দুর্নীতির মামলায় সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেল সন্দীপ ঘোষ!
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ ও বিচারপতি প্রসন্ন বি ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ কলকাতা হাইকোর্টের জামিন বাতিলের নির্দেশ খারিজ করে দেয়। ২০২৪ সালের ২৪ অগস্ট সিবিআইয়ের দুর্নীতি দমন শাখার নথিভুক্ত মামলার ভিত্তিতে ‘স্পেশাল কেস নং ১/২০২৫’-এ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০বি, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগে চার্জশিট দাখিল হয়েছিল।
স্মরণ করা যাক, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ছিল, সরকারি অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ সরাসরি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। অভিযুক্তের প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে সাক্ষীদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা প্রকাশ করেই হাইকোর্ট জামিন খারিজ করেছিল। আজ সেই মামলাতেই সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেলেন সন্দীপ ঘোষ।
কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন অপেক্ষা করছে অভয়ার খুন ও ধর্ষণ মামলায়। সেই মামলায় সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা দিতে পারেনি সিবিআই। তথ্যপ্রমাণ লোপাটের মামলায় হেফাজতে থাকা সন্দীপ ঘোষ সেই মামলাতেই আগেই জামিন পেয়েছেন। আমরা প্রথম থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে এসেছি, সিবিআইয়ের তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থতার সুযোগে আর্থিক দুর্নীতির মামলাতেও একদিন জামিন পেয়ে যাবেন সন্দীপ ঘোষ। আজ সেই আশঙ্কাই সত্যি হল।
দুঃখ পেয়ে লাভ নেই, বিস্মিত হয়েও লাভ নেই। সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। যে মামলায় একটি তরুণীর ধর্ষণ ও খুনের বিচার হওয়ার কথা, যে মামলায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে অভিযুক্তকে হেফাজতে রাখা হয়েছিল, সেই মামলাতেই তদন্তকারী সংস্থা সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা দিতে পারল না কেন? তদন্তের এই হাল কার স্বার্থ রক্ষা করছে? কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
জামিন মানেই নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া নয়। কিন্তু তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা যখন অভিযুক্তের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে, তখন বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্তরা জামিন পেয়ে যায়, অথচ প্রতিবাদী কণ্ঠকে দমনের অভিযোগ ওঠে, জাতীয় পতাকা ওড়ানোর ঘটনায় মানুষকে তিহার জেলে পাঠানো হয়। এ কেমন বিচার, এ কেমন ব্যবস্থা?
আর মহামহিম রাজ্য সরকার! অভয়ার বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ মাস পেরিয়ে কার্যত অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে যে সরকার, তাদের কাছেও আজ কোনও জবাব নেই। এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সিবিআইকে বাধা দিচ্ছিল তাই তদন্তের কাজ এগোচ্ছিল না এটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু আজ কেন্দ্রে ও রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার। তাহলে এখন সিবিআইয়ের এই ব্যর্থতার দায় কার? ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে সিবিআই কী করছে, তার জবাব কে দেবে?
‘অভয়া ভুলিনি’ বলে চিৎকার আর কুনাট্য মঞ্চস্থ করা ছাড়া বিচার নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়? ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের প্রশ্ন প্রথম দিন থেকেই তুলে এসেছে West Bengal Junior Doctors’ Front। অথচ এত আন্দোলন, এত প্রতিবাদ, এত মানুষের আত্মত্যাগের পরেও বিচারপ্রক্রিয়ার এই পরিণতি! অভয়ার বিচারকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সিঁড়ি বানিয়ে মানুষের সঙ্গে এই নিষ্ঠুর প্রতারণা আর কতদিন?
বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে তথাকথিত ‘ওয়াশিং মেশিন মডেল’ নিয়েও ক্ষোভ ও সংশয় ক্রমশ বাড়ছে। সবুজ থেকে গেরুয়া, অভিযোগ থেকে ক্ষমতার অলিন্দে পুনর্বাসন, এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই সন্দীপ ঘোষের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালীরা যদি ব্যবস্থার ফাঁক গলে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার বলয়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান, তবে সাধারণ মানুষ বিচার চাইবেন কার কাছে?
আজকের এই পরিণতি দেখে সত্যিই মনে হচ্ছে, অভয়ার খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় যেন কেউ দায়ীই নয়! আজ যেন গোটা ব্যবস্থা বার্তা দিতে চাইছে, No one killed Abhaya!
এবার শুধু এটুকু দেখা বাকি, সন্দীপ ঘোষকে স্বাস্থ্য ভবনে প্রিন্সিপাল কিংবা ডিএমই পদে আসীন হতে দেখি কি না! যে ব্যবস্থায় তদন্তের ব্যর্থতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আর ক্ষমতার দাপটের কাছে মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা বারবার পরাজিত হয়, সেখানে এমন পরিণতি আর কতটা অবিশ্বাস্য?
এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার! অভয়ার বিচার চেয়ে পথে নামা মানুষের প্রশ্নের উত্তর আজও নেই। আছে শুধু প্রতিশ্রুতি, প্রহসন আর অপেক্ষা।











