চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। সেটা হয়তো খুব একটা কাজের কথা নয় – কিন্তু অন্তত ওটুকু হলে পরের চুরি আটকানো যায়।
এবার পুজোয় পুলিশ, খুব সম্ভবত মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায়, বামপন্থী বইয়ের স্টল ভাঙাভাঙির কাজকেই পাখির চোখ হিসেবে দেখেছিল।
অপকর্মকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সব জরুরি কর্তব্য পেছনের সারিতে চলে গেছিল কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে পুলিশ যখন সংখ্যায় সীমিত, তখন বুকস্টল ভাঙতে ফোর্স পাঠাতে হলে অন্যদিকে কিছু টান পড়াটাই স্বাভাবিক। আর সমগ্র বাহিনীর ফোকাস অন্যদিকে সরে গেলে পুরো ব্যবস্থাটা নড়বড়ে হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু সতের-আঠারোজন মানুষ মারা যাবার পর বসে বসে পুলিশ-প্রশাসনকে গালি দিলে প্রাণগুলো ফিরে আসবে না। এদেশে গাফিলতি যার বা যাদের, তার/তাদের শাস্তি পেতে বিশেষ দেখিনি। তদন্ত কমিটি বসে, একধরনের তদন্তও হয়, কিন্তু দোষী বা দায়ী ব্যক্তি কে সেকথা তামাম দুনিয়া জানতে পারলেও কমিটি তাদের চিহ্নিত করতে পারে না – তদন্তের শেষে, বড়জোর কাউকে একটা বলির পাঁঠা ঠাউরে তাকে শাস্তি দিয়ে বাকি সবকিছু ধামাচাপা দেওয়া হয়। এটাই সিস্টেম।
এক্ষেত্রেও তদন্ত কমিটি বসেছে। যথার্থ দায়ী বা দোষী যারা, তারা শাস্তি পাবে কিনা তার উত্তর সময়ই বলবে।
কিন্তু, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা অনেক দর্শকই বলছেন, পুলিশের ভিড় সামলানোর সিস্টেম এবারে অনেক নড়বড়ে। এই কথা যদি সত্যি হয় – এবং সেই দুর্বলতাই যদি এত বড় দুর্ঘটনার কারণ হয় – তাহলে পুলিশের উচিত এখুনি কলকাতার বড় বড় পুজোর প্যান্ডেল ও তার ঢোকা-বেরোনোর পথ ইত্যাদি পুনরায় পরিদর্শন করা এবং নতুন পরিস্থিতিতে নতুন করে খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। পুজোর এখনও তিনদিন বাকি এবং প্রতিমাদর্শন যেহেতু বন্ধ করা হচ্ছে না (বন্ধ করাটা কাজের কথাও না) – ব্যবস্থাটা যদি সত্যিসত্যিই নড়বড়ে থাকে, তাহলে চটজলদি মেরামতের ব্যবস্থা না নিলে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিছু অসম্ভব নয়। সাধারণ বুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞান বলে, এই মুহূর্তে কলকাতা পুলিশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এটাই।
ব্যাপারটা হয়তো চোর পালানোর পর বুদ্ধি বাড়ার মতোই – তবু, বুদ্ধি যখনই বাড়ুক তা ঠিকই কোনও না কোনও ভাবে কাজে লেগে যায়।
কিন্তু বিস্মিত হয়ে দেখলাম, এই এত বড় দুর্ঘটনার পরেও, গতকাল গভীর রাত্তিরে কলকাতা পুলিশের মস্ত বাহিনী বুলডোজার ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত ছিল যাদবপুর সহ অন্যত্র বামদের বুকস্টল ভাঙার কাজে।
মানুষের ভিড় নতুন নয় – ভিড় বছর বছরই বাড়ছে এবং বাড়ছে ভিড়-বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট কৌশল। সিস্টেম নড়বড় করা ও ভিড়ের চাপে ভেঙে পড়া, সেটাও হয়তো খুব আশ্চর্য ঘটনা নয়। এত বড় দুর্ঘটনা এই প্রথমবার হলেও হবো-হবো পরিস্থিতি এর আগেও হয়েছিল, ঘটব-ঘটব করেও আগে ঘটেনি, এবারে ঘটে গেল – ব্যাপারটাকে দুর্ভাগ্যজনকও বলা যেতে পারে। কোনোটির জন্যই বর্তমান সরকারকে ব্যতিক্রমী রকমের অপদার্থ বলা মুশকিল।
কিন্তু যে জায়গায় এই সরকার সত্যিসত্যিই ব্যতিক্রমী, সেটা হলো বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার চয়ন – এবং দুর্ঘটনা-দুর্যোগ যা-ই ঘটুক, সেই অগ্রাধিকারকেই পাখির চোখ করে কিছুতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট না হওয়া। (গত তিন-চার দশক ধরে যা দেখছি,,পুলিশ চিরকালই কর্তব্যজ্ঞানরহিত আজ্ঞাবাহক – অন্ধ আনুগত্য ও কর্তাভজা মনোবৃত্তি কখনও একটু বেশী আর কখনও একটু কম – তাদের নতুন করে দোষারোপ করার মানে হয় না।)
লক্ষ্য কী, অগ্রাধিকার কী – সরকারী দল তা গোপন করার চেষ্টা করছেন না। কিন্তু আপনি দেখতে পাচ্ছেন কি?










